চেতনার ক্ষতি পোষানো সহজ হবে না: শীলা মোমেন

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হলেও বিগত দিনে মুক্তিযুদ্ধের ‘চেতনা থেকে বিচ্যূতি’ বাংলাদেশকে পিছিয়ে দিয়েছে বলে মনে করেন একাত্তরের কণ্ঠযোদ্ধা শীলা মোমেন।

মিন্টু চৌধুরী চট্টগ্রাম ব্যুরোবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 16 Dec 2015, 05:55 AM
Updated : 16 Dec 2015, 06:01 AM

স্বাধীনতার ৪৪ বছরে এসে তার উপলব্ধি, বাংলাদেশের জন্মের কয়েক বছরের মধ্যে স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশকে বিশ বছর পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল, মানুষের মন থেকে মুছে ফেলা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধকে।

দীর্ঘ এই সময়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেছে, তা পুষিয়ে বাংলাদেশকে দাঁড় করানো সহজ হবে না বলে মনে করেন তিনি।    

বিজয়ের ৪৪তম বার্ষিকী উদযাপনের প্রাক্কালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে একান্ত আলাচারিতায় একাত্তরের এই কণ্ঠযোদ্ধা যুদ্ধ সময়ের স্মৃতি এবং বর্তমান সময়ে এসে তার প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন শীলা মোমেন। 

একাত্তরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ছাত্রী শীলা মোমেন থাকতেন রোকেয়া হলে। সেই সময়ের ছায়ানটের এ শিল্পী কাছ থেকে দেখেছেন ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও স্বাধীকার আন্দোলন।

পারিবারিকভাবেই রাজনীতি ও সংস্কৃতি সচেতন শীলা হলের ছাদ থেকেই শুনেছেন ৭ মার্চের বঙ্গন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ। পরে ঢাকার পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে ফিরে আসেন চট্টগ্রামের বাসায়।

শীলা মোমেন জানান, ২৭ মার্চ রাতে চট্টগ্রামে পাকিস্তানি বাহিনী বোমাবর্ষণ শুরু করলে পরিবারিকভাবেই তাদের গ্রামে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। প্রথমে পটিয়ার চক্রশালায় মামার বাড়ি, সেখান থেকে রাউজানের বাড়িতে যাওয়ার পথে রাজাকারদের কবলে পড়ে সর্বস্ব খোয়ান তারা।

কয়েকদিন সেখানে থেকে সাব্রুম সীমান্ত দিয়ে এপ্রিলের শেষ দিকে আগরতলা হয়ে কলকাতা চলে যায় পুরো পুরিবার। সেখানে শিল্পী স্বপন চৌধুরীর কাছে খবর পান ‘মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা’ গঠনের। ওয়াহিদুল হক, সানজীদা খাতুন, মাহমুদুর রহমান বেনু, শাহীন সামাদসহ বাংলাদেশ থেকে ওপারে চলে যাওয়া আরও অনেক শিল্পীর সঙ্গে তিনিও সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হন।

“কলকাতায় থাকা এদেশের বুদ্ধিজীবীরা আমাদের সঙ্গে ছিলেন। এছাড়া কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের সহায়ক সংস্থা নামে সংগঠন, যেটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, তারা আমাদের সর্বাত্মক সহায়তা দিয়েছেন। প্রবাসী সরকারের সঙ্গেও আমাদের সংস্থার যোগাযোগ ছিল।

“আমাদের কাজ ছিল পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে গান গেয়ে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন তৈরি করা, অর্থ সাহায্যও পেতাম। গান গেয়ে পাওয়া অর্থ শরণার্থী শিবিরে দেওয়া হতো।”

মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প, শরণার্থী শিবিরে গান গেয়ে তাদের উজ্জীবিত করার কাজ করে শিল্পী সংস্থা।

স্মৃতির পাতা হাতড়ে শীলা মোমেন বলেন, “মুক্তিযোদ্ধাদের অনেক প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে গিয়েছি গান করতে। কিশোর থেকে বৃদ্ধ- জানে না কি হবে ভবিষ্যতে। কিন্তু তাদের ইস্পাত কঠিন লক্ষ্য- যুদ্ধে যাবে। তাদের এই লক্ষ্য আমাদের মনে কঠিন দাগ কেটেছে।      

“শরণার্থী শিবিরগুলোতে দেখেছি তাদের সীমাহীন দুর্ভোগ। সেখানে গেলেই সবচেয়ে বেশি মুষড়ে পড়তাম। একটি দেশ, জাতির অভ্যূদয়ের জন্য তাদের কষ্ট, ত্যাগ- এককথায় বর্ণনাতীত।”

ভারত যেদিন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় সেদিন বাংলাদেশের কলকাতা হাইকমিশনে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের অনুষ্ঠানে শিল্পী সংস্থার সঙ্গে শীলা মোমেনও ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে জাতীয় সংগীতে অংশ নেন।

এছাড়া একাত্তরের ৬ ডিসেম্বর যশোর মুক্তাঞ্চল হওয়ার পর প্রবাসী সরকারের পক্ষ থেকে পতাকা ওড়ানোর অনুষ্ঠানেও শিল্পী সংস্থার একটি ছোট দলের সঙ্গে শীলা মোমেনও সেখানে গান পরিবেশন করেন।

মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থার সদস্যের সঙ্গে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রেও গান গেয়েছেন শীলা মোমেন। একাত্তরে বেতার কেন্দ্রে খবরের আগে ‘জনতার সংগ্রাম চলবেই’ গানটি তাদেরই গাওয়া।

যুদ্ধের পরের বছর মার্চে দেশে ফিরে আসেন শীলা মোমেন ও তার পরিবার। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা শেষ করে চট্টগ্রামে ফিরে আসেন।

একাত্তরে নির্মম হত্যাযজ্ঞ, নির্যাতন আর স্বাধীনতার কয়েক বছরের মাথায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যা- দুটো স্মৃতিই তাকে সবচেয়ে বেশি পীড়া দেয় এখনো।

“দেশে একটা সময় কেটেছে যখন শেখ মুজিবের নামই নেওয়া যেত না। যে চেতনা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়। রাজাকারদের গাড়িতে রাষ্ট্রীয় পতাকা উঠেছে। একটা রাজনৈতিক শক্তির পেছনে থেকে পাকিস্তানপন্থীরাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল।’’

দীর্ঘসময় সময়ে ধরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার যে ক্ষতি হয়েছে তা পোষানো সহজ নয় মন্তব্য তিনি বলেন, “যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয়েছে, অনেকের সাজা কার্যকরও হয়েছে। দেশ ধীরে ধীরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ফিরছে। কিন্তু আমরা অনেক পিছিয়ে আছি।

“মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দেশের আপামর জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। সাংস্কৃতিক ও শিক্ষা পৌঁছে দিতে হবে। এর মধ্য দিয়ে অপশক্তিকে প্রতিরোধ করা যাবে।”

এজন্য তরুণদেরই অগ্রণী ভূমিকায় থাকতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

“তরুণদের ওপর ভরসা রাখতে হবে। তারাই আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়বে। তবে বাজার অর্থনীতির থাবা তরুণদের একটি অংশকে আত্মকেন্দ্রিক করে গড়ে তুলছে। দেশ কোথায় যাচ্ছে তাতে তাদের কোনো মাথা ব্যথা নেই। তাদের সে জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।”

শিশুদের শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতির যোগসূত্র ঘটাতে ১৯৭৬ সালে নিজের হাতে গড়া ‘ফুলকী’র অধ্যক্ষ শীলা মোমেন ১৯৯৬ সালে গড়ে তুলেছেন শুদ্ধ সংগীত চর্চা কেন্দ্র ‘রক্তকরবী’। এর পরিচালকও তিনি।