ব্যাট ও বাইবেল নিয়ে ‘স্পাইসম্যানের’ গর্বের ভুবন

বিপিএলে বিদেশি ক্রিকেটারদের মধ্যে নিয়মিত মুখ আন্দ্রে ফ্লেচার। তার এই নাম অবশ্য হারিয়ে যেতে বসেছে আরেক নামের আড়ালে! ক্রিকেটবিশ্ব তাকে চেনে ‘স্পাইসম্যান’ নামে। এই নামের পেছনে আছে দারুণ এক গল্প, আছে গর্ব। গল্পের উপকরণ অনেক আছে মাঠের ভেতরে-বাইরে তার জীবনের নানা বাঁকেও। প্রিমিয়ার ব্যাংক খুলনা টাইগার্সের হয়ে খেলতে আসা ক্যারিবিয়ান ব্যাটসম্যান গল্পের ঝাঁপি মেলে ধরলেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায়।

আরিফুল ইসলাম রনিআরিফুল ইসলাম রনিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 13 Feb 2022, 04:43 AM
Updated : 13 Feb 2022, 10:09 AM

আপনার ‘স্পাইসম্যান’ নামটি দিয়েই শুরু করা যাক। সম্ভবত ধারাভাষ্যকার ড্যানি মরিসন দিয়েছিলেন এই নাম?

আন্দ্রে ফ্লেচার: হ্যাঁ, ড্যানি মরিসনের কাছ থেকেই নামটা পেয়েছি। সত্যি বলতে, আমার সবচেয়ে প্রিয় ধারাভাষ্যকার তিনিই। আমি গ্রেনাডা থেকে এসেছি, যেটি মসলার দ্বীপ হিসেবেও পরিচিত। প্রচুর মসলা উৎপাদন করি আমরা। আমাদের মসলার খ্যাতি আছে দুনিয়াজুড়ে এবং আমরা এটা নিয়ে গর্ব করি।

ড্যানি যখন সিপিএলে ধারাভাষ্য দিতে গ্র্রেনাডায় আসেন, আমার দেশের প্রেমে পড়ে যান তিনি। ওই সময়টায় সম্ভবত গ্রেনাডার একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে আমি সিপিএল খেলছিলাম। ড্যানি আমাকে ধারাভাষ্যে ‘স্পাইসম্যান’ নাম দিয়ে দেন। এরপর এটি ক্রমে ছড়িয়ে পড়ে ও পরিচিতি পেয়ে যায়।

আপনিও মনে হয় খুব পছন্দ করেন নামটি, জার্সির পেছনে এই নামই লেখা!

ফ্লেচার: অবশ্যই, খুবই পছন্দ করি। এরকম একটা ‘সিগনেচার’ নাম পেতে কার না ভালো লাগে! যেখানেই যাই, লোকে আমাকে এই নামে ডাকে এবং এই নামের পেছনের গল্প শুনতে চায়। আমিও খুব আগ্রহ নিয়ে সবাইকে বলি। কারণ এটা স্রেফ একটা ডাক নাম বা খেতাব নয়, এই নামে আমার দেশের গর্ব মিশে আছে। আমার দেশের অস্তিত্ব ও পরিচয় জড়িয়ে। একটা নাম দিয়ে আমার দেশকে তুলে ধরতে পারছি, এর চেয়ে ভালো লাগার ব্যাপার আর কী হতে পারে!

আপনার কিছু ভিডিও খুব জনপ্রিয়, যেখানে দেখা যাচ্ছে, আপনার চোখ বেঁধে রাখার পরও সামনে রাখা নানা মসলার নাম আপনি ঠিকঠাক বলে দিচ্ছেন। রান্নার কিছু ভিডিও আছে। রান্না করতে ভালোবাসেন?

ফ্লেচার: মসলার দেশে আমার বেড়ে ওঠা, মসলার নাম ঠিকঠাক বলে দেওয়াই তো স্বাভাবিক। রান্না করতেও পছন্দ করি। ছোট থেকেই রান্নাঘরে থাকতে ভালো লাগে আমার। ছেলে হয়ে রান্নাঘরে সময় কাটানোর ব্যাপারটিও উপভোগ করি। বেশিরভাগ সময় তো মেয়েদেরই দেখা যায় এখানে। আমি অবশ্যই পেশাদার শেফ হওয়ার মতো নই, তবে যথেষ্ট ভালো রান্না করি বলেই মনে করি।

বাংলাদেশের কোনো খাবার রান্নার আগ্রহ হয়েছে বা চেষ্টা করেছেন?

ফ্লেচার: রান্নার পাশাপাশি খেতেও পছন্দ করি আমি। চিকেন বিরিয়ানি আমার অসম্ভব প্রিয়। যথেষ্ট খাই বাংলাদেশ বা এই অঞ্চলে এলে। কোনো একদিন এটা রান্না করতে চাই আমি। এখনও পারিনি, তবে শিখব অবশ্যই।  

ক্রিকেটে ফেরা যাক। বিপিএলে দারুণ কয়েকটি পারফরম্যান্স আছে এবার আপনার, তিন খেলায় ম্যান অব দা ম্যাচ হয়েছেন। আবার ভালো করতে পারেননি ৫ ম্যাচে। নিজের চোখে কেমন দেখছেন এই পারফরম্যান্স?

ফ্লেচার:
ভালো-মন্দ মিলিয়ে। রানের চেয়ে দলের হয়ে জয়ে অবদান রাখতে পারাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কয়েকটি ম্যাচে চাপের মধ্যে ভালো করতে পেরেছি। দলকে লক্ষ্যে নিতে পেরেছি, এটাই স্বস্তির। ম্যাচ সেরা হওয়া বা না হওয়া আমাকে ভাবায় না। দলের যা প্রয়োজন, সেটাই করতে চাই। সবসময় পারি না, ক্রিকেটে তা সম্ভব নয়। তবে চেষ্টা করে যেতে চাই সবসময়। খুলনাকে যত বেশি সম্ভব ম্যাচ জেতাতে চাই। চ্যাম্পিয়ন হয়ে বিপিএল থেকে দেশে ফিরতে চাই।

বিপিএলে আপনি নিয়মিত মুখ। খুলনা টাইটান্সে একটি মৌসুমে ভালো করতে না পারলেও অন্যান্য মৌসুমে বেশ ভালো খেলেছেন। সিলেটের দুই ফ্র্যাঞ্চাইজির হয়ে রেকর্ড বেশ ভালো। তবে বিপিএলে বেশির ভাগ সময় যে উইকেটে খেলা হয়, আপনার মতো ব্যাটসম্যানদের কাজটা তাতে সহজ নয়। আপনি কিভাবে মানিয়ে নিলেন?

ফ্লেচার: চ্যালেঞ্জিং তো বটেই। তবে অনেক দিন ধরে খেলছি বিপিএলে, স্থানীয় ক্রিকেটারদের কাছ থেকে অনেক শিখেছি এখানে খেলার ধরন। কোন বোলার কেমন বল করে, কোন উইকেটে কীভাবে খেলা উচিত, ওদের কাছ থেকে জেনে নেই নিয়মিত। চেষ্টা করেছি নিজের শক্তির জায়গাটা ধরে রেখে কন্ডিশন বুঝে খেলতে। বিভিন্ন কন্ডিশনে মানিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ তো একজন ক্রীড়াবিদের সবসময়ের বাস্তবতা।

আপনার ক্রিকেট শুরু ও বেড়ে ওঠার সময় তো টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের অস্তিত্ব ছিল না। তখনও কি এরকম আগ্রাসী ছিলেন নাকি সময়ের সঙ্গে হয়ে উঠেছেন?

ফ্লেচার: বরাবরই ছিলাম। যতদূর মনে পড়ে, অনূর্ধ্ব-১৫ পর্যায় থেকেই আমি এরকম খেলি। সেই সময় টেস্ট ক্রিকেটই ছিল সবার ধ্যান-জ্ঞান। আমরাও ব্যতিক্রম ছিলাম না। তবে নিজের ভেতরের আগ্রাসী তাড়নাকে সবসময়ই ভালোবাসতাম আমি।

এখন তো ক্রিকেট দুনিয়া বদলে গেছে। এমন নয় যে, টেস্ট ক্রিকেট এখন কেউ খেলতে চায় না। তবে টি-টোয়েন্টি এখন বড় জায়গা নিয়ে ফেলেছে এবং শুধু এটি খেলেই ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব। আমাদের মতো ক্রিকেটার ভবিষ্যতে আরও বাড়বে, যারা টি-টোয়েন্টিই খেলবে মূলত। যে প্রসঙ্গে বলছিলাম, আগ্রাসী ধরনটা আমাকে সহায়তা করেছে ২০ ওভারের ক্রিকেটকে আপন করে নিতে।

আগ্রাসী মনোভাবের সঙ্গে আপনাদের গায়ের জোরও তো সহায়তা করছে এই সংস্করণে প্রভাব বিস্তারী হয়ে উঠতে!

ফ্লেচার: এটা অনেকটা জেনেটিক। আমাদের জিনেই আছে এটা। তারপর প্রক্রিয়ার ব্যাপার তো আছেই। আমরা জিমে অনেক সময় কাটাই। জোর বাড়ানোর কাজ করি। পেশি পোক্ত করার চেষ্টা করি।

আমাদের দেশে প্রকৃতিগতভাবে গায়ের জোর খুব থাকে না। কিন্তু পেশির জোর বাড়ানোর জন্য কি কি কাজ এখানকার ক্রিকেটাররা করতে পারে?

ফ্লেচার:
কিছুদিন আগেই আমার দলের স্থানীয় কয়েকজন ক্রিকেটারকে বলেছিলাম, ‘এবার বাংলাদেশ ছাড়ার আগে নিশ্চিত করব যেন ওদের সঙ্গে জিমে প্রচুর কাজ করি এবং আমরা শক্তি বাড়াতে জিমে যে কাজগুলি করি, ওদেরকে তা দেখিয়ে দিতে। আমি চেষ্টা করছি। বাকিটা তাদের ব্যাপার।

আমার বয়স ৩৪, তবে মাঠে আমার নিজেকে মনে হয় ২১ বছর বয়সীর মতো। ফিটনেস আমার প্যাশনের জায়গাও। ভবিষ্যতে ফিটনেস ট্রেনার হতে চাই। সেভাবে নিজেকে গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। স্থানীয় ক্রিকেটারদের সঙ্গে ফিটনেস নিয়ে কাজ করে নিজেরও অভিজ্ঞতা হচ্ছে।

তবে শুধু ফিটনেস ট্রেনার হতে চাই বলেই নয়, ওদেরকে দেখিয়ে দিচ্ছি ভালোবাসার জায়গা থেকেও। বিশ্বাস করুন ভাই, এই দেশকে ভালোবাসি আমি। এখানকার মানুষ, ক্রিকেটারদের ভালোবাসি। মূল কারণ, ক্রিকেট খেলাটাকে আপনারা যতটা প্রচণ্ড আবেগ দিয়ে ভালোবাসেন। জানি, কখনও কখনও সেই আবেগের প্রকাশে বাড়াবাড়ি হয়, সীমা ছাড়িয়ে যায়। তবে সেটির কারণও আমি বুঝতে পারি। এত বছর এখানে খেলে সংস্কৃতিটা বুঝি। আমরা, বিদেশি ক্রিকেটাররা এখানে এসে অনেক ভালোবাসা ও যত্ন পাই। খুব আন্তরিকভাবে আমাদের গ্রহণ করা হয় সবসময়। এখানে আসতে পারা তাই অনেক সম্মানের।

এই দেশের প্রতি ভালোবাসা থেকেই ইচ্ছে করে কিছুটা ফিরিয়ে দিতে। ক্রিকেটের সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বাংলাদেশের উন্নতি জরুরি। স্থানীয় ক্রিকেটার যারা আছে এখানে, নিজের স্কিলের সঙ্গে যদি এসব যোগ করতে পারে, বিশেষ করে স্পিনে বড় শট খেলতে জোর লাগে, ওই জোর গায়ে চলে এলে ওদের সামগ্রিক খেলাও অনেক ভালো হয়ে উঠবে। বাংলাদেশের মতো দল ভালো হয়ে উঠলে বিশ্ব ক্রিকেটেরই লাভ।

তবে গায়ের জোর বাড়ানোও একটা প্রক্রিয়া। স্রেফ কাজ শুরু করে দিলেই হলো না। শরীরও পোক্ত থাকতে হবে, যেন সেই কাজগুলোর ধকল সইতে পারে। শরীর পোক্ত করাও আরেকটি প্রক্রিয়া। সবই ওদেরকে বলার চেষ্টা করছি।

স্থানীয় ক্রিকেটারদের কাউকে সেরকম আগ্রহী মনে হলো?

ফ্লেচার: রনির (তালুকদার) সঙ্গে বেশ কথা হয়েছে, ওকে তো আগ্রহী মনেই হলো। আমাদের ফিজিও-ট্রেনারদেরও দেখিয়েছি, আমি কোন কাজগুলি করি। কোন কাজটা করলে শরীরের কোন অংশ কেমন হয়ে উঠবে। ব্যাটিংয়ে কোন শট খেলার ক্ষেত্রে শরীরের কোন অংশের শক্তি বেশি জরুরি, এরকম নানা কিছু।

কয়েকজনকে দেখিয়েছি। আরও কয়েকদিন আছি এখানে। সবাইকে বলেছি, যারা আগ্রহী, আমি দেখাতে পারি।

বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের এগিয়ে যাওয়ার পথ নিয়ে বলছেন। আপনার নিজের কাজটাও খুব সহজ ছিল না। গ্রেনাডার মতো ছোট্ট এবং ক্রিকেট ঐতিহ্যে পিছিয়ে থাকা একটি দ্বীপ থেকে উঠে আসার ভ্রমণটা কেমন ছিল?

ফ্লেচার: অবশ্যই সহজ ছিল না। বেশ প্রতিবন্ধকতা পার হয়েই এগোতে হয়েছে। বিস্তারিত সবকিছু এখন আর বলতে চাই না। দুনিয়াজুড়ে অনেক ক্রীড়াবিদেরই উঠে আসার পথ কঠিন থাকে। সব জেনেই আমরা পথ বেছে নেই এবং এগিয়ে যাই।

আমি শুধু বলতে পারি, পেছনে ফিরে তাকিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ নেই যে ক্রিকেটে নিজের ক্যারিয়ার গড়েছি। অবশ্যই অনেক উঠা-নামা ছিল, প্রত্যাশার অনেকটুকু পূরণ হয়নি। তবে এখন ক্যারিয়ার শেষ হলেও আফসোস থাকবে না। আমি সবসময় উপভোগ করতে চেয়েছি ক্রিকেট এবং নানা চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্যেও উপভোগ করেছি।

হ্যাঁ, গ্রেনেডা ছোট একটি দেশ। এক লাখের একটু বেশি লোকের বাস এখানে। ঢাকায় মিরপুরেও হয়তো আমার গোটা দেশের চেয়ে বেশি লোক থাকে। তবে আমার দেশকে আমি ভালোবাসি ও গর্ব করি। সবাইকে বলি, আমার দেশে গেলে ভালো লাগবেই। দারুণ সৌন্দর্যময় সব সৈকত আছে সেখানে। বাংলাদেশের মতো আমাদের মানুষও খুব বন্ধুত্বপরায়ণ।

আমার দেশ থেকে উঠে এসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে খেলেছি, নানা দেশে খেলছি, গ্রেনাডার একজন হিসেবে এটা আমার জন্য সম্মানের।

বেড়ে ওঠার সময়টায় জুনিয়র মারি (গ্রেনাডার সবচেয়ে পরিচিত ক্রিকেটারদের একজন, ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে ৩৩ টেস্ট, ৫৫ ওয়ানডে খেলা সাবেক কিপার) আমাকে অনেক সহায়তা করেছেন। তার কাছ থেকে শিখেছি প্রচুর।

এছাড়া ডেভন স্মিথ (সাবেক ব্যাটসম্যান), রল লুইস (সাবেক লেগ স্পিনার, এখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের ম্যানেজার), তারাও নানা সময় অনেক সাহায্য করেছেন। এখনও তরুণ ক্রিকেটারদের নিয়ে কাজ করছেন তারা। সম্ভাবনাময় অনেক তরুণ আছে গ্রেনাডায়, যারা ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভালো করতে পারে। ক্যারিবিয়ায় একটা ছোট দ্বীপ থেকে উঠে আসা সহজ নয়। তবে লড়াইটা চলছে সবার।

সেই ছোট দ্বীপ থেকেই উঠে এসে বিশ্বকাপ জয়ের অংশ হতে পারা তো চাট্টিখানি কথা নয়। ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ নিশ্চয়ই আপনার ক্যারিয়ারের স্মরণীয়তম অধ্যায়?

ফ্লেচার:
কোনো সংশয় নেই। প্রতিটি ক্রিকেটারের স্বপ্ন বিশ্বকাপ জয় করা। আমাদের জন্য ওই বিশ্বকাপ আরও বেশি স্মরণীয় নানা কারণে। বিশ্বকাপের আগে পরিস্থিতি ভালো ছিল না (বোর্ডের সঙ্গে ক্রিকেটারদের দ্বন্দ্বের কারণে), এরপর সংযুক্ত আরব আমিরাতে ক্যাম্পে আমাদের নিবিড় অনুশীলন, ভালো করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া, বিশ্বকাপে ভালো শুরুর পর আফগানিস্তানের কাছে হেরে যাওয়া, ঘুরে দাঁড়িয়ে স্বাগতিক ভারতকে হারিয়ে ফাইনালে, এরপর ফাইনালটা যেভাবে শেষ হলো, কার্লোস ব্র্যাথওয়েটের টানা ৪ ছক্কা, সেই সময়ের উত্তেজনা-রোমাঞ্চ, উল্লাস, সবই এক জীবনের স্মৃতি।

আপনি তো শেষদিকে চোটে পড়ে গিয়েছিলেন। ফাইনালে কি ডাগআউটে ছিলেন?

ফ্লেচার: হ্যাঁ, দুর্ভাগ্যজনকভাবে ফিট থেকে বিশ্বকাপ শেষ করতে পারিনি। তবে ডাগআউটেই ছিলাম।

শেষ ওভারের আগে কেমন ছিল মানসিক অবস্থা? চার ছক্কায় খেলা শেষ হওয়ার পর?

ফ্লেচার: সত্যি বলতে, খুব একটা নার্ভাস ছিলাম না। ধর্মপ্রাণ খ্রিস্টান হিসেবে ঈশ্বরে প্রবল বিশ্বাস আমার। শান্ত থেকে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলাম আর ইশ্বরের কৃপার অপেক্ষায় ছিলাম। খুব রিল্যাক্সড হয়ে বসেছিলাম। দুটি ছক্কার পর বুঝে গেলাম, দিনটা আমাদেরই।

সবাই অবশ্যই আমার মতো ছিল না। কেউ স্থিরভাবে বসে থাকতে পারছিল না। অস্থির হয়ে পায়চারি করছিল অনেকে। শেষপর্যন্ত সবকিছু ভালোভাবে হলো। ম্যাচের পর যে অবস্থা ছিল, আপনি যদি ওই ড্রেসিংরুমে থাকতেন, জীবনেও ভুলতে পারতেন না ওই রাত।

আপনার আরেকটি স্মরণীয় ঘটনার কথাও পড়েছিলাম গতবছর। বিগ ব্যাশে খুব বাজে ফর্মে ছিলেন। এরপর ব্রায়ান লারার ফোন পেলেন, পরের ম্যাচে ৮৯ রানের বিধ্বংসী ইনিংস খেললেন…

ফ্লেচার: এই ঘটনাও ভোলার নয়। ওই বিগ ব্যাশ… কী বলি, আমার জীবনের কঠিনতম টুর্নামেন্ট ছিল সম্ভবত সেটি। একদমই ভালো করতে পারছিলাম না।

এক রাতে, ম্যাচ শেষে ফিরে বিছানায় শুয়ে খুব হতাশ হয়ে ভাবছিলাম, ‘এরপর কী...আর কী করতে পারি আমি!’ কোনোভাবেই রানে ফিরতে পারছিলাম না। তখন ইনস্টাগ্রামে একটি ম্যাসেজ পেলাম ব্রায়ান লারার কাছ থেকে। আমার ফোন নম্বর চাইলেন। আমি ভাবলাম, ‘এটা কি কোনো ফেক আইডি? ব্রায়ান লারা কেন আমার নম্বর চাইবেন!’

সংশয় নিয়েই নম্বর দিলাম। তিনি ফোন করলেন। আমার আউটের ধরনগুলি তিনি খেয়াল করছিলেন। সেসব নিয়েই কিছু কথা বললেন। আমাকে বারবার বলছিলেন যে, ‘তুমি ফর্মেই আছো, সেটা-দু-একটা শটেই বোঝা যায়। স্রেফ নিজেকে একটু সময় দিতে হবে।’ কোন ম্যাচে আমি আগে থেকেই ঠিক করে রাখা শট খেলতে গিয়ে বিপদে পড়েছি, কোন ম্যাচে কী করতে চেয়েছি, সব বিস্তারিত বলে তিনি করণীয়টা বলে দিলেন। মনস্তাত্ত্বিক আরও কিছু কথা…।

তার সঙ্গে কথা বলার পর মুহূর্তেই যেন চাঙা হয়ে উঠলাম। মনে হচ্ছিল, পারলে তখনই মাঠে নেমে যাই! পরে ৮৯ রানের ওই ইনিংসটা খেলার পর ড্রেসিং রুমে ফিরে কান্না করে দিয়েছিলাম। ইনিংসটি আমাকে এতটাই নাড়িয়ে দিয়েছিল। ম্যাচের পরও ব্রায়ানের সঙ্গে কথা হয়েছিল। তিনি খুবই খুশি ছিলেন।

আরেকটি কথাও আমাকে বলতেই হবে। ম্যাচের পর ম্যাচ খারাপ করছিলাম, তারপরও মেলবোর্ন স্টার্সের কোচ-ম্যানেজার, অধিনায়ক ম্যাক্সি (গ্লেন ম্যাক্সওয়েল), দলের প্রতিটি ক্রিকেটার যেভাবে পাশে থেকেছে, বিদেশের একটা লিগে এটা অবিশ্বাস্য। বাজে ফর্মে থাকার পরও ওরা আমাকে এই অনুভূতিটা দিয়েছে যে, আমি দারুণ ফর্মে আছি!

বিশেষ করে ম্যাক্সির কথা আলাদা করে বলতে চাই। বিদেশি ক্রিকেটারদের প্রতি সব দলের, অধিনায়কের বাড়তি চাওয়া থাকে। কিন্তু সে আমাকে এতটুকু বুঝতে দেয়নি প্রত্যাশার চাপ। বরং সবসময় ফুরফুরে রাখার চেষ্টা করেছে। এত বাজে করার পরও সুযোগ দিয়ে গেছে আমাকে। ওই আবহে থাকতে পারাটা দারুণ ব্যাপার এবং পেশাদার জীবনের বড় একটা শিক্ষাও। পরে শেষ দুই ম্যাচ খেলতে পারিনি চোটের কারণে। তখনও ওরা দারুণ আন্তরিক ছিল।

ভবিষ্যতে আবার যদি কখনও সুযোগ হয়, চেষ্টা করব প্রতিদান দিতে। ক্রিকেটার হিসেবে যদি নাও হয়, ফিটনেস ট্রেনার হিসেবে।

বিগ ব্যাশে ব্যাট হাতে সময় খুব ভালো না কাটলেও মাঠে নাচের ঝলক দেখিয়ে ঠিকই মাতিয়েছিলেন!

ফ্লেচার: আমরা ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটাররা চাই বিনোদন দিতে, শুধু ব্যাটে-বলে নয়, নানাভাবে। গ্যালারি আর টিভির দর্শকদের মাতিয়ে রাখতে চাই। ক্রিকেট খেলাটাই তো দিনশেষে বিনোদন। আমরা চাই, খেলাটাকে ভালোবেসে যারা দেখছেন, তাদের সময়টা উপভোগ্য হোক।

তাছাড়া, ভালো একটি ক্যাচ নিলে, গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট পেলে, অনুভূতিও খুব ভালো থাকে। আমাদের উচ্ছ্বাস প্রকাশের ধরন এরকম।

লারার কথা বললেন, ক্যারিবিয়ায় তো কিংবদন্তি ক্রিকেটারের অভাব নেই। এমন কেউ আছেন, খেলা নিয়ে যার সঙ্গে আপনার কথা হয় নিয়মিত?

ফ্লেচার: কোর্টনি ওয়ালশের সঙ্গে অনেক কথা হয়। যদিও তিনি ফাস্ট বোলার ছিলেন, গ্রেট বোলার, কিন্তু খেলার সবকিছু তো জানেন। তার সঙ্গে কথা হয় ক্রিকেট ও নানা কিছু নিয়ে।

স্যার ভিভের (ভিভিয়ান রিচার্ডস) সঙ্গেও কথা হয়, মূলত ফেইসবুকে। আরও আছেন কজন, খুব নিয়মিত নয়। তবে কথা হয় মাঝেমধ্যে। তাদের সঙ্গে সাধারণ কোনো আড্ডা বা আলাপচারিতা থেকেও অনেক কিছু শিখতে পারি।

আপনার পিঠাপিঠি বড় বোন শেরি ফ্লেচার তো স্প্রিন্টার। ২০০৮ বেইজিং অলিম্পিকে ১০০ ও ২০০ মিটারে দৌড়েছেন তিনি, রেকর্ড গড়ে গ্রেনাডার দ্রুততম মানবী হয়েছেন, ২০০ মিটারে প্যান-আমেরিকান গেমসে ব্রোঞ্জ জিতেছেন। আপনি ক্রিকেটে কিভাবে এলেন?

ফ্লেচার:
আমার পরিবার কিন্তু স্পোর্টিং পরিবার। আমার মা জেসি ফ্লেচার ছিলেন দারুণ স্প্রিন্টার ও দুর্দান্ত ক্রিকেটার। দুটিতেই খুব ভালো ছিলেন। মায়ের অ্যাথলেটিক সত্ত্বাকে আপন করে নিয়েছে আমার বোন, ক্রিকেটার সত্ত্বাকে আমি.. হাহাহহা।

আসলে আমিও একসময় স্প্রিন্টিংয়ে নেমেছিলাম। তবে দ্রুতই বুঝে গেছি, এটা আমাকে দিয়ে হবে না।

আমার বোন আমাদের পরিবারের ভালোবাসার সুতো। খুবই স্নেহময় ও যত্নশীল। আমাদের পরিবারের জন্য সবচেয়ে গর্বের মুহূর্তটি ছিল বেইজিং অলিম্পিকের ট্র্যাকে ওকে দেখা।

আমার ভাইরাও ভালো ক্রিকেটার ছিল। আমার মতো এতদূর ওরা আসতে পারেনি, কিন্তু খুবই প্রতিভাবান ছিল। বিশেষ করে একজন, শেন ফ্লেচার, আমার চেয়েও ভালো খেলত। আমি সবসময় বলি, সে ক্রিকেটকে সিরিয়াসলি নিলে অনেক দূর যেত। কিন্তু সিরিয়াস হয়নি সে। অনূর্ধ্ব-১৫, অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায় পর্যন্ত ক্লাস ক্রিকেটার ছিল। ওপেনিং ব্যাটসম্যান, কিপিং করত, লেগ স্পিনও করত। গ্রেনাডায় অনেকে তাকে ‘গ্রেনাডার ওয়ার্ন’ বলেও ডাকত, কারণ অনেক টার্ন করতে পারত। এখন সুইজারল্যান্ডে থাকে, টুকটাক ক্রিকেট খেলে সেখানে।

এত বছর বিপিএলে খেলছেন, বাংলাদেশে নিশ্চয়ই অনেক বন্ধু পেয়ে গেছেন?

ফ্লেচার: অনেক বন্ধু আছে এখানে আমার, বেশির ভাগই ক্রিকেটার। খুলনার হয়ে প্রথম যখন খেলতে আসি, তখন থেকেই বন্ধুত্ব অনেকের সঙ্গে। প্রথমবার বিপিএল খেলার পর কদিন আমি থেকে গিয়েছিলাম। অনেকের বাসায় গিয়েছি, খেয়েছি। ইলিশ মাছ ভাজা খেয়ে তো পাগল হয়ে গিয়েছিলাম! এখনও এটা আমার ভালো লাগে।

বন্ধুত্ব যাদের সঙ্গে হয়েছে, নাফিস ইকবালের কথা আলাদা করে বলতে হবে। খুলনার সময় থেকেই ওর সঙ্গে সম্পর্ক। এখন আরও পোক্ত হয়েছে।

২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের পর ড্যারেন স্যামি একটা কথা বলেছিলেন যে, তাদের দলে একজন যাজক আছে, আন্দ্রে ফ্লেচার, যিনি সবসময় প্রার্থনা করেন!

ফ্লেচার: আমার খ্রিস্টান জীবনকে আমি খুবই সিরিয়াসলি নেই এখন। আগেও নিয়েছি। পরে জীবনে নানা পর্যায় এসেছে, ভালো-মন্দ সময় কেটেছে, কখনও পথচ্যুত হয়েছি, কখনও ফিরেছি। তবে এখন আমি একদম অনুগত।

ক্যারিবিয়ায় বেশির ভাগ মানুষই খ্রিস্টান। আমি এখন চেষ্টা করি, যিশু খ্রিস্ট যে পথ দেখিয়ে গেছেন, যতটা সম্ভব সেই পথ অনুসরণ করতে। এটাও জানি, আপনারা সবাই, এই দেশের মানুষও তাদের ধর্মকে খুব গুরুত্ব দিয়ে নেয়। ক্রিকেট খেলা যেমন আমার জন্য গর্বের ও সম্মানের, তেমনি যিশুর অনুসারী হতে পারাতেও আমি গর্ববোধ করি অনেক। ঈশ্বরের সেবা করতে চাই আজীবন।

শোনা যায়, আপনার ক্রিকেট কিট ব্যাগে ব্যাটের পাশাপাশি যত্ন করে বাইবেলও রাখেন সবসময়?

ফ্লেচার: বাইবেল আমার ব্যাগে সবসময়ই থাকে। আমার কাছে এটা শক্তি-প্রেরণার উৎস। যাবতীয় সমস্যার সমাধান পাই এখানে। বিশেষ করে, সময় যখন ভালো কাটে না, বাইবেল পড়লে মনে সাহস পাই, স্বস্তি পাই। বাইবেলের দিকে তাকালে সবসময় মনে হয়, ইশ্বর আমাকে কোন পথে চলতে বলেছেন, জীবন কিভাবে পরিচালনা করা উচিত, কোনটা অনুচিত। ব্যাট আর বাইবেল শুধু আমার ব্যাগেই নয়, হৃদয়েও জায়গা নিয়ে থাকে সবসময়।