ডিজেলের আঁচ পড়বে বাজারে, বাড়বে খরচ

মহামারীর মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যেরই দাম বেড়েছে। এখন ডিজেলের দামের ‘রেকর্ড’ বৃদ্ধি তা কোথায় নিয়ে যাবে, সেই হিসাবই কষছেন মিরপুরের টোলারবাগের বাসিন্দা আবদুর রাজ্জাক।

ওবায়দুর মাসুমও ফয়সাল আতিকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 4 Nov 2021, 06:34 PM
Updated : 4 Nov 2021, 06:34 PM

ক্ষুব্ধ কণ্ঠে তিনি বলেন, “এক লিটার তেল, এক কেজি পেঁয়াজ আর এক কেজি ডাল কিনতেই আগের চেয়ে ১০০ টাকা বেশি চলে যাচ্ছে। এখন ডিজেলের দাম বাড়ার অজুহাতে আবারও দাম বাড়বে। আমরা যারা সীমিত আয়ের মানুষ, তারা কই যাব?”

বিমানবন্দর থেকে কালশীগামী বাসে চড়ে রাজ্জাক ভাবছেন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে বাসের বাড়তি ভাড়াও যে গুণতে হবে তাকে।

এই বাড়তি ভাড়ার জোগান কীভাবে হবে, তা নিয়ে দুর্ভাবনায় পড়েছেন উত্তরা থেকে ফার্মগেইটের নিয়মিত যাত্রী এখলাসুর রহমান।

তিনি বলেন, “আমি প্রতিদিন আপ-ডাউন করি ফার্মগেইটে। প্রতিদিন আসা যাওয়ায় দুই বার ১০ টাকা করে ২০ টাকা বাড়তি দিতে হবে। মাসে ৫০০ টাকার বেশি। কিন্তু আমার বেতন তো বাড়বে না। আমি বা আমার মতো নিম্ন আয়ের মানুষ যে মাসে ৫০০ টাকার একটা ডিপিএস চালাতাম, সেটা আর করা যাবে না।”

ডিজেলের দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়বে বাস, ট্রাক, কভার্ডভ্যানের ভাড়ায়। লঞ্চসহ নৌযানের ভাড়াও বাড়বে। আর এর পরোক্ষ প্রভাব পড়বে বহু খাতে।

ট্রাক কিংবা নৌযানের ভাড়া বেড়ে গেলে শাক-সবজি থেকে শুরু করে যে সব পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে বাজারে আসে, তার সবেরই দাম বাড়বে।

ফলে দেশের সব পরিবারেরই মাসিক খরচের হিসাব নতুন করে সাজাতে হবে।

দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক শিল্পেও যে ডিজেলের দাম বৃদ্ধির আঁচ পড়বে, সেটাও বলছেন এই খাতের ব্যবসায়ীরা। ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকায় বিদ্যুতের দাম বাড়ার শঙ্কাও দেখা দিয়েছে।  

কৃষিক্ষেত্রে সেচ পাম্প ও পাওয়ার টিলার ডিজেলে চলে বলে কৃষকেরও ব্যয় বাড়বে। মাছ ধরা ট্রলারগুলোরও জ্বালানি ডিজেল, তাই সেখানেও খরচা বাড়বে। 

সাগরে ইলিশ শিকারে যাওয়া এই জেলে নৌকাগুলো চলে ডিজেলে। ফাইল ছবি

ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেন, ‘বেআইনিভাবে’ সরকারের এই ব্যয় বৃদ্ধির ঘোষণায় ভোক্তার জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে।

সরকারকে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেন তিনি।

গত কয়েক মাস ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে লোকসান কমাতে সরকার বৃহস্পতিবার থেকে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম প্রতি লিটার ৬৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮০ টাকা করে।

বরিশাল চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি সাইদুর রহমান রিন্টু বলেন, একবারে এত মূল্য বৃদ্ধি তিনি আগে দেখেননি।

“দেশের ইতিহাসে এক লাফে ১৫ টাকা জ্বালানি বৃদ্ধির ঘটনা কখনও ঘটেনি। আগে হয়ত ২/৫ টাকা অথবা সর্বোচ্চ ৮ টাকা বেড়েছিল।”

বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসম্পাদক রাকেশ ঘোষ বলেন, “একবারে তেলের দামের এমন বৃদ্ধি আমার জীবনে দেখি নাই।”

রাজনৈতিক অঙ্গন থেকেও এই মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদ আসছে।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা জি এম কাদের বৃহস্পতিবার এক সভায় বলেছেন, “আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে এই অজুহাতে তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু, করোনাকালে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অনেক কম ছিল, তখন তো তেলের দাম কমানো হয়নি। তখন যে পরিমাণ টাকা লাভ হয়েছে সেই টাকা কোথায় গেল?”

ক্যাব চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেন, আইন অনুযায়ী বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন-বিইআরসির গণশুনানি করে এই মূল্য বৃদ্ধি করার কথা। বিইআরসিকে পাশ কাটিয়ে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধিতে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ ‘বেআইনি’।

তিনি আরও বলেন, “আন্তর্জাতিক বাজারের প্রেক্ষাপটে হোক কিংবা অন্য যে কোনোভাবেই হোক, জ্বালানি তেলের বার বার হ্রাস-বৃদ্ধি করা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে যুক্তিসঙ্গত নয়।

“স্থিতিশীল রাখার জন্য জ্বালানির ‘মূল্য স্থিতিশীলতা তহবিল’ গঠন করা উচিৎ। যখন বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কম ছিল, তখন বিপিসি হাজার হাজার কোটি টাকা তেল বিক্রি করে আয় করেছে। তারা সেই টাকা কী করেছে? তাদেরকে জিজ্ঞেস করা উচিৎ।”

ডিজেলের দাম বাড়ার পর বৃহস্পতিবার ঢাকায় বাস চলাচল তুলনামূলক কম ছিল।

শুরুর বিশৃঙ্খলা পরিবহনে

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা না করে বিভিন্ন স্থানে বাস থেকে বাড়তি ভাড়া আদায় শুরু হয়েছে। আবার কেন্দ্রীয়ভাবে শুক্রবার থেকে বাস-ট্রাক চালানো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পরিবহন মালিকরা।

বৃহস্পতিবারই নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী বাসের ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে অভিযোগ করেছেন মোহাম্মদ আশিক নামে এক ব্যক্তি।

তিনি বলেন, “জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ১৫ টাকা। ভোরের আলো না ফুটতেই নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন বাস ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে।”

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মহাসচিব মোজাম্মেল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, গণপরিবহনে ভাড়া নিয়ে একটা ‘নৈরাজ্যের’ সৃষ্টি হয়েছে।

“সকালে নারায়ণগঞ্জে থেকে ঢাকা আসার পথে একটি বাসে আমার কাছ থেকে ৩৪ টাকার ভাড়া ৫০ টাকা আদায় করেছে। অথচ তেলের দাম বেড়েছে লিটারে ১৫ টাকা।”

মিরপুর থেকে বনশ্রী রুটের বাসের যাত্রী ইশতিয়াক হাসান জানান, বৃহস্পতিবার বাড়তি ভাড়া নেয়নি কোনো বাস। তবে শুক্রবার থেকেই বেশি ভাড়া নেওয়া হবে বলে জানিয়ে দিয়েছে।

“আমি মহাখালী যাই ২০ টাকা করে। বাস থেকে নামার সময় হেলপার বলে দিয়েছে, তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় কাল থেকে ৫ টাকা করে বেশি ভাড়া দিতে হবে।”

এক লাফে তেলের দাম ১৫ টাকা বাড়ানোয় বাসের ভাড়া না বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই বলে যুক্তি দেখাচ্ছেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। তবে মহামারীর এই সময়ে যাত্রীরা এই বর্ধিত ভাড়া দিতে পারবে কি না, তা নিয়েও সন্দিহান তারা।

সায়েদাবাদ-গাজীপুর রুটের বলাকা পরিবহনের চালক মো. স্বপন মিয়া জানান, সায়েদাবাদ থেকে গাজীপুর সারাদিন ৬ বার আসা-যাওয়া করে তার বাস। দৈনিক গড়ে ডিজেল লাগে ৬০ লিটার। লিটারে ১৫ টাকা দাম বাড়ায় এখন তাকে দৈনিক ৯০০ টাকা বেশি খরচ করতে হবে। এ অবস্থায় ভাড়া বাড়ানো ছাড়া উপায় নাই।

“এখন চৌরাস্তা থেকে সায়েদাবাদের ভাড়া ৬০ টাকা করে নিই। আমাদের মালিকের দৈনিক জমা ৩ হাজার টাকা। ভাড়া না বাড়াইলে গাড়ি চালাইয়া পোষামু কেমনে?”

ফাইল ছবি

মুক্তাগাছা থেকে মহাখালীগামী ইসলাম পরিবহনের বাসচালক আনোয়ার হোসেন বলেন, মুক্তাগাছা থেকে ঢাকা আসা-যাওয়ায় গড়ে ৮০ লিটার ডিজেল লাগে। তেলের দাম বাড়ায় নতুন করে আরও ১২শ টাকা বাড়তি খরচ হবে এই খাতে।

এখন ভাড়া বাড়ালেও তা যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা কঠিন হবে বলে মনে করেন এই চালক।

“মুক্তাগাছা থেকে ঢাকার ভাড়া ২০০ টাকা। কিন্তু এই ভাড়াই দেয় না, ১৫০ টাকা, খুব বেশি হলে ১৮০ টাকা নেওন যায়। নতুন ভাড়া কেউ মানব? মানব না, বাড়তি ভাড়া কেউ দিব না। খালি ঝগড়াঝাঁটি বাড়ব। আমাগো জন্য খুব সমস্যা হইয়া গেল, গাড়ি চালানো কঠিন হইয়া যাইব।”

ঢাকা-টাঙ্গাইল রুটের ঝটিকা পরিবহনের বাসের চালক সালাহউদ্দিন বলেন, করোনাভাইরাস মহামারী শুরু হওয়ার থেকে বাসে যাত্রীর পরিমাণ কমে অর্ধেকে চলে এসেছে। এ কারণে তাদের রোজগারও কমে গেছে। এখন বাড়তি খরচ হবে তেলের জন্য।

“তেলের খরচ হেই হারে বাড়ব, ভাড়া কিন্তু সেই হারে বাড়ান যাইব না। আর ভাড়া বাড়লেও মানুষ টেকা দিব কোত্থাইকা। মানুষের কাছে তো টাকাই নাই, আয় রোজগার কইমা গেছে।”

বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসম্পাদক রাকেশ ঘোষ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, হঠাৎ করে তেলের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় পরিবহন খাত সঙ্কটে পড়ে যাবে।

“যৌক্তিক, না অযৌক্তিক, সেটা আমি বলব না। করোনাভাইরাস মহামারীর পর বিশ্ববাজারে সবকিছুর দাম ঊর্ধমুখী। তারমধ্যেও আমাদের দেশে মোটামুটি স্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শুধু যাত্রী পরিবহনই না, ট্রাক, লঞ্চসহ সবকিছুর ভাড়া বেড়ে যাবে। আমাদের পরিবহন খাতেও একটা বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়ে যাবে।”

ভাড়া বাড়ানোর দাবি তুলে পরিবহন মালিকরা ইতোমধ্যে শুক্রবার সকাল থেকে বাস-ট্রাক না চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিআরটিএ রোববার বৈঠক ডেকেছে। আপাতত তখন পর্যন্ত পণ্য পরিবহন ও গণপরিবহন বন্ধই থাকছে।  

ফাইল ছবি

বাংলাদেশ কভার্ড ভ্যান, ট্রাক ও ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি মালিক সমিতি ও বাংলাদেশ ট্রাক কভার্ড ভ্যান, প্রাইম মুভার ও পণ্য পরিবহন মালিক সমিতির ভাইস প্রেসিডেন্ট নুরুল ইসলাম জানান, তারা নতুন ভাড়া নির্ধারণ করতে জরুরি বৈঠকে বসছেন।

ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে আমদানি পণ্য ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকায় এবং রপ্তানি পণ্য ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায় পরিবহন করা হয়।

পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকা চট্টগ্রাম আসা-যাওয়ায় ৪০০ কিলোমিটার পথে জ্বালানিবাবদ খরচ দুই হাজার টাকা বেড়ে যাবে। এভাবে অন্যান্য দূরত্বেও বর্ধিত খরচ হিসাব করে নতুন ভাড়া নির্ধারণ করতে হবে।

খরচা বাড়ছে নৌপথেও

লঞ্চ মালিক সমিতির সহ সভাপতি ও বরিশাল চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি সাইদুর রহমান রিন্টু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ডিজেলের দাম বাড়ায় লঞ্চ ভাড়াও বাড়াতে হবে।

“জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে বর্তমান ভাড়ায় চলা সম্ভব না। একটা লঞ্চে এক থেকে দেড় লাখ টাকার তেল বেশি লাগছে। এই টাকা খরচ করে একটা লঞ্চ চালানো সম্ভব না। আমরা সমিতির নেতারা অচিরেই বৈঠক করে নতুন ভাড়া নির্ধারণ করব।”

এমভি ফারহান লঞ্চের মহাব্যবস্থাপক ফারুক হাসান জানান, দক্ষিণাঞ্চলের হাতিয়া, বেতুয়া, ডুলারহাট, ঝালকাঠি ও বরগুনা রুটে যেসব লঞ্চ চলাচল করে সেখানে প্রতিদিন চার হাজার লিটার তেল খরচ হয়। এছাড়া বরিশাল রুটে যেসব লঞ্চ চলে সেখানে আরও বেশি পরিমাণে তেল খরচ হয়।

লঞ্চ মালিকরা ধারণা করছেন, তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে হাতিয়া ও সমপরিমাণ দূরত্বের গন্তব্যে নতুন করে ৬০ হাজার টাকা এবং বরিশাল ও সমপরিমাণ দূরত্বে অন্তত এক লাখ টাকা করে বেশি খরচ পড়বে।

ফাইল ছবি

ঢাকার সদরঘাট থেকে প্রতিদিন ৮০ থেকে ৮৫টি যাত্রীবাহী লঞ্চ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াত করে।

এছাড়া ঢাকার সদরঘাট থেকে চট্টগ্রামের সদরঘাট ও দেশের বিভিন্ন আন্তঃজেলায় চলাচল করে কয়েকশ মালবাহী লাইটার জাহাজ, বালুবাহী বাল্কহেড ও অন্যান্য ছোট যাত্রীবাহী জাহাজ।

এছাড়া চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ সাগরতীরবর্তী জেলাগুলো থেকে প্রতিদিন যেসব ছোট-বড় নৌযান নদী-সমুদ্রে গমন করে তাদের সবাই জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করে ডিজেল। ফলে ডিজেল জ্বালানির সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে প্রতিটি মানুষের জীবন ও জীবিকা।

বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নুরুল কাইয়ুম খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, সমুদ্রগামী একটি ২০০ টনের জাহাজ ২২ দিনের সাগলে গেলে ৬৭ লাখ টাকার ডিজেল প্রয়োজন হয়। জ্বলানির মূল্য বৃদ্ধির ফলে নতুন করে ১৫ লাখ টাকার খরচ বাড়বে। 

মেরিন ফিশারিজ অ্যাসোসিয়েশনের হিসাব অনুযায়ী, চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে ২৬২টি মাছ ধরার জাহাজ সমুদ্রে গমন করে। কিন্তু এসব জাহাজে ধরা পড়া মাছ কেনার জন্য রয়েছেন ১৫ থেকে ২০ জন ক্রেতার একটি ‘সিন্ডিকেট’। সামুদ্রিক মাছের বিনিময় মূল্য প্রতিকেজি ৬০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কারণে জাহাজ মালিকদের লাভ থাকে খুবই কম।

নুরুল কাইয়ুম বলেন, “জাহাজ মালিকদের মাঝে মধ্যেই মাছ ধরতে গিয়ে লোকসান গুনতে হয়। এখন তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে খরচের যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে, তাতে লোকসানের মুখে থাকা অনেক ব্যবসায়ীকে এই খাত থেকে সরে দাঁড়াতে হবে।”

একই অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শেখ আবিদ হোসেন জানান, সমুদ্রগামী মাছ ধরার জাহাজের সার্বিক খরচের ৭০ শতাংশই হয় তেলের মূল্য বাবদ। ফলে জ্বালানির ২৩ শতাংশ বৃদ্ধিতে একেকটি জাহাজকে ১৫ লাখ থেকে ১৮ লাখ টাকা বেশি গুনতে হবে। কারণ সাগরে একমাস অবস্থান করার জন্য জাহাজগুলোকে ৮০ টন জেল জ্বালাতে হয়।

অন্য খাতেও প্রভাব

পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ সহ সভাপতি শহীদুল্লাহ আজিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি পণ্য পরিবহনের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলবে, যা সামলে উঠা এই  খাতের পক্ষে সম্ভব হবে না।

“এমনিতেই আমাদের দেশে এখন ৭/৮ হাজার টাকার কভার্ডভ্যান ভাড়া বেড়ে ১০/১২ হাজার টাকা, আবার ক্ষেত্র বিশেষ ১৫/২০ হাজার টাকা হয়ে গেছে। এখন নতুন করে দাম বৃদ্ধির খরচ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা চিন্তাও করা যাচ্ছে না।”

এছাড়া পোশাক কারখানার জেনারেটর ও বয়লারগুলোও ডিজেলে চলে বলে সেখানেও ব্যয় বাড়বে বলে জানান তিনি।

সরকারি পর্যায়ে পাইকারি বিদ্যুতের একক ক্রেতা ও বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বিপিডিবির একজন কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ডিজেলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রতিদিন গড়ে ১২০০/১৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়ে থাকে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে সেজন্য অতিরিক্ত ৭০০ কোটি টাকা বেশি খরচ করতে হবে পিডিবিকে। কারণ, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জ্বালানি খরচ বাড়লে কমলে সেটা মূল ক্রয় চুক্তি অনুযায়ী ‘পাস থ্রো’ হয়ে যায়। অর্থাৎ দাম যতটা বাড়ে সেটা বিদ্যুতের মূল্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

ডিজেলের সঙ্গে কেরোসিনের দামও লিটারে ১৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে। ফলে গ্রামের গৃহস্থালিতে কিংবা দোকানে যারা কেরোসিনের চুলা ব্যবহার করেন, তাদের ব্যয় বাড়বে।

বিপিসির হিসাবে, গত এক দশক ধরে কৃষিখাত, শিল্পখাত, বিদ্যুৎ উৎপাদন খাত, যোগাযোগ খাত, গৃহস্থালি খাতে দেশে প্রতি বছর ৫০ লাখ থেকে ৭০ লাখ টন ডিজেল ও কেরোসিন ব্যবহার হচ্ছে।

কেবল ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে যোগাযোগ খাতে ৬৪ শতাংশ, কৃষিখাতে ১৮ শতাংশ, শিল্পখাতে ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ, বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে ৬ দশমিক ৭৪ শতাংশ, গৃহস্থালি খাতে ২ শতাংশ জ্বালানি ব্যয় হয়েছিল।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক