জন্মসাথীর তালাশ

মুক্তিযুদ্ধের আগুনঝরা দিনগুলো পেরিয়ে ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি ঢাকার হলি ফ্যামিলি রেডক্রিসেন্ট হাসপাতালে জন্ম নেয় ১৩টি শিশু, যাদের পাঁচজন আবার যুদ্ধশিশু; এই যুদ্ধশিশুরা দ্রুতই ছিটকে পড়ে মাতৃভূমির বন্ধন থেকে, ছড়িয়ে পড়ে নানা দেশে।

সুলাইমান নিলয়বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 22 March 2016, 01:30 PM
Updated : 16 Dec 2016, 10:02 AM

স্বাধীন দেশে বাকি যে আটটি শিশু নিজেদের পরিবারের সঙ্গে বেড়ে উঠেছিল, তাদের একজন শবনম ফেরদৌসী।

বাংলাদেশের সমান বয়সী মেয়েটি বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে জানতে থাকে ইতিহাস। একই হাসপাতালে একই দিনে জন্ম নেওয়া বাকি শিশুদের সঙ্গে অনুভব করতে থাকে ‘জন্মের বন্ধন’। শবনমের মনের গহীনে তারা হয়ে ওঠে ‘জন্মসাথী’।

বড় হয়ে সেই জন্মসাথীদের খোঁজে শুরু হয় শবনমের অনুসন্ধান।

হাসপাতালের সেই জন্মসাথীদের খোঁজ শবনম পাননি। তবে সেই তালাশের পথে একাত্তরের তিন যুদ্ধশিশুর সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। তৈরি হয় ৯০ মিনিটের প্রামাণ্যচিত্র ‘জন্মসাথী’।

মূল প্রামাণচিত্রটি জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে, জাতীয় স্মৃতিসৌধের দৃশ্যদিয়ে শুরু হলেও পাঁচ মিনিটের ট্রেইলার শুরু হয়েছে হলি ফ্যামিলির করিডোরে। ভয়েস ওভারে ভেসে আসে- ‘আই রিমেমবার, আই রিমেমবার, দ্য হাউজ হোয়্যার আই ওয়াজ বর্ন।’

একটি ঘর দেখিয়ে ডাক্তার বলে উঠলেন, জন্মের পর আপনি এখানেই ছিলেন।

এরপর আবার ভয়েস ওভার: ‘এ ঘর সেই ঘর, যেখানে আমরা জন্মেছিলাম। আমরা ১৩ জন জন্মসাথী। যার মধ্যে তিন-চার জন যুদ্ধশিশুর পরিচয় মাথায় নিয়ে জন্মেছিল। আমি খোঁজ করি, সেই তিন-চার জনকে। আমি খুঁজে ফিরি আমার জন্মসাথীদের।”

খুঁজতে খুঁজতে শবনম যান আর্মানিটোলার ফাদার রিচার্ড টিমের চার্চে। সেখানে তাকে বলা হয়, যুদ্ধশিশু যাদের জন্ম হয়েছিল, তাদের অধিকাংশই মাদার তেরেসার মাধ্যমে দেশের বাইরে চলে গেছে।

ঠাকুরগাঁওয়ের বীরাঙ্গনা টেপরি বর্মনের সন্তান সুধীর।

একাত্তরে স্বজনরা নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে টেপরি বর্মনকে তুলে দিয়েছিলেন হানাদারের হাতে।

এরপর দৃশ্যপটে আসেন এক বীরাঙ্গনা। তাকে বলতে শোনা যায়, “আপনি যে বলতাছেন, পাক বাহিনীগোর বাচ্চা, না আমাদের স্বামীর বাচ্চা?

“পাক বাহিনীর বাচ্চা এখানে কেউ প্রকাশ করে নাই। কেন করে নাই? যে ইজ্জত বেহের আছে।”

এরপর দৃশ্যপটে আসেন ঠাকুরগাঁওয়ের একজন বীরাঙ্গনা ও তার ছেলে।

এক ভ্যানচালকের দৃশ্যের পেছনে ভয়েস ওভারে বলা হয়, ‘টেপরি বর্মনের গর্ভে জন্ম নিয়েছিল, এই যুদ্ধ শিশু, নাম তার সুধীর।’

সুধীরের মায়ের গল্প রোমহর্ষক। বেঁচে থাকার তাগিদে স্বজনরাই তাকে তুলে দিয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে।

সুধীরের মামা রমেশ বর্মনের ভাষায়, “কতগুলা লোক বইললো, ওনার বোনটা আছে সুন্দর, ওনাকে দিলে আমাদেরকে বাঁচাইয়া রাখবে। আর যদি না দেন, তাইলে তোদেরকে কাউকেও রাখবে না।”

এরপরের দৃশ্যপট মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। সেখানে একাত্তরের বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধশিশুদের ছবি আর সেই সময়ের পেপার ক্লিপিংয়ের প্রদর্শনীর দৃশ্যের মাঝে ভয়েস ওভারে শবনম গল্পকে এগিয়ে নিতে থাকেন।

একদিন সহকর্মী জাফরের কাছে তিনি জানতে পারেন, কানাডা থেকে দেশে এসেছেন একাত্তরের এক যুদ্ধশিশু; নাম মনোয়ারা ক্লার্ক।

“একাত্তরের এপ্রিলের দিকে ওকে (মনোয়ারা) নিয়ে যাওয়া হয় কানাডায়। ৪৩ বছর বয়সে এই প্রথম তার দেশে আসা- একটা সার্টিফিকেটের আশায়। ওর কোনো বার্থ সার্টিফিকেট নেই।”

এরপর পর্দায় হাজির হন মনোয়ারা ক্লার্ক। স্বাধীন বাংলাদেশের মাটি থেকে দূরে ঠেলে দেওয়ার ক্ষোভ ফোটে তার কণ্ঠে।

“বাংলাদেশ গেইভ মি অ্যাওয়ে….. হোয়াই অ্যাম আই ইন কানাডা?”

এর পরের গল্পটা শামসুন নাহারের। লড়াইয়ের মাঝে জন্ম নেওয়া যে শিশু পরিণত বয়সে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়ে যান।

ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তুরীন আফরোজের ভাষায়, “২০১৪ সালে যখন মামলা শুরু হলো, শুনানি শুরু হলো, তখন কিন্তু এই যুদ্ধশিশু আমাদের এখানে এসে সাক্ষ্য দিয়েছে। সে বলছে, আমার নাম শামসুন নাহার, আমার পিতা অজ্ঞাত।”

ভয়েস ওভারে শামসুন নাহারের কাছে জানতে চাওয়া হয়: “নিজের জন্ম পরিচয় নিয়ে খারাপ লাগে না?”

জবাবে দৃঢ়তার সঙ্গেই তিনি বলেন, “না খারাপ লাগে না। আগে খারাপ লাগত, এখন খারাপ লাগে না।”

শামসুন নাহার বলেন, জন্মদাতাকে কখনো দেখতে ইচ্ছা হয়নি তার। ‘কে বাবা’- এই প্রশ্নটাও মনে আসেনি।

ঘরহীন এই লড়াকু নারীর গল্প শুনে সুধীরকে ‘তুলনামূলকভাবে সুখী’ বলে মনে হয়েছে নির্মাতা শবনমের কাছে, যা ফুটে উঠেছে তার কথায়।

“সুধীরের একটা ঘর আছে। ভাঙাচোরা, সুখী। কিন্তু শামসুন নাহার? আজও আমি তার বাড়ি যেতে পারিনি। কোনো ঘরই তার ঘর নয়। প্রতিবার ওর সাথে দেখা করতে হয় চা বাগানের বাংলোয়, রেল লাইনের ধারে কিংবা ফসলের ক্ষেতে।

“তাহলে এখন তুমি সারাটা জীবন কই থাকবা,” প্রশ্ন ছুড়ে দেন শবনম।

ফসলের ক্ষেতে বসে শামসুন নাহারের সরল জবাব, “থাকমু আল্লায় দিলে, থাকবার ব্যবস্থা হইবোনে।”

২০১৪ সালে শেকড়ের খোঁজে কানাডা থেকে দেশে আসেন মনোয়ারা ক্লার্ক।

চলচ্চিত্র নির্মাতা শবনম ফেরদৌসীর সঙ্গে যুদ্ধশিশু শামসুন নাহার, যিনি সাক্ষ্য দিয়েছেন যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে।

মনোয়ারা আর শামসুন নাহার দুইজন দুই মহাদেশে বড় হলেও এক জায়গায় মিল পাওয়া যায় দুইজনেরই। যুদ্ধশিশু পরিচয় জানার পর স্বামী-সন্তান চলে যায় মনোয়ারার, আবার বিয়ে করেন শামসুন নাহারের স্বামীও।

পরিচয় নিয়ে স্বামীর খোঁটা শুনেই সাত সাগর তের নদী পাড়ি দিয়ে জন্ম-সনদ নিতে এসেছিলেন মনোয়ারা; পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলে যার সন্তানকেও কেড়ে নেয় স্বামী। সন্তানকে ফেরত পাওয়ার আরেক যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে মনোয়ারা অনুভব করেন তার জন্ম সনদ নেওয়ার তাগিদ।

অন্যদিকে ছোটবেলায় বন্ধুহীন কাটাতে হয় সুধীরের। জন্মের পর যাকে মেরে ফেলতে বলেছিল প্রতিবেশীরা। তবে সুধীরের নানাই তাকে বাঁচিয়ে রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়ে নিজের মেয়েকে বলেছিলেন, “ওকে মারিস না, আমি মরে গেলে ও-ই তোকে খাওয়াবে।”

নানা স্কুলেও দিয়েছিলেন সুধীরকে; যদিও নানার মৃত্যুতে প্রথম শ্রেণিতেই তার পড়ালেখা শেষ হয়।

বাবার জীবনে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে সুধীরের মেয়ে জনতা বর্মনকেও।

তিনি বলেন, “মানুষ অনেক কথা বলে তখন খারাপ লাগে। অনেকে সামনে বলে না, পেছনে বলে। কেউ আবার সামনেই বলে।”

এত কিছুর মাঝেই জনতাকে প্রশ্ন করা হয়, ‘যদি আবার যুদ্ধ হয়, তাহলে কী হবে?’

জবাবে কৈশোর উত্তীর্ণ জনতা বলেন, “যুদ্ধ হলে হবে, আমরা যুদ্ধ করব।”

অন্যদিকে জীবনের কষ্ট আরো বেড়েছে শামসুন নাহারের। ‘যুদ্ধশিশু’ পরিচয় নিয়ে খারাপ লাগে কি-না, এমন প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “খারাপ লাগতো। অহন আরো বেশি কষ্ট লাগে।”

কষ্টের কথা বলতে গিয়ে নির্মাতার সঙ্গে চা খাওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, ‍“দুই বছর ধইরা এক কাপ চাও খাই না।”

মৃত্যুদণ্ড পাওয়া একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারের মামলার এই সাক্ষী বলেন, “বিচার চাইতে গিয়া এহন আবার মৃত্যু। জানে মাইরা ফালায় দিবো। আমার কে আছে যে, বাঁচাইতে পারবো?”

চলচ্চিত্র আন্দোলনের কর্মী শবনম ফেরদৌসী লেখাপড়া করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছয় নারী ভাষা সৈনিকের জীবন নিয়ে তিনি এর আগে নির্মাণ করেছেন তথ্যচিত্র ‘দি ল্যাঙ্গুয়েজ ফাইটার’।

এক ডজনের বেশি প্রামাণ্যচিত্রের নির্মাতা শবনম ফেরদৌসী তার ‘বিষকাব্য’ শর্ট ফিল্মের জন্য ২০১৪ সালে পেয়েছেন রেইনবো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র পুরস্কার। 

‘জন্মসাথী’র প্রযোজনায় শবনম পাশে পেয়েছেন একাত্তর টেলিভিশন ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরকে। মঙ্গলবার স্টার সিনেপ্লেক্সে এই চলচ্চিত্রের প্রিমিয়ারে ছিলেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ও সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এই প্রিমিয়ারের মিডিয়া পার্টনার।

শবনম বলেন, ৪৪ বছর আগে একটি হাসপাতালে একদিনে ১৩ শিশুর জন্ম হওয়া খুব স্বাভাবিক ঘটনা ছিল না।

“বড় হওয়ার পর জেনেছি, ১৩টি শিশুর মধ্যে পাঁচজন ছিল যুদ্ধশিশু। প্রথম জানার পরই আমার মনে প্রশ্ন জাগে, আমিও তো হতে পারতাম তাদের একজন।

“ক্রমশঃ ওই ভাবনা আমাকে আঁকড়ে ধরে। দেখতে এবং স্বভাবে যদি বাবার মতো না হতাম, তবে হয়তো ক্ষীণ একটা সন্দেহ থেকেই যেত। স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর আমি খুঁজে ফিরি আমার বাকি ১২ জন্মসাথীকে... আমরা যারা যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে একসাথে জন্মেছি, একই ঘরে ক্ষুদে ক্ষুদে বিছানায় হাত-পা নেড়ে কেঁদেছি, ঘুমিয়েছি...।”

স্বাধীন দেশে সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুদের ইংরেজিতে ‘ভিক্টরি চাইল্ড’ বলা হয়। তার জন্মসাথীদের পাঁচজন এবং তাদের মতো আরও অনেককে তাহলে কেন ‘ওয়ার চাইল্ড’ বলা হবে- সেই প্রশ্ন শবনমের।

“তাদের জন্ম কি এদেশের স্বাধীনতা বহন করে আনেনি? তবে কেন এই বিভেদ? তাদের জন্ম তো আরও সম্মানের হওয়া উচিত, যেমন সম্মানিত এদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানরা।”

জন্মসাথীদের খুঁজে না পাওয়ার আক্ষেপ ঝরে শবনমের কণ্ঠে।

“আমি তাদের খুঁজি। খোঁজ মেলে না। পাইনা কারও পরিচয়। দু’একটা উল্লেখযোগ্য জায়গায় খোঁজ নেই। সব তথ্য নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। কই পাব আমার জন্মসাথীদের? এই ১৬ কোটি মানুষের ভিড়ে কোথায় লুকিয়ে আছে তারা?”