সব ঋতুতেই সুতি

শীত শেষ হতে চলছে। আর কদিন বাদেই গরমে হবে ওষ্ঠাগতপ্রাণ। এর মাঝেও পরনে কিছুটা আরাম দেয় সুতির পোশাক।

লাইফস্টাইল ডেস্কপ্রতিবেদক, মরিয়ম মনি, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 3 Feb 2013, 03:57 AM
Updated : 3 Feb 2013, 03:57 AM

আমরা বাঙ্গালী, আমাদের পোশাকের রয়েছে হাজার বছরের ঐতিহ্য। বাঙালী নারীর পোশাক মানেই শাড়ি বা সালোয়ার কামিজ, আর ছেলেদের বেলায় লুঙ্গি, ধুতি, পাজামা-পাঞ্জাবি। কালের বিবর্তনে আমরা আমাদের দেশীয় পোশাকের ঐতিহ্যের সঙ্গে পাশ্চাত্যের সংমিশ্রণ ঘটিয়েছি। তবে যে পোশাকই পরা হোক না কেন কাপড়ের ক্ষেত্রে সুতির কোন বিকল্প নেই। সুতির পোশাক অত্যন্ত আরামদায়ক। সব ঋতুতেই সুতি কাপড়ের জুড়ি নেই। তাছাড়া সুতি কাপড় পোশাক পরলে যে কোন নারী- পুরুষের মাঝে একটি মার্জিতভাব প্রকাশ পায়। সুতি কাপড়ের আরেকটি বড় সুবিধা হচ্ছে এটি সহজলভ্য।

সুতি সুতা মূলত প্রাকৃতিক তন্তু দিয়ে তৈরি। আর এগুলো আসে রেশম গুটি, কার্পাস তুলা ইত্যাদি উপাদান থেকে। রেশম গুটি এবং কার্পাস তুলার বীজ থেকে তন্তুগুলোকে আলাদা করে নানা রকম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি হয় সুতা। প্রাথমিক অবস্থায় এটি খুব নরম হয়। পরে স্পিনিং ও নিটিংয়ের মাধ্যমে এ সুতা মজবুত ও মসৃণ করা হয়। এই মসৃণ সুতা দিয়েই বোনা হয় সুতি কাপড়। এর সঙ্গে কিছু প্রাকৃতিক ও রাসায়নিক উপাদানের মিশ্রণে তৈরি হয় লিনেন, ফ্লানেল, এন্ডি প্রভৃতি কাপড়। এগুলোকে বলা যায় সুতির বিবর্তিত রূপ। আমাদের দেশের তৈরি সুতি কাপড়ের জুড়ি মেলা-ভার। তবে মিসরে যে সুতি কাপড় নীল-নদের উপত্যকায় তৈরি হয় সেটাকে বলা হয় সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মানের সুতি কাপড়।

বস্ত্র সাম্রাজ্যে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত এ দেশের সুতি কাপড় পোশাক দুনিয়া শাসন করেছে। একটি দিয়াশলাইয়ের বাক্সে পঞ্চাশ হাত মসলিন কাপড় রাখার কৃতিত্বও দেখিয়েছিল এ অঞ্চলের তাঁতীরা। কালক্রমে সেই আধিপত্য হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল কৃত্রিম সুতার কাপড়ের কাছে। বিংশ শতাব্দীর প্রায় পুরো সময়টাই কৃত্রিম কাপড়ের দখলে ছিল। একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে আবার পৃথিবীর পোশাক রাজ্য সুতির দখলে চলে আসে।

গরমের সময়ে সুতির কাপড়ের আবেদন যেন একটু বেশি।কারণ এটি আরামদায়ক।প্রচন্ড গরমে সুতি কাপড়ের  পোশাক দেহে ও মনে স্বস্তি এনে দেয়। আজকাল আমাদের ফ্যাশন হাউজগুলোতেও সুতি কাপড়ের প্রাধান্য লক্ষণীয়। ফ্যাশন হাউসগুলো সময়ের চাহিদাকে মাথায় রেখে তৈরি করছে বিভিন্ন ডিজাইনের সুতির পোশাক। আজকাল আবার সুতি কাপড়ের ওপর দেশাত্ববোধকে ফুটিয়ে তুলতে এসব হাউসগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

এদেশে এখন সুতি কাপড়ের রয়েছে অন্যরকম চাহিদা। সব বয়সের নারী-পুরুষের কাছেই এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। শাড়ি, পাঞ্জাবি থেকে শুরু করে শার্ট, ফতুয়া, সালোয়ার-কামিজ পর্যন্ত সব ধরনের পোশাক তৈরি হচ্ছে সুতি কাপড় দিয়ে। চিরায়ত বাঙ্গালী নারীর জীবনে সুতি কাপড়ের যে আবেদন, সেটা অন্য কোন কাপড়ের সঙ্গে মেলানো অসম্ভব। সালোয়ার কামিজ, স্কার্ট, টপস, জিন্স প্যান্ট, ফতুয়া, টি-শার্টসহ নানা ধরনের সুতি কাপড়ে ফ্যাশন হাউসগুলো ভর্তি থাকে সব ঋতুতেই।

গরমের মৌসুম এলেই ছেলেদের টি-শার্ট, ফতুয়া, পাঞ্জাবি, একচ্ছত্র আধিপত্য চোখে পড়ে বিভিন্ন মার্কেট ও ফ্যাশন হাউসগুলোতে। শাহবাগের আজিজ কো-অপারেটিভ মার্কেট যেন টি-শার্টের রাজ্য। অসহ্য গরমে এসব পোশাক অসাধারণ স্বস্তিদায়ক। আর এসব পোশাক সবই তৈরি হয় সুতি কাপড় দিয়ে।

শিশুদের নরম ত্বকে সব ঋতুতে সুতির বিকল্প নেই। বাচ্চার শরীরে ঘামাচি আর র‍্যাশ ওঠার হাত থেকে রক্ষা পেতে অবশ্যই সুতি কাপড় পরাতে হবে।

এ সময়ের উপযোগী সুতি কাপড় নিয়ে ফ্যাশন ডিজাইনারদের রয়েছে নানান মত।

শাহীন আহমেদ (অঞ্জনস): আমাদের দেশের আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ বলা হলেও এখন কিন্তু চরম গরম পড়ে। তাই আমাদের এ আবহাওয়ায় সব সময়ই সুতি পোশাক পরা প্রয়োজন। আর গরমের সময়তো সুতি কাপড়ের জুড়ি নেই। কারণ এটি আরামদায়ক, পাতলা- তাই সহজেই বাতাস ঢুকতে পারে। সুতির ব্যবহার আমাদের দেশে অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। আদিবাসীদের পোশাক লক্ষ্য করলেই তা বোঝা যায়। আমাদের দেশে সুতির পাশাপাশি রাজশাহীর সিল্কের প্রচলন ছিল। পরে বাইরে থেকে অন্যান্য কাপড় এসেছে।

মুনিরা ইমদাদ (টাঙ্গাইল শাড়ি কুটির): সুতি কাপড়ের মধ্যে টাঙ্গাইল শাড়ি আমাদের দেশে অনেক জনপ্রিয়। সত্যি কথা বলতে, এদেশের নারীরা দীর্ঘদিন ধরে টাঙ্গাইল শাড়ি ব্যবহার করে আসছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টাঙ্গাইল শাড়ির ফ্যাশনে রঙেও এসেছে বহু বৈচিত্র্য। মাঝে জর্জেট এসে টাঙ্গাইল শাড়িকে কিছুটা দমিয়ে দিয়েছিল। এখন আবার তার ঐতিহ্য ফিরে পেয়েছে। এ শাড়ি দামে সস্তা হলেও পরতে আরাম আর দেখতেও সুন্দর। বাঙ্গালী নারীর শাড়ির ব্যবহার যতদিন থাকবে টাঙ্গাইল শাড়িও ততদিন থাকবে।

খালিদ মাহমুদ খান (কে-ক্রাফট): শুধু আমাদের দেশেই নয়, সারা পৃথিবীতে সুতি কাপড় জনপ্রিয়। এদেশে বহুকাল থেকেই সুতি কাপড় ব্যবহার করা হচ্ছে। এক সময় আমাদের সুতি-মসলিন কাপড় সারা পৃথিবীতেই বিখ্যাত ছিল। বর্তমানে কয়েকটি অঞ্চল সুতির জন্য বিখ্যাত। টাঙ্গাইল, নরসিংদী, কুমিল্লা, মানিকগঞ্জেও কিছু সুতির কাজ হয়।

জাভেদ কামাল (চরকা): এদেশের আবহাওয়ায় সুতি কাপড় অনেক আরামদায়ক। আমাদের সুতির পোশাক বিশ্বের অনেক দেশেই পছন্দ করে। সুতি কাপড়ের পোশাক যেমন গরম থেকে স্বস্তি দিবে তেমনি ফ্যাশন হিসেবেও মানানসই।

বিপ্লব সাহা (রঙ): সুতি কাপড়কে যে কোনভাবে অর্থাৎ মনের মতো করে সাজানো যায়। রঙের প্রধান পোশাক শাড়িগুলো কিন্তু সব সুতির। 

লিপি খন্দকার (বিবিয়ানা): আমি সবসময়ই সুতির পোশাক পছন্দ করি। ‘বিবিয়ানা’তেও আমি সুতির পোশাকই বেশি তৈরি করি। এ ছাড়া শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, ফতুয়া কিংবা পাঞ্জাবি যদি সুতি কাপড়ের হয় তবে তাতে বিভিন্ন মেটেরিয়ালস ব্যবহার করে তাকে আরো সুন্দর করা সম্ভব।

শীতে যেমন মোটা সুতি কাপড়ের পোশাক আরামদায়ক তেমিন গরমে পাতলা সুতি’র পোশাক স্বত্বিকর। তাই আসুন সুতিতে অভ্যস্ত হই।