‘দেশের মাঠে মুস্তাফিজ চ্যাম্পিয়ন, দেশের বাইরে উন্নতি প্রয়োজন’

অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানদের সম্প্রতি এরকম নাচিয়ে ছাড়লেন মুস্তাফিজুর রহমান। কিন্তু উইকেটে সহায়তা না পেলে তিনিও হয়ে ওঠেন অসহায়। দেশের বাইরে তার কার্যকারিতা, তার সুইং-ইয়র্কারে উন্নতি হবে কিভাবে? বাংলাদেশের পেস বোলিং কোচ ওটিস গিবসন দেখালেন সেই পথ। পাশাপাশি তাসকিন আহমেদ, শরিফুল ইসলামদের এগিয়ে চলা, অন্যান্য পেসারদের শক্তি-দুর্বলতা-সম্ভাবনা, বাংলাদেশের পেস বোলিং সংস্কৃতির বদল ও ভবিষ্যৎ ভাবনা, সব কিছু নিয়েই বাংলাদেশের পেস বোলিং কোচ একান্তে কথা বললেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে।

আরিফুল ইসলাম রনিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 13 August 2021, 01:23 PM
Updated : 14 August 2021, 08:17 AM

অস্ট্রেলিয়া সিরিজে মুস্তাফিজুর রহমান কতটা দুর্দান্ত বল করেছেন, এটা তো সবাই দেখেছেন। বোলিং কোচ হিসেবে আপনাকে কতটা তৃপ্তি দিয়েছে তার পারফরম্যান্স?

ওটিস গিবসন: আমি সত্যিই খুব খুশি তার বোলিং দেখে। কন্ডিশন ফিজের পক্ষে ছিল। সে তা পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে দুর্দান্ত বোলিং করেছে। এই কন্ডিশনের জন্য যেমনটি উপযুক্ত, একদম সেরকম বোলিং করেছে।

পিচ ছিল মন্থর, গ্রিপ করেছে। সে তাই সিম আপ বল তেমন একটা করেনি, সুইং করানোর চেষ্টা করেনি। কাটার খুব কার্যকরভাবে কাজে লাগিয়েছে। যেটা বললাম, কন্ডিশনের দাবি মিটিয়েছে নিখুঁতভাবে।

এরকম উইকেটে মুস্তাফিজ বরাবরই বিপজ্জনক। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ানরা যেভাবে চোখে সর্ষে ফুল দেখেছে, এটা কি তাদের ব্যাটিংয়ের দুর্বলতা নাকি উইকেটের কারণে?

গিবসন: দেখুন, ফিজ খুবই কুশলী ও দক্ষ বোলার। এসব উইকেটে তার বোলিং শিল্পীত ও মোহনীয়। তার কাটার এমনিতেই বোঝা কঠিন, কবজির ঝাঁকুনিতে ও বল ছাড়ার ধরনের কারণে ব্যাটসম্যান বিভ্রান্ত হয়। এবার উইকেটে বল গ্রিপ করেছে প্রচণ্ড, অনেক ডেলিভারি বাঁহাতি স্পিনারের মতো ঘুরেছে। শুধু অস্ট্রেলিয়া নয়, এরকম পিচে ওকে খেলতে যে কোনো দলই ভুগবে। অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানরাও ওকে এখানে খেলতে গেলে খেই হারাবে।

আপনারা তো জানতেন, উইকেট এরকম হবে। মুস্তাফিজের বোলিংয়ের এই পরিকল্পনা আগে থেকেই ছিল নাকি মাঠে নেমে তিনি নিজেই ঠিক করেছেন?

গিবসন: দুটি মিলিয়েই। আমরা জানতাম, এই সিরিজে তার বড় ভূমিকা থাকবে। এই কন্ডিশনে সে অনেক অভিজ্ঞ, এখানেই সবসময় খেলে এসেছে এবং জানে, এখানে কেমন বোলিং করতে হয়। উইকেট দেখেই সে দ্রুত নিজের করণীয় বুঝে নিয়েছে। বলে খুব বেশি গতি না দেওয়া, কাটার কাজে লাগানোর চেষ্টা করা… আপনি দেখেছেন, মিচেল স্টার্ক ও অস্ট্রেলিয়ার অন্যরা গতি দেওয়ার চেষ্টা করলেই তাদেরকে খেলা সহজ হয়ে উঠেছে। মুস্তাফিজ গতির চেষ্টাই করেনি।

দেশের বাইরে গেলেও ওকে এটা করতে হবে বেশি করে, কন্ডিশন ও উইকেট দ্রুত বুঝে উঠতে হবে। কোথায় কোন স্কিল বেশি কার্যকর, তা বুঝতে হবে। প্রতিটি কন্ডিশন ও উইকেটের প্রয়োজন বুঝে সেভাবেই বল করতে হবে।

এই প্রসঙ্গেই আসতাম। এ বছর নিউ জিল্যান্ড সফরে, গত বছর পাকিস্তান সফরে আমরা দেখেছি, ব্যাটিং সহায়ক উইকেটে কিংবা যেখানে বল গ্রিপ করে না, সেখানে মুস্তাফিজ ধুঁকেছেন অনেক। রান দিয়েছেন দেদার…

গিবসন: এটাই বলছিলাম, এসব জায়গায় উন্নতিই এখন তার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গত এক বছর ধরে সুইং বোলিংয়ে তার উন্নতির জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি আমরা। সে বল সুইং করানো শিখছে।

ইবাদতের পারফরম্যান্স ভালো না হলেও তাকে নিয়ে গিবসনের আশা অনেক।

বাংলাদেশের উইকেটে, বিশেষ করে মিরপুরে, টি-টোয়েন্টিতে, এমনকি ওয়ানডেতেও স্পিন দিয়ে বোলিং শুরু করা হয়। ফিজ বোলিংয়ে আসতে আসতে বল সুইং করানো অবস্থায় থাকে না বেশির ভাগ সময়। দেশের বাইরে গেলে তাকে নতুন বল হাতে নিতে হয়। সুইং করানোটা তাই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে উন্নতি জরুরি।

উন্নতিটা হতে পারে কিভাবে? বাংলাদেশে তো এরকম উইকেটেই খেলা হয় যে স্পিনাররা বেশি কার্যকর। ম্যাচে চেষ্টা না করে শুধু অনুশীলন করে কি সুইংয়ে উন্নতি সম্ভব?

গিবসন: আমরা অনুশীলনে সবসময় ওকে নতুন বলে বোলিং করাই। খেয়াল করলে দেখবেন, আগের চেয়ে বেশি সুইং সে করাতে পারে। ডানহাতি ব্যাটসম্যানের জন্য বল ভেতরে আনাও শিখেছে। আইপিএলে রাজস্থান রয়্যালসের হয়ে কিন্তু সে সুইং করিয়েছে দুই দিকেই। বাইরে নিয়েছে, ভেতরে এনেছে।

আইপিএল আমি মনে করি ফিজের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বাইরে বোলিংয়ের জন্য কঠিন উইকেটে বড় বড় ব্যাটসম্যানদের সামনে টানা খেলে সে সুইং ও অন্যান্য বৈচিত্র্যে উন্নতি করতে পারে। এছাড়াও জাতীয় দলের হয়ে যখন দেশের বাইরে খেলবে, নতুন বল নিয়মিত দিতে হবে তাকে। আর দেশে থাকার সময়টায় অনুশীলনে নতুন বল আর অন্যান্য স্কিল নিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে হবে।

সে বুদ্ধিমান ছেলে। জানে কিভাবে কাজ করতে হয়, কোন পথে এগোতে হয়। বাংলাদেশে সে চ্যাম্পিয়ন বোলার। বিশেষ করে মিরপুরে তার মতো কেউ নেই। দেশের বাইরে বোলিংয়ে তাকে আরও শিখতে হবে এবং দ্রুত মানিয়ে নিতে হবে।

এমন নয় যে সে এসব পারছে না। দেশের বাইরেও উন্নতি করছে। তবে আরেকটু দ্রুত করতে হবে।

ডানহাতি ব্যাটসম্যানের জন্য বল ভেতরে আনা ডেলিভারি অস্ট্রেলিয়া সিরিজে তাকে করতে দেখা যায়নি। হয়তো প্রয়োজন পড়েনি। তবে অনুশীলনে কাজ কতটা চলছে?

গিবসন: অবশ্যই চলছে, পর্দার আড়ালে অনেক কাজ হচ্ছে। অনেক ডেলিভারি, অনেক স্কিল নিয়েই কাজ চলছে। এখন তাকে মাঠে নেমে বুঝতে হবে, কোন উইকেটে সে কোন স্কিল কাজে লাগাবে। মিরপুরের উইকেটে বাউন্সের চেষ্টা করার মানেই নেই। আবার অনেক উইকেটে গেলে কাটার ধরবে না, সুইং মিলবে না। তাকে উইকেট দ্রুত পড়তে শিখতে হবে এবং সেভাবে বোলিং করতে হবে।

তাসকিনের সঙ্গে কাজ করা দারুণ উপভোগ করেন গিবসন।

একজন বোলারের অনেক স্কিল ও বৈচিত্র্য থাকতে পারে। মাঠে নেমে উইকেট বুঝে তাকেই ঠিক করতে হবে, কোন স্কিল এখানে কার্যকর হবে। ব্যাটসম্যান বুঝেও বল করতে হবে, সবার জন্য এক স্কিল সমান কার্যকর নয়।

তার ইয়র্কার নিয়েও হাহাকার ওঠে অনেক, একটা সময় দুর্দান্ত ইয়র্ক করতে পারতেন তিনি…

গিবসন: আমি আপনাকে নিশ্চিত করতে পারি, আগেও বলেছি, সবকিছুর অনুশীলন চলছে। ইয়র্কার, নতুন বলে সুইং, বল ভেতরে আনা, এমনকি বাউন্সার, অনেক কাজ চলছে।

ব্যাপারটি হলো, কন্ডিশন ও উইকেট বুঝে বল করা। কোথায় কোনটি দরকার। অস্ট্রেলিয়া সিরিজে ইয়র্কার প্রয়োজন হয়নি, সে চেষ্টা করেনি। আশা করি, সামনে দেখতে পাবেন।

শরিফুল ইসলামও এই সিরিজে দারুণ বোলিং করেছেন। তরুণ এই পেসার বেশ কয়েক মাস ধরেই দলের সঙ্গে আছেন, খেলছেন। তাকে কেমন দেখছেন?

গিবসন: শরিফুল খুব দ্রুত উন্নতি করছে। তার সবচেয়ে ভালো ব্যাপার হলো, খুব দ্রুত শিখছে সে। আমি তো বটেই, কোচ ও অধিনায়করা তাকে খুব উঁচু মানের মনে করেন। তাকে নিয়ে আমাদের সবারই অনেক আশা।

ভালো ব্যাপার হলো যে সে সুযোগগুলো লুফে নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শুরুটা ভালো হয়েছে। এতে সে আত্মবিশ্বাসী হবে, চাপ অনুভব করবে না এবং দলও তার ওপর ভরসা করতে পারবে।

ফিটনেস আরও ভালো হলে, শরীর পোক্ত হলে কি শরিফুল আরও দ্রুতগতিতে বল করতে পারবেন? বয়সভিত্তিক পর্যায়ে বেশ গতিময় ছিলেন তিনি…

গিবসন: হ্যাঁ, অবশ্যই পারে। সেই উপাদান তার ভেতরে আছে। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, গতি পেতে গিয়ে সে অন্য কিছু হারিয়ে ফেলতে পারে। এখনও তার বয়স কম, অনভিজ্ঞ, অনেকটাই নতুন। জোর করে কিছু করা যাবে না। ওর সহজাত গতির মধ্যে রেখেই স্কিলে উন্নতির চেষ্টা করতে হবে।

বাংলাদেশে পেস বোলিংয়ের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখছেন বোলিং কোচ গিবসন।

এমনিতেই ওর স্কিল বেশ ভালো। খুবই আত্মবিশ্বাসী এক তরুণ সে এবং বেশ আগ্রাসী। তাড়াহুড়োর কিছু নেই। সময়ের সঙ্গে ওর গতি এমনিতেই বাড়বে। আমাদের স্রেফ মাথায় রাখতে হবে, সে বাচ্চা ছেলে। অনেক সময় সামনে পড়ে আছে।

এর মধ্যেই তিনি তিন সংস্করণে খেলে ফেলেছেন। তার শরীরের ওপর চাপ না দেওয়া, বেছে বেছে খেলানো, এসব কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

গিবসন: তা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সেই ভাবনা টিম ম্যানেজন্টের আছে বলেই মনে করি। যেটা বললাম, আমরা তাকে কোনোরকম চাপই দিচ্ছি না। তাকে নিজের মতো থাকতে দিয়েই চেষ্টা করছি উন্নতির।

অল্প সময়ের মধ্যে সে সত্যিই ভালো করেছে, দ্রুত উন্নতি করছে এবং আমার মতে, বাংলাদেশের জন্য দারুণ সম্ভাবনাময় এক পেসার সে।

মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিন শেষ ম্যাচে সুযোগ পেয়ে ভালো পারফর্ম করেছেন। কিন্তু তার আগে জিম্বাবুয়েতে একদমই নির্বিষ ছিলেন দুই সংস্করণে। দেশের বাইরে তার স্কিলের ঘাটতি আছে বলেও মনে হয়েছে, প্রচুর রান গুনেছেন। তার বোলিংয়ের কোন দিকগুলো নিয়ে আপনাদের কাজ চলছে?

গিবসন: কখনও কখনও সাইফের মতো একজন আসলে…প্রকৃষ্ট উদাহরণ। দেশের কন্ডিশনের জন্য খুব ভালো বোলার সে, এখানকার জন্য স্কিল সেটও আছে। কিন্তু দেশের বাইরে…সে একটু বেশিই অনুমেয় মাঝেমধ্যে। এখানকার স্কিল ও দেশের বাইরের স্কিল একরকম কার্যকর হবে না।

ফিজের মতো তাকেও দেশের বাইরে কন্ডিশন ও উইকেট দ্রুত পড়তে শিখতে হবে। কখনও কখনও এটা সে করতে পারছে না।

তবে সে পরিশ্রমী। কাজ করতে ইচ্ছুক। দেশের উইকেটে যথেষ্ট কার্যকর। আমরা তার সঙ্গে কাজ করে যাব আরও ভালো হয়ে উঠতে।

তার গতির ঘাটতি কি এখানে বড় বাধা?

গিবসন: পেস থাকলে তো ভালো। তবে সবসময় সেটা জরুরি নয়। অনেকের ক্ষেত্রে পেস না থাকাই শক্তি। তার মূল শক্তি হতে পারে নিশানা। যেহেতু পেস অত বেশি নয়, তার নিশানা ও অন্যান্য স্কিল গুরুত্বপূর্ণ হবে।

সবাই ৯০ মাইল গতিতে বল করবে না। প্রত্যেকেই যখন নিজের চূড়ান্ত গতি বুঝতে পারবে, এরপর সেটিকে ভিত্তি ধরে ধারাবাহিকতা ও অন্যান্য স্কিল রপ্ত করতে হবে। সাইফকেও সেটা বুঝতে হবে।

তাসকিন আহমেদ অস্ট্রেলিয়া সিরিজে সুযোগ পাননি হয়তো কন্ডিশনের কারণে। এর আগে শ্রীলঙ্কায় ও জিম্বাবুয়েতে যেমন বোলিং করেছেন তিনি, এই তাসকিনকে কেমন দেখছেন?

গিবসন: অসাধারণ একটা বছর কাটাচ্ছে সে। দুর্দান্ত বোলিং করে চলেছে। বিশেষ করে টেস্ট ক্রিকেটে।

তাসকিন এখন নিজের খেলা নিয়ে অনেক খাটে। সবসময় কিছু শিখতে চায়। উন্নতি করার তাগিদটা চোখে পড়ে স্পষ্ট। সে সবসময়ই বলে যে আগের চেয়ে ভালো করতে চায়। সত্যি কথা বলতে, তার সঙ্গে কাজ করা এখন দারুণ আনন্দময়। কারণ পরিশ্রমে তার কমতি নেই এখন। মাঠের বাইরে, জিমে এবং অনুশীলনে অনেক কাজ করছে সে।

আপনার কি মনে হয়, টেস্ট থেকে সে সীমিত ওভারে খেলতে নামছে, দুই সংস্করণের লেংথে মানিয়ে নিতে একটু সময় লাগছে তার?

গিবসন: হতে পারে। দেখুন, খেলাটা এখন দিন দিন যে জায়গায় যাচ্ছে, সব সংস্করণে সফল হতে হলে অনেক অনেক বেশি স্কিলফুল হতে হবে। স্টক বল তো অবশ্যই শক্তির জায়গা, পাশাপাশি বৈচিত্র্য থাকতে হবে অনেক।

বিশেষ করে, খুব ভালো ইয়র্কার সবার থাকা জরুরি। বিশ্বজুড়ে সেরা সব বোলারের ইয়র্কার খুব ভালো এখন। এছাড়া স্লোয়ার বল, বিভিন্ন ধরনের স্লোয়ার…আমরা চেষ্টা করছি তাসকিনের এবং অন্য বোলারদেরও এই জায়গাগুলো নিয়ে কাজ করার। এগুলো সবই একটা প্রক্রিয়া। আশা করি, সামনের মাসগুলায় আস্তে আস্তে আমাদের কাজের ফল আমরা দেখতে পাব।

আপনি নিজে ও কোচিং স্টাফের অন্যরা ইবাদত হোসেনকে উচ্চাশার কথা বলেছেন অনেকবার। কখনও কখনও, কিছু স্পেলে তিনি ভালো করেছেনও। তবে তা কি যথেষ্ট? ৮ টেস্টে তার উইকেট ৮টি, গড় ৯১.৫০। দেশের বাইরেই খেলেছেন ৭ টেস্ট, তারপরও পারফরম্যান্স কি আশা জাগানিয়া?

গিবসন: আমি সত্যি বলতে, তার বোলিং পছন্দ করি। সে কিন্তু খুব অভিজ্ঞ নয় এখনও। যদিও অনেক দিন ধরেই আছে দলের সঙ্গে, তবে খুব বেশি খেলেনি।

বাংলাদেশের মতো জায়গায়, ফাস্ট বোলারের কাজটা সহজ নয়। এমনকি ঘরোয়া ক্রিকেটেও ফাস্ট বোলাররা খুব বেশি বোলিং পায় না। ঘরোয়া ক্রিকেটে বা দেশের মাঠে আমরা এক পেসার নিয়ে বা কোনো পেসার ছাড়াও খেলি। অথচ দল দেশের বাইরে গেলেই আমরা প্রত্যাশা করি, ওই ফাস্ট বোলাররা দলকে জেতাবে। ৫ উইকেট নেবে। এভাবে কাজ হয় না আসলে।

ঘরোয়া ক্রিকেটে যদি কেউ না জানে যে কিভাবে লম্বা স্পেলে বোলিং করতে হয়, চাপ সৃষ্টি করতে হয় বা উইকেট কিভাবে নিতে হয়, তাহলে দেশের বাইরে গিয়ে সে কিভাবে পারবে? তা কন্ডিশন যতই সহায়ক হোক।

ইবাদত বেশ ফিট, শক্তিশালী। ১৪০ কিলোমিটার গতিতে বল করে নিয়মিত। তার নিশানা সবসময় ভালো নয়। তবে এটা নিয়ে কাজ করছে। প্রতি ম্যাচেই তার উন্নতি হচ্ছে।

আমি মনে করি, টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের হয়ে অনেক বড় ভূমিকা রাখবে সে। শুধু টেস্ট নয়, আমার মনে হয় খুব ভালো ওয়ানডে বোলারও হয়ে উঠতে পারে সে।

আবু জায়েদ চৌধুরি কিন্তু যখনই সুযোগ পান, বেশির ভাগ সময় ভালোই করেন। তার পরও কিছু টেস্টে তাকে বাইরে থাকতে হয়েছে। তিনি কি এক্ষেত্রে দুর্ভাগা নন?

গিবসন: আসলে…সত্যি বলতে…নিশ্চিত নই, ব্যাপারটি হলো, কন্ডিশন ও উইকেট দেখে কোচ-অধিনায়ক সিদ্ধান্ত নেন একাদশের। একটা ব্যাপার হলো, বাংলাদেশের এখন সৌভাগ্য, একগাদা ভালো পেসার আছে, যা আগে ছিল না। ইবাদত ১৪০ কিলোমিটার গতিতে বল করতে পারে, তাসকিন পারে, শরিফুল উঠে আসছে, হাসান মাহমুদও বেশ গতিময়। রাহি (আবু জায়েদ) সুইং করাতে পারে…।

দেশের বাইরে গেলে, অধিনায়ক যদি বাড়তি গতিময় বোলার চান বা অন্য ধরনের, বেশ বিকল্প আছে এখন। রাহি কয়েকটা টেস্টে খেলতে পারেনি। তবে সে নিশ্চিতভাবেই দারুণ বোলার। টেস্টে ওকে আমাদের অবশ্যই প্রয়োজন আছে।

হ্যাঁ, কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাকে দুর্ভাগা বলা যায় যে, তার বদলে একটু গতিময় পেসারকে বেছে নিয়েছেন কোচ ও অধিনায়ক। তবে এটায় রাহির দায় নেই। ক্রিকেট এরকমই, পরিস্থিতি অনুযায়ী একেকজনকে প্রয়োজন পড়ে। রাহির অবশ্যই প্রক্রিয়া ধরে রেখে কাজ করে যেতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে, যেন পরের সুযোগটা এলেই লুফে নিতে পারে।

সামনে তাকালে, আগামী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানের কন্ডিশনে বাংলাদেশের পেস আক্রমণ কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন?

গিবসন: কোচ, অধিনায়ক ও নির্বাচকরা ঠিক করবেন, কোন পেসারদের নিয়ে বিশ্বকাপে যাওয়া হবে। আমাদের টি-টোয়েন্টি দলে সাকিব, মেহেদি, এখন নাসুম, ওরা দারুণ বোলিং করছে এবং সন্দেহ নেই যে, আরব আমিরাতেও স্পিনারদের ভূমিকা থাকবে মুখ্য। পেসারদের ভূমিকা যা দেওয়া হবে দল থেকে, অধিনায়ক যা চাইবে, আশা করি তারা তা পূরণ করতে পারবে।

আমার কাজ পেসারদের প্রস্তুত করা। সব কন্ডিশন, সব সংস্করণের জন্য পেসারদের তৈরি করার চেষ্টা করছি আমরা। কোচ ও অধিনায়ক ঠিক করবেন, কোন পেসারকে কখন, কোথায়, কিভাবে কাজে লাগবেন।

এই যে এরকম পেস প্রতিকূল কন্ডিশনে খেলতে হচ্ছে, পেসারদের নিয়ে এত কাজ করছেন, কিন্তু পর্যাপ্ত সুযোগ মিলছে না, বাংলাদেশের পেস বোলিং কোচ হওয়াটা কি কখনও কখনও একটু হতাশার?

গিবসন: ওভাবে ভাবলে তো চলবে না। এটা স্রেফ বাস্তবতা… মেনে নিয়েই কাজ করতে হয়। অবশ্যই খুব আদর্শ কিছু নয়। কিন্তু এভাবেই এগিয়ে যেতে হবে।

হতাশার কিছু তাই নেই। পেসারদেরও আমি এটাই বলি যে, কারও সামনে যদি একটি সুযোগও আসে, সেই একটিই কাজে লাগাতে হবে। শারীরিক ও মানসিকভাবে ফিট থেকে, সুযোগের অপেক্ষায় থাকবে হবে।

নানা সময়ে আপনি বলেছেন, প্রধান কোচও বলেছেন যে বাংলাদেশের পেস বোলিং সংস্কৃতি বদলে দিতে চান আপনারা। সেটা কতটা পারলেন এখনও পর্যন্ত?

গিবসন: টেস্ট ক্রিকেটে কিছুটা পেরেছি বলে মনে হয়। কিছুটা নমুনা আমরা দেখেছি। শ্রীলঙ্কায় আমরা তিন পেসার খেলিয়েছি। জিম্বাবুয়েতে দুই পেসার হলেও গতিময় দুজনকে দেখেছি, তাসকিন ও ইবাদতই ছিল ম্যাচের সবচেয়ে গতিময় দুই বোলার এবং আগ্রাসী বোলিং করেছে। নিউ জিল্যান্ড সফরে গতির দিক থেকে তাসকিন ছিল নিউ জিল্যান্ডের সবচেয়ে দ্রুতগতির বোলারের সমান্তরালে।

আমরা ফাস্ট বোলারদের আরও আগ্রাসী করে তোলা ও মানসিকতা ভালো করার চেষ্টা করছি। একটা সময় বাংলাদেশে ফাস্ট বোলারদের কাজ ছিল কয়েক ওভার বোলিং করে স্রেফ বলটা পুরনো করে স্পিনারদের উপযোগী করে দেওয়া। আমরা সেখানে বদল আনার চেষ্টা করে যাচ্ছি। অধিনায়ক যেন উইকেট শিকারি হিসেবেই পেসারদের দেখতে পারে এবং পেসাররা যেন সেই ভরসা অর্জন করতে পারে।

সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের ভবিষ্যৎ কেমন দেখছেন?

গিবসন: এই মুহূর্তে আমাদের পেস বোলারদের দিকে যদি দেখেন, তাসকিন-মুস্তাফিজ-শরিফুল-ইবাদত-সাইফ-রাহি… হাসান মাহমুদ এখন ইনজুরিতে থাকলেও অনেক সম্ভাবনাময়… তরুণ আরও অনেক পেসার উঠে আসছে।

এই ছেলেরা নানা সময় দেখাচ্ছে, তাদেরকে সুযোগ দিলে তারা পার্থক্য গড়তে পারে। কেবল পাশে থাকতে হবে তাদের।

আমি মনে করি, ওরা বাংলাদেশের ক্রিকেটকে এগিয়ে নেওয়ায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে। শুধু দেশের বাইরেই নয়, দেশেও অবদান রাখতে পারে। ওদের ওপর সেই আস্থা রাখতে হবে। আমি ওদের সঙ্গে কাজ খুবই উপভোগ করছি।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক