তরুণদের আগ্রহ ভোটের চেয়ে ইভিএমে বেশি

এবার ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন নিয়ে তরুণ ভোটারদের আগ্রহ তেমন দেখা না গেলেও তাদের অনেকে প্রথমবার ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট দিতে কেন্দ্রে যেতে চান।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 28 Jan 2020, 06:35 PM
Updated : 28 Jan 2020, 06:39 PM

আগ্রহীতরুণদের বেশিরভাগই ভেবেচিন্তে এলাকার বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে পছন্দেরপ্রার্থীকে ভোট দিতে চেয়েছেন। আর অনাগ্রহীদের কেউ কেউ অতীতের কাউন্সিলরদের কর্মকাণ্ডেএতটাই হতাশ যে, তারা ভোটকেন্দ্রে যাওয়ারই প্রয়োজন অনুভব করছেন না।

ভোটনিয়ে আগ্রহ-অনাগ্রহের কেন্দ্রে ইভিএমকে রাখার কথা জানিয়েছেন মালিবাগের শান্তিবাগএলাকার তরুণ তামিম আহমেদ।

তিনিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার ভোট দেওয়ার ইচ্ছা নেই। যেতেও পারি, নাওযেতে পারি। তবে যাওয়ার একটা কারণ আছে- ইভিএমে ভোটটা দেব, আগে কখনও দিইনি। একদিকদিয়ে মনে হচ্ছে ভোট দেব না, আবার মনে হচ্ছে ইভিএমে দিই।”

নিজেরআগ্রহ না থাকলেও বাবা-মার কাছ থেকে ভোট দেওয়ার বিষয়ে উৎসাহ পাওয়ার কথা জানানতামিম।

১ফেব্রুয়ারি ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে নির্বাচনে সম্পূর্ণ ভোটগ্রহণ হবেইভিএমে।

এবারঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ৩০ লাখ ৯ হাজার এবং দক্ষিণ সিটিতে ২৪ লাখ ৫২ হাজারভোটার রয়েছেন।

দুইসিটিতে সাড়ে ১২ লাখ নতুন ভোটার

যারা২০১৫ সালের পর প্রথম ভোট দেবেন মেয়র ও কাউন্সিলর পদে। এরমধ্যে সম্প্রসারিত ৩৬টিওয়ার্ডের ভোটারও রয়েছে।

উত্তরসিটিতে  ৬ লাখ ৬৫ হাজারের মতো এবং দক্ষিণে ৫ লাখ ৮২ হাজারেরওবেশি নতুন ভোটার রয়েছে।

দক্ষিণসিটি কর্পোরেশনের আরেক তরুণ ভোটার রাফসান শরীফ ইমনও বলেন ইভিএম নিয়ে আগ্রহের কথা।

“যদিওআমি গত সংসদ নির্বাচনে প্রথম ভোটার ছিলাম কিন্তু ইভিএমে এবারই প্রথম ভোট দিচ্ছি,তাই আগ্রহটা আগের চেয়ে এখন বেশি।”

ভোটেরপরিবেশ সম্পর্কে ইমন বলেন, “নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও অনুকূল পরিবেশ থাকলে এবং কোনো বিশৃঙ্খলারসৃষ্টি না হলে অবশ্যই ভোট দিতে যাব। ভোট আমার অধিকার, সেজন্য ভোট দিতে যাব, তবেপ্রতিনিধি নির্বাচনটাও গুরুত্বপূর্ণ।”

ঢাকা দক্ষিণে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপসের প্রচারে সঙ্গী হচ্ছেন অনেক তরুণ।

জলাবদ্ধতা,যানজট, দূষণ প্রতিরোধে প্রতিশ্রুতি দিলেও সিটি করপোরেশন সেভাবে ভূমিকা রাখে না বলেইমনে করেন কাকরাইলের বাসিন্দা তনয় পোদ্দার।

তিনিবলেন, “ফ্লাইওভার নির্মাণের পর রাস্তাঘাট কিছুটা উন্নত হলেও এখনও বৃষ্টিতে আমাদেরগলিতে পানি জমে যায়। যানজট তো লেগেই থাকে। এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে কাউন্সিলরকে বলা হলেতিনি বলেন, ‘দেখছি ব্যাপারটা’।

”আশাকরব, যারা এবার নতুন নির্বাচিত হয়ে আসবেন তারা কিছুটা হলেও কাজ করে দেখাবেন। ভোটেরফলাফল কি হবে জানি না। তবে চাইব, যিনিই আসুক, আমাদের কথা শুনুক, কাজ করে দেখাক।”

ইসিকর্মকর্তারা জানান, ২০০২ সালে অনুষ্ঠিত অবিভক্ত ঢাকা সিটির নির্বাচনে ভোটার সংখ্যাছিল প্রায় ২৮ লাখ। দেড় যুগ পর এখন দ্বিগুণভোটার দুই সিটিতে।

যাদেরবয়স ১৯ থেকে ৩৬ বছরের মধ্যে এমন ভোটার রয়েছেন প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এরমধ্যে ১৯ থেকে২৩ বছর বয়সী ভোটার রয়েছেন ১০ লাখের বেশি; আর ২৪ থেকে ৩৬ বছর বয়সী ভোটার ১২ লাখেরবেশি।

দক্ষিণের১৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা তামান্না তাসনিয়া মৌ ভোটার হয়েছেন উত্তর সিটির ৩৭নম্বর ওয়ার্ডে। শান্তিনগর থেকে তাকে ভোট দিতে আসতে হবে মেরুল বাড্ডায়।

সর্বশেষকাউন্সিলর তাদের মেরুলের বাড়ির দীঘি ভরাট করায় জলাবদ্ধতার ভোগান্তি পোহাতে হয়েছেবলে ক্ষুব্ধ তিনি। তারপরও এবার ভোট দিতে যাবেন তিনি ইভিএম দেখার আগ্রহ থেকে।

তাসনিয়াবলেন, “এখন প্রযুক্তির যুগ। ডিজিটাল পদ্ধতিতেই তো সবকিছু হওয়া উচিৎ। ইভিএমে ভোটনিয়ে অনেকে আতঙ্কে ভুগছে, আসলে ব্যাপারটা একটু জেনে নিলেই হয়। এটাতে কোনো সমস্যাদেখছি না।”

দক্ষিণসিটি কর্পোরেশনের তরুণ ভোটার আফিফা আক্তার ভোট নিয়ে মোটেও আগ্রহী নন। বিষয়টিকে‘ঝামেলা’ মনে করেন তিনি।

“যদিওপ্রথম ভোটার তাও কোনো আগ্রহ নেই। আমি প্রার্থীর কাছে যা প্রত্যাশা করি তাবাস্তবায়ন হয় না, তাহলে ভোট দিয়ে লাভ কী?”

ঢাকা উত্তরে বিএনপির মেয়রপ্রার্থী তাবিথ আউয়ালের প্রচারেও রয়েছেন তরুণরা।

দক্ষিণখানেরইছাপুরার ভোটার রাকিবুল আলম আর সেলিম রহমানের ভোট নিয়ে কোনো উচ্ছ্বাসই নেই। কারণআগের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড।

সেলিমবলেন, “কী হবে ভোট দিয়ে? যারা কাউন্সিলর ছিলেন, ঘুরেফিরে তারাই হয়ত আসবেন। কিন্তুকোনো উন্নয়নই হবে না। উন্নয়নের টাকাটা নিজেরা লুটেপুটে খাবে। আমাদের ভোট দেওয়ারকোনো মানে হয় না।”

উত্তরের৪৯ নম্বর ওয়ার্ডের তরুণ জামাল হোসেন অবশ্য নগরের বাসিন্দা হিসেবে ভোটের অধিকারকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’মনে করেন। তবে সেই অধিকার প্রয়োগের আগে অবশ্যই এলাকার উন্নয়নকেই গুরুত্ব দেবেনতিনি।

“আমাদেরভোট আমরা দেব, ফলাফল কী হয়, সেটা পরের ব্যাপার। এলাকায় কী কাজ হয়েছে, কী হয়নি,সেসব বিবেচনাতেই আমরা ভোট দেব।”

২০১৫ সালে সর্বশেষনির্বাচনে উত্তরের ৩৬টি ওয়ার্ডে ভোটার ছিল ২৩ লাখ ৪৫ হাজার ৩৭৪ জন। নতুন ১৮টি ওয়ার্ডযুক্ত হয়ে এখন ৫৪টি ওয়ার্ড এ সিটিতে। নতুন ওয়ার্ডগুলোতে ভোটার আছেন পাঁচ লাখ ৭১হাজার ৬৮৪ জন। সবমিলিয়ে ২০২০ এসেএই সিটিতে ভোটার এখন ৩০ লাখ ১০ হাজার ২৭৩ জন। অর্থাৎ, উত্তরে ছয় লাখ ৬৪ হাজার ৮৯৯জন ভোটার বেড়েছে।

অন্যদিকে ২০১৫সালে দক্ষিণ সিটি নির্বাচনে ৫৭টি ওয়ার্ডে ভোটার ছিল ১৮ লাখ ৭০ হাজার ৭৫৩ জন। পরেযুক্ত হয় আরও ১৮টি ওয়ার্ড, মোট ৭৫টি ওয়ার্ড। দক্ষিণের ১৮টিওয়ার্ডে ভোটার আছেন চার লাখ ৭৭ হাজার ৫১০ জন। সব মিলিয়ে এইসিটিতে ভোটার এখন ২৪ লাখ ৫৩ হাজার ১৯৪ জন, অর্থাৎ পাঁচ বছর পর এখানে ভোটার বেড়েছেপাঁচ লাখ ৮২ হাজার ৪৪১ জন।

নির্বাচনীপ্রচারে মেয়র-কাউন্সিলর প্রার্থীরা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ঝরালেও তার ‘সিকিভাগওবাস্তবায়ন হবে না’ বলে মনে করেন ওই এলাকার ভোটার নাসরিন আক্তার।

“ভোটএলে তাদের কত কথা! আর ভোট চলে গেলে তো তাদের চেহারাটাও দেখি না। এই হল আমাদেরকাউন্সিলরদের অবস্থা। আওয়ামী লীগ আর বিএনপি- সব দলেই একই অবস্থা। কাকে ভোট দেব,চিন্তা করছি।”

ভোটনিয়ে উদ্দীপ্ত থাকলেও পরিবেশ নিয়ে মনে শঙ্কা আছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েরশিক্ষার্থী সুরাইয়া আমিনের।

তিনিবলেন, কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নয়, ভোটকেন্দ্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, সুষ্ঠুপরিবেশ চান তিনি।

“এবারেরনির্বাচন নিয়ে আমি অনেক বেশি এক্সাইটেড। কারণ সবাই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, আগেরনির্বাচনে এমনটা ছিল। নতুন ভোটার তাই আগ্রহটা আরও বেশি।”

ভোটেরনিরাপদ পরিবেশ আর ইভিএম নিয়ে একই মনোভাব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকুরে ফরহাদ রেজার।ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি কিংবা বিরোধী দলের প্রার্থী বিবেচনার বিষয় নয় বলে মনেকরেন তিনি।

“এলাকারউন্নয়নে কাজ করবেন এমন উদ্যোগী, সৎ ব্যক্তিকে ভোট দিতে চাই। দল সেখানে বিবেচনারবিষয় নয়। তবে বিরোধীদলের ভালো প্রার্থী থাকলেও তাকে ভোট দিতে কয়েকবার ভাবব। কারণএই সময়ে তারা কতটা কাজ করতে পারবেন, সে বিষয়ে সংশয় রয়েছে।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক