বাস্তুহারা সাপ আতঙ্ক ছড়াচ্ছে গ্রামে, মরছে পিটুনিতে

চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার সারোয়াতলী গ্রামের কৃষক বাবুল আইচ এখন ধান কাটতে মাঠে যেতেও ভয় পান, কারণ ধানের গোছার নিচেও লুকিয়ে থাকছে সাপ।

উত্তম সেনগুপ্তবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 4 Dec 2021, 03:44 AM
Updated : 4 Dec 2021, 05:21 AM

গত দুই মাসে এই গ্রামের নারী-শিশুসহ অন্তত ১০ জনকে সাপে কাটার পর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়।

স্থানীয়রা বলছেন, গ্রামের লাগোয়া সারোয়াতলী খাল খননের জন্য আশপাশের জঙ্গল কাটার পর থেকেই সাপের উপদ্রব বেড়ে গেছে। খালপাড় আর জঙ্গলে থাকা সাপ ও প্রাণীরা বসতি হারিয়ে চলে আসছে লোকালয়ে।

আতঙ্ক আর অজ্ঞতা থেকে মাঝেমধ্যেই পিটিয়ে মারা হচ্ছে এসব সাপ, যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরিবেশবিদরা। তারা বলছেন, এভাবে সাপ মেরে ফেললে ওই এলাকার বাস্তুতন্ত্রে প্রভাব পড়বে।

সারোয়াতলী ইউনিয়নের দক্ষিণ সারোয়াতলী গ্রামে সাপের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে গ্রামবাসী। সাপের পাশাপাশি বিভিন্ন বণ্য প্রাণীও লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। আতঙ্কিত লোকজন নিধনের চেষ্টা করছে এসব সাপ।

৫ নম্বর সারোয়াতলী ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সুরেশ চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, কৃষি জমিতে সেচের পানি সরবরাহ ঠিক রাখতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (বিএডিসি) এ খাল খনন করছে। এর অংশ হিসেবে কয়েক মাস আগে তাদের গ্রামের লাগোয়া খালপাড়ের জঙ্গল কেটে ফেলা হয়।

এর পর থেকে বিভিন্ন প্রজাতির সাপ কৃষি জমিতে, উঠানে, রাস্তায় এবং বাড়ি ঘরেও ঢুকে পড়ছে। পাশাপাশি বনবিড়াল, বাঘডাশসহ বিভিন্ন বণ্যপ্রাণী লোকালয়ে এসে হাঁস মুরগি খেয়ে ফেলছে, ফসল নষ্ট করছে।

কম বিষধর সাপের পাশাপাশি বিষধর গোখরা, শঙ্খিনীর সঙ্গে দারাশের মতো ভয়ঙ্কর সাপেরও দেখা মিলছে বলে জানান দক্ষিণ সারোয়াতলী গ্রামের বাসিন্দা রণধীর দত্।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কৃষি জমির পাশাপাশি বাড়ির আশপাশে সাপ দেখা যাচ্ছে। কৃষকরা ধান কাটতেও জমিতে যেতে ভয় পাচ্ছে।”

কৃষক বাবুল আইচ বললেন, “কাটা ধানের গোছার নিচে সাপ লুকিয়ে থাকছে। আবার রোদ উঠলেই জমির আইলে উঠে আসছে। অনেকে হাতে লাঠি নিয়ে জমিতে যাচ্ছে সাপের ভয়ে।”

বিষয়টা শুধু ভয় পাওয়ার মধ্যে আটকে নেই। স্থানীয় কৃষক বাসুদেব পাল জানালেন, তাকে এক মাসের মধ্যে দুইবার সাপে কেটেছে জমিতে কাজ করাতে যাওয়ার পথে।

মৃদুল বিশ্বাস নামে স্থানীয় এক দোকানী জানান, জমির পাশে শিম গাছ রোপণের সময় তার পঞ্চাশোর্ধ বোনকে সাপ ছোবল দেয় কয়েক সপ্তাহ আগে। সাপটি ছিল বিষধর, তার বোনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিতে হয়েছে।

সাপের উপদ্রব থেকে বাঁচতে বাড়ির জানালা ও ফাঁকা জায়গায় নেট লাগিয়েও পরিত্রাণ মিলছে না বলে জানালেন স্থানীয় বাসিন্দা সুশান্ত দাশ গুপ্ত।

তিনি বলেন, ঘরের বিভিন্ন স্থানে তিনি এসিডের বোতলও ঝুলিয়ে রেখেছেন, কিন্তু লাভ হচ্ছে না। মাস খানেক আগে ঘরে বসে টিভি দেখার সময় দুটো সাপ ঘরের চাল থেকে টিভির ওপর পড়ে। পরে সেগুলোকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।

তার প্রতিবেশী পরিতোষ দাশ গুপ্ত বললেন, সাপের পাশাপাশি তাদের এলাকায় বনবিড়াল, বাঘডাশ ও গন্ধগোকুলের আনাগোনাও বেড়ে গেছে। ঘরের আশপাশেই সেগুলো আস্তানা করছে, সুযোগ পেলে হাঁস-মুরগি খেয়ে ফেলছে।

৫ নম্বর সারোয়াতলী ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সুরেশ চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সাপের  উপদ্রব বেশ কয়েক মাস ধরেই হচ্ছিল। গেল বর্ষা মৌসুমে বিষয়টি স্বাভাবিক মনে করেছিলাম। কিন্তু শীতেও সাপের এমন উপদ্রব স্বাভাবিক ঘটনা না। আগে আমরা কখনো এরকম দেখিনি।”

তিনি বলেন, “বিষয়টি আমি ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে অবহিত করেছি, যাতে সরকারিভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।”

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বোয়ালখালীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুন নাহার বলেন, বিষয়টি তারা ‘খোঁজ নিয়ে দেখছেন’।

এদিকে আতঙ্কের কারণে প্রতিদিনই বিভিন্ন স্থানে পিটিয়ে সাপ মারা হচ্ছে। স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, গত সোমবার রাতে রান্না করার লাকড়ি নেওয়ার সময় সাপ বের হয়ে আসে। ফনা তুলে ছোবল দিতে গেলে সেটিকে পিটিয়ে মেরে ফেলেন তারা।

পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বলছেন, সাপের আবাস নষ্ট হয়ে যাওয়ায় নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে সেগুলো লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব সাপ যদি নিধন করা হয়, তাহলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।

চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার ভারপ্রাপ্ত ডেপুটি কিউরেটর ও চিকিৎসক শাহাদাত হোসেন শুভ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সাপ মারা হলে ইঁদুরের উৎপাত বেড়ে যাবে। তাতে রোগ জীবাণু ছড়াবে এবং প্রচুর পরিমাণ ফসল নষ্ট হবে। অর্থনৈতিক এবং স্বাস্থ্য- দুই দিকেই ক্ষতি।

তবে কাউকে সাপে কাটলে অপেক্ষা না করে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী মনে করেন, আবাসস্থলে আঘাত আসার কারণেই সাপগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাচ্ছে। উষ্ণ গোপন স্থানে আশ্রয় পাওয়ার আশায় বাড়ি ঘরে ঢুকেছে।

“আসলে যে কোনো উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের আগে ইকোলজিক্যাল ইমপেক্ট কী হতে পারে সেটা খতিয়ে দেখা দরকার। যেটা আমাদের সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে দেখা হয় না। আপাতদৃষ্টিতে ক্ষুদ্র ক্ষতি মনে হলেও এটা এক সময় বৃহৎ আকার ধারণ করে।

“অর্থনৈতিকভাবে চিন্তা করলে ইঁদুরসহ বিভিন্ন ক্ষতিকারক পোকা এবং প্রাণী খেয়ে ফেলে সাপ বছরে কয়েক কোটি টাকার ফসল রক্ষা করে। বিশেষ করে ধান উৎপাদন ও সংরক্ষণে এর ভূমিকা ব্যাপক।”

প্রাণিবিদ্যার এ শিক্ষক মনে করেন, সাপের অর্থনৈতিক উপকারের বিষয়টি হিসেব করা গেলেও সাপ নিধনে যে ‘ইকোলজিক্যাল ব্যালেন্স’ নষ্ট হবে, সেটার মূল্য নির্ধারণ করা যাবে না।

“সাধারণত মানুষজন সাপকে ভয় পায় এবং অজ্ঞতা থেকে সেগুলো মারে। যেটা পরিবেশের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। কোথাও সাপ দেখা গেলে দূর থেকে শব্দ করলেই কিন্তু সেগুলো চলে যাবে।”

সাপের উপদ্রব থেকে রক্ষা পেতে বাড়ির আশপাশে ব্লিচিং পাউডার ছিটিয়ে রাখার পরামর্শ দেন আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক