'নাইন মান্থস টু ফ্রিডম': পাকিস্তানি গণহত্যার দলিল

ভন ভন করছে মাছি, ক্ষুধার্ত দুটো কুকুর একটি পচে যাওয়া লাশ থেকে খুলে পড়া মাংস কাড়াকাড়ি করছে। লাশ খুবলে খাওয়া এই কুকুর গুলোর সঙ্গে যোগ দেয় শকুন। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে বাংলাদেশের গ্রাম কিংবা শহরের আনাচে কানাচে পরিচিত দৃশ্য হয়ে উঠেছিল এটি। আর এমন সব দৃশ্যই ধারণ করেছে 'নাইন মান্থস টু ফ্রিডম'।

গ্লিটজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 16 Dec 2015, 06:07 AM
Updated : 16 Dec 2015, 06:07 AM

ভারতীয় তথ্যচিত্র নির্মাতা সুখদেভ সিং সাধু তার ক্যামেরায় ধারণ করেছেন যুদ্ধকালীন ভয়াবহতাকে। স্বাধীনতা অর্জনের জন্য নয় মাস পুরো বাঙালি যে সংগ্রাম করেছে, যে অবর্ণনীয় আত্মত্যাগ স্বীকার করেছে সেটা তার তথ্যচিত্রের মূল বিষয় হয়ে এসেছে।পাকিস্তান বাহিনির নৃশংস গণহত্যাকে তিনি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন।

সম্প্রতি বাংলাদেশে গণহত্যার জন্য ক্ষমা চাইতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে পাকিস্তান। তাদের দাবী সঠিক এবং গ্রহণযোগ্য কোনো প্রমাণ নেই গণহত্যার। ‘নাইন মান্থস টু ফ্রিডম: দ্য স্টোরি অফ বাংলাদেশ’ এই দাবিকে সর্বাঙ্গে মিথ্যা প্রমাণ করে। 

তথ্যচিত্রের শুরুটা বাংলাদেশের যুদ্ধ শেষে একটি গ্রামের অবস্থা নিয়ে। স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে থাকা এক কৃষক পরিবারের দৃশ্য থেকে সেটি ফ্ল্যাশব্যাকের মতো করে ফিরিয়ে আনে মাসখানেক আগের অন্ধকার সময়টাকে। যুদ্ধের ভয়াবহতায় কোটি মানুষকে নিজেদের ভিটা ছাড়তে হয়েছিল। মাইলের পর মাইল হাঁটতে হয়েছে শুধু একটু মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের জন্য। সীমান্তের ওপারে ভারতে আশ্রয় মিলেছে, কিন্তু যুদ্ধের কড়াল গ্রাস থেকে মুক্তি মেলেনি। সুখদেভের ক্যামেরা তুলে এনেছে কলেরায় আক্রান্ত হয়ে শিশুদের মৃত্যু কিংবা আপন জনের মৃতদেহের সামনে ক্ষুধায় কাতর এক বৃদ্ধার খাওয়ার চেষ্টার ছবি। এক কিশোরীর শূন্য দৃষ্টিতে ক্যামেরা তাক করেই নির্মাতা যেন বোঝাতে চাচ্ছিলেন কি প্রচণ্ড নৃশংসতার মুখোমুখি হতে হয়েছে এই মানুষগুলোকে। 

প্রতিদিন গড়ে ৪০ হাজার শরনার্থীকে আশ্রয় দেয়ার সরঞ্জাম যোগাতে নানা আন্তজর্াতিক দাতব্য সংস্থার সাহায্য সত্বেও হিমশিম খাচ্ছিল ভারত। কোটি মানুষের শরনার্থী শিবিরগুলো মৃত্যুকূপে পরিণত হচ্ছিল। পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরতাকে বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে ফরাসী উপন্যাসিক আন্দ্রে মালরোকে বলতে শোনা গেল, অস্ত্র হাতে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধে নামতে চেয়েছিলেন তিনি।

সুখদেভ আরো দেখান, ডন ও পাকিস্তান অবসারভারের মতো পাকিস্তানি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে মুক্তিযোদ্ধাদের বর্ণনা করা হচ্ছে নাশকতাকারী হিসেবে, আওয়ামী লিগকে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে ফ্যাসিবাদী দল হিসেবে। পাকিস্তানি গণমাধ্যমের মিথ্যাচার তুলে ধরা হয় প্রয়াত পরিচালক জহির রায়হান এবং আলমগীর কবিরের বক্তব্যে। পাকিস্তানি সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানে মুক্তিযুদ্ধের ওপর প্রতিবেদন তৈরির। তাকে বলতে শোনা যায়, সাতজন নিরীহ মানুষকে কিভাবে চোখের সামনে নৃশংসভাবে খুন হতে দেখেছেন তিনি। 

‘নাইন মান্থস টু ফ্রিডম’-এ মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটও স্পষ্টভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। ১৯৪৮ দেশভাগ, ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন থেকে ৭০ এর নির্বাচন এবং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র বোঝানোর চেষ্টা করে হয়েছে সংগৃহীত ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে। সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ এবং খোদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে, বাঙালি কিভাবে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর বর্বর অত্যাচারের হাত থেকে রেহাই পেতে চাচ্ছিল। 

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে অনেকেই ইন্দো-পাকিস্তান যুদ্ধ হিসেবে অভিহিত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু এই তথ্যচিত্রে ভারতের অবস্থান একটি মিত্র দেশ হিসেবেই। পুরো তথ্যচিত্রে মুখ্য হয়ে পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরতা আর বাংলাদেশি গেরিলাদের তাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অবস্থানের বিষয়টি। 

২৬শে মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা আর ১৭ই এপ্রিল মেহেরপুর বৈদ্যনাথতলায় স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠনের পর সুখদেভের ক্যামেরা যুদ্ধের দুটি নিরবিচ্ছিন্ন ঘটনার প্রতিনিধি হয়ে ওঠে। পাকিস্তানি শত্রু নিধনের প্রয়াসে মুক্তিবাহিনির প্রশিক্ষণ এবং গেরিলা আক্রমণ ও সম্মুখ সমরের চিত্র যেমন ধারণ করা হয়েছে, তেমনি পাকিস্তানি বাহিনির নির্বিচার গণহত্যার চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। 

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর। ঢাকার ‘অভিসার’ সিনেমা হলে চলছে ‘দ্য ফল অফ রোমান এম্পায়ার’ সিনেমাটি। সারা ঢাকাজুড়ে চলছে বিজয়োল্লাস। রোমান সাম্রাজ্যের পতনের মত পাকিস্তানি শাসকদের শোষণের অন্ত ঘটে রেসকোর্স ময়দানে। সুখদেভের ক্যামেরা তখন লাখো বাঙালির বিস্ফারিত চোখে নিবদ্ধ। তবে শেষ আঘাতটাও হেনেছিল পাকিস্তান, গুটিকয়েক বিশ্বাসঘাতকের সহায়তায়। বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করার লক্ষ্যে হত্যা করা হয় দেশের শীর্ষ বুদ্ধিজীবীদের। রায়ের বাজারের বধ্যভূমিতে পড়ে ছিল তাদের ছিন্ন ভিন্ন লাশ। সে ছবিও অংশ হয়েছে 'নাইন মান্থস টু ফ্রিডম'-এর। 

জেনারেল ইয়াহিয়া খান একবার বলেছিলেন, বাঙালি জাতি বাঁদর আর মুরগির মতই। পাকিস্তানিদের চালানো গণহত্যায় ইয়াহিয়ার সেই চরম বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের প্রতিফলন পাওয়া যায়। ‘নাইন মান্থস টু ফ্রিডম: দ্য স্টোরি অফ বাংলাদেশ’-এর ঘৃণা, বিদ্বেষ, বর্বরতা আর আত্মত্যাগের পথ বেয়ে বাঙালির বিজয় ছিনিয়ে আনার গল্প বলে।