মেগা প্রকল্প নিয়ে ভাবতে হবে নতুন করে: সেলিম রায়হান

মহামারীর মধ্যে ইউক্রেইন যুদ্ধ অর্থনীতিকে যে সঙ্কটের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, তা থেকে উত্তরণের স্পষ্ট নির্দেশনা বাজেটে চাইছেন গবেষক সেলিম রায়হান; সেই সঙ্গে বর্তমান প্রেক্ষাপটে মেগা প্রকল্পগুলো নিয়ে নতুন করে চিন্তা-ভাবনার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি।

ফয়সাল আতিক নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 6 June 2022, 07:10 PM
Updated : 7 June 2022, 10:33 AM

২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটের আগে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অর্থনীতির হালের গতিচিত্র নিয়ে নিজের মতামত তুলে ধরেন সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকনোমিক মডেলিং বা সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান।

আগামী ৯ জুন জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের বাজেট উত্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এবার পৌনে ৭ লাখ কোটি টাকার বাজেট দিতে যাচ্ছেন তিনি।

সেলিম রায়হানের ভাষ্যে, গত দেড় দশকে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে যে স্থিতিশীলতা ছিল, সেটা এখন বড় ধরনের চাপে পড়েছে। যে চাপ কোভিড মহামারীতেও ছিল না, যা ইউক্রেইন যুদ্ধ তৈরি করেছে।

মূল্যস্ফীতি, ডলারের দামে অস্থিরতা, আমদানির উল্লম্ফন, রেমিটেন্সের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি যে দেশের অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ হিসাবে এসেছে।

“সার্বিকভাবে বাজেটে এই বিষয়গুলোকে চ্যালেঞ্জ হিসাবে নিয়ে সব পরিকল্পনা করতে হবে। এর একটা পরিষ্কার দিক-নির্দেশনা বাজেটে থাকতে হবে,” বলেন সেলিম।

বাংলাদেশের বর্তমান বিদেশি ঋণে ‘অস্বস্তিকর’ কিছু না দেখলেও সামনে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের দেখতে হবে, এই ঋণ কতটা উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে, কতটা ফল বয়ে নিয়ে আসে।”

গত ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বিদেশি ঋণের হিসাব প্রায় ৯১ বিলিয়ন ডালার ছাড়ায়। অর্থবছরের বাকি ছয় মাসে আরও কী পরিমাণ ঋণের বোঝা দেশের অর্থনীতিতে চেপেছে, তার হিসাব এখনও পরিষ্কার হয়নি।

সেলিম রায়হান বলেন, “বিদেশি ঋণের প্রকল্পে যে সম্ভাব্যতা যাচাই বা ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি হয়, তার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক থাকে না। অনেকগুলো প্রকল্পে সময় ও খরচ অতিরিক্ত হয়ে যাওয়া ঋণের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে।”

তিনি বলেন, “আমি মনে করি এই মুহূর্তে যতগুলো মেগা প্রজেক্ট আছে, তার একটা স্টক টেকিং নেওয়া প্রয়োজন। যতগুলো বিদেশি ঋণনির্ভর প্রকল্প আছে, সেগুলোদের প্রকৃত অবস্থা কেমন, ফিজিবিলিটি স্টাডিগুলো কেমন ছিল, এখনকার পরিস্থিতি কতটা বদলেছে, এইসব।

“এমনও শোনা যায় যে কিছু প্রকল্পের ফিজিবিলিটি সঠিকভাবে হয়নি। সেখানে রিভিউ দরকার, স্টক টেকিং দরকার।”

“এটা এক বাজেটে হবে না। তবে একটা রোডম্যাপ বা উদ্যোগ নিতে হবে। সামনের দিনগুলোতে মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া ও বাস্তবায়নের জন্য এধরনের পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে,“ বলেন তিনি।

‘সমস্যা স্বীকার করতে হবে’

অধ্যাপক সেলিম রায়হান মনে করেন, মানুষ যে অর্থনৈতিক সঙ্কটে রয়েছে, সেটা আগে সরকারকে স্বীকার করতে হবে, নইলে সমাধানের পথ মিলবে না।

কোভিড মহামারীর মধ্যে ২০২১-২০২২ অর্থবছরের বাজেট উত্থাপনের আগে মহামারীর ধাক্কায় দেশের অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠী ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৪০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল বলে এক মাঠ জরিপের তথ্যে জানিয়েছিল সানেম।

মহামারীর কারণে নতুন দরিদ্র জনগোষ্ঠী সৃষ্টি হওয়ার বিষয়টি অন্যান্য অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছিল।

কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এসব গবেষণা প্রতিবেদন শতভাগ গ্রহণ করা হয়নি। সাময়িকভাবে কিছু মানুষের অর্থিক অবস্থা খারাপ হলেও মহামারীর বিধিনিষেধ উঠে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে পরিস্থিতি আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে বলে দাবি করে আসছেন অর্থমন্ত্রী।

তবে চলমান মূল্যস্ফীতির ও বৈশ্বিক মন্দা পরিস্থিতির হুমকি সম্পর্কে সরকারি ভাষ্য ও বেসরকারি অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ প্রায় অভিন্ন অবস্থানে। দ্রব্যমূল্য মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে এবং মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষের কষ্ট বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি এখন স্বীকৃত।

সেলিম রায়হান বলেন, “বাজেটে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার আগে সমস্যাটা স্বীকার করতে হবে। গত বাজেটেও হয়নি এ বাজেটেও নতুন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বীকৃতি থাকবে কি না, সন্দেহ।

“মূল্যস্ফীতির ফলে যে মানুষগুলো বেশি চাপে পড়েছে, সেটা হয়ত স্বীকার করছে। কিন্তু কিছু মানুষ যে মহামারীর সময়ে আর্থিক সক্ষমতা হারিয়েছে বা কমে গেছে, সরকার সেটা স্বীকার করতে চাচ্ছে না। এখন জিনিসপত্রের দাম বাড়ার ফলে নতুন করে যেই মানুষগুলো চাপে পড়েছে, সেটা কিছুটা স্বীকার করছে।

তিনি বলেন, “সমস্যাকে স্বীকার করতে হবে। সমস্যার গভীরতা কতটুকু সেটা হিসাব করতে হবে। আপনি যদি মনে করেন, সমস্যা অতটা গভীর নয়, তাহলে সমাধান সঠিকভাবে হবে না।”

পরিস্থিতি তুলে ধরে এই গবেষক বলেন, “আমরা বুঝতে পারছি, দেশের নিম্ন আয়ের মানুষ খুব কষ্টে আছে এই মুহূর্তে। নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষও এক ধরনের কষ্টে আছে। অনেক খরচ কাটছাঁট করতে হচ্ছে। সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।”

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে টিসিবির ট্রাকের সামনে দীর্ঘ লাইন। ফাইল ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল কীভাবে?

নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য কীভাবে সহনীয় পর্যায়ে আনা যায়, সে বিষয়ে স্পষ্ট একটা দিক-নির্দেশনা বাজেটে চাইছেন সেলিম রায়হান।

তিনি বলেন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি কীভাবে আরও বিস্তৃত করা যায়, নতুন করে যারা মূল্যবৃদ্ধির চাপে পড়েছে তাদেরকে কীভাবে এই কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করা যায়, বাজেটে তার নির্দেশনা থাকা উচিৎ।

চলমান মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া বিবেচনায় সামাজিক সুরক্ষার বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানান সেলিম রায়হান।

“সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে অনেকগুলো ভাতা রয়েছে যেগুলো বছরের পর বছর ৫০০ থেকে ৭০০ টাকার মধ্যে রয়ে গেছে। তাদের ভাতার মধ্যে মূল্যস্ফীতি, জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি এসবের কোনো রিফ্লেকশন নেই। এগুলোকে ঠিক করতে হবে। এই মুহূর্তে ৫০০ /৭০০ টাকা তেমন কিছুই না। এগুলো অনেক বাড়াতে হবে।”

চলতি অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ৭ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১৭ দশমিক ৮২ শতাংশ।

সঙ্কট মোকাবেলায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি ঘটানোর জন্য সরকারকে বিভিন্ন রকম নীতি সংস্কারের পরামর্শ দেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে আরও বেশি প্রণোদনামূলক অর্থায়ন ও নীতি সহায়তা বাড়ানোর পক্ষে মত দেন তিনি।

সেলিম রায়হান বলেন, “কোভিড পরবর্তী সময়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের রিকভারিটা ওভাবে হয়নি। তারাই সবচেয়ে কম সরকারি সহযোগিতা পেয়েছে। উৎপাদন খাত ও সেবাখাতের উদ্যোক্তারা সামলাতে পারছেন না। তারা যদি টিকে থাকতে না পারে তাহলে কর্মসংস্থান বড় হুমকিতে পড়বে।

“বাজেটে মাইক্রো ও স্মল এন্টারপ্রাইজগুলোর সমস্যার সমাধানের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিৎ। ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ ও ঋণের প্রবৃদ্ধি বাড়াতে উদ্যোগ নেওয়া উচিৎ। অনেক বিনিয়োগকারী কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে নতুন বিনিয়োগে দ্বিধাগ্রস্ত। তাদেরকে অভয় দেওয়া দরকার। কেন ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বাড়ছে না, সেটা খুঁজে বের করা দরকার। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে কাজে লাগানো দরকার।”

এর পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বিনিয়োগের বাধা দূর করা ও ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করার পরামর্শ দেন তিনি। 

প্রতিবেশী দেশ ভারতের উদাহরণ টেনে বলেন, “গত এক বছর ভারত যেভাবে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করেছে বাংলাদেশ তা পারেনি। কারণ তারা বিনিয়োগ সহজিকরণ করতে পেরেছে। কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস অনেক এগিয়েছে তাদের।

“সেই তুলনায় বাংলাদেশে কস্ট অব ডুয়িং বিজনেসে খুব অগ্রগতি নেই। ইজ অব ডুয়িং বিজনেসের অগ্রগতি নেই। এখন সময় এসেছে এক্সচেঞ্জ রেট, বাণিজ্যনীতি, ব্যাংকিং নীতি, আর্থিক নীতি, কর খাত এসব বিষয়কে একটা ডিটারমাইন্ড পর্যায়ে নিয়ে আসার।”

‘অর্থ পাচারের ফাঁকগুলো বন্ধ করতে হবে’

দেশের কিছু মানুষ অবৈধভাবে কালো টাকার মালিক হচ্ছে এবং এসব টাকা বিদেশে পাচার করছে বলে বিশ্লেষকরা বার বার সতর্ক করলেও সরকারের পক্ষ থেকে তা এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছিল এতদিন।

তবে সম্প্রতি অস্বাভাবিকভাবে আমদানি বেড়ে যাওয়া, ইতিহাসের সর্বোচ্চ বাণিজ্য ঘাটতি দেখা দেওয়া, রেমিটেন্স প্রবাহ কমে যাওয়া, রিজার্ভ কমে যাওয়া এবং সর্বোপরি ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হতে শুরু করার প্রেক্ষাপটে বিদেশে অর্থপাচারের বিষয়টি দৃশ্যত স্বীকার করে নেয় সরকার। পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকম দায়মুক্তি দেওয়ার বিষয়টি এখন সরকারের সক্রিয় বিবেচনায়।

এ প্রসঙ্গে সেলিম রায়হান বলেন, “বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রিপোর্টে বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচারের বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু দেশের নীতি-নির্ধারকরা এটাকে অস্বীকার করেছিল। এবারই দেখলাম- সেই টাকা ফেরত আনার জন্য এক ধরনের প্রচেষ্টা, যেটা টাকা পাচারের এক ধরনের স্বীকৃতি।

“এখন যৌক্তিক ও মৌলিক প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে টাকা বাইরে যাচ্ছে কেন? ফিরিয়ে আনা, না আনা তো দ্বিতীয় ধাপ। টাকা পাচারের পথগুলো বন্ধ করতে হবে। আইন-কানুনগুলো ঠিক মতো প্রয়োগ হচ্ছে কি না? কারণ আমরা জানি এখানে প্রচুর ফাঁক-ফোঁকর রয়েছে। তাদের ঠেকানোর জন্য পর্যাপ্ত মনিটরিং সিস্টেম নেই।”

দেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে টাকা পাচারে উৎসাহী হবে বলেই মন্তব্য করেন এই গবেষক।

ডলারের সঙ্গে টাকার বিনিময় হারটা সঠিক না থাকলে হুন্ডি বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, “হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচার হয়ে যায় কি না, দেখতে হবে। কারণ যারা হুন্ডির মাধ্যমে দেশে টাকা পাঠাচ্ছে, তারা সেই টাকাটা গ্রহণ করছে দেশের বাইরে ডলারে।”

আমদানির আড়ালে পাচার হচ্ছে কি না- সেদিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে সেলিম রায়হান বলেন, “আমদানির যে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে, সন্দেহ প্রকাশ করা হচ্ছে যে এর পেছনেও ওভার ইনভয়েসিং আছে। এবং যদিও সরকার এখন চেষ্টা করছে বিলাসী পণ্য আমদানি নিয়ন্ত্রণের। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় বিলাসী পণ্যের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানিও অস্বাভাবিক বেড়েছে।

“ক্যাপিটাল মেশিনারিজে যেই ৪০ থেকে ৫০ ভাগ আমদানি বেড়েছে, এখানেও ওভার ইনভয়েসিং হয়েছে কি না, দেখতে হবে। এখানে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে।”

‘টাকার অবমূল্যায়নের পদ্ধতি দরকার’

ডলার ও টাকার মানের উঠানামা নিয়ে সেলিম রায়হান বলেন, টাকার অবমূল্যায়ন করা দরকার ‘খুব বিচার বিবেচনা করে’।

“কারণ কার্ব মার্কেটে ডলারের যে দামটা দেখা যাচ্ছে, সেটা প্রকৃত মূল্য নাও হতে পারে। বাজারে অনেক সময় ডলারের দাম বাড়তে থাকলে অনেকে হুড়োহুড়ি করে সেখানে যুক্ত হয়ে যান, কিছু ব্যবসা করতে চান। অতিরিক্ত চাহিদা সৃষ্টির কারণে যে দাম হয়, সেটা প্রকৃত দাম নাও হতে পারে।

“ডলারের প্রকৃত মূল্য থেকে বাজার মূল্য কতটা মিস এলাইনড বা বেঠিক আছে, সেটা কিন্তু হিসাব করে বের করা যায়। সেই জায়গাটাতে একটা পথ বের করা উচিৎ যে কীভাবে এই মিস এলায়েনমেন্ট থেকে বের হওয়া যায়,” বলেন তিনি।

“টাকার অবমূল্যায়ন অবশ্যই করা উচিৎ। কিন্তু সেটা কতটা করতে হবে, সেই বিবেচনা এডহক ভিত্তিতে করা উচিৎ হবে না। একটা পদ্ধতিগতভাবে বিবেচনা করা উচিৎ। কিন্তু আমাদের দেশে অবমূল্যায়নের কোনো পদ্ধতি দাঁড় করানো হয়নি। কারণ অবমূল্যায়নের বিষয়টি অনেকটা অবহেলিত ছিল। আর দেশের বাজারও গত এক দশক ধরে প্রায় স্থিতিশীল ছিল।”

খোলা বাজারে ডলারের চাহিদা বেড়ে গেলে বাংলাদেশ ব্যাংক সরবরাহ বাড়িয়ে আগে বাজার সামলাতে পারলেও এখন পরিস্থিতি নেই বলে মন্তব্য করেন সেলিম রায়হান।

‘রিজার্ভ নিয়ে উদ্বেগ থাকছে’

বাংলাদেশে বিদেশি মুদ্রার মজুদ ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে গেলেও গত কয়েক মাসে তা কমে ৪১ বিলিয়নে নেমে এসেছে। এর কারণ হচ্ছে একদিকে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া, অন্যদিকে রেমিটেন্স কমে যাওয়া। এছাড়া খোলা বাজারে ডলারের ঘাটতি দেখা দেওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টাও করেছে।

এ প্রসঙ্গে সেলিম রায়হান বলেন, “আমাদের বর্তমান রিজার্ভ খুব স্বস্তির কথা বলছে না। সাধারণ সময়ে ৫ থেকে ৬ মাসের আমদানি খরচ রাখার কথা বলা হয়। আমাদের ৪২ বিলিয়ন ডলার দিয়ে সেটা হয়ত সম্ভব হবে, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে আট থেকে ১০ মাসের আমদানির রিজার্ভ থাকতে হত। হয়ত আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই তবে উদ্বেগের জায়গা আছে।”

‘কর খাতে বড় সংস্কার প্রয়োজন’

সেলিম রায়হান বলেন, চলমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সরকারের আয়কে একটা চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলে দেবে। সেজন্য করখাতেও একটা ‘বড়’ সংস্কার লাগবে।

ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা থেকে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা পর্যন্ত যেভাবে কর খাতের সংস্কারের কথা বলা হয়েছে, তার কোনো প্রতিফলন আগের বাজেটগুলোতে দেখতে না পাওয়ার কথা বলেন তিনি।

“এসব কারণে বছরের পর বছর ট্যাক্স জিডিপি রেশিও ১০ থেকে ১২ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে। করখাতের সংস্কারগুলো সরকার সঠিকভাবে করতে পারলে গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে সরকার প্রয়োজনীয় খরচ করতে পারবে না। এবার মনে করি, সরকার আরও বেশি চাপে থাকবে। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অনেক পিছিয়ে আছে।”

তিনি বলেন, কঠিন সময়েই বড় সংস্কারগুলো করতে হয়। ব্যাংকিং খাত, করখাত, বাণিজ্য নীতি, পুঁজিবাজার, মুদ্রানীতি এসব খাতে অনেকগুলো সংস্কার দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষমাণ আছে।

সানেমের পক্ষ থেকে গত ১০/১৫ বছরের বাজেট হিসাব করে দেখা গেছে, প্রস্তাবিত বাজেট ও বাস্তবায়িত বাজেটের মধ্যে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত পার্থক্য থাকে। অর্থাৎ ৭৫ শতাংশের বেশি বাস্তবায়িত হয় না।

সেলিম রায়হান বলেন, “বাজেটে খরচ করাই কিন্তু বড় কথা নয়। কিন্ত আমাদের সাফল্য ধরা হয় যে, আমরা খরচ করতে পেরেছি কি না?

“বাজেটে কেন্দ্রীয় কোনো মনিটরিং কিংবা ইভালুয়েশনের পদ্ধতি খুবই দুর্বল। ফলে যে কারণে খরচটা করা হয়েছে, সেই কারণটা অর্জন করা কিংবা সমস্যাটার সমাধান করা গেছে কি না, সেই আলোচনা নেই। যখনই সঠিক নিরীক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা হবে, তখনই জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতার প্রসঙ্গটি চলে আসবে।”

“এবারে বাজেটে আমরা সেই টানাপড়েনগুলো দেখব। হয়ত প্রস্তাবিত বাজেটে অনেক কিছু বলা যাবে, তবে দেড় বছর পর বলা যাবে যে আসলে কতটা বাস্তবায়ন হল,” বলেন তিনি।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক