কৌতুকের স্থান নিয়েছে ভাঁড়ামো: টেলি সামাদ

টেলিসামাদ। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অত্যন্ত শক্তিশালী ও জনপ্রিয় কৌতুক অভিনেতা। জন্ম ২০ ডিসেম্বর, মুন্সীগঞ্জের নয়াগাঁও এলাকায়। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা টেলি সামাদ বড়ভাই বিখ্যাত চারুশিল্পী আব্দুল হাইয়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করে পড়াশোনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায়। সংগীতেও রয়েছে এই গুণী অভিনেতার পারদর্শিতা। ‘মনা পাগলা’ ছবির সংগীত পরিচালনা করেছেন তিনি। ১৯৭৩ সালে ‘কার বউ’ দিয়ে তার চলচ্চিত্রে পা রাখা। চার দশকে ৬০০ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন।

>> আহমেদ তেপান্তরবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 2 Jan 2014, 11:17 AM
Updated : 3 Jan 2014, 12:46 PM

সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে কৌতুক অভিনয়ের ধারা সম্পর্কে নিজের ভাবনার কথা বলেছেন টেলি সামাদ।

গ্লিটজ: বাংলা চলচ্চিত্রে কৌতুকের এক বিশেষ অবস্থান রয়েছে। এর  কারণ কী?

টেলি সামাদ: দৈনিন্দিন জীবনে গ্রাম বাংলার মানুষেরা কথায় কথায় মজার ছড়া কেটে আনন্দ করেন। বাঙালি জন্মগতভাবেই রসিক। পরিচালক ও চিত্রনাট্যকাররা বাঙালির এ রসবোধকে চলচ্চিত্রের পর্দায় শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পেরেছেন। এ জন্য কৌতুক বাংলা চলচ্চেত্রে বিশেষ অবস্থান করে নিতে পেরেছে।

গ্লিটজ: ভালো কৌতুক অভিনেতার কী কী গুণাবলী থাকা দরকার বলে মনে করেন?

টেলি সামাদ: আমি মনে করি কৌতুক পরিবেশন সৃষ্টিশীল একটা কাজ এবং সবচেয়ে কঠিন। এই কঠিন কাজটি দর্শকদের কাছে সাবলীলভাবে উপস্থাপন করতে হবে, সুতরাং হাস্যরসের সহজাত একটা ক্ষমতা শিল্পীর থাকতে হবে। যিনি তার চোখ-মুখ, হাত-পা, বক্তব্য, আঞ্চলিকতা-- এগুলোর ব্যবহার সঠিকভাবে করতে পারবেন তিনি সফল হবেন। যেমন রবিউল ভাইয়ের সংলাপ বলতে বলতে কান নাড়ানোর ক্ষমতা ছিল, খান জয়নুল ভাইয়ের কৌতুহল উদ্দীপক স্টাইল, আশীষ কুমার লৌহর কঠিন বাক্য সহজভাবে ডেলিভারির ক্ষমতা। আমি নিজে অভিনয়ের চেয়ে বক্তব্য দিয়ে দর্শক মাতাতে বেশি চেষ্টা করেছি।

গ্লিটজ: অভিনেতা দিলদার মারা যাওয়ার পর চলচ্চিত্রে কমেডিসংকট তীব্র হয়েছে, কথাটি কি সত্য?

টেলিসামাদ: কথাটি খুবই সত্য। দিলদার চলচ্চিত্রে আমার পরে এসেছেন। আমরা দুজন এক সঙ্গে অনেক ছবিতে অভিনয় করেছি। ওর সংলাপ বলার একটা বিশেষ ভঙ্গি ছিল, যেটা দর্শক ভালোভাবে গ্রহণ করেছিল। দেখতে ছোট হওয়া তার জন্য সুবিধাজনক হয়েছিল। দিলদার এই দুইয়ের সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন অত্যন্ত সার্থকভাবে। এক সময় বাংলা চলচ্চিত্রে রবিউল, খান জয়নুল, আশীষ কুমার লৌহ, আনিস, লালু, হাসমতের মতো গুণী কৌতুক অভিনেতারা ছিলেন। আমি তাদের সঙ্গে অভিনয় করেছি। কিন্তু যখন তারা একে একে সবাই চলে গেলেন তখন কমেডি চরিত্রের প্রতিযোগিতা কমে গেল। আর কমেডির ভার দিলদার আর আমার উপর চেপে বসল। ততদিনে কিন্তু গল্প থেকে কৌতুক উঠি উঠি করছে। এ অবস্থায় দিলদার চলে যাওয়ায় হুট করেই একটা শূন্যতা বিরাজ করছে। কৌতুকের স্থলে ভাঁড়ামো স্থান করে নিয়েছে।

গ্লিটজ: এর থেকে উত্তণের উপায় কী?

টেলিসামাদ: সংকট যখন দেখা দিয়েছে, তখন উত্তরণের পথও আসবে। সে ক্ষেত্রে গল্পে, চিত্রনাট্যে, ভাষায় পরিবর্তন আনতে হবে। বলছি না এগুলো বদলে দিতে হবে। হিউমারকে যোগ করে এগুলো করতে হবে। হিউমার বিষয়টা যে সস্তা ভাঁড়ামি নয় তা বুঝতে হবে। আমার প্রশ্ন হচ্ছে টেলিভিশনে যেখানে গল্পের ফাকে বিস্তর হিউমার দিয়ে যাচ্ছেন শিল্পীরা, সেখানে চলচ্চিত্রে কেন সেটা হচ্ছে না। এর কারণ এই দিকটা নিয়ে কেউ ভাবছেন না, যেগুলো আগে মিতা, কাজী জহির, সুভাষদা ভালো বুঝতেন।

গ্লিটজ: আপনি তো নায়কের ভূমিকায়ও অভিনয় করেছেন, পরে কৌতুক অভিনেতা হলেন, কেন?

টেলিসামাদ: আসলে আমি কৌতুক অভিনেতা শুরু থেকেই। যখন টেলিভিশনে পারফর্ম করি তখন থেকেই। চারটি ছবিতে নায়ক চরিত্রে অভিনয় করেছি। দর্শক আমাকে নায়ক হিসেবে গ্রহণ করেছিল। তবে এতটুকু বুঝে নিয়েছিলাম, দর্শক আমাকে কৌতুকঅভিনেতা হিসেবেই বেশি পছন্দ করে।

গ্লিটজ: কলকতার ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় আর বাংলাদেশে খান জয়নুল, সাইফুদ্দিন, রবিউল, আনিস--এদের আপনি কিভাবে মেলাবেন?

টেলিসামাদ: আসলে আমি, খান জয়নুল, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় তিনজনই মুন্সিগঞ্জের এবং একই এলাকার। এদিক থেকে একটা মিল আছে। বৃহত্তর ঢাকার ভাষাকে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতার চলচ্চিত্রে কৌতুক অভিনয়ে অনন্যভাবে ব্যবহার করেছেন। সে ধারাবাহিকতা রাখার চেষ্টা করেছি আমি আর খান জয়নুল। আর যদি চলচ্চিত্রে কমেডিয়ানদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার কথা বলেন, তবে বলব এর শুরুটা কলকাতায় ভানু, জহরের মাধ্যমে। এ বাংলায় সুভাষ দত্ত, খান জয়নুল, সাইফুদ্দিন সেটা দেখিয়েছেন। তারা নায়ক-নায়িকাদের সঙ্গে টক্কর দিয়ে কাজটি করে গেছেন।

গ্লিটজ: কৌতুক অভিনেতা ও ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রের মধ্যে কি আগে একটা প্রচ্ছন্ন প্রতিযোগিতা হত?

টেলি সামাদ: অবশ্যই, অনেক সময় আমরা কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোকে ছাড়িয়ে যেতাম। আমাদের অনেক কৌতুক অভিনেতাই নায়ক চরিত্রে অভিনয় করেছেন। খান জয়নুল ভাই, আমি, দিলদার, হাসমত ভাই-- সবাই এর উদাহরণ। কলকাতাতে, ভানু-জহর এদের উদাহরণ তো আর নতুন করে না দিলেও চলবে।

গ্লিটজ: আপনি যে একজন চারুশিল্পী সে কথা এতদিন প্রচার হয়নি কেন?

টেলি সামাদ: আসলে বড়ভাই (প্রয়াত আবদুল হাই) এত বড় শিল্পী যে একই ঘরে থেকে তার ধারেকাছেও আমি যেতে পারিনি। অভিনেতা পরিচয়ের বাইরে ওই পরিচয়টা তেমন করে বলার সুযোগও হয়নি।

গ্লিটজ: ভবিষ্যতে কী আপনার কোনো একক প্রদর্শনী হবে?

টেলিসামাদ: এর আগে একবার উদ্যোগ নিয়েছিলাম কিন্তু পরিচিতরা এসে ছবিগুলো নিয়ে যায়, তাই একত্রিত করা যাচ্ছে না। তবে এবার বোধহয় একটা প্রদর্শনী করতেই হবে। সে লক্ষে কাজও শুরু করেছি।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক