ইবাদতের আশার পালে বোল্ট-সাউদির প্রেরণার দোলা

নিউ জিল্যান্ড সফরে প্রথম টেস্টে বাংলাদেশের জয়ের নায়ক ইবাদত হোসেন চৌধুরি। ইতিহাস গড়া জয়ে বলা যায় আকাশে উড়ছিলেন। পরের টেস্টেই বাস্তবতার জমিনে নেমে আসতে হয়েছে। তবে এই পরিক্রমায় নিজেকে নতুন করে চিনেছেন তিনি, বুঝেছেন করণীয় আর এঁকেছেন ভবিষ্যতের পথরেখা। সেখানে বড় প্রেরণার উৎস হয়ে এসেছেন টিম সাউদি, ট্রেন্ট বোল্ট, নিল ওয়্যাগনার, কাইল জেমিসনরা। নিউ জিল্যান্ডের পেসারদের কাছ থেকে পাওয়া প্রশংসা, প্রেরণা ও নিজের নানা উপলব্ধির গল্প ক্রাইস্টচার্চ থেকে ফোনে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে শোনালেন বাংলাদেশের এই পেসার।

আরিফুল ইসলাম রনিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 13 Jan 2022, 06:16 AM
Updated : 13 Jan 2022, 06:16 AM

দুই টেস্টে দুইরকম অভিজ্ঞতা হলো। সিরিজ শেষে আপনার মনে কোন অনুভূতির খেলা বেশি, ভালো নাকি মন্দ?

ইবাদত হোসেন চৌধুরি: সত্যি বলতে, মনটা ভীষণ খারাপ। সবার এত আশা ছিল প্রথম টেস্টের পর আমরা ভালো করব। আমার কাছেও সবার প্রত্যাশা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। আমরা ভালো খেলতে পারিনি, আমিও ভালো বল করতে পারিনি।

প্রথম টেস্টের ভালোলাগা তো আছেই। ওটা আজীবনের একটা সঙ্গী। কিন্তু ক্রিকেট খেলায় একটা ম্যাচ নিয়ে বসে থাকলে তো চলে না। ধারাবাহিকতা ধরে রাখাই হলো আসল। সেটি পারিনি। চেষ্টা করেছি, আসলে বুঝতেই পারছিলাম না এখানে কী হলো।

তৃতীয় দিন খেলা শুরুর আগে দেখা গেল আপনি, তাসকিন, শরিফুল, শহিদুলরা কথা বলছেন টিম সাউদি, ট্রেন্ট বোল্ট, কাইল জেমিসনদের সঙ্গে। আপনাকে দেখা গেল সাউদির সঙ্গে অনে কথা বলতে। বোলিং খারাপ হওয়া নিয়েই কথা বলছিলেন?

ইবাদত: হ্যাঁ, বোলিং নিয়েই। আমরা আসলে পিক করতে পারছিলাম না, ক্রাইস্টচার্চের উইকেটে কোন লেংথ ভালো। সাউদি বললেন, ‘মাউন্ট মঙ্গানুইয়ের উইকেট অনেকটা বাংলাদেশ বা উপমহাদেশের মতোই। সেখানে তোমাদের লেংথ খুব ভালো ছিল। ওই উইকেটের জন্য আদর্শ লেংথ। কিন্তু ক্রাইস্টচার্চে আরও সামনে রাখতে হয় বল। আমরা এখানে বল স্রেফ ভাসিয়ে দেই। বাতাসে সুইং করে, পিচ থেকেও মুভমেন্ট পাওয়া যায়। কিন্তু তোমরা উইকেটে হিট করেছো। আমাদের ব্যাটসম্যানরা এখানকার উইকেট জানে, বাউন্স ট্রাস্ট করে। ওরা তাই তোমাদের বল ছেড়ে দিয়েছে বা মেরেছে।’

কাইল জেমিসন পরামর্শ দিচ্ছেন তাসকিন আহমেদকে। ছবি: টিভি থেকে।

অভ্যস্ততার ব্যাপারে সাউদি বলেছেন যে, বাংলাদেশের উইকেটে খেলে এসে ক্রাইস্টচার্চের উইকেটে মানিয়ে নেওয়া সহজ নয়। ব্যাটসম্যানদের চ্যালেঞ্জের কথাই বলে সবাই, কিন্তু বোলারদের কাজটাও কঠিন। সাউদি নিজেই বললেন, উপমহাদেশে এসে তারাও সমস্যায় পড়েন। কারণ তাদের সহজাত লেংথ হলো ফুল লেংথ। কিন্তু উপমহাদেশে সেটা করলে বল সুন্দর ব্যাটে আসে, অনেক রান গুনতে হয়।

এই ব্যাপারগুলো নিয়েই কথা হলো।

ভিডিও দেখে মনে হলো, তিনি সম্ভবত আপনাকে রিস্ট পজিশন নিয়ে কিছু দেখাচ্ছিলেন!

ইবাদত: রিস্ট পজিশন নিয়েও কথা হয়েছে। মূলত এই কারণেই তার সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ ছিল আমার। সাউদির অ্যাকশন অনেক স্মুথ, রিস্ট পজিশন, রিলিজ, এসব খুবই সুন্দর। আমি কিছু ব্যাপারে জানতে চেয়েছি। উনি আন্তরিকভাবে দেখিয়েছেন।

উনি নিজে থেকেই বলেছেন যে আমার রিস্ট পজিশন ও রিলিজ এমনিতে ভালো আছে। শুধু উইকেট বুঝে বল করার কথা বললেন বারবার। কোন উইকেটে কোন লেংথে বল করতে হবে। উইকেট আর কন্ডিশন বুঝে বল করলে আমরা আরও ভালো করব, এটা বললেন জোর দিয়ে।

সাউদি জানতে চাইলেন যে বাংলাদেশের পরের টেস্ট কোথায়। আমি বললাম যে দক্ষিণ আফ্রিকায়। তখন তিনি আবার বললেন যে, দক্ষিণ আফ্রিকার উইকেটে পেসারদের যে সহায়তা থাকে, সেটা কাজে লাগতে হলেও লেংথটা পিক করা জরুরি। তার পরামর্শ হলো, দক্ষিণ আফ্রিকায় যাওয়ার আগে আমরা যেন লেংথ পিক করার প্রস্তুতি নিয়ে যাই। বাংলাদেশে যদি এরকম কোনো উইকেট থাকে অথবা যতটা সম্ভব কাছাকাছি উইকেট তৈরি করে যেন প্র্যাকটিস করি।

সাউদিরা তাহলে আন্তরিকভাবেই সময় দিয়েছেন আপনাদের!

ইবাদত: ওরা যে ভাই কী ভালো, বিশ্বাস করতে পারবেন না। এত বড় বোলার ওরা, তিনশ করে উইকেট বোল্ট-সাউদির, ওয়্যাগনার এমন ভয়ঙ্কর বোলার, কিন্তু মাঠের বাইরে ওরা অসম্ভব ভালো আর বিনয়ী। আমাদের সবাইকে যে সম্মান ওরা দিয়েছে, বলে বোঝানোর নয়।

কয়েকটা ঘটনা বলি। ক্রাইস্টচার্চে প্রথম দিনে আমাদের বোলিং একদম ভালো হয়নি। ১ উইকেটে ৩৪৯ রান ওদের। আমার মন খুব খারাপ ছিল। দ্বিতীয় দিন সকালে মন খারাপ নিয়ে ওয়ার্ম আপ করছিলাম। নিউ জিল্যান্ড দলও ছিল এক পাশে। হঠাৎ ট্রেন্ট বোল্ট এসে আমাকে বললেন, “কাল যা হয়ে গেছে, সেটা অতীত। আজকে নতুন দিন, নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ো।”

নিউ জিল্যান্ড সফরের সাফল্যের পর সামনে আরও ভালো করতে চান ইবাদত। ছবি: বিসিবি।

আমি অবাকও হলাম, ভালোও লাগল। তার এক কথায় মনটা ভালো হয়ে গেল। তার দলের বিপক্ষে খেলা, সেদিনও বল করব তাদের ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে। তারপরও তিনি এসে উৎসাহ দিয়ে গেলেন, বললেন যেন ভালো বোলিং করি। ওরা এতটাই ভালো।

মাউন্ট মঙ্গানুই টেস্টের সময় বোল্ট আমাকে বললেন, “তোমার তো দারুণ রিভার্স হচ্ছে। আমাকে রিভার্স শেখাবে?” আমি তো লজ্জা পেয়ে গেলাম। বললাম, “তুমি বিশ্বের সেরা পেসারদের একজন। তুমি, সাউদি, তোমরা এসবের মাস্টার। আমি শিখতে চাই তোমাদের কাছ থেকে।” বোল্ট হেসে বললেন, “তুমি খুব ভালো বোলিং করছো। আমাদের ব্যাটসম্যানরা খেলতে পারছে না।”

ওয়্যাগনার তো ম্যাচ শেষে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “ম্যান অব দা ম্যাচ তোমার প্রাপ্য। যোগ্য হিসেবেই পেয়েছো। আমাদের ব্যাটসম্যানদের অনেক সমস্যা হয়েছে তোমাকে খেলতে। তোমার বোলিং উপভোগ করেছি আমরা।”

ক্রাইস্টচার্চের বোলিং নিয়ে যখন হতাশ আমরা, সাউদি তখন বললেন, “তোমাদের হতাশ হওয়ার কারণ নেই। তোমাদের বডি ম্যাকানিজম এরকম হয়ে গেছে যে দেশের মতো লেংথে বল করবে। চাইলেও অনেক সময় লেংথ বদলানো যায় না, কারণ ব্যাক অব দা মাইন্ডেই থাকে লেংথ একটু পেছনে রাখা। আমরা যেমন উপমহাদেশে গেলে ঠিকঠাক করতে পারি না অনেক সময়।”

ওয়্যাগনারের একটা কথা আমার খুব ভালো লেগেছে। তারা যখন আমাদের খুব প্রশংসা করছেন, আমি বললাম যে, “তোমরা এত বড় বড় বোলার, আমরা তো তেমন কিছু না…।” তখন ওয়্যাগনার বললেন, “আমরা জানি যে তোমাদের এই পারফরম্যান্সের পেছনে অনেক কষ্ট, অনেক পরিশ্রম আছে। এমনি এমনি এসব হয়নি, রাতারাতি হয়নি। ফাস্ট বোলারদের ব্যাপারটা ফাস্ট বোলাররাই ভালো বোঝে। অনেক কষ্ট করতে হয় আমাদের। বাংলাদেশের কন্ডিশনে থেকে তোমাদের কাজ কতটা কঠিন, আমরা তা বুঝি।”

সাউদির সঙ্গে কথা শেষে বলেছিলাম যে, “ভবিষ্যতে যদি কোনো পরামর্শের জন্য তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই, সম্ভব সেটা?” তিনি বললেন, “অবশ্যই, আমার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর দিচ্ছি তোমাকে। যে কোনো প্রয়োজনে নক করো, আমি চেষ্টা করব হেল্প করতে।”

শুধু এসবই নয়, সিরিজে অনেকবারই ওয়্যাগনার-বোল্টরা আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, পিঠ চাপড়ে দিয়েছেন, অনেক প্রশংসা করেছেন। ভদ্রতার খাতিরে হাই-হ্যালো নয়, আন্তরিকভাবেই কথা বলেছেন অনেক।

নিউ জিল্যান্ড সফরে শেষটা ভালো হলো না, কিন্তু প্রথম টেস্টে যা হয়েছে, এর চেয়ে ভালো কিছু তো আর হয় না!

ইবাদত: এটা তো ভোলার মতো নয়। ম্যাচের ফল তো স্মরণীয় অবশ্যই, কিন্তু আমরা যেভাবে খেলেছি, দলের পরিবেশ যা ছিল, এসব কারণেই বেশি মনে রাখার মতো। সবাই অনেক উজ্জীবিত ছিলাম আমরা, কিছু একটা করতে মরিয়া ছিলাম। সুজন ভাই (টিম ডিরেক্টর খালেদ মাহমুদ) সবাইকে এত মোটিভেট করেছেন, সত্যি বলতে অন্যরকম একটা ব্যাপার চলে এসেছিল দলে।

শুধু আমার পারফরম্যান্সের কারণেই নয়, সব দিক থেকেই ম্যাচটি অসাধারণ ছিল। দলের পরিবেশই এরকম ছিল যে আপনাকে বল দিলে আপনিও ১০ উইকেট নিয়ে নিতেন। এতটাই উজ্জীবিত ছিল সবাই।

দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজের জন্য যেভাবে প্রস্তুতি নিতে বললেন সাউদি, সেটা কি সম্ভব?

ইবাদত: উইকেটের ব্যাপারে তো কিছু করার নেই। এরকম উইকেট আমাদের দেশে কোথায় পাব! সাউদি অবশ্য বলেছেন, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো বাউন্সি, ক্রাইস্টচার্চের মতো সবুজ, এরকম কিছু উইকেট বাংলাদেশে থাকা দরকার, অন্তত পেসারদের প্র্যাকটিস করার জন্য হলেও।

সাউদির পরামর্শ অনুযায়ী লেংথ ঠিক করা নিয়ে আমি ভাবতে শুরু করেছি। আমাদের কম্পিউটার অ্যানালিস্টের সঙ্গে কথা বলেছি। উনি দক্ষিণ আফ্রিকার বিস্তারিত সবকিছু বুঝিয়ে দিয়েছেন আমাকে। আমার বোলিংয়ের কিছু দিকও তুলে ধরেছেন, দক্ষিণ আফ্রিকার কন্ডিশনের প্রেক্ষাপটে কেমন করা উচিত। আমি নোট নিয়ে রেখেছি। দেশে ফিরে বিপিএল আছে। এর ফাঁকে এবং বিপিএল শেষে সেসব নিয়ে কাজ করব।

মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে আপনার পারফরম্যান্সটাও তো প্রেরণা হয়ে থাকবে? আপনার টেস্ট রেকর্ড খুব বাজে ছিল। প্রশ্ন উঠছিল অনেক। এখন অন্তত টেস্ট ক্রিকেটে পায়ের নিচে জমিন খুঁজে পেলেন!

ইবাদত: তা তো অবশ্যই। যেহেতু ভালো করতে পারছিলাম না, একটা চাপ ছিল। ভালো করার তাগিদ ছিল। এবার নিউ জিল্যান্ড যাওয়ার আগে অনেক কাজ করেছি। জাতীয় লিগের সময় নাজমুল ভাইয়ের (সাবেক জাতীয় পেসার ও এখনকার কোচ নাজমুল হোসেন) সঙ্গে কাজ করেছি। উনি অনেক উৎসাহ দিয়েছেন। তালহা ভাই ((সাবেক জাতীয় পেসার ও এখনকার কোচ তালহা জুবায়ের) অনেক পরামর্শ দিয়েছেন। আমাদের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের সঙ্গে ওয়েস্ট ইন্ডিজে আছেন উনি এখন, সেখান থেকে ফোন করে বলেছেন যে উনারা সবাই খুব খুশি আমার বোলিং দেখে। 

আমি সবার এই খুশিটা ধরে রাখতে চাই। আরও অনেক ভালো করতে চাই। আরও বেশি কষ্ট করতে চাই। প্রক্রিয়াটা ঠিক রাখতে চাই। সাফল্য তো আমার হাতে নাই। তবে নিজের কাজের জায়গায় কোনো ঘাটতি রাখতে চাই না।

শিখতে চাই আরও অনেক। জাতীয় দলে অনেক দিন ধরে থাকলেও ম্যাচ তো বেশি খেলিনি। সাউদির সঙ্গে কথা হচ্ছিল যখন, তখন বললাম যে “আমার টেস্ট অভিষেক কিন্তু নিউ জিল্যান্ডেই। তুমিও খেলেছিলে ওই ম্যাচে।” তিনি বললেন, “হ্যাঁ, হ্যামিল্টনে। মনে আছে।” আমি বললাম, “এই প্রায় তিন বছরে ১০টি টেস্ট খেলতে পেরেছি।”

সাউদি বললেন, “আমি ৮৩ টেস্ট খেলেছি, এখনো শিখছি। তোমাদের সামনে অনেক সময় আছে। যত খেলবে, তত শিখবে।”

সাউদির এই কথা আমার মনে প্রবল প্রভাব ফেলেছে। ১৪ বছর ধরে টেস্ট খেলার পর উনি এই কথা বলছেন। আমাদের তো তাহলে কত কিছু শেখার বাকি!

ক্রাইস্টচার্চে খারাপ করায় আত্মবিশ্বাসে ধাক্কা লেগেছিল। সাউদির কথায় নতুন উদ্যম পেয়েছি। আমরা যদি কষ্ট করি, শিখতে পারি, ভালো করতে পারি, তাহলে নিজেদের যেমন লাভ, আরও বেশি লাভ দেশের ক্রিকেটের। দেশকে আমরা তা দিতে চাই।

সবাই আমাদের পাশে থাকবেন, উৎসাহ দেবেন, আমরা অবশ্যই পারব আরও ভালো কিছু করতে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক