Published : 14 Oct 2023, 12:49 PM
প্রথম উইকেট পড়ার পর থেকেই শুরু হয় কৌতূহল। প্রেসবক্স থেকে সবার উৎসুক দৃষ্টি থাকে মাঠে। গ্যালারি থেকে কিংবা টিভি পর্দার সামনেও নিশ্চিতভাবে লাখো চোখের কৌতূহলভরা অপেক্ষা থাকে। পরের ব্যাটসম্যান কে?
বিশ্বকাপ চলছে। বাংলাদেশের ব্যাটিং অর্ডার নিয়েও ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’ খেলা চলছে। বিশ্বকাপের আগের সময়টায় যার যে ব্যাটিং পজিশন ছিল, বিশ্বকাপে এসে তাদেরই কেউ কেউ চেনা জায়গা হারিয়ে পারফরম্যান্সেও হয়ে গেছেন অচেনা। ব্যাটিং অর্ডারের এমন ওলট-পালটের কারণ জানতে চাইলে সহ-অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত বারবার বললেন ‘কোচ-অধিনায়ক জানেন।’ কোচদের একজন, নিক পোথাসের দাবি, ‘এটাই আধুনিক ক্রিকেট।’
নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের আগে ওপেনিং জুটির ব্যর্থতা প্রসঙ্গে শান্ত সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, “এই ওপেনিং নিয়ে আমরা চিন্তাই না করি। মানে এই চিন্তাটাই বাদ দিয়ে দেই…!” শান্ত যে ভাবনা থেকেই বলুন না কেন, বিশ্বকাপে দলের প্রথম তিন ম্যাচে ওপেনারদের নিয়েই সংশয় ছিল না। মানে, পারফরম্যান্স নিয়ে অবশ্যই দুর্ভাবনা ছিল ও আছে। কিন্তু ব্যাটিং অর্ডারে পজিশন তাদের ছিল অটুট।
এরপরই ব্যাটিং অর্ডার নিয়ে নানা গবেষণার শুরু। শান্ত নিজেও সেখানে ‘গিনিপিগ।’ এই বছর দেশের সফলতম ব্যাটসম্যান তিনি। রান তার সবচেয়ে বেশি, গড় সবচেয়ে ভালো। এই সংস্করণে এ বছর এখনও পর্যন্ত ৭৬৪ রান তার। তিন নম্বরে ব্যাট করতে নেমেই করেছেন ৫৯৪ রান। এই পজিশনে এবছর ওয়ানডেতে এখনও পর্যন্ত বিশ্ব ক্রিকেটেই চতুর্থ সফলতম ব্যাটসম্যান তিনি।

সাম্প্রতিক সময়ে দলের ব্যাটিংয়ের স্তম্ভ হয়ে উঠেছেন তিনি, বড় ভরসার জায়গাও। তিন নম্বর জায়গা নিয়ে আপাতত দুর্ভাবনার কোনো কারণই ছিল না। অথচ বিশ্বকাপে এসে দেখা যাচ্ছে, সেই পজিশনেই তিনি অনিয়মিত।
বিশ্বকাপে দুটি ম্যাচে তাকে নামানো হয়েছে চার নম্বরে। একটিতে তিনে। যদিও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তিনে নেমে আউট হয়ে গেছেন তিনি প্রথম বলেই। চারে নেমে আফগানিস্তানের বিপক্ষে করেছেন ফিফটি। বিশ্বকাপের আগে এশিয়া কাপে চারে নেমেই সেঞ্চুরি করেছিলেন আফগানদের বিপক্ষে। তবে বছরের শুরু থেকে ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করে তিন নম্বর পজিশনেই তো তিনি বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছেন। এই পজিশনের চ্যালেঞ্জ ও দাবিগুলো তার খুব ভালো করে জানা। বিশ্বকাপের মতো জায়গায় তাহলে কেন তার ওপর ভরসা রাখা যাবে না!
শান্তর ব্যাটিং অর্ডার বদলে যাওয়ার বড় কারণ, মেহেদী হাসান মিরাজের বিশেষজ্ঞ ব্যাটসম্যান হয়ে ওঠা। এশিয়া কাপে আফগানদের বিপক্ষে সেঞ্চুরির পর থেকে আর তাকে লোয়ার-মিডল অর্ডারে খেলানো হয়নি। টপ বা মিডল অর্ডারেই নিয়মিত জায়গা দেওয়া হচ্ছে তাকে। মূলত তাকে জায়গা দিতে গিয়েই অন্যদের ব্যাটিং অর্ডার নড়ে যাচ্ছে প্রবলভাবে।
মিরাজ অবশ্যই এই মুহূর্তে খুব ভালো ফর্মে আছেন। তার ব্যাটিংয়ের সার্বিক উন্নতিও দৃশ্যমান। কিন্তু তাকে তো দল মূলত ‘ভাসমান’ হিসেবে রেখেছে ব্যাটিং অর্ডারে। প্রয়োজন বুঝে তাকে নানা জায়গায় কাজে লাগানো যেতে পারে। কিন্তু এমন একজনকে নিয়মিত ওপরের দিকে খেলানো তো দলের ভারসাম্যের জন্য হতে পারে ক্ষতিকর। আর বিশ্বকাপের মঞ্চে যদি তাকে এভাবে ব্যবহার করাই হয়, তাহলে তা আরও আগে থেকেই শুরু করা ছিল যৌক্তিক।
ব্যাটিং অর্ডারের এই পালাবদলে সবচেয়ে বেশি হাঁসফাঁস অবস্থায় আছেন তাওহিদ হৃদয়। ওয়ানডে ক্রিকেটে শুরুটা তার কতই না দারুণ হয়েছিল! ৫ নম্বরে দুর্দান্ত খেলে জায়গাটা আপন করে নিয়েছিলেন। এই পজিশন নিয়েও দলকে মনে হচ্ছিল নির্ভার। এশিয়া কাপে দুটি ইনিংসে ৬ নম্বরে নেমেও ভালো দুটি ইনিংস উপহার দেন। সেই তাকে বিশ্বকাপে হুট করেই খেলানো হচ্ছে ৭ নম্বরে!
এমনিতে ব্যাটিং অর্ডারের ৪ ও ৫ নম্বর কিংবা ৫ ও ৬ নম্বরের ভূমিকা বেশির ভাগ সময় কাছাকাছিই থাকে। কিন্তু ৭ নম্বর মানে পুরো ভিন্ন ভূমিকা, আলাদা ঘরানা, স্কিল ও মানসিকতার ব্যাপার। বিশ্বকাপের দুই ম্যাচে হৃদয়ের ব্যাটিং দেখেই বোঝা গেছে, এই পজিশনে তিনি স্বচ্ছন্দ নন। দ্বিধা আর সংশয়ের ছাপ স্পষ্ট পড়েছে তার ব্যাটিংয়ের ধরনে।
ব্যাটিং অর্ডার নিয়ে তাই জমা হচ্ছে প্রশ্নের পাহাড়। নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে শান্তর দিকেও ছুটে গেল প্রশ্নের পর প্রশ্ন। শুরুতে তার ছোট জবাব, “এটা কোচ ও অধিনায়ক বলতে পারবেন…।” পরে আবার যোগ করলেন, “আমরা যারা ব্যাট করি, আমরা সবাই জানি, কে কখন ব্যাট করবে, যে-ই ম্যাচে খেলতে আসে। তবে এর পেছনের কারণটা কোচ ও অধিনায়ক বলতে পারবেন।”
তার নিজের ব্যাটিং পজিশন যে নড়ে গেল, সেই প্রশ্নে উত্তরটা প্রত্যাশিতই থাকল। বিতর্কের পথ পা বাড়াতে চাইলেন না। তবে কোচ-অধিনায়কের কথা বললেন আবার।
“দলের জন্য যে কোনো পজিশনে খেলতে প্রস্তুত। চার নম্বরেও রান করেছি আমি, এমন নয় একদমই করিনি। দুটি ম্যাচে রান হয়নি। তবে যেটা বললাম, এটা কোচ-অধিনায়কের সিদ্ধান্ত। আমি খুশি… আমাকে যে পজিশনে ব্যাটিং করতে বলবে, আমি প্রস্তুত।”
ভিন্ন ব্যাটিং পজিশনে মানিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জটা অবশ্য তিনি অস্বীকার করলেন না। তবে দলের প্রয়োজনের কথাও বললেন। সঙ্গে আরও একবার যোগ করলেন কোচ-অধিনায়কের চাওয়ার কথা।
“একটু তো মানিয়ে নিতেই হয়, সত্যি বলতে। তবে আমার মনে হয়, সবারই ওই ফ্লেক্সিবিলিটি থাকা দরকার, যে কোনো সময় যে কোনো পজিশনে ব্যাটিং করার এবং এটাও বলব না যে হঠাৎ করেই হয়। সব ব্যাটসম্যানও জানে। এটা নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করার প্রয়োজন মনে হচ্ছে না আমার কাছে। পুরোটাই অধিনায়ক ও কোচ যেভাবে সিদ্ধান্ত নেন, ওভাবে আমরা ব্যাট করার চেষ্টা করি।”

“যারা মিডল অর্ডারে ব্যাট করে, চার-পাঁচ-ছয়, প্রতিটি জায়গায় ফ্লেক্সিবিলিটি থাকে আমার মনে হয়। তবে এসব যদি না হয় (ব্যাটিং অর্ডারের নড়াচড়া), তাহলে ওই ব্যাটসম্যানদের জন্য একটু হলেও সুবিধা হয়। তবে এখানে প্রতিটি ব্যাটার স্বচ্ছন্দই আছে। অভিযোগ কারও নেই যে আমার ব্যাটিং অর্ডার একেদিন একেকরকম হচ্ছে এবং ওখানে আমি করতে পারব না। অভিযোগ আসলে কারও নেই।”
চাইলে শান্তর কথা থেকে কিছুটা অসন্তুষ্টির আঁচ পাওয়া যেতে পারে। কিংবা সাধারণ কথা হিসেবেও ধরে নেওয়া যেতে পারে। তবে ব্যাটিং অর্ডারের ওলট-পালট না হলে যে ব্যাটসম্যানদের সুবিধাই হয়, সেটি তো উল্লেখ করেই দিলেন তিনি। এটা অবশ্য এমনই মৌলিক ব্যাপার যে, আলাদা করে উল্লেখ না করলেও চলত।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকে এখনও পর্যন্ত অধিনায়ক সাকিব আল হাসান কোনো সংবাদ সম্মেলনে আসেননি। তার কাছ থেকে পেছনের ভাবনা জানার উপায় নেই। নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের আগে বা পরে পাওয়া যায়নি কোচ চান্দিকা হাথুরুসিংহেকেও। তবে দলের ভাবনা সম্পর্কে ধারণা কিছুটা পাওয়া গেল সহকারী কোচ নিক পোথাসের কথায়।
“এটাই আধুনিক ক্রিকেট। ব্যাটাররা জানে যে তাদেরকে ফ্লেক্সিবল থাকতে হবে ও মানিয়ে নিতে হবে। ব্যাটিং অর্ডার নিয়ে অনেক আগে থেকেই আলোচনা করা হয়। প্রতিপক্ষ ও কন্ডিশনের ওপর তা নির্ভর করে। অনেক কিছু ভেবেচিন্তে এটা করা হয়।”
আধুনিক ক্রিকেট অবশ্য বাংলাদেশের চেয়েও বেশি রপ্ত করা দল কম নেই বিশ্ব ক্রিকেটে। এমনিতে নানা সময় তারা বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেও বড় আসরে ব্যাটিং পজিশনের মৌলিক জায়গাগুলোয় তারা আপোস করে কমই।
হয়তো বাংলাদেশ আরও বেশিই আধুনিক!