অর্থনীতি ২০২০: মহামারীর খাদ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর আশা নতুন বছরে

রাজনৈতিক স্থিতির সঙ্গে অর্থনীতিতে যে স্বস্তি নিয়ে বাংলাদেশ ২০২০ সাল শুরু করেছিল, প্রথম প্রান্তিক না পেরোতেই করোনাভাইরাস মহামারী সব ওলোটপালট করে দিয়েছে।

আবদুর রহিম হারমাছি প্রধান অর্থনৈতিক প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 30 Dec 2020, 04:50 AM
Updated : 30 Dec 2020, 04:50 AM

শেষ প্রান্তিকে এসে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করলেও সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ জাগিয়ে রেখেছে শঙ্কা। সেই উদ্বেগ সঙ্গী করেই ২০২১ সালে প্রবেশ করছে বাংলাদেশ।

আশার কথা হল, এই মহামারী যতটা বিপদে বাংলাদেশকে ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল, সরকারের সময়োচিত বিভিন্ন পদক্ষেপে তা অনেক ক্ষেত্রে এড়ানো গেছে। সোয়া লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে বড় ভূমিকা রেখেছে।

নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মূল কাঠামো এ বছরই পূর্ণ অবয়ব পেয়েছে। সেই সঙ্গে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স সরকারকে যোগাচ্ছে সাহস।

পুরো বছরের মূল্যায়ন করতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ মুস্তফা কামাল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এই মহামারীর প্রেক্ষাপটে ‘পৃথিবীর যে কোনো দেশের চেয়ে ভালো অবস্থায়’ রয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি।

“সবাইকে অবাক করে দিয়ে এই মহামারীকালেও বেশি বেশি রেমিটেন্স পাঠিয়ে চলেছেন আমাদের প্রবাসী ভাই-বোনেরা। এর উপর ভর করে ৪২ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে রিজার্ভ। রপ্তানি আয় এখনও ইতিবাচক। মূল্যস্ফীতি সহনীয়।

“স্বপ্নের পদ্মা সেতুর পূর্ণ অবয়ব দেশবাসীর মতো আমাদেরও (সরকার) সাহসী করে তুলেছে। এই সাহস দিয়েই আমরা কোভিড-১৯ মোকাবেলা করে মাথা উঁচু করে দাঁড়াব; জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘স্বপ্নের সোনার বাংলা’ গড়ে তুলব।”

করোনাভাইরাসের টিকা আসার খবরও টিকে থাকার সাহস যোগাচ্ছে ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের। পরিস্থিতি কতোদিনে স্বাভাবিক হবে, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব না। তবে দেশের অর্থনীতিকে আবার পথে ফেরানোই যে ২০২১ সালের মূল কথা হবে, সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত।

আর সেজন্য অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের দিকেও মনোযোগী হওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “অর্থনীতির স্বাস্থ্য ভালো রাখতে যে ওষুধ খাওয়ানো প্রয়োজন, সেগুলো করতে হবে। অর্থাৎ যে রিফর্মসগুলো (সংস্কার) জোরালোভাবে চালানো দরকার, সেগুলো করতেই হবে। বিশেষ করে, রজস্ব আদায় বাড়াতে ব্যাপক সংস্কার করতে হবে। ব্যাংক খাতে শৃংখলা ফিরিয়ে আনতেও জোরালো পদক্ষেপ দরকার।”

মহামারীর মধ্যে লকডাউনে সবচেয়ে বেশি ভুগতে হয়েছে নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষকে

জিডিপিতে হোঁচট

ধারাবাহিক অগ্রগতির পথ ধরে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা বাংলাদেশ ২০১৯-২০ অর্থ বছরের জন্যও ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরেছিল। কিন্তু মহামারীর মধ্যে দুই মাসের লকডাউন আর বিশ্ব বাজারের স্থবিরতায় তা বড় ধাক্কা খায়।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে গত অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ২৪ শতাংশে নেমে আসে, যদিও এই অংক আরও কম হওয়ার কথা বলে অনেক বিশ্লেষকের ধারণা।

মহামারীর বাস্তবতার মধ্যেই চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে ৮ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরেছে সরকার। তবে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো অতটা আশা দিতে পারছে না। 

গত অক্টোবরে বিশ্ব ব্যাংক বলেছে, মহামারীর ধাক্কায় ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসতে পারে। আর আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে এই দাতা সংস্থাটি।

আর এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বলেছে, ধাক্কা সামলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। এ কারণে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি ৬ দশমিক ৮ শতাংশ হতে পারে।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের ভাষায়, বিশ্ব ব্যাংক যে পূর্বাভাস দিয়েছে, তা ‘বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে’।

তিনি বলেছেন, “বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুঁরে দাঁড়িয়েছে। সবগুলো সূচকই এখন ভালো। আমার ধারণা, এবার আমাদের প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের উপরে থাকবে।”

করোনাভাইরাসের এই সঙ্কটের মধ্যে খোলা রাখা হয়েছে পোশাক কারখানাগুলো। শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য রাজধানীর মৌচাকে স্নোটেক্স নামের একটি গার্মেন্টসে ঢোকার আগে শ্রমিকদের তামমাত্রা মাপা হচ্ছে। ছবি: মাহমুদ জামান অভি

আহসান এইচ মনসুর বলছেন, অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস ‘মোটামুটি’ গেছে। বাকি ছয় মাসে বড় ধরনের উন্নতি না হলে ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন ‘কোনোভাবেই; সম্ভব নয়।

“একটা বিষয় আমি স্পষ্ট করে বলছি, এই কঠিন সময়ে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি যদি ৫ শতাংশও হয়, তাহলেও সেটা হবে খুবই ভালো হবে। পৃথিবীর অনেক দেশই এই প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারবে না।”

এ বছরের একটি আলোচিত বিষয় ছিল মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে বাংলাদেশের পেছনে ফেলার পূর্ভাভাস। আইএমএফ এর ওই পূর্বাভাস নিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা হয়।

গত অক্টোবরে আইএমএফের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুকের হিসাব ধরে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, ২০২০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ৪ শতাংশ বেড়ে এক হাজার ৮৮৮ ডলারে উন্নীত হতে পারে।

অন্যদিকে লকডাউনের কারণে সংকোচনের মুখে পড়া ভারতের মাথাপিছু জিডিপি সাড়ে ১০ শতাংশ কমে ১ হাজার ৮৭৭ ডলারে নামতে পারে।

তবে আগামী বছর ভারতের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার দ্রত হবে, তাতে মাথাপিছু জিডিপি বেড়ে সামান্য ব্যবধানে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ।

মহামারীকালে চাকরি হারিয়ে ফিরে আসতে হয়েছে অনেক প্রবাসী কর্মীকে।

আশা বাঁচিয়ে রেখেছে রেমিটেন্স

মহামারীর অভিঘাতে পুরো বিশ্বের অর্থনীতিই টালমাটাল। অনেক দেশেই কাজ হারিয়েছেন অভিবাসী কর্মীরা। সরকারি হিসাবে গত ১ এপ্রিল থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ৩ লাখ ২৬ হাজার ৭৫৮ জন প্রবাসী কর্মী দেশে ফিরে এসেছেন।

এই প্রেক্ষাপটে রপ্তানি বাণিজ্যের মত প্রবাসী আয়েও বড় ধাক্কা লাগবে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তবে তা ঘটেনি। বরং প্রবাসী পাঠানো অর্থই আশা বাঁচিয়ে রেখেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরের ২৪ দিনেই ১৬৬ কোটি ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। সব মিলিয়ে ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে রেমিটেন্স বাবদে দেশে এসেছে ২১ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার, যা ২০১৯ সালের পুরো সময়ের চেয়ে ১৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেশি।

এর আগে এক বছরে বাংলাদেশে এত রেমিটেন্স আর কখনো আসেনি। ২০১৯ সালে ১৮ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা।

এই মহামারীর বছরেই প্রবাসী আয়ে আরও একটি রেকর্ড হয়েছে। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের রেমিটেন্স এসেছিল দেশে, যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ।

বাংলাদেশ ব্যাংক, ফাইল ছবি

৪৩ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলকে রিজার্ভ

রেমিটেন্সের উপর ভর করে মহামারীর মধ্যেই বাংলাদেশের বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন ৪৩ বিলিয়ন (৪ হাজার ৩০০ কোটি) ডলারের মাইলফলকে ছুঁতে চলেছে। বাংলাদেশের রিজার্ভ এখন পাকিস্তানের দ্বিগুণেরও বেশি।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২৭ডিসেম্বর রোববার দিন শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৪২ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার, যা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এই বছরের মধ্যেই রিজার্ভ ৪৩ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করবে বলে আশা করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

বর্তমানের রিজার্ভ দিয়ে প্রতি মাসে চার বিলিয়ন ডলার হিসেবে সাড়ে দশ মাসের বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।

অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে পণ্য রপ্তানি থেকে বাংলাদেশ যে আয় করেছে, তার ৪৫ শতাংশই এসেছে নিট পোশাক রপ্তানি থেকে।

রপ্তানি আয়ে ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি

মহামারীর ধাক্কায় রপ্তানি খাত যতটা পিছিয়ে পড়েছে, বড়দিন ঘিরে পোশাক রপ্তানির পালে হাওয়া লাগলে তা কিছুটা হলেও সামলে নেওয়া যাবে বলে আশা করছিলেন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা।

ইউরোপ-আমেরিকায় করোনাভাইরাস সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ সেই আশায় বাধ সাধলেও এর মধ্যেই কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে রপ্তানি বাণিজ্য, আর তা সম্ভব হয়েছে নিট পোশাকে ভর করে।

মহামারীতে বিশ্বের অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ায় গত এপ্রিলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় তলানিতে ঠেকেছিল; ওই মাসে সবিমিলিয়ে মাত্র ৫২ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছিল। পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল মাত্র ৩৬ কোটি ডলার।

বিধি-নিষেধ শিথিলে কারখানা খোলার পর মে ও জুন মাসে রপ্তানি আয় বাড়তে শুরু করে। কিন্তু অক্টোবরে আবার হোঁচট লাগে রপ্তানি আয়ে। নভেম্বরে এসে ফের প্রবৃদ্ধির দেখা মেলে।

সবমিলিয়ে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) এক হাজার ৫৯২ কোটি ৩৫ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ১ শতাংশ বেশি।

এই সময়ে পণ্য রপ্তানি থেকে বাংলাদেশ যে আয় করেছে, তার ৪৫ শতাংশই এসেছে নিট পোশাক রপ্তানি থেকে।

বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও এভিন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, কম দামের পোশাক, বিশেষ করে নিট পোশাক রপ্তানি বাড়ায় কিছুটা স্বস্তি থাকলেও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নতুন করে ‘লকডাউন’ শঙ্কাও জাগাচ্ছে। সব মিলিয়ে আগামী কয়েক মাসে ভালো কিছুর আশা তারা করতে পারছেন না।

তবে অর্থনীতির গবেষক আহসান এইচ মনসুর বলছেন, এই দুঃসময়ে সামান্য হলেও প্রবৃদ্ধি হওয়াটাই আশার কথা।

মহামারীতে লকডাউনেও সচল ছিল চট্টগ্রাম বন্দর, তবে আমদানি-রপ্তানি দুটোই হয়েছে কম

আমদানি কমছে

২০১৯-২০ অর্থবছরে আমদানি ব্যয় আগের বছরের চেয়ে ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ কমেছিল। করোনাভাইরাসের ধাক্কায় ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ভাগে তা আরও কমেছে। এর অর্থ হল, দেশের মানুষের ভোগ ব্যয় কমেছে এবং নতুন শিল্প স্থাপনে বিনিয়োগ কমেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-অক্টোবর সময়ে ১৫ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলারের বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৩ শতাংশ কম।

এই চার মাসে খাদ্য পণ্য ছাড়া সব পণ্যের আমদানিই কমেছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি (ঋণপত্র) খোলার পরিমাণ কমেছে ৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ। জ্বালনি তেল আমদানির এলসি কমেছে ৩৫ শতাংশ। আর শিল্পের কাঁচামালের আমদানি কমেছে ৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ। শিল্পের মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি কমেছে ১২ দশমিক ৫৫ শতাংশ।

লেনদেন ভারসাম্যে বড় উদ্বৃত্ত

মহামারীর মধ্যে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সূচক বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট) উদ্বৃত্ত বেড়েই চলেছে।

অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) এই উদ্বৃত্তের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪০৫ কোটি ৪০ লাখ (৪.০৫ বিলিয়ন) ডলার। গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের এই সময়ে ১৫২ কোটি ১০ লাখ ডলার ঘাটতি ছিল।

আহসান এইচ মনসুর বলছেন, রেমিটেন্স উল্লম্ফন এবং আমদানির ব্যয় কমার কারণেই লেনদেন ভারসাম্যে বড় উদ্বৃত্ত রয়েছে।

“কিন্তু ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কোভিড-১৯ এর দ্বিতীয়-তৃতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। বাংলাদেশেও সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে রেমিটেন্স ও রপ্তানি আয় কমলে লেনদেন ভারসাম্যসহ অর্থনীতিতে যে স্বস্তির একটা ভাব ছিল, সেটা আর থাকবে না।”

অক্টোবরে বাড়লেও নভেম্বরে কিছুটা কমে এসেছে মূল্যস্ফীতি

মূল্যস্ফীতি ‘সহনীয়’

পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে (মাসওয়ারি) এবার নভেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ, গত বছরের নভেম্বর মাসে তা ছিল ৬ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ।

খাদ্য সামগ্রীর দাম বাড়ায় গত অক্টোবরে মূল্যস্ফীতি যেটুকু চড়েছিল, তা কমে এসেছে এক মাস বাদে। বাজারে শীতের সবজি ওঠার পাশাপাশি আলু, পেঁয়াজের দাম কমায় নভেম্বরে মূল্যস্ফীতি কমেছে বলে জানিয়েছে পরিসংখ্যান ব্যুরো।

সাত বছর পর গত অক্টোবরে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সূচক মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৬ শতাংশে উঠেছিল, নভেম্বরে তা ৫ দশমিক ৫২ শতাংশে নেমে এসেছে।

এর অর্থ অর্থ হল, ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে যে পণ্য বা সেবার জন্য ১০০ টাকা খরচ করতে হত, ২০২০ সালের নভেম্বরে সেই পণ্য বা সেবার জন্য ১০৫ টাকা ৫২ পয়সা খরচ করতে হয়েছে।

রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি ৩.৫৩ শতাংশ

গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে আগের বছরের চেয়ে ২ দশমিক ৪৫ শতাংশ রাজস্ব আদায় কম হয়েছিল। আশঙ্কা করা হয়েছিল, মহামারীর কারণে এবার রাজস্ব আদায় অনেক কমে যাবে। তবে পরিস্থিতি ততটা খারাপ হয়নি।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, চলতি অর্থবছরের পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) সময়ে ৮৭ হাজার ৯২ কোটি ৭১ লাখ টাকার রাজস্ব আদায় হয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৩ দশমিক ১৯ শতাংশ বেশি।

তবে এই পাঁচ মাসে লক্ষ্যের চেয়ে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা কম আদায় হয়েছে। এ সময়ে লক্ষ্যমাত্রা ধরা ছিল ১ লাখ ১২ হাজার ৯৫৯ কোটি টাকা।

তলানিতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি

বিনিয়োগ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান নিয়ামক হচ্ছে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ। কোভিড-১৯ মহামারীর মধ্যে প্রণোদনায় ভর করে বাড়তে থাকা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি ফের তলানিতে নেমে এসেছে।

২০১৯-২০ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৬১ শতাংশে নেমে এসেছিল। প্রণোদনা ঋণে ভর করে চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে প্রবৃদ্ধি হয় ৯ দশমিক ২০ শতাংশ।

অগাস্টে তা বেড়ে ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশে ওঠে। সেপ্টেম্বরে তা আরও বেড়ে ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ হয়। কিন্তু অক্টোবরে দা এক শতাংশ পয়েন্ট কমে আবার সেই ৮ দশমিক ৬১ শতাংশে নেমে এসেছে।

কমছে সরকারের ব্যাংক ঋণ

চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৮৫ হাজার কোটি টাকা ধার করার লক্ষ্য ধরেছিল সরকার। চার মাস পার হয়ে গেলেও নিয়েছে মাত্র ৯৪৫ কোটি টাকা।

ধারণা করা হয়েছিল, মহামারীর এই কঠিন সময়ে সরকারকে ব্যাংক থেকে প্রচুর ঋণ করে দেশ চালাতে হবে। তবে বাস্তবে তেমনটি ঘটেনি।

সঞ্চয়পত্র বিক্রি অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় এবং মহামারী মোকাবেলায় বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার কাছ থেকে প্রচুর ঋণ পাওয়ায় সরকারকে ব্যাংকের দারস্ত হতে হচ্ছে না। এ কারণেই ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ নিচের দিকে নামতে শুরু করেছে।

ঢাকার মতিঝিলে সোনালী ব্যাংকের স্থানীয় কার্যালয়, ফাইল ছবি

সঞ্চয়পত্র: গত অর্থবছরের বেশি ঋণ ৪ মাসেই

ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ কমলেও সঞ্চয়পত্র থেকে অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে।

চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে সঞ্চয়পত্র থেকে ১৫ হাজার ৬৪২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ঋণ হয়েছে সরকারের, যা গত অর্থবছরের (জুলাই-জুন) পুরো সময়ের চেয়ে এক হাজার ২১৪ কোটি টাকা বেশি।

গত অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে সঞ্চয়পত্র থেকে ৫ হাজার ৫২১ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছিল সরকার। এ হিসাবে অর্থবছরের প্রথম চার মাসে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ বেড়েছে আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে তিন গুণ।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরেছে সরকার। তার ৭৮ দশমিক ২১ শতাংশ চার মাসেই নেওয়া হয়ে গেছে।

গত অর্থবছরে এই খাত থেকে মোট ১৪ হাজার ৪২৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকার ঋণ নিয়েছিল সরকার। 

বিদেশি ঋণ-সহায়তা বেড়েছে ৮৩%

চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বাবদ বাংলাদেশে এসেছে ১৬৫ কোটি ১০ লাখ ডলার। গত বছরের এই চার মাসে এসেছিল ৯০ কোটি ১০ লাখ ডলার। অর্থাৎ, এই চার মাসে বিদেশি ঋণ-সহায়তা বেড়েছে ৮৩ দশমিক ২৪ শতাংশ।

করোনাভাইরাসের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিসহ বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থার কাছ থেকে মোটা অংকের ঋণ পাওয়ার কারণে বিদেশি ঋণে এই উল্লম্ফন হয়েছে।

গত অর্থবছরে ৭ বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা দিয়েছিল দাতারা, যা ছিল আগরে বছরের চেয়ে ১১ দশমিক ৭০ শতাংশ বেশি।

এডিপি বাস্তবায়নে গতি নেই

বিদেশি ঋণ-সহায়তা বাড়লেও সরকারের উন্নয়ন কাজে তেমন গতি নেই মহামারীর মধ্যে।

অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ১২ দশমিক ৭৯ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে বাস্তবায়নের হার ছিল ১৩ দশমিক ২৫ শতাংশ।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ভবন

ফুরফুরে মেজাজে পুঁজিবাজার

দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশের পুঁজিবাজার চলছে ফুরফুরে মেজাজে। মূল্যসূচকের পাশাপাশি লেনদেনেও মোটামুটি চাঙাভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

২০১০ সালের ধসের পর নানা উদ্যোগ নেওয়ার পরও বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে ঘুরে দাঁড়ায়নি। মাঝে-মধ্যে এক-দুই মাসের জন্য বাজারে কিছুটা ইতিবাচক ধারা লক্ষ্য করা গেলেও পরে আর সেটা স্থায়ী হয়নি। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে আরও একটি বড় ধসের মুখে পড়ে পুঁজিবাজার। বেশিরভাগ শেয়ারের দর তলানিতে নেমে যায়।

মার্চে দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে লকডাউনের মধ্যে দুই মাসের বেশি সময় বন্ধ থাকে লেনদেন। ৩১ মে থেকে দেশের পুঁজিবাজারে ফের লেনদেন শুরু হয়।

মহামারী শুরুর পর গত জুনে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স যেখানে ৪ হাজার পয়েন্টের নিচে নেমে গিয়েছিল, সেই সূচক এখন সোয়া ৫ হাজার পয়েন্ট ছাড়িয়ে গেছে। লেনদেনও ছাঁড়িয়েছে হাজার কোটি টাকা।

মঙ্গলবার দিন শেষে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স  ৫ হাজার ৩৫৮ পয়েন্টে অবস্থান করছিল। লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা।

ব্যাংক খাতের কার্যক্রম প্রণোদনা ঘিরে

প্রণোদনার বাইরে ব্যাংক খাতের অন্য ঋণ বিতরণ কার্যক্রম এখন অনেকটাই স্থবির। সেই সঙ্গে বন্ধ আছে সব ধরনের ঋণের কিস্তি আদায়।

মহামারীর কারণে জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ঋণ শ্রেণিকরণে স্থগিতাদেশ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। পরে দুই দফায় তার মেয়াদ ৬ মাস বাড়িয়ে ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়।

সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ায় এই সময় আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে এফবিসিসিআইসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন। সার্বিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

অন্য বছর ঈদ এলে ব্লক প্রিন্টয়ের কাজে ব্যস্ততা বাড়ে কারিগরদের, এবার মহামারীর মধ্যে ব্যবসা কার্যত বন্ধই ছিল। এ ধরনের ছোট ব্যবসার জন্যও সরকার প্রণোদনা দিয়েছে, কিন্তু সেই ঋণ দিতে আগ্রহী হয়নি ব্যাংকগুলো

প্রণোদনা: ‘ছোট’রা বঞ্চিত

দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবেলায় সোয়া লাখ কোটি টাকার মোট ২১টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে সরকার।

এরমধ্যে সবচেয়ে বড় প্যাকেজ ৩৩ হাজার কোটি টাকার, শিল্প ও সেবা খাতের জন্য। ২০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ সিএমএসএমই’র জন্য।

প্রণোদনার এই অর্থ ব্যাংক থেকে ঋণ হিসেবে পাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। এই দুই প্যাকেজের অর্থের অর্ধেক বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জোগান দেওয়া হচ্ছে।

দুই প্যাকেজেরই ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ। এর মধ্যে ৪ শতাংশ পরিশোধ করবে ঋণ গ্রহীতা শিল্প/ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। বাকি ৫ শতাংশ সরকার ভর্তুকি হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে দেবে।

শিল্প ও সেবা খাতের প্যাকেজের ৩৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ বড় উদ্যোক্তাদের বিতরণ করে ফেলেছে ব্যাংকগুলো। কিন্তু ছোট উদ্যোক্তাদের ঋণ বিতরণ বাড়ানো যায়নি নানা পদক্ষেপ নিয়েও।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য বরাদ্দ ২০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত বিতরণ করা হয়েছে ৮ হাজার ২১৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ, অর্ধেকও বিতরণ হয়নি।

অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বার বার তাগাদা দেওয়া হয়েছে ব্যাংকগুলোকে, ঋণ বিতরণের সময়সীমাও বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু প্রত্যাশিত ফল মেলেনি।

গত ৩ ডিসেম্বর এক মতবিনিময় সভায় ‘কর্মসৃজন ও গ্রামীণ অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন অর্থসচিব আবদুর রউফ তালুকদার। সেখানে বলা হয়, সিএমএসএমই খাতের ঋণ বিতরণ পরিস্থিতি নিয়ে খুশি নয় অর্থ মন্ত্রণালয়।

“যেমনটা প্রত্যাশা করা হয়েছিল ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প এবং মাঝারি শিল্পে (সিএমএসএমই) তেমন ঋণ বিতরণ হয়নি। এমনকি, ছোট ঋণের ঝুঁকির দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংক নেওয়ার পরও এ খাতের ঋণ বিতরণ বাড়েনি। এটা খুবই দুঃখজনক।”

এর বাইরে ছোট উদ্যোক্তাদের অন্য পাঁচটি প্যাকেজের ঋণ বিতরণের চিত্রও হতাশাজনক। কোনো কোনো প্যাকেজের একশ-দেড়শ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ হয়েছে মাত্র।

এফবিসিসিআই সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নানা অজুহাতে ব্যাংকগুলো ছোট ঋণ বিতরণে আগ্রহ দেখায় না। অথচ এই ঋণ খেলাপি হওয়ার নজির খুবই কম। তারপরও ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে কেন ঋণ দিতে চায় না বুঝতে পারি না। আমি মনে করি, শুধু বড় বড় উদ্যোক্তা নয়; সবার পাশেই ব্যাংকগুলোর দাঁড়ানো উচিৎ।”

বিদেশি বিনিয়োগে সুখবর নেই

মহামারীর ধাক্কায় বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মত বাংলাদেশেও বিদেশি বিনিয়োগ আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) ৭২ কোটি ডলারের সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এসেছে, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩১ শতাংশ কম।

২০১৯-২০ অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে ১০৪ কোটি ডলারের এফডিআই পেয়েছিল বাংলাদেশ।

এই চার মাসে নিট এফডিআই কমেছে আরও বেশি; ৫০ দশমিক ১৬ শতাংশ। এ সময়ে মাত্র ১৫ কোটি ৩০ লাখ ডলারের নিট এফডিআই পেয়েছে বাংলাদেশে। গত বছরের একই সময়ে তা ৩০ কোটি ৭০ লাখ ডলার ছিল।

আর এক বছরের মধ্যে পদ্মা সেতু চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া যাবে বলে আশা করছে সরকার

নতুন আশা পদ্মা সেতু ঘিরে

দক্ষিণ জনপদের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণে যে বিপুল কর্মযজ্ঞের সূচনা হয়েছিল পদ্মার পাড়ে, তা এখন পূর্ণ অবয়ব পেয়েছে। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতুর পুরো মূল কাঠামো ইতোমধ্যে পুরোপুরি দৃশ্যমাণ হয়েছে।

এখন সেতুর ঢালাইয়ের কাজ, অ্যাপ্রোচ রোড ও ভায়াডাক্ট প্রস্তুত করা, রেলের জন্য স্ল্যাব বসানো হয়ে গেলেই স্বপ্নের পদ্মাসেতু যানবাহন চলাচলের উপযোগী হবে। সেজন্য আরও বছরখানেক সময় লাগবে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক জায়েদ বখত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বঙ্গবন্ধু সেতু চালুর পর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে; তারচেয়েও বেশি প্রভাব রাখবে পদ্মা সেতু।

ইতোমধ্যে এই সেতু ঘিরে ঢাকাসহ আশপাশের এলাকা এবং দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় নানা খাতে বিনিয়োগ শুরু হয়ে গেছে। একের পর এক গড়ে উঠবে ছোট-বড় শিল্প কলকারখানা।

“সবচেয়ে বড় কথা হলো সড়কপথ ও রেলপথে যোগাযোগের সময় চার ঘণ্টা কমে যাবে। তাতে মানুষের যাতায়াত সহজ হবে। নতুন ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে উঠবে।”

জায়েদ বখত বলেন, প্রাক–সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সময় বিআইডিএস অনুমান করেছিল, পদ্মা সেতু হলে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। তবে এখনকার বাস্তবতায় সেই হার আরও বেশি হবে।

“সেতু চালু হলে সম্প্রসারিত হবে বাজার। এত দিন সেখানে কৃষিপণ্যের বাজার ছোট ছিল, এখন সেই বাজার বড় হবে। কৃষকেরা ঢাকায় ফসল পাঠাতে পারবেন। ধারণা করা যায়, দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের মোট আয় দ্বিগুণ হয়ে যাবে।”

পদ্মা সেতুর চালু হলে মোংলা বন্দর গতি পাবে। এতোদিন এই বন্দর তেমন একটা ব্যবহৃত হতো না। এখন যোগাযোগ গতি পেলে এই বন্দরের ব্যবহারও বাড়বে।

“সে কারণেই আমি বলছি, আমরা যা ধারনা করছি, তারচেয়ে বেশি সাফল্য নিয়ে আসতে পারে স্বপ্নের পদ্মা সেতু,” বলেন জায়েদ বখত।

পদ্মা সেতু চালু চলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুই অংকের ‘ঘরে’ গিয়ে পৌঁছাবে বলে আশা করছেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল।

তিনি বলেন, “পদ্মা সেতু চালু হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার হবে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি এক থেকে দেড় শতাংশ বাড়বে। আমাদের সরকারের নিজস্ব গবেষণাও তাই বলে।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক