বাবরের রেকর্ড ইনিংসের পর রিজওয়ানের সেঞ্চুরিতে বাঁচল পাকিস্তান

জিততে হলে গড়তে হতো রান তাড়ার রেকর্ড। ডিঙাতে হতো অস্ট্রেলিয়ার রানের পাহাড়। প্রথম ইনিংসে দেড়শর আগে গুটিয়ে যাওয়া পাকিস্তান বাবর আজমের অসাধারণ ইনিংসে অবিশ্বাস্য কিছু করে দেখানোর সম্ভাবনা জাগাল। অধিনায়কের বিদায়ের পর যদিও পাল্টে গেল দৃশ্যপট। উল্টো তখন চোখ রাঙাচ্ছিল হারের শঙ্কা। পরে হাল ধরলেন মোহাম্মদ রিজওয়ান, তার দারুণ শতকে শেষ পর্যন্ত ম্যাচ বাঁচিয়ে মাঠ ছাড়ল স্বাগতিকরা।

স্পোর্টস ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 16 March 2022, 01:01 PM
Updated : 16 March 2022, 03:35 PM

রোমাঞ্চের নানা বাঁক পেরিয়ে শেষ দিনের শেষ ওভারে এসে ড্র হলো করাচি টেস্ট। তিন টেস্টের সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচই শেষ হলো ড্রয়ে।

অস্ট্রেলিয়া ৯ উইকেটে ৫৫৬ রানে প্রথম ইনিংস ঘোষণার পর পাকিস্তান গুটিয়ে যায় স্রেফ ১৪৮ রানে। রেকর্ড ৪০৮ রানে এগিয়ে থেকে সফরকারীরা আবার ব্যাটিংয়ে নেমে ইনিংস ঘোষণা করে ২ উইকেটে ৯৭ রান নিয়ে।

পাকিস্তানের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ৫০৬ রানের। টেস্ট ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৪১৮ রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ড ওয়েস্ট ইন্ডিজের। তার চেয়েও ৮৮ রান বেশি করার দুরূহ চ্যালেঞ্জ। বাবর-রিজওয়ানের ব্যাটে একসময় সেই সম্ভাবনাই উঁকি দেয়। পঞ্চম দিনের শেষ ২০ ওভারে তাদের প্রয়োজন ছিল ১৩১ রান, হাতে তখনও ৬ উইকেট।

বাবর ফেরার পর সেই পথে আর এগোতে পারেনি পাকিস্তান। শেষ পর্যন্ত ৭ উইকেটে ৪৪৩ রান করতে পারে তারা।

প্রায় দুই দিন ব্যাটিংয়ের চ্যালেঞ্জ সামলে পাকিস্তানকে জয়ের সমতুল্য ড্র এনে দেওয়ার নায়ক বাবর, পার্শ্বনায়ক আবদুল্লাহ শফিক ও রিজওয়ান। ইনিংস শুরু করতে নেমে শফিক অল্পের জন্য করতে পারেননি সেঞ্চুরি, আউট হন ৯৬ রানে। তবে বাবরের সঙ্গে তার ২২৮ রানের জুটিই গড়ে দেয় ভিত।

ম্যারাথন ইনিংস খেলার পর কিছুটা আক্ষেপ থাকার কথা বাবরেরও। টেস্ট ইতিহাসের প্রথম অধিনায়ক হিসেবে যে চতুর্থ ইনিংসে ডাবল সেঞ্চুরির রেকর্ডটি গড়া হলো না তার। তবে তার ক্যারিয়ার সেরা ১৯৬ রানের ইনিংসটি এখন এই তালিকায় সর্বোচ্চ।

ন্যাথান লায়নের পরপর দুই বলে যখন বাবর ও ফাহিম আশরাফ বিদায় নিলেন, দিনের খেলা বাকি তখনও ১২.১ ওভার। সাজিদ খানের পর নুমান আলিকে নিয়ে দলকে ড্রয়ের পথে এগিয়ে নেন রিজওয়ান। এই কিপার-ব্যাটসম্যান ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় সেঞ্চুরিতে অপরাজিত থাকেন এক ছক্কা ও ১১ চারে ১০৪ রান করে।

২ উইকেটে ১৯২ রান নিয়ে বুধবার খেলতে নেমে সাবধানী শুরু করেন শফিক ও বাবর। মাটি কামড়ে উইকেটে পড়ে থেকে দুইজন কাটিয়ে দেন প্রথম ঘণ্টা। এই সময়ে ১৪ ওভারে রান আসে ৩২।

অস্ট্রেলিয়া বোলারদের কোনোরকম সুযোগ না দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকেন তারা। কাঙ্ক্ষিত তিন অঙ্ক থেকে স্রেফ এক বাউন্ডারি দূরে থাকতে বিদায় নেন শফিক। প্যাট কামিন্সের অফ স্টাম্পের বাইরের বলে স্লিপে ধরা পড়ে শেষ হয় তার ৩০৬ বল ও ৪৬৫ মিনিট স্থায়ী ইনিংস। যেখানে এক ছক্কার সঙ্গে চার ৬টি।

ভাঙে তৃতীয় উইকেটে বাবর-শফিকের ২২৮ রানের জুটি। টেস্ট ইতিহাসে চতুর্থ ইনিংসে এই উইকেটে এর চেয়ে বড় জুটি আর আছে কেবল একটি। সেটাও পাকিস্তানের, শান মাসুদ ও ইউনিস খানের ২৪২; শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২০১৫ সালে।

লাঞ্চের পর দেড়শতে পা রাখেন আগের দিনের সেঞ্চুরিয়ান বাবর। পরের ওভারেই অস্ট্রেলিয়া দলের মুখে হাসি ফোটান কামিন্স। দুর্দান্ত এক আউটসুইঙ্গারে কট বিহাইন্ড করে দেন ফাওয়াদ আলমকে।

১৬১ রানে বাবরকে ফেরানোর সুযোগও এসেছিল অস্ট্রেলিয়ার সামনে। কিন্তু অভিষিক্ত মিচেল সোয়েপসনের পরপর দুই বলে ক্যাচ নিতে পারেননি ট্রাভিস হেড ও মার্নাস লাবুশেন।

এরপর রিজওয়ানের সঙ্গে জমে ওঠে বাবরের জুটি। চা বিরতির পর কয়েকটি ওভারে তারা দ্রুত রান তুললে একটু হলেও জয়ের সম্ভাবনা জেগে ওঠে। এরপর অবশ্য আবার নিজেদের গুটিয়ে নেন দুজন।

১০৬ বলে ফিফটি স্পর্শ করেন রিজওয়ান। তাদের জুটির শতক হয় ২০৯ বলে। শেষ ঘণ্টায় যখন ম্যাচ, লায়ন এসে ঘুরিয়ে দেন মোড়।

তার অফ স্পিনে ব্যাটের পর প্যাডে লেগে শূন্যে ওঠে যাওয়া বাবরের সহজ ক্যাচ মুঠোয় জমান লাবুশেন। শেষ হয় পাকিস্তানের সময়ের সেরা ব্যাটসম্যানের এক ছক্কা ও ২১ চারের ইনিংস।

১০ ঘণ্টার ইনিংসে বাবর খেলেন ৪২৫ বল। টেস্টে চতুর্থ ইনিংসে চারশর বেশি বল খেলা চতুর্থ ব্যাটসম্যান তিনি। ম্যাচের শেষ ইনিংসে বাবরের ৬০৩ মিনিটের চেয়ে বেশিক্ষণ খেলেছিলেন কেবল ইংল্যান্ডের মাইকেল আথারটন, ১৯৯৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৬৪৩ মিনিট।

লায়নের পরের বলে ফাহিম স্লিপে ধরা পড়লে অস্ট্রেলিয়া শিবিরে বয়ে যায় স্বস্তির হাওয়া। আশা জাগে জয়ের। তখনও যে পাকিস্তানের ১২ ওভারের বেশি খেলার বাকি। আর সফরকারীদের প্রয়োজন কেবল তিন উইকেট।

অস্ট্রেলিয়ার সেই আশার বাতিকে নিভিয়ে দেন রিজওয়ান। এক প্রান্ত আগলে রেখে ১৭৩ বলে করেন সেঞ্চুরি। সাজিদ ফেরার পর নুমানের সঙ্গে জুটিতে দলকে আর বিপদে পড়তে দেননি রিজওয়ান।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

অস্ট্রেলিয়া ১ম ইনিংস: ৫৫৬/৯ ডিক্লে.

পাকিস্তান ১ম ইনিংস: ১৪৮

অস্ট্রেলিয়া ২য় ইনিংস: ৯৭/২ ডিক্লে.

পাকিস্তান ২য় ইনিংস: (লক্ষ্য ৫০৬) ১৭১.৪ ওভারে ৪৪৩/৭ (আগের দিন ১৯২/২) (শফিক ৯৬, বাবর ১৯৬, ফাওয়াদ ৯, রিজওয়ান ১০৪*, ফাহিম ০, সাজিদ ৯, নুমান ০*; স্টার্ক ২১-৬-৫৮-০, কামিন্স ২৬-৬-৭৫-২, সোয়েপসন ৫৩.৪-৮-১৫৬-০, লায়ন ৫৫-২০-১১২-৪, গ্রিন ১৫-৪-৩২-১, লাবুশেন ১-১-০-০)

ফল: ম্যাচ ড্র

সিরিজ: দুই ম্যাচ শেষে তিন ম্যাচের সিরিজটি ০-০ সমতায়

ম্যান অব দা ম্যাচ: বাবর আজম

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক