‘কালু’ নামে ডেকে এখনও স্যামির ‘ভাই’

সানরাইজার্স হায়দরাবাদে ড্যারেন স্যামিকে ‘কালু’ নামে ডাকতেন, এমন একজন ক্রিকেটার যোগাযোগ করেছেন তার সঙ্গে। একসময় স্যামি যাকে বলেছিলেন ‘আজীবনের ভাই’। ‘কালু’ নামের অর্থ জানার পরও সম্পর্ক বদলায়নি, এখনও তাকে ভাইয়ের মতোই দেখেন স্যামি। তবে ক্যারিবিয়ান অলরাউন্ডার এটিও জানালেন, ওই ক্রিকেটারের সঙ্গে তার কথা চলছে এবং তাকে বর্ণবাদের ব্যাপারটি শেখানোর চেষ্টা করছেন।

স্পোর্টস ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 12 June 2020, 07:12 AM
Updated : 12 June 2020, 10:47 AM

কয়েকদিন আগে স্যামি অভিযোগ করেছিলেন, আইপিএলে সানরাইজার্স হায়দরাবাদে খেলার সময় অনেকেই তাকে ও শ্রীলঙ্কান অলরাউন্ডার থিসারা পেরেরাকে ডাকতেন ‘কালু’ নামে। পরে ভারতীয় পেসার ইশান্ত শর্মার পুরোনো একটি ইনস্টাগ্রাম পোস্টে স্যামির দাবির পক্ষে প্রমাণ মেলে।

অভিযোগ তোলার সময় স্যামি আহবান করেছিলেন, ‘কালু’ নামে যারা ডেকেছেন, তারা যেন তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং ব্যাখ্যা দেন। এবার ক্রিকেট ওয়েবসাইট ইএসপিএনক্রিকইনফোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্যামি জানালেন, একজনের সঙ্গে তার কথা চলছে।

“ওদের একজন (সানরাইজার্স সতীর্থ) আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং আমাদের আলোচনা চলছে। সে এমন একজন, আমি নিশ্চিত যার কাছে এখনও আমার আর তার ড্রেসিং রুমের বড় একটি ছবি আছে, যেখানে আমি অটোগ্রাফ দিয়েছিলাম এবং লিখেছিলাম, ‘ব্রাদার্স ফর লাইফ।’ আমি তাকে এখনও সেটিই মনে করি।”

“ তবে, তার মানে সত্যটি মুছে যাচ্ছে না বা আড়াল হচ্ছে না যে, সুনির্দিষ্ট একটি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছিল, যেটি গায়ের রঙের কারণে হতে পারে অপমানজনক। কেউ আমার বন্ধু হোক বা তাকে আমি ভাই হিসেবে দেখি, আমাদের উচিত এটি নিয়ে আলোচনা করা এবং আমরা করে যাব।”

ইনস্টাগ্রাম ভিডিওতে স্যামি সেই সতীর্থদের আহবান করেছিলেন, ‘কালু’ নামে ডাকায় তার কাছে ক্ষমা চাওয়ার। তবে এখন মনোভাব বদলেছে তার। যার সঙ্গে কথা চলছে, ওই ক্রিকেটার এখনও ক্ষমা চাননি এবং স্যামি তা জরুরীও মনে করছেন না।

“আহ… এখনও নয় (ক্ষমা চেয়েছে কিনা)। দেখুন, একটি ব্যাপার আমার জায়গা থেকে আমি একভাবে দেখতে পারি, অন্য পাশ থেকে আপনি আরেকভাবে। দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। আমার ব্যাপারটি স্পষ্ট করে দিতে চাই, আমার গায়ের রঙে আমি খুশি। কাউকে আমি সুযোগ দেব না, মানসিকভাবে আমাকে ছোট অনুভব করানোর। গায়ের রঙ নিয়ে আমি গর্বিত। কাজেই কেউ ক্ষমা চেয়েছে বা চায়নি, এতে আমার ভাবনা বদলাচ্ছে না যে কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে আমি কতটা গর্বিত। কিছুই বদলাচ্ছে না।” 

স্যামির দাবি, কাউকে তিনি অপরাধী হিসেবে দাঁড় করাতে চান না, স্রেফ শেখাতে চান।

“আমি এটিকে দেখছি শেখানোর সুযোগ হিসেবে। আমি কারও দিকে আঙুল তুলে বলছি না যে, ‘এই লোকটি বর্ণবাদী।’ না, আমি তেমন নই। আমি স্পষ্ট করেই বলেছি, আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে, কথা বলতে। কারণ আমি সবসময় সামনে তাকাতে চাই। স্পর্শকাতর ব্যাপার, অস্বস্তিকর আলোচনা বলে পিছু হঠার লোক আমি নই।”

স্যামির অভিযোগের পর সানরাইজার্স হায়দরাবাদ দল ও ভারতের বোর্ড সংশ্লিষ্ট অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, ৬ বছর পর কেন এই অভিযোগ। তবে  অভিযোগ তোলার সময় স্যামি বলেছিলেন, ‘কালু’ শব্দটির অর্থ তিনি তখন মনে করেছিলেন ‘তেজি ঘোড়া’ এবং সেটিকে মজা হিসেবেই দেখেছিলেন। সম্প্রতি ভারতীয়-মার্কিন অভিনেতা ও উপস্থাপক হাসান মিনহাজের একটি ভিডিও দেখে ‘কালু’ শব্দের অন্য অর্থ জানতে পারেন। এই সাক্ষাৎকারেও সেটির বিস্তারিত ব্যাখা দিলেন স্যামি।

“আগেও স্পষ্ট করে বলেছি, হাসানের একটি ভিডিও দেখছিলাম আমি। তখনই জানতে পারি, আমাকে যে নামে ডাকা হতো, সেটির অন্য মানে আছে, অপমানজনক অর্থ আছে। আমি শুনেছি যে সানরাইজার্স ও বিসিসিআই বলেছে, কেন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করিনি তখন। যেটি আমার জানাই ছিল না, সেটি নিয়ে অভিযোগ করব কেন! হাসানের ভিডিও দেখেই এখন জানতে পেরেছি।”

“ আর, সত্য কথা বলার জন্য ভুল সময় বলে কিছু নেই। কেউ কি অস্বীকার করেছে আমার অভিযোগ? আমি তো আর পাগল নই! আমাকে যে নামে ডাকা হতো, এটির অন্য অর্থ আছে জানার পর আমি ক্ষুব্ধ অবশ্যই, কিন্তু ওই ড্রেসিং রুমে সেরা কিছু সময়ও কাটিয়েছি।”

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশের নির্যাতনে কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর পর থেকে বিশ্বজুড়ে যে বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন চলছে, সেটির ধারাবাহিকতায়ই এসেছে স্যামির এই অভিযোগ। গত কিছুদিনে বর্ণবাদ নিয়ে সোচ্চা হয়েছেন ক্রিস গেইল, ডোয়াইন ব্রাভো, কার্লোস ব্র্যাথওয়েট, মাইকেল কারবেরিসহ অনেক ক্রিকেটারই।

স্যামির দাবি, আরও অনেকেরই আছে বর্ণবাদের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা। কিন্তু তারা নিরব আছেন বাস্তবতার কাছে অসহায় হয়ে।

“ চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো সাহসী সবাই নয়, কারণ এখান থেকেই তো রুটি-রুজি আসছে। শক্তিধর মানুষদের চ্যালেঞ্জ করা সহজ নয়। নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার ভয় থাকে কখনও কখনও। অনেকেরই শঙ্কা থাকে, এসব করলে ভবিষ্যতের ফল ভালো হবে না।”

“তবে এটা তাদের ব্যাপার। আমি অমন নই। নিজের বিশ্বাসে শক্ত অবস্থান নিতে আমি কখনও পিছপা হইনি, সেটা যার বিরুদ্ধেই হোক না কেন। আমি সেভাবেই বেড়ে উঠেছি।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক