বৈষম্য কমবে কীভাবে, তা নেই বাজেটে: মির্জ্জা আজিজ

মহামারী ও যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দেশে আয় বৈষম্য বেড়ে গেলেও তা কমানোর কোনো পথরেখা নতুন বাজেটে পাননি ২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 11 June 2022, 09:30 AM
Updated : 11 June 2022, 10:01 AM

শনিবার ঢাকায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক ফোরামের আয়োজনে বাজেটোত্তর সংলাপে ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ ‍তুলে ধরেন তিনি।

‘কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রত্যাবর্তনের’ স্লোগান দিয়ে বৃহস্পতিবার সংসদে নতুন অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

এবার ‘গরিববান্ধব’ বাজেট দেওয়া হয়েছে বলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতারা দাবি করেছেন। অর্থমন্ত্রীও বলেছেন, গরিবদের কথা মাথায় রেখেই বাজেট দিয়েছেন তিনি।

মির্জ্জা আজিজ বলেন, “আমাদের দেশে দারিদ্র্য বিমোচনের হার কমে আসছে। এর একটি কারণ মূল্যস্ফীতি, আরেকটি আমাদের দেশে আয় বৈষম্যের মাত্রা ক্রমশই বেড়ে যাচ্ছে।”

“এই আয় বৈষম্য কীভাবে কমানো হবে, তার কোনো দিক-নির্দেশনা বাজেটে নেই।”

আয় বৈষম্যের চিত্র ‘জিনি সহগ’ দিয়ে তুলে ধরেন মির্জ্জা আজিজ।

তিনি বলেন, “সেটা (জিনি সহগ) এখন বাংলাদেশে শূন্য দশমিক ৪৮৯। শূন্য দশমিক ৫০ হলে সেটা বিপজ্জনক ধরে নেওয়া হয়।”

জিনি সহগে শূন্য নির্দেশ করে চরম সমতা অর্থাৎ সবার আয় বা সম্পদের পরিমাণ সমান। ১ নির্দেশ করে চরম অসমতা অর্থাৎ একজন ব্যক্তি সব অর্থ আয় করেন, বাকিরা কোনো আয় করেন না।

বাংলাদেশে ১৯৮৮ সালে জিনি সহগ ছিল শূন্য দশমিক ৩০ এর নিচে। ২০১৬ সালেও ছিল শূন্য দশমিক ৩২। এখন তা বেড়ে শূন্য দশমিক ৪৯ মানে দেশে আয় বৈষম্য বেড়িছে।

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনির কর্মসূচিগুলোর সঠিক বাস্তবায়নের উপরও জোর দেন মির্জ্জা আজিজ।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশে অনেকেই আছেন, যাদের বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আসার কথা না, কিন্তু তারাও অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন বা হন। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের যোগসাজশে অথবা স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে তারা এই সুযোগ নেন।”

এর ফলে প্রকৃত দরিদ্ররা বঞ্চিত হচ্ছেন বলে মনে করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক এই উপদেষ্টা।

“সুতরাং এই যে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, সেটা যাতে সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয় এবং এই খাতে যাতে কোনো তহবিল তসরুপ না হয়।”

আগামী অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী খাতে মোট ১ লাখ ১৩ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছেন অর্থমন্ত্রী।

প্রস্তাবিত বরাদ্দ চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের চেয়ে ৬ হাজার কোটি টাকা বাড়লেও মোট বাজেট ও জিডিপির তুলনায় এর হার কমেছে।

বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন

নতুন অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার বাজেট বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ১৪ শতাংশ বড়।

প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব খাতে আয় ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা। এই অঙ্ক বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত রাজস্ব আয়ের ১১ দশমিক ৩১ শতাংশ বেশি।

আয় ও ব্যয়ের হিসাবে সামগ্রিক ঘাটতি থাকছে ২ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

৭.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির আশা রেখে দেওয়া বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৬ শতাংশে আটকে রাখার কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী।

এই প্রেক্ষাপটে বাজেট বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মির্জ্জা আজিজ।

তিনি বলেন, “বাজেটের যে লক্ষ্যগুলো আছে, সেগুলো আমাদের দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে খুব একটি অযৌক্তিক না, তবে নানা কারণে এটা বাস্তবায়ন নিয়ে আমি খুবই সন্দিহান।”

চলতি অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় যে টাকা বরাদ্দ ছিল, তা খরচ করতে না পারার বিষয়টি তুলে ধরেন মির্জ্জা আজিজ।

চলতি অর্থ বছরের প্রথম ৯ মাসে এডিপির ২৯ শতাংশ বাস্তবায়নের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, “এটা আমাদের একটি বড় সমস্যা, প্রথম আট-নয় মাসে আমাদের কম টাকা খরচ হয়, শেষের দুই-তিন মাসে তাড়াহুড়ো করে বাকি টাকা ব্যয় করা হয়। যার ফলে কাজের মান সঠিক থাকে না। অনেক সময় কাজ না করেও চেক লেখা হয়।

“বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনার মাধ্যমে যে সুফল আমরা অর্থনীতির জন্য আশা করি, সেই সুফল পাওয়া সম্ভব হয় না। তো এই ব্যাপারে আমি বাজেট বক্তৃতায় কিছু দেখি নাই।”

বাজেট বাস্তবায়নে ‘পুরস্কার ও তিরস্কার’র সংস্কৃতি চালুর পরামর্শ দেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হয়ে দুই বার জাতীয় বাজেট দিয়ে আসা মির্জ্জা আজিজ।

তিনি বলেন, “বাজেট বাস্তবায়নে রিওয়ার্ড এবং পানিশমেন্টের দরকার আছে। অর্থাৎ বাজেট যারা বাস্তবায়ন করছেন, তারা যদি সময়মতো টাকা খরচ করতে না পারেন, তাহলে তিরস্কারের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

“যারা ভালো কাজ করবে, তাদের পুরস্কারের ব্যবস্থা থাকতে হবে। সেটা যে আর্থিক হতে হবে, সেরকম নয়। তাদের যদি অর্থমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী একটি পুরস্কার হাতে তুলে দেন, তখন তারা উৎসাহিত হবেন।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক