বাজেট বাস্তবায়নে রাজস্ব আহরণই চ্যালেঞ্জ: অ্যামচেম

বাজেটে সরকার রাজস্ব আহরণের যে উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে, তা অর্জন কঠিন হবে বলে মনে করছে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম)।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 12 June 2022, 06:28 PM
Updated : 12 June 2022, 06:28 PM

ব্যবসায়ীদের এই সংগঠনটির সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ বলেছেন, “বাংলাদেশে রাজস্ব আহরণ কাঠামো খুব দুর্বল। অথচ রাজস্ব আহরণ বাড়াতে না পারলে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। তাই রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সক্ষমতা বাড়ানো ও সংস্থাটিকে অটোমেশন করার কথা আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি।”

২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে রোববার অ্যামচেম আয়োজিত আলোচনায় একথা বলেন তিনি।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল পৌনে ৭ লাখ কোটি টাকার বাজেটে রাজস্ব খাত থেকে আয় ধরেছেন ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা, যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত রাজস্ব আয়ের ১১.৩১ শতাংশ বেশি। এটা অর্জন নিয়ে অর্থনীতিবিদরাও সন্দিহান।

অ্যামচেম সভাপতি এনবিআরের সক্ষমতা বাড়িয়ে করজাল বিস্তৃত করার পরামর্শ দেন।

কর্পোরেট করহার কমানোর প্রস্তাবকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি বলেন, করর্পোরেট করহার আরও কিছুটা কমিয়ে বিনিয়োগের ভালো পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা ইতিবাচক। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি স্বাভাবিক রাখা প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

সভায় ২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, “চলমান পরিস্থিতিতে প্রস্তাবিত বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র সাড়ে ৫ শতাংশ ঘাটতি ধরা হয়েছে। এটা অন্তত ৬ শতাংশ করা যায়। তাহলে চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতির অভিঘাত থেকে দেশের প্রান্তিক মানুষকে বাঁচানো, ভর্তুকি ও প্রণোদনার বরাদ্দ আরও কিছুটা বাড়ানো যেত।”

রাজস্ব আহরণকে ‘প্রধান দুর্বল জায়গা’ হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি বলেন, দেশে ৭২ লাখ টিআইএনধারী হলেও রিটার্ন দাখিল করেছে মাত্র ২৯ লাখ।

প্রত্যক্ষ কর বাড়াতে তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর উপর জোর দেন।

ঘাটতি বাজেটের অর্থায়নে দেশের ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণ নেওয়ার যে লক্ষ্য ধরা হয়েছে, তা নিয়ে মির্জ্জা আজিজ বলেন, “বেসরকারি ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে যদি সরকারই এত বিপুল অর্থ নিয়ে নেয়, তাহলে বেসরকারি বিনিয়োগ ব্যাহত হবে। তাই এই টার্গেট আরও কমিয়ে ফেলা উচিৎ।”

কর্পোরেট করহার কমানোর ফলে দেশে বিনিয়োগ বাড়বে বলে আশাবাদী তিনি। তবে একই সঙ্গে বলেন, “কিন্তু কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন শ্রমিকের অভাব আমাদের বিনিয়োগে একটা অপূর্ণতা রয়ে গেছে।”

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, “চলমান পরিস্থিতিতে আগামী বাজেটের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জ হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। এটি নিয়ন্ত্রণে ভর্তুকি ও প্রণোদনা বাড়ানে এবার বাজেটের আকার আরও বড় করার প্রয়োজন ছিল।”

জিডিপির আকারের তুলনায় বাংলাদেশের বাজেট পৃথিবীর ‘সবচেয়ে ছোট’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমাদের জিডিপির মাত্র ১৩ শতাংশ, যা পৃথিবীর সবচেয়ে কম। প্রতিবেশী ভারতের বাজেট জিডিপির ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ, থাইল্যান্ডের বাজেট ২৫ দশমিক ৪ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট জিডিপির ৪৭ দশমিক ৮ শতাংশ এবং জার্মানির বাজেট ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ।

“আমাদের কর-জিডিপির অনুপাতও একইভাবে সবচেয়ে কম। মূলত রাজস্ব আহরণে দুর্বলতাই আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে আমাদের কর-জিডিপির অনুপাত সিঙ্গেল ডিজিট। অথচ এটা অন্তত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার উচিৎ।”

তবে প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যম্ফীতির চাপ সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য আরও কিছু করার প্রয়োজন ছিল বলে মনে করেন আহসান মনসুর।

তিনি বলেন, সামাজিক সুরক্ষা খাতের বিভিন্ন কর্মসূচিতে যে মাত্র ৫০০ টাকা করে ভাতা চলছে বছরের পর বছর। এখন টাকার মান কমে যাওয়ায় ওই ৫০০ টাকায় আগের পণ্য পাওয়া যাচ্ছে না। তাই এই ভাতার পরিমাণ ও মানুষের সংখ্যা বাড়ানো উচিৎ।

মনসুর বলেন, “আন্তর্জাতিক লেনদেনে চলতি হিসাবের ঘাটতি এবং মূল্যম্ফীতির চাপে দেশের অর্থনীতি একটা সঙ্কটকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ বাস্তবতায় জিডিপির হিসেবে বাজটের আকার কিছুটা ছোট করায় অভ্যন্তরীণ চাহিদা হয়ত কিছুটা কমবে। চাহিদা সীমিত রাখা এবং মূল্যম্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে মুদ্রানীতিই যথোপযুক্ত হাতিয়ার। মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রেও এর সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। অথচ বর্তমানে ব্যাংক ঋণ এবং সঞ্চয়ে সুদের হার বেঁধে দেওয়া হয়েছে।”

বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের বিপরীতে টাকার ওঠা-নামার ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা রক্ষার বিষয়টিতে বেশি মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, “এখনও আমাদের প্রধান শক্তি কৃষি। আর আমাদের রপ্তানির প্রধান চালিকা শক্তিশক্তি পোশাক রপ্তানি। এই দুই প্রধান খাতকে প্রধান টার্গেটে রেখে প্রান্তিক মানুষের জন্য সহায়ক প্রণোদনা ও ভর্তুকি দিয়ে প্রস্তাবিত বাজেট সাজানো হয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচন এখনো আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক