পরীক্ষায় দেখা গেল, চট্টগ্রামে ছিটানো কীটনাশকে মশা তেমন মরছে না

মশা নিধনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন যে কীটনাশক ছিটিয়ে আসছে, তার কার্যকারিতা খুব কম বলে দেখেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা।

চট্টগ্রাম ব্যুরোবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 3 August 2021, 02:17 PM
Updated : 3 August 2021, 02:27 PM

সিটি করপোরেশনের অনুরোধে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি ‘টেকনিক্যাল কমিটি’ করে কীটনাশকের কার্যকারিতা পরীক্ষা করেছিল।

মঙ্গলবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. শিরীণ আখতারের উপস্থিতিতে চট্টগ্রামের মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরীর কাছে কমিটির প্রতিবেদন হস্তান্তর করা হয়।

দুই বছর আগে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনেও মশা দমনের কীটনাশক নিয়ে একই ফল দেখা গিয়েছিল। পরে কীটনাশক বদলানো হয়।

চট্টগ্রামে ছিটানো কীটনাশকের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে গত মার্চে মেয়রের অনুরোধে ছয় সদস্যের এই টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

পরীক্ষার জন্য সিসিসি চারটি এডাল্টিসাইড ও একটি লার্ভিসাইডের নমুনা দেয় টেকনিক্যাল কমিটিকে। যারমধ্যে একটি এডাল্টিসাইড-লাইট ডিজেল অয়েল (এলডিও) যা কালো তেল নামে পরিচিত এবং লার্ভিসাইডটি বর্তমানে সিটি করপোরেশন মশা নিধনে ব্যবহার করে।

অন্য তিনটি এডাল্টিসাইড পরীক্ষামূলক নমুনা হিসেবে টেকনিক্যাল কমিটিকে দেয় সিসিসি। যার মধ্যে একটি ভেষধ কীটনাশক, যেটি এডাল্টিসাইড ও লার্ভিসাইড উভয় হিসেবে ব্যবহার করা যায়। বাকি ‍দুটি রাসায়নিক কীটনাশক।

টেকনিক্যাল কমিটি নগরীর ৯৯টি স্থান পরিদর্শন করে ৫১টি এবং ক্যাম্পাস ও আশেপাশের ছয়টি স্থান থেকে মশার লার্ভা সংগ্রহ করে।

এডিস ও এনোফিলিস এই দুই প্রজাতির মশার লার্ভা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগারে লালন করে পূর্ণবয়স্ক করা হয়। এরপর সরবরাহ করা কীটনাশনের নমুনা এসব লার্ভা ও মশার উপর প্রয়োগ করে কার্যকারিতা যাচাই করা হয়।

কার্যকারিতা কম

সিসিসি বর্তমানে যে লার্ভিসাইডটি ব্যবহার করে (স্প্রে), সেটি পরীক্ষা করে (একই মাত্রায়) দেখা গেছে, দুই ঘণ্টা পর লার্ভা মৃত্যুর হার মাত্র ১৬ শতাংশ। তবে মিশ্রণে ১০ ‍গুণ বেশি মাত্রায় প্রয়োগ করে ৮৪ শতাংশ পর্যন্ত লার্ভা মৃত্যুর হার মিলেছে।

আর নতুন ভেষজ নমুনাটি ব্যবহার করে দুই ঘণ্টায় শতভাগ লার্ভা মৃত্যুর প্রমাণ পাওয়া গেছে পরীক্ষায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও টেকনিক্যাল কমিটির আহ্বায়ক ড. রবিউল হাসান ভুঁইয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “হারবাল নমুনাটি শতভাগ কার্যকর। এটি বিভিন্ন উদ্ভিদের নির্যাস দিয়ে তৈরি।  রাসায়নিক কীটনাশকগুলোর কার্যকারিতা তুলনামূলক কম।”

রাসায়নিকের মাত্রা বাড়ালে কার্যকারিতা বাড়লেও তার অন্য সমস্যার দিকটি তুলে ধরে তিনি বলেন, “তাতে অন্য ছোট কীটপতঙ্গ-প্রাণির জীবননাশ এবং পরিবেশ ও মানুষের ক্ষতি হওয়ার খুব বেশি সম্ভাবনা থাকে।”

একইভাবে এডাল্টিসাইডের ক্ষেত্রে (স্প্রে) বর্তমানে ব্যবহৃত ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষা করে (২ ঘণ্টা সময় সীমায়) প্রাপ্তবয়স্ক মশা মৃত্যুর হার ৩৪ শতাংশ পাওয়া গেছে। মাত্রা ১০ গুণ বাড়ালে তা সর্বোচ্চ ৭৬ শতাংশ পর্যন্ত হয়।

বিপরীতে সরবরাহ করা ভেষজ নমুনাটিতে শতভাগ সাফল্য মিলেছে। অন্য দুটি এডাল্টিসাইডের কার্যকারিতা ৮ শতাংশ। মাত্রা বাড়িয়েও মশার মৃত্যুহারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন মেলেনি গবেষণায়।

লার্ভা নিধনে শুধু কেরোসিন স্প্রে করলে তা ৮৪ শতাংশ কার্যকরী বলে গবেষণায় জানা গেছে। তবে এর কার্যকারিতা শুরু হয় ছিটানোর দুই ঘণ্টা পর থেকে।

আর ফগার মেশিনের মাধ্যমে ভেষজ ও রাসায়নিক দুই ধরণের এডাল্টিসাইড ছিটিয়েই কার্যকারিতা মিলেছে সর্বোচ্চ ১৯ শতাংশ। এমনকি মাত্রা বাড়িয়েও খুব বেশি সুফল মেলেনি।

তাই প্রতিবেদনে ফগার মেশিনের চেয়ে স্প্রে পদ্ধতিতে ওষুধ ছিটানো বেশি কার্যকর হবে বলে উল্লেখ করা হয়।

চার সুপারিশ

টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য সচিব বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক রাসেল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তারা বাসাবাড়ির আশেপাশের এলাকা ও নালা-নর্দমা, খাল পরিষ্কার করে পানি প্রবহমান রাখা, নির্দিষ্ট বিরতিতে কীটনাশকের কার্যকারিতা যাচাই, রাসায়নিক কীটনাশকের পরিবর্তে ভেষজ কীটনাশক ব্যবহার এবং মশা নিয়ন্ত্রণে জৈব পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ানোর সুপারিশ করেছেন।

গবেষণালব্ধ প্রতিবেদনকে ‘অত্যন্ত ফলপ্রসূ’ উল্লেখ করে মেয়র রেজাউল বলেন, “এ ধরণের বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদন সিসিসি এই প্রথম বারের মতো পেয়েছে। এটি মশক নিধনে দিক নির্দেশনামূলক উপায় অন্বেষণের পথ দেখিয়েছে।”   

টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. এইচ এম আবদুল্লাহ আল মাসুদ বলেন, “দীর্ঘদিন রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারে মশা রেজিস্ট্যান্ট কিনা তা যাচাইয়ে মশার জিনগত পরীক্ষার সুপারিশ করেছি।

“লার্ভা খায় এমন মাছের চাষ, অণুজীব ব্যবহার ও উদ্ভিদের নির্যাস দিয়ে লার্ভা ধ্বংসের সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।”

ড. ওমর ফারুক বলেন, “লেবু, পুদিনা, তুলসি, নিম ও তেজপাতার ঘ্রাণ মশা সহ্য করতে পারে না। তাই আইল্যান্ডসহ বিভিন্ন স্থানে এসব গাছ লাগাতে বলেছি। উদ্ভিদের নির্যাস থেকে কীটনাশক তৈরিতে গবেষণা সহায়তা পেলে কাজ করা সম্ভব বলে মেয়রকে জানিয়েছি।”

টেকনিক্যাল কমিটিতে আরও ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. তাপসী ঘোষ রায়, ভূগোল ও পরিবেশ বিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. শহীদুল ইসলাম ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী।

তাদের সহযোগিতা করেন মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমেস্ট্রি এন্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. আশেকুল ইসলাম।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক