‘ডাক্তার ভালো করছে’

কথা সাহিত্যিক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর দুই বছর পার হয়ে গেল। যার হাত ধরে অভিনয়ে এসেছেন তিনি আজ নেই। অভিনয়ে তাই এখন তেমন উৎসাহ পান না ডা. এজাজুল ইসলাম। হুমায়ুন আহমেদের মৃত্যুদিনে গ্লিটজের পাঠকের জন্য খুলে দিয়েছেন তার স্মৃতির ঝাঁপি।

>> ডা. এজাজুল ইসলামবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 19 July 2014, 11:35 AM
Updated : 13 Nov 2014, 09:43 AM

আমার শ্রদ্ধেয় হুমায়ূন স্যারের সঙ্গে পরিচয়টাই একটু অন্যভাবে হয়েছে। তার সঙ্গে প্রথম দেখাটা হয়েছিল আমার চিকিৎসাবিদ্যার শিক্ষক ডা. আব্দুল করিমের পিজি হাসপাতালের চেম্বারে। আমি গিয়েছিলাম আমার কাজে। গিয়ে দেখি হুমায়ূন স্যার সেখানে বসে আছেন। তারা দুজনে একই স্কুলে লেখাপড়া করেছেন একসময়।

এর আগে হুমায়ূন স্যারের সঙ্গে কখনো দেখা হয়নি আমার। তারপরও আলাপ করতে গিয়ে তিনি অত্যন্ত আন্তরিক হয়ে পড়লেন। আমার মেডিকেলের শিক্ষক একটা কথা বললে হুমায়ূন স্যার কথা বলতেন তিনটা।  আমার প্রথম দেখাতেই মনে হলো স্যার আমাকে অনেক মায়া করেন, অনেক স্নেহ করেন, অনেক ভালোবাসেন।

পরিচয়ের পরবর্তী এক যুগের অধিক সময় স্যারের সঙ্গে কাজ করেছি। এই দীর্ঘ সময়টুকু ঠিক প্রথম দেখার সময় যে ভাবনা আমার ছিল-- স্যার আমাকে অনেক ভালোবাসেন, অনেক কিছু দিয়েছেন, অনেক স্নেহ করে ফেলেছেন, তার প্রমাণ আমি প্রতি মুহূর্তেই পেয়েছি। প্রত্যেকটি দায়িত্বপূর্ণ কাজে স্যার আমার ওপর ভরসা করতেন অনেক বেশি। এমনকি যে কাজে সমস্যা হতে পারে, ঝামেলা হতে পারে-- এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাজটিও সবসময় স্যার আমাকে করতে দিতেন।

‘অদেখা ভুবন’ নাটকের শুটিং করতে যাওয়ার সময় আমি জানতে পারলাম একটি বাগানবাড়ি করার স্বপ্ন দেখেন স্যার।

‘অদেখা ভুবন’-এর শুটিংয়ে যাচ্ছিলাম বাসে করে। স্যার সামনের দিকে বসা। তিনি আমাকে ডেকে বললেন-- “ডাক্তার আমার একটা সুন্দর বাগানবাড়ির স্বপ্ন। অনেককে বলেছি, সবাই বলে স্যার দেখব দেখব। কিন্তু কেউ আসলে দেখে না। আমাকে বলেই যায় দেখব। পরে কেউ দেখে না। আমি শুধু তোমাকে দায়িত্ব দিলাম-- তুমি আমাকে একটা জায়গা দেখে দিবে। কাউকে কিচ্ছু বলার দরকার নাই। এ দায়িত্ব শুধুই তোমার।”

শুটিং শেষ করার ফেরার পর অনেক খোঁজাখুজি করে এখনকার নুহাস পল্লীর জায়গাটুকু স্যারকে খুঁজে দেই। স্যার অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন। নুহাস পল্লীর জায়গা দেখে আসার পর স্যার আমাকে বলেছিলেন ডাক্তার-- “আমার জীবনে অনেক বড় একটা স্বপ্ন তোমার মাধ্যমে আল্লাহপাক পূরণ করে দিলেন।” আরও বললেন “তুমি কি চাও?” আমি বললাম-- “স্যার আমি আপনার সঙ্গে থাকতে চাই।”

তারপর যখন ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ ছবিটা বানাবেন-- স্যার আমাকে ডেকে বললেন পুরো ছবির দায়িত্ব তোমার। ব্যবস্থাপনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব তোমাকে পালন করতে হবে। আমি পালন করেছি। ছবির শুটিং শেষ হওয়ার পর স্যার আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ ছবির শেষ দৃ্শ্য নেওয়ার পর--“এই ছবির শুটিং আজকে শেষ। যে না থাকলে এ ছবির শুটিং শেষ করতে পারতাম না। সে হচ্ছে আমাদের ডাক্তার।” এই বলে তিনি আমাকে কাছে ডাকলেন এবং বুকে জড়িয়ে ধরলেন। স্যারের চোখে তখন পানি। স্যার কাঁদলেন আমিও কাঁদলাম। এ রকম অসংখ্য দায়িত্ব স্যার আমাকে দিয়েছেন। আমি সব্বোর্চ চেষ্টার মাধ্যমে সফল হওয়ার জন্য কাজ করেছি।

স্যার আমাকে সবসময় ডাক্তার বলে ডাকতেন।

আমার প্রথম অভিনয় স্যারের ‘সবুজ সাথী’ নাটকের মাধ্যমে। স্যার আমার জন্য ছোট্ট একটি দৃশ্য রেখেছেন। দৃশ্যটি বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য সামনসামনি বসে পিতা যেমন পুত্রকে লেখাপড়া শেখায় ঠিক সেইভাবে একটি একটি করে সংলাপ যেভাবে বলেন আমি ঠিক সেইভাবে সংলাপ বলি। কীভাবে অভিনয় করা প্রয়োজন আমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন, আমিও সেভাবে অভিনয় করছি। দৃশ্যটি শেষ হওয়ার পরে বললেন-- “এই আমাদের ডাক্তারতো ভালো অভিনয় করে।”

আমার আনন্দের স্মৃতি অনেক আছে। কিন্তু যখন আমার কোনো কাজে স্যার সন্তুষ্ট হয়ে বলতেন-- “ডাক্তার ভালো করছে।” আমার কী আনন্দ লাগতো, ভাষায় বুঝাতে পারবো না।

স্যারের হাত ধরে আমি আমার অভিনয় জীবনে যেটুকু পেয়েছি-- আমি মনে করি তা অনেক। শুধু অভিনয় জীবনের পাওয়াটুকুই না, একজন আদর্শ মানুষের সঙ্গে থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। একজন মানুষ তার জীবনে এক যুগের অধিক সময় যদি একজন ভালো মানুষের সঙ্গে সময় কাটানোর সৌভাগ্য পায়-- সেটা তার জীবনে অনেক বড় পাওয়া।

জীবন, কাজ, দায়িত্ব থেকে শুরু করে প্রত্যেকটি বিষয়ে স্যার মাঝেমধ্যে আমাদের উদাহারণ, উপদেশ দিতেন-- এগুলো আমার জীবনে অনেক বড় পাওয়া। স্যার চলে গেছেন-- আমি আমার জীবনে অনেক বড় একজন মানুষকে, অনেক বড় একজন অভিভাবককে হারিয়েছি। তার যাওয়ার পরে, কোনো কিছুতেই আমি আগের মতো উৎসাহ খুজে পাইনা। যখনই অভিনয় করতে যাই স্যারের কথা মনে পড়ে।

আমার চিকিৎসাকাজের প্রতি স্যারের শ্রদ্ধাবোধ ছিল। শুটিং করতে গেলে, স্যার অ্যাসিসটেন্ট ডিরেক্টরদের বলে দিতেন-- “ডাক্তারের কাজ শেষ করে তাকে আগে ছেড়ে দাও। ডাক্তার রোগী দেখতে যাবেন।”

স্যার আমাকে ভালাবাসতেন আমি যাতে ভালো অভিনয় করি। এ নিয়ে তিনি ভাবতেনও। আমি যেন ভালোভাবে ডাক্তারি করি সেদিকেও স্যার লক্ষ্য রাখতেন। এমনকি সংসারের প্রতি মনোযোগী যেন থাকি-- এ ব্যাপারেও তিনি নজর রাখতেন। তিনি চলে যাওয়াতে আমার মনে হয় আমি একজন অভিভাবকহীন, এতিম।

সিঙ্গাপুরে গিয়ে স্যারের ক্যান্সার ধরা পড়ল। স্যার দেশে ফিরে আসলে আমি সারাদিন তার বাসায় থাকতাম। আমার বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে যারা আমেরিকায় ছিলেন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সব খবরাখবর জানাতাম।

সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে আসার পর প্রথম দিন আমি যখন সন্ধ্যায় বাসায় যাওয়ার জন্য তার কাছে অনুমতি চাইলাম, ঘরে তখন স্যারের অনেক বন্ধুবান্ধব বসে আছেন। স্যার অনেক জোরে জোরে আমাকে ইংরেজিতে ধন্যবাদ দিলেন। যার অর্থ হিসেবে আমি মনে রেখেছি-- “আমাকে নিয়ে এতো ভাববার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ ডাক্তার।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক