বাড়ি থেকে পালিয়ে রেণু হন রোজিনা

আশির দশকে রোজিনার একের পর এক হিট সিনেমা দর্শক মহলে তাকে করে তুলেছিল জনপ্রিয়; দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের সিনেমায়ও অভিনয় করে প্রশংসিত হন তিনি।

সাইমুম সাদ গ্লিটজ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 5 April 2022, 02:47 AM
Updated : 6 April 2022, 04:20 PM

দেড় দশক ঢাকাই চলচ্চিত্রে দাপুটে অভিনয়ের পর অনিয়মিত হলেও অভিনয় ছাড়েননি রোজিনা। কয়েক বছর ধরে থাকছেন লন্ডনে।

প্রবাস থেকে ফিরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হলেন রোজিনা, রাজবাড়ি জেলার গোয়ালন্দের নানা বাড়িতে।

এই বাড়ি থেকে পালিয়ে রওশন আরা রেণু কীভাবে রোজিনা হয়ে উঠলেন, স্মৃতির সেই ঝাঁপি খুলে দিলেন তিনি।

জন্ম তার ১৯৫৫ সালে। তার দুই দশক পর রাজমহল সিনেমা দিয়ে রুপালি জগতে তার পদার্পণ। তার উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে রয়েছে কসাই,দোলনা, জীবনধারা, রাক্ষুসী, গাঁয়ের ছেলে,অভিযান, অবিচার, মহানগর, বিনি সুতোর মালা, শীষনাগ,বৌমা,ধনী গরীব, সাজানো বাগান, ক্ষতিপূরণ। শুরুর দিকেই কসাই সিনেমায় অভিনয় করে পার্শ্ব চরিত্রের জন্য প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান রোজিনা। এরপর ‘জীবনধারা’র জন্য সেরা অভিনেত্রীর জাতীয় পুরস্কার পান। প্রযোজক হিসেবেও জীবনধারা, দোলনার মতো জনপ্রিয় চলচ্চিত্র নিয়ে এসেছিলেন তিনি। নব্বই দশকের প্রথম দিকে অভিনয়ে বিরতি দিয়েছিলেন, এক যুগ পর ২০০৬ সালে ফেরেন ‘রাক্ষুসী’ সিনেমা দিয়ে।

শৈশব রাজবাড়ি-গোয়ালন্দে

আমার জন্ম রাজবাড়িতে। আমরা চার বোন ও দুই ভাই। শৈশবের বেশিরভাগ সময় গোয়ালন্দে নানা বাড়িতে কেটেছে। স্কুলে পড়াশোনা করেছি রাজবাড়িতে। সেই বাড়ির পাশেই চিত্রা সিনেমা হল ছিল। সন্ধ্যার শো দেখতে যেতাম।

পাঁচ-ছয় জন বান্ধবী ছিল, একই স্কুলে পড়তাম। স্কুলে যাওয়ার পথে সিনেমার মাইকিংয়ের পেছনে দৌড়াতাম। টিফিনের টাকা জমিয়ে বান্ধবীদের নিয়ে সিনেমা দেখার পরিকল্পনা করতাম। মা অবশ্য পছন্দ করতেন না। মাকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য বলতাম, বান্ধবীর বাসায় রাতে থাকব।

খুব সুন্দর শৈশব কেটেছে রাজবাড়িতে। বাড়ির পাশে আম-কাঁঠালের বাগান ছিল। অন্যের গাছের আম পেড়ে খেতাম, কাঁঠাল পেড়ে মাটির নিচে পুঁতে রাখতাম। এসব নিয়ে মায়ের বকুনী-মার খেতাম। মায়ের পিটুনি খেয়ে রাজবাড়ি থেকে গোয়ালন্দে নানা বাড়ি চলে আসতাম।

নায়িকা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে পালিয়ে ঢাকায়

সিনেমা হলে শাবানা ম্যাডাম, কবরী ম্যাডামদের সিনেমা দেখে ভাবতাম, আমিও একদিন সিনেমা করব। আলী ভাই নামে আমাদের এক পরিচিতজন ছিলেন ঢাকায়; মঞ্চ নাটক করতেন। তিনি মাঝে মাঝে আমাদের বাসায় এলে তাদের মঞ্চ নাটকের গল্প করতেন। চলচ্চিত্রের অনেকের সঙ্গে তার পরিচিত ছিল; তাদের গল্প করতেন। আলী ভাইকে একবার বলেছিলাম, আমি সিনেমায় অভিনয় করব। উনি বলতেন, ‘খালাম্মা মারবে’।

পরে একদিন মায়ের মার খেয়ে রাজবাড়ি থেকে পালিয়ে ঢাকায় চলে গেলাম। আলী ভাইদের বাসায় উঠলাম। সেটা ১৯৭৭ সালের কথা। মা ভেবেছিল, আমি গোয়ালন্দে গিয়েছি। হন্যে হয়ে খোঁজ করেও না পেয়ে অস্থির হয়ে উঠেন। পরে খবর পেলেন, আমি ঢাকায়। মা চলে গেলেন ঢাকায়। মাকে দেখে আমি চৌকির নিচে, খাটের নিচে পালাই! আলী ভাইয়ের মা বললেন, দুই দিন পর ওকে আমরা পাঠিয়ে দেব। পরে মা রাজবাড়ি চলে আসেন।

তখন আলী ভাইদের মঞ্চনাটকের মহড়া চলছিল। মহড়ায় গিয়ে আমি বসে থাকতাম। নাটকের শো’র দুদিন আগে হিরোইন অসুস্থ হয়ে যান। পরে আলী ভাই বললেন, ‘তুই নাটকটা কর’। বললাম, আমি তো কোনো রিহার্সেল করি নাই। আমার অভিজ্ঞতাও নাই। দুই দিন রিহার্সেল করে লালবাগের শায়েস্তা খান হলে শো করেছিলাম।

নাটকের পর জন্ম নিয়ন্ত্রণ পিলের (মায়া) বিজ্ঞাপন করে পরিচিতি পেলাম।

‘পাসিং শটে’ ক্যামেরার সামনে, ১০ টাকা আয়

সংসদ ভবনের পাশে খেজুর বাগানে ‘জানোয়ার’ নামে একটি সিনেমার দৃশ্যধারণ চলছিল। পরিচালক ছিলেন কালিদাস বাবু, উনি এখন বেঁচে নেই। ওয়াসিম সাহেব হিরো ও সুচরিতা ম্যাডাম হিরোইন ছিলেন।

শুটিং দেখতে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখি, টেবিলে বসে নর্তকীরা নৃত্য করছে। পরিচালকের সহকারী আমাকে বললেন, ‘এই মেয়ে আসো তো। একটা শট দাও’। আমি হতভম্ব হলাম। পরে আমি খুব আগ্রহ নিয়ে গেলাম। শার্ট-প্যান্ট পরিয়ে দিয়ে মেকআপ করিয়ে দিল। ফ্লোরে রিহার্সেল দিল। এক মিনিটের মধ্যে একটা শট দিয়েছিলাম। পরে ড্রেস পরিবর্তনের পর আমাকে পারিশ্রমিক হিসেবে ১০ টাকা দেওয়া হয়েছিল। ১০ টাকা পেয়ে হতভম্ব হয়েছিলাম, আমরা তো ঘুরতে এসেছি। শুটিং করতে আসিনি। আমি আর জিজ্ঞাসা করিনি। আমি আমার প্রথম উপার্জন নিয়ে গর্ববোধ করি।

সেই সিনেমার ক্যামেরাম্যান আমার কিছু ছবি তুলেছিলেন। সেই ছবিগুলো কীভাবে কীভাবে যেন অনেকের কাছে গিয়েছিল।

প্রথম সিনেমায় নাম লিখিয়েও সরে দাঁড়ালেন

এর মাঝে পরে আলতামাশ সাহেব ‘সাগর ভাসা’ নামে একটি সিনেমা করছিলাম। সেখানে নতুন হিরো-হিরোইন খুঁজছিলেন তারা। সেখানে ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে খুব ভয় পেয়েছিলাম। আঞ্চলিক ভাষার টান চলে আসছিল। আফজাল সাহেব আমাকে সঞ্চয়িতা পড়তে দিলেন। পরবর্তীতে বললেন, আমরা নির্বাচিত হয়েছি। নতুন হিরো হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন চঞ্চল মাহমুদ। আমাদের নাচ-গান শিখতে হবে। সেইভাবেই আমরা শিখছিলাম।

আমি মহড়া দিলাম। ছবির শুটিং শুরু হলো বলধা গার্ডেনে। এর মধ্যে আমার জলবসন্ত হয়েছিল। আমার গালে যে স্পট আছে সেটা জলবসন্ত থেকেই এসেছিল। শুটিংয়ে গিয়ে দেখি, নায়িকা হিসেবে ম্যাডাম কবরী কাজ করছেন। আমার একটু ইয়ে লাগল। ভাবলাম, এখানে তো আমার একক হিরোইন হওয়ার কথা। ওইদিন শুটিং করে আমি চলে আসলাম।

আমর স্বপ্ন হল শাবানা ম্যাডাম, কবরী ম্যাডাম হওয়া। পরদিন আর শুটিংয়ে যাইনি। আমাকে প্রধান চরিত্রে নেওয়ার কথা বলে পার্শ্ব চরিত্রে কাজ করতে আমার আত্মসম্মানে লেগেছিল। পরে সিনেমাটি আর করিনি।

রাজমহলে অভিষেক

এর মাঝে ‘রাজমহল’ সিনেমায় একক অভিনেত্রী হিসেবে আমার রুপালি পর্দায় অভিষেক ঘটে। তখন রেণু নামেই অভিনয় করেছিলাম।

পরে ‘মিন্টু আমার নাম’ সিনেমায় অভিনয়ের সময়ে মহিউদ্দিন স্যার আমার নাম দিলেন রোজিনা। এর মধ্যে ‘আয়না’ নামে আরেকটি সিনেমা করছিলাম মশিউর সাহেবের। সেখানে আমার নাম দেওয়া হয়েছে শায়লা। তখন আমার কিছু বলার ছিল না।

‘মিন্টু আমার নাম’ সিনেমার পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনে করে বলা হলো, আমার নাম রোজিনা। সিনেমার গল্পের চরিত্রের নামও রাখা হল রোজিনা। যেন পপুলার হয়। পরে মহড়া চলল।তারপর থেকে রোজিনা নামেই পরিচিতি পেলাম।

ভালোবেসে টাক হলেন ভক্ত

রাজমহল সিনেমা মুক্তির পর আমার কয়েকটি সিনেমা হিট হয়েছিল। তখন সবাই বলত, ম্যাডাম ম্যাডাম। সবাই ছাতা ধরে এগিয়ে আসত। তখন একজন টি-বয়ও আমাকে ভালোবাসে, প্রডিউসার, ডিরেক্টরও ভালোবাসে; যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে সেও ভালোবাসে।

মাঝে একটা ঘটনা মনে পড়ল, নারায়ণগঞ্জের একটা স্টুডিওতে শুটিং চলছিল, আমার সঙ্গে ছিলেন ফারুক ভাই। জমিদার বাড়িতে শুটিং করেছি। একটা ছেলে আমার জন্য পাগল ছিল; প্রায়ই সেটে আসত। ফারুক ভাই একবার তাকে বলছিল, ‘ওই যা দাঁড়ায়ে থাকোস, ভালোবাসোস। ও (রোজিনা) তোকে টাক হয়ে আসতে বলছে’। ও বেচারা পরদিন টাক হয়ে এসেছিল।

কক্সবাজারে গিয়ে আরেক ভক্ত আমার জন্য পাগল ছিল। তাকে পারভেজ ভাই বলল, খাসির রোস্ট করে খাওয়াও তাহলে রোজিনার সঙ্গে কথা বলিয়ে দেব। কিছু কিছু সময় খুব দুষ্টুমি করতাম আমরা। পরে পুরো একটি খাসির রোস্ট খাইয়েছিল শুটিংয়ের ইউনিটকে।

ছবি: নয়ন কর

তারকাখ্যাতি পাওয়ার পর

সুপারস্টার হওয়ার পর গোয়ালন্দে আসা হয়নি। রাজবাড়িতে এসেছিলাম। তখন তো বাড়ির সামনে লোকে-লোকারণ্য। আমাদের বাসার চতুর্দিকে দেওয়াল বেয়ে লোকজন বাসায় চলে আসত। আমি তো এখানকার মেয়ে। আমাকে ছোট বেলা থেকেই দেখেছে। আমি কখনও অবহেলা করিনি।

এখন জীবন-যাপন

কয়েক বছর ধরে লন্ডনে বসবাস করছি। মাঝে দেশে আসি, এলাকার মানুষের জন্য কিছু করার চেষ্টা করছি। পাশাপাশি সিনেমার সঙ্গে আছি। ‘ফিরে দেখা’ সিনেমার কাজ করছি। আগামীতেও সিনেমার প্রযোজনার পরিকল্পনা আছে।

 
তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক