‘একাত্তরের মা জননী’ আমার স্বপ্নের সিনেমা : শাহ আলম কিরণ

এ বছর সরকারি অনুদান পাওয়া চলচ্চিত্র ‘একাত্তরের মা জননী’র নির্মাতা শাহ আলম কিরণ। বর্তমানে তিনি এই সিনেমার প্রি-প্রডাকশনের কাজ করছেন। এই মুহূর্তে চিত্রনাট্য তৈরি এবং শিল্পী বাছাইয়ের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ব্যস্ততার ফাঁকে গ্লিটজকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে তার নির্মাতাজীবন নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন। সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন রাশেদ শাওন।

রাশেদ শাওনবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 22 August 2013, 11:25 AM
Updated : 23 August 2013, 05:22 AM

রাশা : ‘একাত্তরের মা জননী’র শুটিং শুরু করছেন কবে?

শাহ আলম কিরণ : কথাসাহিত্যিক আনিসুল হকের উপন্যাস থেকে সিনেমাটি তৈরি করছি। গল্পটির আগে-পিছে বিভিন্ন ঘটনা যোগ হবে। এই মুহূর্তে স্ক্রিপ্টিংয়ের ঘষামাজার কাজ চলছে। এরমধ্যে অভিনয় শিল্পীদের বাছাই প্রক্রিয়াও এগিয়ে চলছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে অগাস্টের শেষ থেকে শুটিংয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে।

রাশা : এ ধরনের একটি গল্প বাছাই করলেন কেন?

শাহ আলম কিরণ : এখন পর্যন্ত আমার তৈরি করা সিনেমার সংখ্যা ২৪টি। এর মধ্যে দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিনোদনধর্মী সিনেমা থাকলেও এখন পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের কাহিনি নিয়ে কোনো সিনেমা তৈরি করা হয়নি। সেদিক থেকে আমার বহুদিনের স্বপ্ন ছিল মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে গল্প গড়ে উঠেছে এমন একটি সিনেমা তৈরি করা। এটি সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার উপলক্ষ। এই সিনেমা দিয়ে আমি স্বপ্নপূরণ করতে চাই।

রাশা : চলচ্চিত্র নির্মাতা হয়ে উঠলেন কীভাবে?

শাহ আলম কিরণ : আমি চলচ্চিত্র নির্মাতা হওয়ার আগে যখন স্কুলে পড়ি তখন আমার অভিনেতা হওয়ার খুব শখ ছিল। যখন নাখালপাড়া স্কুলে ক্লাস ফাইভে পড়ি তখন আমি প্রথম মঞ্চে উঠেছিলাম একটি কৌতুক পরিবেশন করতে। এরপর থেকেই স্কুলে নানা অনুষ্ঠানে অভিনয় করতে থাকি। এরমধ্যে আমি যখন ফার্মগেট স্কুলে ক্লাস এইটে পড়ি তখন পত্রিকায় একটি বিজ্ঞাপন দেখলাম। সেখানে বলা ছিল উর্দু সিনেমা ‘আধিরাত’-এর জন্য শিশুশিল্পী নেওয়া হবে। তিন কপি ছবিসহ নির্দিষ্ট ঠিকানায় যোগাযোগ করতে বলা হয়। আমি নিজে নিজেই স্টুডিও থেকে ছবি তুলে কাগজে দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী অফিসটিতে গেলাম। আমার ছবিসহ অন্যান্য কাগজপত্র তাদের দিলাম। তখন ওরা আমাকে বলল আরও তিনশ’ টাকা দিতে হবে। এটা হচ্ছে নিবন্ধন ফি। আর একজন স্কুলে পুঁয়া ছাত্রের কাছে তখন সেটা বিশাল ব্যাপার। টাকাটা আমি দিতে পারলাম না।

এরপর আমি যখন আমি ক্লাস নাইনে উঠলাম, তখন আমাদের ছিলেন প্রতিবেশী চলচ্চিত্র নৃত্যপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম। তিনি টিএন্ডটিতে চাকরি করতেন। আমি তার সঙ্গে এফডিসিতে শুটিং দেখতে গেলাম। অন্যদিকে এটাও ভাবলাম যেহেতু তিনি সিনেমার লোক তাই তাকে ধরলে হয়তো সিনেমায় অভিনয় করার সুযোগ করে দিতে পারেন। একদিন তিনিই আমাকে ডেকে বললেন, তোমার তো কপাল খুলে গেছে। তোমাকে অভিনয় করতে হবে। সিনেমাটির নাম ছিল ‘পারুলের সংসার’। সিরাজুল ইসলাম ভূঁইয়া পরিচালিত সিনেমাটিতে সাত রাজপুত্রের এক রাজপুত্র ছিলাম আমি। এই সিনেমার পরিচালক ছিলেন সিরাজুল ইসলাম। সবকিছু ঠিক হওয়ার পরে আমি তার অফিসে যাই। কস্টিউম বানানোর জন্য মাপ নেয় দর্জি। সবকিছু হয়ে যাওয়ার পরেও আমার দুর্ভাগ্য পিছু ছাড়ল না। শুটিং শুরুর আগে আমার পরীক্ষার ডেট দিয়ে দিল। এবারও অভিনয় করা হল না। তবে আমি তখন মঞ্চে কাজ করতাম। তখন এখনকার মতো নাটকের দল বা গ্রুপ থিয়েটার ছিল না। তবে আমি কল্যাণ মিত্র, শৈলেন গুহঠাকুরতার প্রযোজনায় কাজ করতাম। ‘কুয়াশার কান্না’ নামে একটি নাটকে কাজ করে আমি বেশ প্রশংসিত হয়েছিলাম। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হল; দেশও স্বাধীন হল। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে তখন এফডিসিকে পুনর্গঠন করা হচ্ছে। সে সময় রুহুল আমিন ভূঁইয়া নামে একজন সিনেমা বানাতে চাইলেন। সেক্ষেত্রে আমি অগ্রণী ভূমিকা নিলাম। তিনি সিনেমার প্রযোজক ও পরিচালক। সিনেমার নাম ‘দস্যুরাণী’। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন আলগীর ও শাবানা। খলচরিত্রে অভিনয় করেন সে সময়ের আলোচিত অভিনেতা রাজু আহমেদ। এই সিনেমায় আমি প্রযোজকের লোক, আবার অ্যাসিটেন্টও। ছোট্ট একটি চরিত্রে অভিনয়েরও সুযোগ পেয়ে গেলাম। এভাবেই চলচ্চিত্রে আসা।

রাশা : পরিচালক হিসেবে কখন কাজ শুরু করলেন?

শাহ আলম কিরণ : প্রথম সিনেমাটি করার পরে দেখলাম, আমার সবকিছু ম্যাচিউরড নয়। অনুভব করলাম পড়ালেখা শেষ করা দরকার। বাড়ি থেকেও সে দিকেই চাপ দিচ্ছিল। সিনেমার কাজে একটা বিরতি পড়ল। সে সময় আমি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ি। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর রাজনীতি থেকে একেবারে সরে আসি। তখন আবার চলচ্চিত্রে মনোনিবেশ করি। সেই থেকে আজও কাজ করে যাচ্ছি। বিরতির পরে প্রথম কাজ করি ‘সাধু শয়তান’ সিনেমায়। প্রয়াত নির্মাতা মুহম্মদ সাঈদের প্রধান সহকারী হিসেবে কাজ করলাম। এরপর ধারাবাহিকভাবে মোতালেব হোসেন, নূর হোসেন বলাই, এ. জে. মিন্টু, কামাল আহমেদের সঙ্গে কাজ করি। আশির দশকে শুরুতে আজমত উল্লাহ মিঠুর প্রযোজনায় প্রথম সিনেমার কাজে হাত দিই। সিনেমার নাম ছিল ‘নিয়তির খেলা’। অভিনয় করেন উজ্জ্বল, অঞ্জু ঘোষ, দিতি।

সিনেমাটি যখন শেষের দিকে তখন একদিন প্রধান অভিনেত্রী অঞ্জু ঘোষ আমার নির্দেশনার বাইরে গিয়ে কাজ করে। আমার গুরু এ. জে. মিন্টু আমাকে শিখিয়েছিলেন একটি সিনেমায় পরিচালকই হলেন প্রধান। তিনি যা বলবেন, অন্য শিল্পীরা তাই করবেন। আমি অঞ্জুর এমন আচরণে শুটিং প্যাক করে দিই। পরে সিনেমার চিত্রনাট্য বদলে নতুন চিত্রনাট্য করে সিনেমাটির কাজ শেষ করি। সিনেমার শুটিং শেষে যখন আমি মিউজিকের কাজ করছি তখন সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে মির্জা আব্দুল কাদের দ্বিতীয় সিনেমা করার প্রস্তাব দিলেন। আমি তখন তাকে জানালাম আমার প্রথম সিনেমা যদি দর্শক নেয় তবেই আমি পরের সিনেমা করব। ‘নিয়তির খেলা’ ১৯৮২-৮৩ সালে মোটামুটি ব্যবসা করল। আমি মির্জা আব্দুল কাদেরের প্রযোজনায় আমার দ্বিতীয় সিনেমা ‘অশান্ত সংসার’ তৈরি করলাম। সেই থেকে এখন পর্যন্ত আমার বানানো ২৪টি সিনেমা  মুক্তি পেয়েছে। এর বাইরে দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাক্সবন্দি হয়ে আছে দুটি সিনেমা। আমার বানানো ‘সাজঘর’, মাটির ঠিকানা’ প্রভৃতি সর্বাধিক আলোচিত সিনেমা।

রাশা : এ বছর সরকারি অনুদানে সিনেমা বানাচ্ছেন। সিনেমাটি মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে। এই সিনেমা নিয়ে আপনার মতামত জানতে চাই।

শাহ আলম কিরণ : প্রতিটি মানুষেরই স্বপ্ন থাকে এমন কিছু করার যা তাকে বাঁচিয়ে রাখবে। সৃষ্টিশীল মানুষদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা আরও বেশি। আমি এ ধরনের কাজ করার যখনই সুযোগ পেয়েছি তা কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি। কলকাতার নির্মাতা গৌতম ঘোষের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’তে যৌথ পরিচালক হিসেবে কাজ করেছি, যদিও তখন আমি বেশকিছু সিনেমা বানিয়ে নির্মাতা হিসেবে পরিচিত। এখানে উল্লেখ করতে চাই বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ প্রযোজনার সিনেমা আমিই বেশি করেছি।  আমি এই কাজগুলো করেছি কারণ আমি ভাবতাম ওদের সঙ্গে কাজ করলে ওদের শিল্পী, নির্মাতা, প্রযোজক, কলাকুশলিদের কাজ করার ধরন আমার আয়ত্বে আসবে। তাই হয়েছে। আমি শিখেছি অনেক। যাই হোক এই বয়সে এসে আমি আমার স্বপ্নের কাজটি করতে চাইছি এখনই। কেননা ভবিষ্যতে আমার এই শক্তি নাও থাকতে পারে। সরকার আমাকে যে সুযোগ দিয়েছে এ জন্য আমি কৃতজ্ঞ।

অনেকেই আমাকে প্রশ্ন করেন আপনি মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্মের মানুষ হয়েও কেন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সিনেমা করেননি। এই জায়গাটা থেকে আমি বেরিয়ে আসতে চাই। যদিও আমি জানি মুক্তিযুদ্ধ একটা বিশাল বিষয়। আড়াই ঘণ্টার মধ্যে সেলুলয়েডে ধারণ করা খুবই কঠিন। একে ঠিকভাবে তুলে ধরতে গেলে অনেক সময়, অনেক গবেষণা, অনেক অর্থের প্রয়োজন। তারপরও আমি হাল ছাড়িনি। মনে মনে একটি গল্প খুঁজছিলাম। আনিসুল হকের উপন্যাস ‘সাহসিনী জননী ১৯৭১’ পড়ার পরে আমার মনে হয়েছে এই গল্পটি আমার সিনেমার প্লট হতে পারে। এখানে মুক্তিযুদ্ধের নয়মাস আছে। এর আগে ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের অনেক ঘটনাই আছে বিক্ষিপ্তভাবে। সবকিছু মিলিয়ে এটা নিয়ে একটি সুন্দর মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা হতে পারে। আমার কাছের কয়েকজনের সঙ্গে এটা নিয়ে কথা বললাম। এরপরে আমি গল্পটি জমা দিই। এখানে সরকার যে অর্থ দেবে তা দিয়ে পুরো সিনেমা হয়তো হবে না। তবে সরকার আমাকে যে সম্মান করছে, তার জন্য নিজেকে সম্মানিত মনে করছি। এই সিনেমা নিয়ে অনেক কথাই হচ্ছে। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে বলতে চাই না, এটা আমার শেষ সিনেমা। আমি শুধু এতটুকু বলব, ‘একাত্তরের মা জননী’ আমার স্বপ্নের সিনেমা। একটি ঘটনা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের নতুন চেতনাকে আমি দর্শকদের উপহার দিতে পারব এই বিশ্বাস আমার আছে।

আমি মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছি। এর সবকিছু আমার খুব কাছ থেকে দেখা। সেই চিন্তা থেকে সিনেমাটি নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন। আমার বিশ্বাস যা কিছু অর্জন করেছি এবং যে সামর্থ আছে তা দিয়ে একটি ভালো সিনেমা দেশকে উপহার দিতে পারব।

রাশা : ‘ওরা এগার জন’ থেকে ‘গেরিলা’ পর্যন্ত বেশকিছু মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা হয়েছে। সেক্ষেত্রে আপনার সিনেমাটির বৈশিষ্ট্য কী হবে?

শাহ আলম কিরণ : এক্ষেত্রে আমি নাসির উদ্দীন ইউসুফকে তার ‘গেরিলা’ সিনেমার জন্য ধন্যবাদ জানাই। এরপরে আমি বলব, নাসির উদ্দীন ইউসুফ আমার চাইতে মুক্তিযুদ্ধকে অনেক বেশি চেনেন। তিনি গেরিলা যোদ্ধা ছিলেন। একটি সেক্টরের নেতৃত্বও দিয়েছেন তিনি। তার এই সিনেমাটিও ছিল অনেক বড় বাজেটের। আর আমার এই সিনেমার সঙ্গে পার্থক্য হচ্ছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে পুরুষদের মধ্যে যারা যুদ্ধ করতে গিয়ে মারা গেছেন তাদের শহীদ বলছি। যারা সাহসিকতা নিয়ে যুদ্ধ করেছেন তাদের নানা খেতাব দেওয়া হয়েছে। অথচ নারীরা যারা তাদের সবকিছু হারিয়েছেন, তাদের বীরাঙ্গনা বলেই অধ্যায়টা শেষ করে দিয়েছি। উপর থেকে দেখলে মনে হয় শুধু পুরুষরাই যুদ্ধ করেছেন। এখানেই আমার কিছু কথা। এই গল্পটির নাম ‘একাত্তরের মা জননী’। তার মানে এখানে প্রধান চরিত্রটি একজন নারীর। এই গল্পের বিশেষত্ব হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধে নারীরা শুধু নির্যাতিত হয়নি। একজন নারী কীভাবে একটা ক্যাম্পের সমস্ত শত্রুসৈনিককে মেরেছে তার গল্প। বিক্ষিপ্তভাবে অনেক কাহিনি কিন্তু আছে। তারামন বিবিরা এখনও জীবিত। তারা সেই ইতিহাসে সাক্ষী। আনিসুল হক তার উপন্যাসের গল্প ফাঁদার জন্য অনেক কল্পনানির্ভর গল্প বললেও একটি নারীর সত্য ঘটনা তিনি তুলে ধরেছেন। যে একটি ক্যাম্পকে ধ্বংস করে দিয়েছিল, সেই নারীকে নিয়েই এই সিনেমা। এই জায়গায় আমার সিনেমা অন্যান্য সিনেমা থেকে আলাদা। প্রত্যেক নির্মাতাই আলাদা কিছু উপস্থাপন করতে চায়। সেদিক থেকে এ ধরনের গল্প নিয়ে চলচ্চিত্র হলেও আমার দিক থেকে চেষ্টা থাকবে স্ক্রিনে আমার গল্পটি বলার। সেটি পারলেই আমি স্বার্থক।

আমার এই গল্পটা শুরু হবে মুক্তিযুদ্ধের ক্যানভাস থেকে। এই ক্যানভাস শুরু হবে ঊনসত্তরের গণআন্দোলন থেকে। এখানে থাকবে ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ। এরপরে আসবে ২৫ মার্চের কালরাত্রি। এই ক্র্যাকডাউনের পরে আমি আর পুরো বাংলাদেশ নিয়ে থাকতে পারছি না। আমি চলে যাবে নির্দিষ্ট ঘটনার দিকে। সেখান থেকে আমি শেষ করব যুদ্ধাপরাধীদের দিয়ে।

রাশা : সিনেমাটি কোন প্রক্রিয়ায় তৈরি হবে?

শাহ আলম কিরণ : সিনেমা তৈরির ক্ষেত্রে আমাকে দুটি বিষয়ে ভাবতে হচ্ছে। একটি হচ্ছে সিনেমাটি আমরা কোথায় দেখাব এবং এর খরচটা কেমন হবে। এটা ভাবতে গিয়ে কিছুটা কম্প্রোমাইজ করতে হচ্ছে। যাই হোক, আমি চাই সিনেমাটি একটি আর্ন্তজাতিক পর্যায়ে যাক। সেই দিক থেকে বিএফডিসিতে এখনও পঁয়ত্রিশ মিলিমিটারে সিনেমা তৈরিতে সুবিধা বেশি। তাই আমার সিনেমাটি ৩৫ মিলিমিটারে তৈরি করছি। এখন তো চাইলেই ৩৫ মিলিমিটারের সিনেমাকে ডিজিটালে কনভার্ট করা যায়। তাই এই সিনেমাটি ৩৫ মিলিমিটার ক্যামেরাতেই করছি।

রাশা : আপনার দৃষ্টিভঙ্গিতে নিজের তৈরি করা সেরা সিনেমা কোনগুলো?

শাহ আলম কিরণ : আমি প্রথম যে সিনেমাটি করেছি সেটাকে ধরবই। সিনেমাটির ভুলত্রুটি থাকতে পারে। কিন্তু সেখানে আমার সবটুকু আবেগ ছিল। এরপরে আমার ভালো কাজগুলোর একটি ‘সুজন সখী’। এটি খান আতাউর রহমানের সিনেমা। আমি এটাকে রিমেক করেছি। আলোচিত সিনেমা হল-- ‘চুড়িওয়ালা’, ‘জীবন দিয়ে ভালোবাসি’, ‘বিচার হবে’, ‘আসামী বধূ’, ‘ঘরজামাই’ প্রভৃতি।

রাশা : আমাদের চলচ্চিত্র নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে, এটি কীভাবে দেখেন?

শাহ আলম কিরণ : আমি সবসময় আশাবাদী মানুষ। আমি মনে করি চলচ্চিত্রের যে সংকট সেটা কেটে যাবে। ভারতেও এই রকম বন্ধ্যাসময় গেছে। তারা যত সময় নিয়ে এই সংকট কাটিয়ে উঠেছে, আমরা তার চাইতেও অল্পসময়ে এই বন্ধ্যা জায়গা থেকে বের হতে পারব বলে আমার বিশ্বাস। আমাদের চলচ্চিত্রের সংকট তৈরি হয়েছিল কিছু লোভী নির্মাতার অশ্লীল সিনেমার কারণে। এতে দর্শক ভয় পেয়ে গিয়েছিল। তখনই আমাদের প্রকৃত দর্শক সিনেমাবিমুখ হয়। সেই সময়টা থেকে আমরা বেরিয়ে এসেছি। আর একটা কারণে সংকট তৈরি হয়েছে। সেটা হল ভিডিও পাইরেসি ও কেবল টিভির আগ্রাসন। এতে প্রযোজকরা বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। আর দর্শকদের ঘরে বসিয়ে দিয়েছে। এখন অবশ্য সেই জায়গা থেকে বের হতে শুরু করেছি। এখানে আরও একটি বিষয় আমাকে আশাবাদী করছে। বর্তমানে যারা সিনেমা করতে আসছেন, তারা জেনে-বুঝে কাজ করছেন। কারণ তাদের হাতের মুঠোয় এখন পুরো বিশ্ব। চলচ্চিত্রের আপগ্রেডেড টেকনলোজি তাদের হাতে। আমরা কিন্তু এই সুযোগটা পাইনি।

রাশা : নির্মাতা ও অভিনয় শিল্পী নিয়েও তো সংকট আছে। এ প্রেক্ষিতে আপনার মত কী?

শাহ আলম কিরণ : মান্নার মৃত্যুর পরে আমাদের চলচ্চিত্র শাকিব খান নির্ভর হয়ে যায়। কারণ ওই সময়ে কোনো ভদ্র পরিবারের কেউ চলচ্চিত্রে আসতে চায়নি। এখানে কোনো ভবিষ্যত ও সম্ভাবনা না থাকায় এই নির্মাতা ও শিল্পী সংকট তৈরি হয়েছিল। এখন সেই মেঘ কাটতে শুরু করেছে। এক দেড় বছরে অসংখ্য তরুণ নির্মাতা ও নবাগত শিল্পী এসেছেন। তারা নিয়মিত কাজও করছেন। এদের ভিতর থেকে প্রকৃত মেধাবীরা টিকে যাবেন। তারাই এই শিল্পটাকে বদলে দেবেন। আর বিনিয়োগকারীরাও এখন অনেক বেশি আগ্রহী। অনেক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান এই শিল্পে অর্থ লগ্নি করতে আগ্রহী হয়েছে। সবই পরিবর্তনের পূর্বাভাস। আমার বিশ্বাস দুই বছরের মধ্যে ঢাকাই সিনেমা একটি কাঠামোর মধ্যে চলে আসবে।

রাশা : আপনি এই এলাকার স্থানীয় মানুষ। বিএফডিসিকে দেখতে দেখতে বড় হয়েছেন। অনেক বছর ধরে কাজ করছেন। সেক্ষেত্রে বিএফডিসির আধুনিকায়ন করে কাজের উপযোগী করে তুলতে হলে কী করণীয়?

শাহ আলম কিরণ : এখনও বিএফডিসি একটি মন্ত্রণালয়ের অধীন। সরকারের তত্ত্বাবধানেই এর সব কাজ হয়। সরকার এ রকম অনেক প্রতিষ্ঠান চালাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ এর অভ্যন্তরে নানা ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থাকে। সেক্ষেত্রে এর উন্নয়নের জন্য বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিলে দ্রুত উন্নয়ন সম্ভব।

রাশা : আপনার জন্ম, পিতামাতা ও পরিবার সম্পর্কে জানতে চাই।

শাহ আলম কিরণ : জন্ম নোয়াখালির প্রত্যন্ত অঞ্চলে ১৯৫১ সালের ২১ নভেম্বর। আমার পিতা প্রয়াত আলহাজ মফিজুর রহমান ভূঁইয়া। মা আয়েশা রহমানও অনেক আগেই প্রয়াত হয়েছেন। আমার যখন দেড় বছর বয়স, তখন বাবা মা নোয়াখালি থেকে ঢাকার নাখালপাড়ায় চলে আসেন। পরে এখানেই স্থায়ী বসতি গড়েন। আমার পরে আরও পাঁচ ভাইবোন রয়েছে। ওদের সবার জন্ম নাখালপাড়াতে। 

আমার স্ত্রী শায়লা আলম। এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে পরিবার। ছেলে মাহফুজ রহমান ভূঁইয়া নর্থসাউথ ইউনির্ভাসিটি থেকে পড়ালেখা করে অস্ট্রেলিয়া গেছে। মেয়ে শৈলী শারমীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইআর থেকে মার্স্টাস করে এখন প্রবাসী। আমার নাতি-নাতনিও আছে দুটো। সন্তানদের নিয়ে আমি খুবই গর্বিত।

রাশা : আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক