যুদ্ধের জেরে মন্দার ঝুঁকি, সতর্ক করল বিশ্ব ব্যাংক

করোনাভাইরাস মহামারীতে বিপর্যস্ত বিশ্ব অর্থনীতি ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আরেক দফা সংকটে পড়ায় অনেক দেশ মন্দার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বলে সতর্ক করেছে বিশ্ব ব্যাংক।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 8 June 2022, 08:01 AM
Updated : 8 June 2022, 08:46 AM

আন্তর্জাতিক এ আর্থিক সংস্থার প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যালপাস বলেছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে প্রবৃদ্ধির নিম্নগতি অর্থনীতিকে স্থবির করে ফেলছে। আর তাতে ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার স্বল্পোন্নত দেশগুলো অর্থনৈতিক মন্দার বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বাড়ছে। ইউক্রেনের যুদ্ধ, চীনের লকডাউন, সরবরাহ-শৃঙ্খলায় বিঘ্ন এবং অর্থনৈতিক ধীরগতি প্রবৃদ্ধির গতি টেনে ধরছে। এ পরিস্থিতিতে অনেক দেশের জন্য মন্দা এড়ানো কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশ্ব ব্যাংকের প্রধান।

এই প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবার প্রকাশিত বিশ্ব ব্যাংকের ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টস’ প্রতিবেদনে এ বছরে বিশ্বের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে এক তৃতীয়াংশ করা হয়েছে।

ম্যালপাস বলেন, বিশ্বের বেশিরভাগ এলাকায় বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় এ দশকজুড়েই হয়ত প্রবৃদ্ধির ধীরগতি অব্যাহত থাকবে। বহু দেশে মূল্যস্ফীতির হার ইতোমধ্যে কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চে পর্যায়ে পৌঁছেছে। উৎপাদন বাড়ার গতিও খুব ধীর। মূল্যস্ফীতির এই উচ্চ হার হয়ত দীর্ঘ সময় ভোগাবে।

বিশ্ব ব্যাংক মঙ্গলবার ইউক্রেইনের জন্য ১৪৯ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত তহবিল অনুমোদন করেছে। এ তহবিল সরকারি ও স্বেচ্ছাসেবীদের মজুরি দিতে ব্যবহার করা হবে।

নতুন এই অর্থায়ন ইউক্রেইনের জন্য বিশ্ব ব্যাংকের চারশ কোটি ডলারের সহায়তা প্যাকেজের অংশ। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইউক্রেইনের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং স্যানিটেশন সেবায় এই সহায়তা কাজে লাগানো হবে।

ইউক্রেইনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর পর একশ দিনের বেশি পেরিয়ে গেছে। এখনও হামলার কেন্দ্রস্থল থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থাকা বিভিন্ন দেশ যুদ্ধের ধাক্কা টের পাচ্ছে।

উন্নয়নশীল দেশগুলো ধাক্কা সামলে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু খাদ্য ও জ্বালানির ক্রমবর্ধমান খরচ মানুষের জীবনকে ফের উল্টো স্রোতে নিয়ে ফেলছে।

বিবিসি লিখেছে, কেবল দরিদ্র দেশগুলো যে দুর্দশায় পড়েছে, তা নয়। এক জরিপে দেখা গেছে, ব্রিটেনের প্রতি ছয়টি পরিবারের মধ্যে একটি সামর্থ্য হারিয়ে সরকারের ফুড ব্যাংক থেকে খাবার নিচ্ছে। মূল্যস্ফীতি কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়িয়ে দিয়েছে। তাতে বিশ্বব্যাপী বিপর্যস্তদ মানুষের সংগ্রাম আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিশ্ব ব্যাংক এসব বিষয়ে এখনই উদ্যোগী হওয়ার তাগিদ দিচ্ছে। ঋণ থেকে মুক্তির পাশাপাশি খাদ্য রপ্তানিতে বিধিনিষেধ না রাখার আহ্বান জানিয়েছে দেশগুলোকে।

এ ছাড়া খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ বজায় রেখে অস্থিতিশীল বাজার ও দামের ঊর্ধ্বগতি হ্রাসে নীতিনির্ধারকদের একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব ব্যাংক।

বিশ্বের সব দেশকে ইতোমধ্যে একটি মহামারী মোকাবেলা করতে হয়েছে। তাদের সেই সম্মিলিত চেষ্টায় এবার ঢিল পড়লে বিশ্ব আরও দীর্ঘ সংকটে পড়বে বলে বিশ্ব ব্যাংক সতর্ক করেছে।

এখনকার এই কঠিন পরিস্থিতি যে কেবল দুঃখ এবং সামাজিক অস্থিরতা ডেকে আনবে, তা নয়; বছরের পর বছর এ সঙ্কট মানুষকে দুর্দশায় ডুবিয়ে রাখতে পারে।

বিশ্ব ব্যাংক জানিয়েছে, ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভুগতে হবে যুদ্ধের কেন্দ্রে থাকা ইউক্রেইন ও রাশিয়াকে। যুদ্ধ এবং মহামারীর কারণে সেই ভোগান্তি হবে দীর্ঘ।

বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যালপাস। ছবি: রয়টার্স

ম্যালপাস বলেন, “একটি বিশ্ব মন্দা যদি আমরা এড়াতেও পারি, অর্থনীতির এই স্থবিরতা কয়েক বছর ধরে চলতে পারে, যদি না উৎপাদন আর সরবরাহ বড় আকারে বাড়ানো যায়।”

২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিশ্বের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৭ শতাংশ পয়েন্ট কমে যেতে পারে, যা ১৯৭৬ থেকে ১৯৭৯ সালের অচলাবস্থার সময়ের প্রবৃদ্ধি কমার দ্বিগুণেরও বেশি।

বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, ১৯৭০ এর দশকের শেষ দিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সুদের হার বৃদ্ধি জরুরি হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সেই পদক্ষেপই ১৯৮২ সালে ডেকে এনেছিল মন্দা। উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে আর্থিক সংকট তৈরি হয়েছিল।

তবে ১৯৭০ এর দশকে ডলারের দাম কম ছিল এবং তেলের দাম তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল।

বিশ্ব ব্যাংকের প্রসপেক্টস গ্রুপের পরিচালক আয়হান কোস বিবিসিকে বলেন, জ্বালানির ক্রমবর্ধমান দাম খুব সহজে নিয়ন্ত্রণে আনা কোনো সরকারের জন্যই সহজ নয়।

“রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া, ভর্তুকি বাড়ানো কিংবা বাজার নিয়ন্ত্রণ করা এখন সরকারগুলোর উচিত হবে না। এ ধরনের হস্তক্ষেপ দাম আরও বাড়িয়ে দেবে, তাতে আরও বেশি মূল্য চুকাতে হবে।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক