বিচার কবে পাব, আর্তি সুদীপ্তের বাবার

চার বছরেও সুদীপ্ত বিশ্বাস হত্যামামলার বিচার শুরু না হওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন এই ছাত্রলীগ নেতার বাবা মেঘনাথ বিশ্বাস।

মিঠুন চৌধুরীমিঠুন চৌধুরী চট্টগ্রাম ব্যুরোবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 5 Oct 2021, 04:20 PM
Updated : 5 Oct 2021, 04:20 PM

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, “কাল ৬ অক্টোবর। চার বছর পূর্ণ হবে। রিফাত হত্যা বা নুসরাত হত্যা মামলার বিচার শেষ হয়েছে। আমার ছেলের মামলাটাও আলোড়ন সৃষ্টিকারী। আমি কখন ছেলে হত্যার বিচার পাব?”

২০১৭ সালের ৬ অক্টোবর সকালে চট্টগ্রাম নগরীর দক্ষিণ নালাপাড়ার বাসা থেকে ডেকে নিয়ে পিটিয়ে খুন করা হয় নগর ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক সুদীপ্ত বিশ্বাসকে। 

অনেক দিন পেরিয়ে চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ নেতা দিদারুল আলম মাসুমসহ ২৪ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

এরপর কয়েকবার মামলার তারিখে আদালতে গেছেন মেঘনাথ বিশ্বাস। কিন্তু এখনও অভিযোগ গঠন হয়নি।

মেঘনাথ বিশ্বাস কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার বয়স হয়ে গেছে। বিচার দেখে যেতে পারব বলে মনে হচ্ছে না। করোনার মধ্যে আদালত বন্ধ ছিল। এরপর যতবার ডেট পড়েছে, গেছি। এখনো অভিযোগ গঠন হয়নি।”

সুদীপ্ত বিশ্বাস

মামলাটি চালিয়ে নিতে পারবেন কি না, তা নিয়েও শঙ্কিত তিনি।

“বেশিরভাগ আসামি জামিনে আছে। মাঝেমাঝে তারা লোক মারফত টেলিফোনে হুমকিও দেয়। কী করব বুঝতে পারি না। ছেলে পড়িয়ে চলতে হয়। ভয়ে লালখান বাজার যাইনা, ছেলে পড়াতে। সব মিলিয়ে দুরবস্থায় আছি।”

“অর্থাভাবে আইনজীবী দিতে পারিনি। একজন আইনজীবী সহায়তা করছেন। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা বিচার যদি হয়, তাহলে হয়ত বিচারটা পেতে পারি।”

ছেলে হারিয়ে জীবনের বোঝা টেনে নিতে হচ্ছে জানিয়ে মেঘনাথ বিশ্বাস বলেন, “অর্থবল বা প্রভাব প্রতিপত্তি কিছুই আমার নেই। সুদীপ্তর মা অসুস্থ। তার হাঁটাচলা করতে কষ্ট হয়। ছেলে হারা মা কেমন থাকে, বুঝতেই তো পারছেন। মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত হয়ে গেছি। পাগল হওয়ার দশা।

“তবু ছেলে পড়িয়ে (টিউশনি করে) আহার যোগাড় করতে হয়। এই কাজে আজ ৪৫ বছর। আর পারি না। কিন্তু করব কী।”

আগামী ১৩ অক্টোবর এ মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য আছে জানিয়ে সুদীপ্তর বাবার আইনজীবী শাহেদুল আজম শাকিল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দু’জন আসামি কারাগারে আছে। বাকিরা জামিন নিয়েছে। আর দু’জন আসামি পলাতক।

“পলাতক আসামিরা আত্মসমর্পণ করছে না। তাই তাদের বিষয়ে আদালতের আদেশের পর পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে।”

এসব প্রক্রিয়া শেষ করে মামলায় অভিযোগ গঠনে আরও কিছুটা সময় লাগতে পারে বলে জানান আইনজীবী শাহেদুল।

বর্তমানে চট্টগ্রামের মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের অধীনে সদরঘাট থানার জন্য নির্ধারিত (শুনানির দিনে) হাকিম আদালতে মামলার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

সুদীপ্ত হত্যার ঘটনায় তার বাবা মেঘনাথ বিশ্বাস বাদী হয়ে সদরঘাট থানায় অজ্ঞাতনামা সাত-আটজনকে আসামি করে যে হত্যা মামলা করেছিলেন, ঘটনার এক বছর পর তারই আবেদনে আদালত এর তদন্তের দায়িত্ব পিবিআইকে দিয়েছিল।

পিবিআইর দেয়া অভিযোগপত্রে আওয়ামী লীগ নেতা দিদারুল আলম মাছুমকে হামলার ‘নির্দেশদাতা’ ও আইনুল কাদের নিপুকে ‘নেতৃত্বদানকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আসামিদের মধ্যে ১৮ জন গ্রেপ্তার হয়েছিল। তাদের মধ্যে চারজন আদালতে জবানবন্দি দিয়েছিল। পরে তাদের মধ্যে ১৬ জন জামিন পায়।

নানা কারণে আলোচিত দিদারুল আলম মাসুম।

২০১৯ সালের ১২ জুলাই গ্রেপ্তার মিজান হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা হিসেবে মাসুমের নাম বলার পর ওই বছরের ৪ অগাস্ট ঢাকা থেকে মাসুমকে গ্রেপ্তার পিবিআই।

২০১৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে ছাড়া পান মাসুম। পরে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে জামিন আদেশ বাতিল করে আদালত।

ওই বছরের ১৩ নভেম্বর চট্টগ্রাম আদালতে আত্মসমর্পণ করলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়। ২০২০ সালের ২৯ জানুয়ারি আবার জামিনে মুক্ত হন লালখান বাজার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাসুম।

পিবিআই কর্মকর্তারা জানান, লালখান বাজার এলাকা থেকে আটটি অটোরিকশা করে দক্ষিণ নালাপাড়া গিয়েছিল হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা। পিবিআই মামলার তদন্তভার নেওয়ার পর সাতটি অটোরিকশা জব্দ করে। জব্দ করা হয় হামলায় ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেলও। গ্রেপ্তার সবাই মাসুমের অনুসারী বলে নিজেদের পরিচয় দেন।

চট্টগ্রাম সিটি কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি থাকার সময় মাসুম প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

তবে ২০১৪ সালে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর নগর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিনের বলয়ে চলে যান। মাঝে তিনি সাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ডা. আফসারুল আমীনের ‘লোক’ হিসেবেও নিজেকে পরিচয় দিতেন।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক