মাইক্রোবাসে যাত্রী তুলে তারা ছিনতাই করে আসছিল ১০ বছর ধরে

চট্টগ্রামে একটি ছিনতাইকারী চক্রের ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যারা মাইক্রোবাসে যাত্রী তুলে সর্বস্ব কেড়ে নিত, তারপর চলন্ত গাড়ি থেকে ফেলে দিত রাস্তায়।

চট্টগ্রাম ব্যুরোবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 13 Jan 2022, 04:44 PM
Updated : 13 Jan 2022, 04:44 PM

নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ) মো. শামসুল আলম বলছেন, এক দশকের বেশি সময় ধরে এভাবে ছিনতাই করে আসছিল ওই চক্র। তাদের হাতে পড়ে অনেকের প্রাণও গেছে।

চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা, আকবর শাহ ও পাহাড়তলী থানা পুলিশ বুধবার রাতে নগরীর অলঙ্কার মোড় থেকে ওই ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে।

তারা হলেন মো. শাহ আলম আকন (৩২), আবুল কালাম (৪৭), মো. জাকির হোসেন সাঈদ (৩৬), মো. আল আমিন (২৯), মিজানুর রহমান ওরফে চাঁন মিয়া (৫৩) ও নাহিদুল ইসলাম ওরফে হারুণ (৩১)।

এদের মধ্যে শাহ আলম, জাকির ও কালামই মূলত চক্রটি চালাতো বলে বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান অতিরিক্ত কমিশনার শামসুল আলম।

তিনি জানান, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে এক প্রবাসীর মৃত্যুর ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে চক্রটির সন্ধান পেয়েছে পুলিশ।

নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (বন্দর) নোবেল চাকমা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এ চক্রে সদস্য অন্তত ১০ জন। তাদের অধিকাংশের বাড়ি বরগুনায়। তারা সেখান থেকে ঢাকা হয়ে চট্টগ্রাম আসে। পথে বিভিন্ন স্থানে দাঁড়িয়ে মাইক্রোবাসে যাত্রী তোলে এবং তাদের কাছ থেকে টাকা-পয়সা হাতিয়ে নেয়।

“দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে তারা এ কাজটি করলেও ইদানিং সবচেয়ে বেশি করছিল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে।”

কীভাবে তারা কাজটি করে সেই বর্ণনাও দিয়েছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তা নোবেল। তিনি জানান, প্রতি মাসেই কয়েকবার করে এ চক্রের সদস্যরা বরগুনা থেকে চট্টগ্রাম আসত। তাদের গাড়িতে চালকের পাশের আসনে বসত আবুল কালাম। ধার্মিক ব্যক্তির বেশভূষা নিয়ে তিনি গাড়িতে বসে থাকতেন, যাতে রাস্তায় কোনো যাত্রীকে উঠতে বললে সন্দেহ না করে।

“তাদের ফাঁদে পা দিয়ে কোনো যাত্রী গাড়িতে উঠলেই দ্রুত গতিতে গাড়ি চালানো শুরু হয়। কিছু দূর যাওয়ার পর জাকির যাত্রীর সাথে কথা শুরু করে এবং সবকিছু দিয়ে দেওয়ার জন্য বলতে থাকে। কথায় রাজি না হলে তারা সাথে থাকা হাঁতুড়ি দিয়ে মারধর শুরু করে।

“সাথে থাকা টাকা, মোবাইল ফোন ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে নেওয়ার পর পরিবার থেকে বিকাশেও টাকা আনতে চাপ দেয়। টাকা আদায়ের পর তারা ওই ভিকটিমের মোবাইল এবং সিমও নিয়ে ফেলে। পরে যাত্রীকে মহাসড়কের পাশে কোন স্থানে ফেলে দেয়।”

গ্রেপ্তাররা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে বলেছে, এক দশকের বেশি সময় ধরে তারা এ কাজ করে আসছে। বিভিন্ন সময়ে তারা গ্রেপ্তারও হয়েছিল। তবে জামিনে ছাড়া পেয়ে ফের এ কাজে যুক্ত হয়। তাদের মধ্যে হারুণ গত ডিসেম্বর ও চাঁন মিয়া এ মাসের শুরুতে জামিনে ছাড়া পান।

ছিনতাইয়ের জন্য ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে বেছে নেওয়ার কারণ হিসেবে তারা পুলিশকে বলেছে, অপেক্ষাকৃত কম যানজট থাকে বলে এ মহাসড়কে তাদের কাজ সারা সহজ হত।

এডিসি নোবেল চাকমা বলেন, “যেদিন তারা রাস্তায় থাকে, সেদিন এ ধরনের একাধিক ঘটনা ঘটায়। তারা এত বেশি এ ধরনের ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটিয়েছে যে নির্দিষ্ট কোনো হিসাবও দিতে পারেনি।

“এ চক্রের টাকা, পয়সা, মোবাইল ফোন হাতিয়ে নেওয়ার পর সিম ও বিকাশের পিন কোড নিয়ে যায়। অনেক সময় ভুক্তভোগী সে সিম দ্রুত বন্ধ করে না। সেসব সিম ব্যবহার করে তারা টাকা উত্তোলন তুলে নিত।”

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, চট্টগ্রামে অবস্থান করার সময় ওই চক্রের সদস্যরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অলঙ্কার, একে খান থেকে ফেনীর মহিপাল পর্যন্ত প্রতিদিন ঘুরে ঘুরে যাত্রী তুলে ছিনতাই করত।

গত ১৯ ডিসেম্বর হোসেন মাস্টার নামের এক প্রবাসীকে অলঙ্কার থেকে জোরারগঞ্জ নেওয়ার কথা বলে মাইক্রোবাসে তোলে তারা। বিমানের টিকিট কিনতে নগরীর আগ্রাবাদে যাওয়ার কথা ছিল হোসেনের।

তাকে বিভিন্ন স্থানে ঘুরিয়ে সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের বেতারিয়া এলাকায় রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়। গুরুতর আহত হোসেনকে স্থানীয়রা হাসপাতালে নিয়ে গেলেও একদিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার মহিউদ্দিন সেলিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “হোসেন মাস্টারের মামালটির ছায়া তদন্ত করতে গিয়ে আমরা জানতে পারি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এ ধরনের বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে।

“তারা বুধবার চট্টগ্রামে আসার পথে বারৈয়াহাট এলাকা থেকে শামসুদ্দিন নামে আরকে প্রবাসীকে যাত্রী হিসেবে গাড়িতে তোলে। পথিমধ্যে তার কাছ থেকে পাসপোর্ট, নগদ টাকা ও মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে অলঙ্কার মোড়ে এসে আবার অবস্থান নেয়। এ সময় তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।”

গ্রেপ্তার শাহ আলমের বিরুদ্ধে ১১টি, চাঁন মিয়ার বিরুদ্ধে সাতটি, হারুনের বিরুদ্ধে তিনটি, আল আমীনের বিরুদ্ধে দুটি এবং কালাম ও জাকিরের বিরুদ্ধে পাঁচটি করে মামলা আছে।

কালামের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামে ব্যাংক ও স্বর্ণের দোকান ডাকাতি ও খুলনার খালিশপুরে স্বর্ণের দোকান ডাকাতির অভিযোগও রয়েছে।

২০১৪ সালের ডিসেম্বরে চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানা এলাকায় বোমা ফাটিয়ে চট্টগ্রামে একটি স্বর্ণের দোকান ডাকাতির সময় স্প্রিন্টারে আহত হয়েছিল কালাম।

ওই সময় তাকে হাসপাতাল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে জানান মহিউদ্দিন সেলিম, যিনি সে সময় কোতোয়ালি থানার ওসির দায়িত্বে ছিলেন।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক