তাইজুলের সাত সুরে বাঁধা পাকিস্তান

আপনার হয়তো মনে নেই, সবশেষ টেস্টেই ৫ উইকেট আছে তাইজুল ইসলামের। কারণ, আপনার হয়তো মনেই নেই, সবশেষ টেস্ট তিনি কবে খেলেছেন! তাইজুলদের তাই ম্যাচপ্রতি পারফরম্যান্স দিয়েই জানান দিতে হয় নিজেদের উপস্থিতি। যেমন তিনি জানালেন আরেকবার।

আরিফুল ইসলাম রনিচট্টগ্রাম থেকে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 28 Nov 2021, 11:09 AM
Updated : 28 Nov 2021, 04:02 PM

পাকিস্তানের বিপক্ষে চট্টগ্রাম টেস্টে বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর নায়ক তাইজুল ইসলাম। টেস্টের তৃতীয় দিনে তার শিকার ১১৬ রানে ৭ উইকেট।

পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের সেরা বোলিংয়ের রেকর্ড এটি।

বাংলাদেশের হয়ে একাধিকবার ইনিংসে ৭ বা তার বেশি উইকেট নেওয়ার প্রথম কীর্তিও গড়লেন তিনিই। ২০১৪ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে মিরপুরে নিয়েছিলেন ৩৯ রানে ৮ উইকেট। টেস্টে বাংলাদেশের সেরা বোলিংয়ের রেকর্ড যেটি।

নিজের সবশেষ টেস্টে তার ছিল ৭২ রানে ৫ উইকেট। তবে সেই ম্যাচটি ছিল গত এপ্রিল-মে মাসে, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে পাল্লেকেলেতে!

পরের প্রায় সাত মাসে আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আর দেখা যায়নি তাকে। বাংলাদেশের ক্রিকেটে অনেক দিন ধরেই তার পরিচয় টেস্ট স্পেশালিস্ট। তবে দেশের বাইরের টেস্টে আবার তিনি নিয়মিত নন। জুলাইয়ে জিম্বাবুয়ে সফরে একটি টেস্ট খেলে বাংলাদেশ। সফরে গেলেও ওই ম্যাচে তার জায়গা হয়নি একাদশে।

দেশে ফিরে অগাস্টে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ও সেপ্টেম্বরে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজেও স্কোয়াডে ছিলেন তিনি। তবে দুটিই টি-টোয়েন্টি সিরিজে। স্কোয়াডে রাখা হলেও টেস্ট স্পেশালিস্টকে খেলানো হয়নি একাদশে।

বাংলাদেশ টেস্ট ম্যাচই খেলে কম। দেশের মাঠে আরও কম। ম্যাচ খেলার জন্য তাই চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করতে হয় তাইজুলকে। পারফরম্যান্সে মেলে ধরার তাগিদও হয়তো বেশি থাকে।

পাকিস্তানের ব্যাটসম্যানরা ঐতিহ্যগতভাবেই স্পিন ভালো খেলে। তাদেরকে ভুগিয়ে প্রায় একার হাতে বাংলাদেশকে লিড এনে দিলেন তাইজুল।

২০১৬ সালে দুবাইয়ে ৪৯ রানে ৮ উইকেট নিয়েছিলেন ক্যারিবিয়ান লেগ স্পিনার দেবেন্দ্র বিশু। এরপর এই প্রথম পাকিস্তানের বিপক্ষে ইনিংসে ৭ উইকেট নিতে পারলেন কোনো বোলার।

বাঁহাতি স্পিনের সামনে পাকিস্তানি ব্যাটিং এতটা নাকাল হয়েছে সবশেষ ২০১৪ সালে। বাংলাদেশের সদ্য বিদায়ী বোলিং কোচ রঙ্গনা হেরাথ সেবার নিয়েছিলেন ১২৭ রানে ৯ উইকেট।

গত বছর তার সময় কেটেছে বোলিং অ্যাকশন নিয়ে পরীক্ষা-নিরিক্ষা করে। সীমিত ওভারের ক্রিকেটে কার্যকারিতা বাড়াতে সেই সময়ের স্পিন পরামর্শক ড্যানিয়েল ভেটোরির পরামর্শে অ্যাকশন বদলে ফেলেন তাইজুল। সেই অ্যাকশনে অনেক অনুশীলনের পর স্বস্তি পাননি। গত বছরের নভেম্বরে আরেক দফায় পরিবর্তন আনেন অ্যাকশনে। নতুন অ্যাকশন নিয়ে গবেষণা চলে তার পরীক্ষাগারে। সেটিও কার্যকর হয়নি। পরে তিনি ফিরে যান আগের সহজাত অ্যাকশনে।

তাতে ফিরে পান নিজেকেও। এই টেস্ট বা শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওই টেস্টের আগে গত ফেব্রুয়ারিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মিরপুর টেস্টের দুই ইনিংসে নিয়েছিলেন ৪টি করে উইকেট। সব মিলিয়ে এ বছর ৫ টেস্টে ২৭ উইকেট হয়ে গেল তার।

শুধু উইকেট সংখ্যাই নয়, চট্টগ্রামে শনিবার প্রথম সেশনে যে বোলিং উপহার দেন তাইজুল, অনেক দিনের মধ্যে সম্ভবত তা শুধু তার নিজেরই নয়, বাংলাদেশের কোনো বোলারের সেরা বোলিং।

দিনের প্রথম ওভারেই নেন দুটি উইকেট। একদম শুরু থেকেই ফ্লাইটের চাতুর্য, ক্রিজের কার্যকর ব্যবহার আর দারুণ গতি-বৈচিত্র দিয়ে বিভ্রান্ত করতে থাকেন পাকিস্তানি ব্যাটসম্যানদের। ধ্রুপদি বাঁহাতি স্পিনের সুনিপুন প্রদর্শনী মেলে ধরেন তিনি।

এভাবেই তাইজুল নিজের কাজ বেশির ভাগ সময় করে যান ঠিকঠাক। বেশির ভাগ সময় আড়াল থেকেই আলো ছড়ান। কখনও কখনও হয়ে ওঠেন ভাস্বর। এটি তেমনই একটি দিন, যেদিন তাইজুলই সবচেয়ে দ্যুতিময়।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক