নূর মোহাম্মদের ‘জ্ঞাতসারেই’ কোকেন আমদানি

সূর্যমুখী তেল ঘোষণা দিয়ে কোকেন আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান খান জাহান আলী লিমিটেডের চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদের ‘জ্ঞাতসারেই’ আনা হয়েছিল বলে এ ঘটনায় করা মামলার সম্পূরক অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে।

মিঠুন চৌধুরীমিঠুন চৌধুরী চট্টগ্রাম ব্যুরোবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 3 April 2017, 05:29 PM
Updated : 14 May 2017, 12:32 PM

মামলার অধিকতর তদন্ত শেষে সোমবার চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম হারুনুর রশিদের আদালতে সম্পূরক অভিযোগপত্র জমা দেন অধিকতর তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত র‌্যাব-৭ এর কর্মকর্তা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মুহাম্মদ মহিউদ্দিন ফারুকী।

এ মামলায় দেওয়া প্রথম অভিযোগপত্রে নূর মোহাম্মদকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হলেও সম্পূরক অভিযোগপত্রে তাকে আসামি করেছেন অধিকতর তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।

প্রথম অভিযোগ পত্রে ঘটনার সঙ্গে ‘সম্পৃক্ততা না পাওয়ার’ কথা বলে নূর মোহাম্মদকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করেছিলেন তদন্তকারী কর্মকর্তা নগর গোয়েন্দা পুলিশের সেসময়ের সহকারী কমিশনার মো. কামরুজ্জামান।

এ কারণে তদন্তে ত্রুটি রয়েছে জানিয়ে আদালত ২০১৫ সালের ৭ ডিসেম্বর র‌্যাবের একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তা দিয়ে পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেয়।

সম্পূরক অভিযোগপত্রে নূর মোহাম্মদের সঙ্গে নতুনভাবে আসামি তালিকায় এসেছে তার ভাই খান জাহান আলীর পরিচালক মোস্তাক আহমেদের নামও।

সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়া র‌্যাব কর্মকর্তা মুহাম্মদ মহিউদ্দিন ফারুকী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, নূর মোহাম্মদের জ্ঞাতসারে এবং সম্মতিতেই দেশে ও বিদেশে থাকা আসামিরা পারস্পরিক যোগসাজশে তেলে মিশিয়ে কোকেন আমদানি করেছিল।

“এই কোকেন তারা বন্দর থেকে ছাড় করানোরও চেষ্টা করেছিল। ছাড়ের পর তেলে মিশ্রিত কোকেন দেশেই পরিশোধনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন নূর মোহাম্মদ।”

শুরু থেকেই কোকেন আমদানির সঙ্গে নিজের ‘সম্পৃক্ততার’ কথা অস্বীকার করে আসছিলেন নূর মোহাম্মদ।

তার দাবি ছিল, তার অজ্ঞাতসারে প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র ব্যবহার করে অন্যরা এই পণ্য আমদানি ও খালাসের চেষ্টা করেছিল।

কিন্তু অধিকতর তদন্তে জানা যায়, বলিভিয়া থেকে পাঠানো কোকেন আমদানি সংক্রান্ত কাগজপত্রে খান জাহান আলী লিমিটেডের নাম ছিল। এমনকি এ সংক্রান্ত ইমেইল খান জাহান আলীর অফিসিয়াল ইমেইল থেকে মুছে ফেলেন নূর মোহাম্মদের ভাই মোস্তাক আহমেদ।

নূর মোহাম্মদসহ অন্য আসামিদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি সম্পূরক অভিযোগ পত্রে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়।

সম্পূরক অভিযোগপত্রে অন্য আসামিরা হলেন- খান জাহান আলী লিমিটেডের কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফা সোহেল (৩৯), মোস্তফা কামাল (৪২), আইটি বিশেষজ্ঞ মেহেদী আলম (৩১), গার্মেন্ট পণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান মণ্ডল গ্রুপের বাণিজ্যিক নির্বাহী আতিকুর রহমান (২৯), কসকো বাংলাদেশ শিপিং লাইনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপক (করপোরেট, বিক্রয় ও বিপণন) এ কে এম আজাদ (৪৫), সিঅ্যান্ডেএফ কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম (৩২), এবং যুক্তরাজ্যের দুই নাগরিক ফজলুর রহমান এবং বকুল মিয়া (৩১)।

এরমধ্যে শেষ দুইজনসহ নূর মোহাম্মদের ভাই মোস্তাক আহমেদ পলাতক।

এছাড়া কোকেন আমাদানির সঙ্গে জড়িত লন্ডন প্রবাসী মোকতার হোসেন (৪৮) ও মফিজুর রহমান সুমন (৩৭) এবং ভারতের বাসিন্দা রাজুর নাম এসেছে অধিকতর তদন্তে। 

তবে তাদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় ও ঠিকানা শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি বলে সম্পূরক অভিযোগ পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

শুরু থেকেই ‘অবগত’ নূর মোহাম্মদ

আসামিদের মধ্যে গোলাম মোস্তফা সোহেল খান জাহান আলী লিমিটেডের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান প্রাইম শ্রিম্প হ্যাচারি লিমিটেডের ম্যানেজার।

মামলার সাক্ষী খান জাহান আলী লিমিটেডের সহকারী কমার্শিয়াল অফিসার ফয়সাল হোসেন তদন্তকারী কর্মকর্তাকে জানান, সোহেল ২০১৫ সালের মে মাসের দ্বিতীয় বা তৃতীয় সপ্তাহের কোনো একদিন দুপুরে ডিএইচএল কুরিয়ারের একটি খাম থেকে ডকুমেন্টস বের করে জানতে চান- এসব ডকুমেন্টস দিয়ে মাল খালাস করা যাবে কি না।

ডকুমেন্টস তিনটিতে খান জাহান আলী লিমিটেডের নাম লেখা ছিল, যা বলিভিয়া থেকে পাঠানো হয়। ডকুমেন্টগুলোর মালামালের বর্ণনাস্থলে- সানফ্লাওয়ার ক্রুড অয়েল লেখা ছিল বলে জানায় ফয়সাল হোসেন।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, ফয়ালস তখন সোহেলকে জানান, অসম্পূর্ণ ডকুমেন্টস দিয়ে মাল খালাস করা সম্ভব নয়। এসব ডকুমেন্টস কোথায় পেয়েছে জানতে চাইলেও সোহেল কোনো জবাব দেয়নি। এরপর ফয়সাল বিষয়টি নিয়ে খান জাহান আলী লিমিটেডের চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদের সাথে সোহেলকে আলাপের পরামর্শ দেন।

পরদিন বিকেলে নূর মোহাম্মদ অফিসে আসলে ফয়সাল তাকে জানান এলসি বিহীন ডকুমেন্টস সোহেল দেখিয়েছে। এ বিষয়টি চেয়ারম্যানের নজরে আনতে সোহেলকে পরামর্শ দেওয়ার বিষয়টিও বলেন ফয়সাল।

“জবাবে নূর মোহাম্মদ বলেন- আমি বিষয়টি অবগত এবং এ নিয়ে সোহেল এর সঙ্গে কথা বলব,” বলা হয় সম্পূরক অভিযোগপত্রে।

সাক্ষী ফয়সাল হোসেন গত বছরের ১৫ জানুয়ারি আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।

জবানবন্দিতে ফয়সাল হোসেন বলেন, ওই ঘটনার ১০-১২ দিন পর খান জাহান আলী লিমিটেডের ইমেইলে ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্ট এবং বিএল এর সফট কপি আসে। মেইলটি তিনি সোহেলের মেইলে ফরোয়ার্ড করেন।

সম্পূরক অভিযোগপত্রে বলা হয়, খান জাহান আলী লিমিটেডের কার্যালয়ে তল্লাশির সময় ফয়সাল জানান, ‘সোহেল গ্রেপ্তারের পর খান জাহান আলীর অফিসিয়াল ইমেইল আইডি থেকে আগের সব মেইল ডিলিট করে ফেলা হয়’।

“খান জাহান আলীর অফিসিয়াল ইমেইল সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন নূর মোহাম্মদের ছোট ভাই পলাতক আসামি মোস্তাক আহমেদ। তিনিই এগুলো ডিলিট করেন।”

আসামি গোলাম মোস্তফা সোহেল, মোস্তফা কামাল, মেহেদী আলম, আতিকুর রহমান ও এ কে এম আজাদকে খান জাহান আলীর চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদের উপস্থিতিতে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করেন অধিকতর তদন্তকারী  কর্মকর্তা।

জিজ্ঞাসবাদের বিষয়টি উল্লেখ করে অভিযোগপত্রে বলা হয়- নূর মোহাম্মদের প্ররোচনা ও যোগসাজশে অন্য আসামিরা বিদেশে অবস্থানরত পলাতক আসামিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে অপরিশোধিত সূর্যমুখী তেলের আড়ালে নিষিদ্ধ কোকেন অবৈধভাবে আমদানি করেছে।

“নূর মোহাম্মদ পূর্ব থেকেই নিষিদ্ধ কোকেন আমদানির সাথে জড়িত ছিল বলে সাক্ষ্য প্রমাণে প্রতীয়মান হয়।”

অসম্পূর্ণ ডকুমেন্টস দিয়ে মালামাল আমদানির বিষয়টি জানার পরও ‘অসৎ উদ্দেশ্যে এবং উদ্দেশ্যমূলকভাবে’ ২০১৫ সালের ৮ জুনের আগ পর্যন্ত বন্দর কর্তৃপক্ষ বা কোনো প্রতিষ্ঠানকে ওই মালামাল তার নয় বলে জানায়নি।

২০১৫ সালের ৬ জুন শুল্ক গোয়েন্দারা ঘটনা উদঘাটনের আগ পর্যন্ত সব আসামিরা যোগসাজশে কোকেন মিশ্রিত সূর্যমুখী তেল জ্ঞাতসারে খালাসের সম্ভাব্য সব প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন বলেও সম্পূরক অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।

২০১৬ সালের ৭ জুন শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের দেওয়া চিঠির জবাবে পরদিন ৮ জুন দেওয়া চিঠিতে নূর মোহাম্মদ দাবি করেন, ওই কোকেনবাহী চালান তার নয়।

সম্পূরক অভিযোগপত্রে বলা হয়- অসম্পূর্ণ ডকুমেন্টেসের মাধ্যমে কোনো পণ্য আমদানির খবরে আগে থেকেই প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা থাকলেও নূর মোহাম্মদ তা না করে অন্য আসামিদের সাথে যোগসাজোশে পণ্য খালাসের চেষ্টা করেছেন।

অথচ নূর মোহাম্মদের বিরুদ্ধে ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত থাকার বিষয়ে কোনো সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন করেছিলেন আগের তদন্তকারী কর্মকর্তা কামরুজ্জামান।

বন্দরে আটক ১০৭টি ড্রামের মধ্যে ৫৯ ও ৯৬ নম্বর ড্রামে পরীক্ষায় তরল কোকেন পাওয়া যায়। দুটি ড্রামে ১৮৫ লিটার করে মোট ৩৭০ লিটার তরল কোকেন ছিল।

এই ১০৭ ড্রাম তেল বলিভিয়া থেকে সড়ক পথে উরুগুয়ের মন্টিভিডিও হয়ে সমুদ্রপথে সিঙ্গাপুর হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক