মহামারীকালের বাজেটে অসম্ভব আশায় ভর

মহামারীকালে চতুর্মুখী চাপের মধ্যে ৫ লক্ষ ৬৮ হাজার কোটি টাকার যে বাজেট দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, তাতে সঙ্কট সামাল দিতে সরকারের পকেট কিছুটা চওড়া হবে, কিন্তু সেই অর্থের সংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকছেই।

আবদুর রহিম হারমাছি প্রধান অর্থনৈতিক প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 11 June 2020, 09:08 PM
Updated : 12 June 2020, 00:36 AM

২০২০-২১ সালের জন্য তিনি দেশের আয়-ব্যয়ের যে ফর্দ হাজির করেন, তা কাটাছেঁড়া করে ‘অসম্ভব কল্পনাবিলাসই’ দেখতে পাচ্ছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা।

অবশ্য এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের আর কোনো অর্থমন্ত্রীকে বাজেট দিতে হয়নি। মানুষের জীবন আর জীবিকা- দুই কূলই রক্ষা করার কথা মাথায় রাখতে হয়েছে মুস্তফা কামালকে।

সেজন্য গতানুগতিক বাজেটের ধারা থেকে সরে এসে সরকারের অগ্রাধিকারের কাঠামো পরিবর্তন করার কথা অর্থমন্ত্রী নিজেই বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন।

স্বাভাবিকভাবেই করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় তাকে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হয়েছে, লকডাউনে আয়হীন-কর্মহীন হয়ে পড়া কোটি মানুষের খাওয়ানোর জন্য রাখতে হয়েছে অর্থ। এভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেড়েছে ব্যয়ের বড় বড় অংক।

বিপরীতে আয়ের খাত ছিল সঙ্কুচিত। মহামারীতে সাধারণ মানুষের উপর প্রত্যক্ষ কর বাড়াতে পারেননি তিনি। রপ্তানি নেমে এসেছে রেমিটেন্সেরও নিচে, সেখানেও কিছু আরোপ করা কঠিন ছিল। ব্যাংক খাতের নাজুক অবস্থার সঙ্গে পুঁজিবাজারেও আশা জাগানিয়া কিছু নেই।

এই অবস্থায় ক্ষতবিক্ষত অর্থনীতিকে টেনে তুলতে বাড়তি অর্থ যোগাড়ের কথা ভাবতে গিয়ে বাজেট ঘাটতির ৫ শতাংশের বৃত্ত ভাঙার সাহস দেখাতে হয়েছে মুস্তফা কামালকে।

বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে কত আয় হবে, সেটা নিয়ে খুব বেশি না ভেবে অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও জোগানকে ঠিক রাখতে জিডিপির ৬ শতাংশ, ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা ধার-দেনার প্রস্তাব করেছেন তিনি।

অর্থমন্ত্রীর আশা, কর-রাজস্ব থেকে আয় হবে ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এই দুই খাতের প্রাপ্তি থেকে আগামী অর্থবছরে তার ব্যয় পরিকল্পনা ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা।

বিশাল ঘাটতি পূরণে তিনি আশা করছেন, বিদেশ থেকে ৮০ হাজার ১৭ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ৯ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা ঋণ করে তা মেটানো যাবে।

মহামারীর অনিশ্চিত যাত্রার মধ্যেও নতুন বাজেটে ৮ দশমিক ২ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (জিডিপি প্রবৃদ্ধি) অর্জনের লক্ষ্য ধরেছেন মুস্তফা কামাল।

তার এই লক্ষ্যকে ‘হাস্যকর’ বলছেন অর্থনীতির গবেষক আহসান এইচ মনসুর এবং এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম।

রাজস্ব আদায়ের যে বিশাল লক্ষ্য ধরেছেন অর্থমন্ত্রী; তাও ‘অবাস্তব’ বলে মনে করছেন তারা।

কোভিড-১৯ মোকাবেলায় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে যে বড় অঙ্ক বরাদ্দ করা হয়েছে, তা কীভাবে ব্যয় হবে, তার দিক-নির্দেশনা না থাকার বিষয়টিও সামনে আসছে।

করোনাভাইরাস মহামারী গোটা দুনিয়ার চেনা-জানা অনেক কিছুই পাল্টে দিয়েছে। বাদ যায়নি বাংলাদেশে বাজেট উত্থাপন প্রক্রিয়াও। বাজেট পেশকে ঘিরে যে উৎসব, তার রঙও ফিকে হয়ে পড়েছিল ।

ভাইরাস সংক্রমণ এড়াতে স্বাস্থ্য বিধি কঠোরভাবে মেনে বসা সংসদে বৃহস্পতিবার শেখ হাসিনার টানা তৃতীয় মেয়াদের সমরকারের দ্বিতীয় বাজেট নিয়ে হাজির হন মুস্তফা কামাল। যার শিরোনাম তিনি দিয়েছেন-‘অর্থনেতিক উত্তরণ ও ভবিষ্যৎ পথ পরিক্রমা’

মন্ত্রিসভায় বাজেট অনুমোদন থেকে শুরু করে সংসদ নেতা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গী হয়ে সংসদে প্রবেশ, সবখানেই ছিল সামাজিক দূরত্ব। এমনকি অধিবেশন কক্ষে সংসদ সদস্যদের উপস্থিতিও ছিল অনেক কম, কেবল কোরাম পূরণ করার মত।

২০২০-২১ অর্থ বছরের জন্য বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করতে বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে জাতীয় সংসদ ভবনে ঢুকছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল। ছবি: পিআইডি

তার মধ্যেই বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ১৩.২৪ শতাংশ বাড়িয়ে নতুন অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী। টাকার ওই অংক বাংলাদেশের মোট জিডিপির ১৭.৯ শতাংশের সমান।

বিদায়ী অর্থবছরে মুস্তফা কামালের দেওয়া বাজেটের আকার ছিল ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটের ১৮ শতাংশ বেশি এবং জিডিপির ১৮.৩ শতাংশের সমান।

এবার বাজেট তৈরি করতে গিয়ে ব্যয় আর আয়ের হিসাব মেলানো যে কঠিন ছিল, স্বাভাবিকভাবেই তা ফুটে ওঠে অর্থমন্ত্রীর কথায়।

বাজেট বক্তৃতার শুরুতেই তিনি বলেন, “যেহেতু চলতি অর্থবছরেই পড়েছে জাতির পিতার শততম জন্মবার্ষিকী, যেহেতু এ বছরটি জাতির জন্য বিশেষ একটি বছর, আমরা সবাই পুরেপুরি আত্মপ্রত্যয়ী ছিলাম, এ বছর আমরা আমাদের অর্থনীতিতে দেশের সেরা প্রবৃদ্ধিটি জাতিকে উপহার দেব। এক্ষেত্রে আমাদের ইস্পিত লক্ষ্যমাত্রাটি ছিল শতকরা ৮.২ ভাগ থেকে ৮.৩ ভাগ ।

“আমরা শুরুও করেছিলাম সুন্দর আশাদীপ্তভাবে অসাধারণ গতিতে। কিন্তু দুঃখের বিষয় করোনার প্রভাব সারা বিশ্বের অর্থনীতির হিসাব- নিকাশকে সম্পূর্ণ ওলটপালট করে দিয়েছে।”

এই মহামারীর প্রভাবে গত ৩ মাস ধরে অর্থনীতির চাকা থেমে আছে বলা যায়। চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা দ্বিতীয়বার সংশোধনের পরও পূরণ হচ্ছে না বলেই ধরে নেওয়া যায় । কিন্তু খরচ তো আর থেমে থাকবে না, সুতরাং ধার-দেনাই ভরসা।

আয়ের হিসাব মেলাতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী দেখেছেন, সব মিলে হাতে আসতে পারে ৩ লাখ ৮২ হাজার ১৬ কোটি টাকা। কিন্তু ব্যয়ের হিসাব তো আরো অনেক বেশি, ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা।

বাকি ১ লাখ ৮৯ হাজার ৯৯৭ কোটি টাকার জন্য তাকে ভর করতে হচ্ছে দেশের ব্যাংক থেকে ধার-দেনার ওপর। আর এ কারণেই ঘাটতি ছাড়িয়েছে ৬ শতাংশ।

বাজেটে আয়ের অন্যতম বড় জায়গা কর রাজস্ব। এর মধ্যে বেশিরভাগের জোগান দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর। করব্যতীত প্রাপ্তি এবং বিদেশি অনুদান সব মিলে আয় ৩ লাখ ৮২ হাজার ১৬ কোটি টাকা।

 

অনুদান বাদে ঘাটতি ১ লাখ ৮৯ হাজার ৯৯৭ কোটি টাকাকেও আয় হিসেবেই দেখিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এর বড় অংশ নেওয়া হবে ব্যাংক থেকে ঋণ হিসেবে। ব্যাংক বহির্ভূত ঋণও আছে ২৫ হাজার কোটি, যার উৎস সঞ্চয়প্রকল্প। ৫ হাজার কোটি টাকা আসবে বিভিন্ন খাত থেকে।

অর্থনীতিতে অর্থের সরবরাহ বাড়াতে এবার কালো টাকা সাদা করার অনেকটা ঢালাও সুযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রসাধন সামগ্রী ও মোবাইল সেবায় সম্পূরক শুল্ক এবং ব্যাংকে ১০ লাখের বেশি টাকা জমার ক্ষেত্রে আবগারি শুল্ক বাড়ানো হয়েছে।

৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার ব্যয় পরিকল্পনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অনুন্নয়ন বা পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৪৮ হাজার ১৮০ কোটি টাকা, আর উন্নয়ন ব্যয় ২ লাখ ১৫ হাজার ৪৩ কোটি টাকা।

উন্নয়ন ব্যয়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি-এডিপি ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা, এডিপি বহির্ভূত প্রকল্পে ৪ হাজার ৭২২ কোটি কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি ২ হাজার ৬৫৪ কোটি এবং বিভিন্ন স্কিমে রাখা আছে ২ হাজার ৫২২ কোটি টাকা।

উন্নয়ন ও পরিচালন ব্যয়ের সব মিলে ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার মধ্যে অর্থমন্ত্রী সবচেয়ে বেশি টাকা খরচ করবেন জনপ্রশাসন অর্থাৎ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেছনে।

সহজ করে এভাবে বলা যায়, মোট ব্যয় অর্থাৎ বাজেট যদি ১০০ টাকা ধরা হয়, তবে তার ১৮.৫ টাকাই যাবে সরকারি চাকুরেদের বেতন-ভাতা পরিশোধে।

১০০ টাকার হিসাবে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে যাবে ১৫.২০ টাকা। এরপর সবচেয়ে বেশি অর্থ দরকার হবে সুদ পরিশোধে ১০.৯০ টাকা। পরিবহন যোগাযোগ খাতে ১২.৪ টাকা। স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন পাবে ৭.২ টাকা। প্রতিরক্ষায় ৬.১ টাকা, সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ বাবদ খরচ ৫.৬ টাকা। কৃষিতে ৫.৪০ টাকা, জ্বালানী ও বিদ্যুৎ খাতে ৫.৪ টাকা। জনশৃংখলা ও নিরাপত্তায় ৫.৩ টাকা, গৃহায়নে ১.৩ টাকা। বিনোদন, সংস্কৃতি ও ধর্ম বাবদ মাত্র ০.৯ টাকা, শিল্প ও অর্থনৈতিক সার্ভিসে ০.৭ টাকা এবং বিবিধ ব্যয়ে ০.২ টাকা।

মহামারীর এই কঠিন সময়ে এবারের বাজেটে তিন খাত সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে। প্রথমটি হচ্ছে স্বাস্থ্য খাত। দ্বিতীয় ও তৃতীয়টি হচ্ছে যথাক্রমে কৃষি ও সামাজিক নিরাপত্তা খাত।

কোভিড-১৯ মোকাবেলায় যে কোনো জরুরি চাহিদা মেটানোর জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে এবারের বাজেটে। সব মিলিয়ে স্বাস্থ্যখাতে মোট ৪১ হাজার ২৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী।

বরাদ্দের এই অঙ্ক জিডিপির ১ দশমিক ৩ শতাংশ এবং মোট বাজেট বরাদ্দের ৭ দশমিক ২ শতাংশ।

অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেন, প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসকে ‘সঠিকভাবে মোকাবেলা ও এর অর্থনৈতিক প্রভাব দৃঢ়তার সাথে কাটিয়ে ওঠার স্বার্থে’ এবার গতানুগতিক বাজেটের ধারা থেকে কিছুটা সরে এসেছেন তিনি।

“সে কারণে এবারের বাজেটে সরকারের অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে কাঠামো পরিবর্তন আনা হয়েছে । স্বাস্থ্য খাতকে এবার সর্বাপেক্ষা অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে এবং করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে এ খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ, প্রণোদনা ও ক্ষতিপূরণ ইত্যাদির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে ।”

অর্থমন্ত্রী ২০২০-২০১১ অর্থবছরে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জন্য ২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেন।

গত অর্থবছরের মূল বাজেটে এই বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ২৫ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা। তবে সংশোধিত বাজেটে তা ২৩ হাজার ৬৯২ কোটি টাকায় নেমে আসে।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ এড়ানোর পদক্ষেপে এবার বাজেট উপস্থাপনের সময় সংসদে ঢোকার সুযোগ না পেয়ে বাজেটের তথ্যাবলির বই নিয়ে বেরিয়ে আসেন গণমাধ্যমকর্মীরা। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

এই হিসাবে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের বরাদ্দ বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ২৩ শতাংশ বেড়েছে।

স্বাস্থ্য খাতের নাজুক অবস্থা যে করোনাভাইরাস মহামারী প্রকাশ করে দিয়েছে, তা স্বীকার করেছেন পাঁচ বছর পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্ব সামলানোর পর দুই বছর আগে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে আসা মুস্তফা কামাল।

তিনি বলেন, করোনাভাইরাস স্বাস্থ্য খাতের নাজুক অবস্থা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। রাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী হিসেবে এই অব্যবস্থাপনা বড় পীড়া দিয়েছে তাকে।

করোনাভাইরাস মহামারী বিশ্বে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা জাগিয়ে তুলছে বলে কৃষিতে মনোযোগ দিতে হয়েছে অর্থমন্ত্রীকে।

তিনি বলেন, “করোনা উত্তর পৃথিবীতে দুর্ভিক্ষের যে পূর্বাভাস রয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের বিশাল জনজনগোষ্ঠীর খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তাসহ কৃষিখাতের সাথে জড়িত কৃষক, কৃষি শ্রমিক ও অন্যান্য সংশ্লিষ্টদের জীবন ও জীবিকা নিশ্চিত করাই কৃষিখাতের অন্যতম চ্যালেঞ্জ।”

কৃষিতে শতভাগ যন্ত্রের ব্যবহার বাড়িয়ে উৎপাদন খরচ কমাতে চান অর্থমন্ত্রী। আর এজন্য নতুন বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ রেখেছেন ২৯ হাজার ১৮৩ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ ছিল ২৭ হাজার ২৩ কোটি টাকা।

কোভিড-১৯ ঠেকানোর ‘লকডাউনে’ ইতোমধ্যে ৫ কোটির বেশি মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিতে হয়েছে সরকারকে, যা সঙ্কট না কাটা অবধি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা রয়েছে।

এই অর্থের জোগানে নতুন বাজেটের ১৬ দশমিক ৮৩ শতাংশই সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন। এই খাতে বরাদ্দ ৯৫ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক ০১ শতাংশ।

বিদায়ী ২০১৯-২০ অর্থবছরের মূল বাজেটে এ খাতে ৭৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হলেও সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ৮১ হাজার ৮৬৫ কোটি টাকা করা হয়।

মহামারীকালে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে অর্থ বরাদ্দের প্রশংসা পেলেও জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে অর্থমন্ত্রীর প্রাক্কলন পড়েছে সবচেয়ে বেশি সমালোচনায়।

বিদায়ী ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হলেও সংশোধিত বাজেটে তা ৫ দশমিক ২ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে।

করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২০-২১ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল। ছবি: পিআইডি

এর মধ্যে নতুন বছরের জন্য আবার ৮ দশমিক ২ শতাংশ অর্জনের লক্ষ্য ধরাকে ‘হাস্যকর’ অভিহিত করে আহসান মনসুর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটককে বলেন, এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

“অর্থমন্ত্রী জিডিপির কী লক্ষ্য ধরলেন, বুঝতে পারছি না। কোথা থেকে আসবে এই প্রবৃদ্ধি? আমরা অর্থনীতিবিদরা পাঁচ-সাড়ে পাঁচ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরতে বলেছিলাম। সেখানে ৬ শতাংশ ধরা যেতে পারত। বড় এই লক্ষ্য অর্জন ‘অবাস্তব’ এবং ‘কল্পনাপ্রসূত’।”

রপ্তানি আয়-রেমিটেন্স কমছে, আমদানি তলানিতে, মহামারী কত দিন চলবে, তাও নিশ্চিত নয়। “তারপরও ৮ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কোন যাদুর বলে আসবে?” প্রশ্ন করেন ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আহসান মনসুর।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “৮ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি যেটা ধরা হয়েছে, এটা বাস্তব সম্মত নয়।

“বিশ্ব ব্যাংক যেখানে আগামী অর্থবছরে যেখানে এক শতাংশ মতো প্রবৃদ্ধি কথা বলেছে, সেখানে প্রবৃদ্ধির এই টার্গেট একেবারেই অবাস্তব।”

একই কথা বলেন সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনও। তিনি তার পাশাপাশি রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রাও বাস্তবভিত্তিক নয়।

মির্জ্জা আজিজও বলেন, “রাজস্ব আদায়ের যে টার্গেট নেওয়া হয়েছে, এটা অর্জন করা সম্ভব নয়।”

 

বাজেটের ব্যয় সংস্থানে সরকার দেশের ব্যাংকগুলো থেকে যে ৮৪ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছে, তাতে ব্যাংকগুলো চাপে পড়ার পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ ব্যাহত হবে বলেও মনে করেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা।

এদিকে কঠিন পরিস্থিতিতে বাজেট দিয়ে এই সঙ্কট থেকে উত্তরণে ঐশী শক্তির উপর ভরসা করছেন মুস্তফা কামাল।

কুরআনের আয়াত উদ্ধৃত করে তিনি বলেছেন, “সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি তার সৃষ্টির অকল্যাণে কিছু করেন না। তাই অবশ্যই অচিরেই তিনি তার কল্যাণের সুশীতল ছায়ায় আমাদের আশ্রয় দিয়ে এই মহামারী ভাইরাস থেকে সকলকে পরিত্রাণ দেবেন। আমরা ফিরে যাব স্বাভাবিক জীবনযাত্রায়, উন্মোচিত হবে এক আলোকিত ভোরের।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক