হাসান যেন এক ঝলক মুক্ত বাতাস

রাইলি রুশো যেন চমকে গেলেন। মুহূর্তের জন্য তার চোখে-মুখে ফুটে উঠল অবিশ্বাস, এতটা দারুণ ডেলিভারি! সিম পজিশন নিখুঁত, গতি বেশ, বাড়তি বাউন্স আর অ্যাঙ্গেলে বেরিয়ে রুশোর ব্যাটের কানা ছুঁয়ে বল কিপারের গ্লাভসে। নিশ্চিতভাবেই টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা ডেলিভারি! শুধু ওই ডেলিভারিই নয়, গতি আর স্কিল দিয়ে এবারের বিপিএলে দারুণভাবে নজর কেড়েছেন তরুণ পেসার হাসান মাহমুদ।

ক্রীড়া প্রতিবেদকসিলেট থেকে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 3 Jan 2020, 03:56 PM
Updated : 3 Jan 2020, 04:45 PM

রুশোকে আউট করা ডেলিভারির আগে মেহেদী হাসান মিরাজকে বোল্ড করেন হাসান। পরে অসাধারণ একটি ‘ব্যাক অফ দা হ্যান্ড’ স্লোয়ারে বোল্ড করেন রবি ফ্রাইলিঙ্ককে। শেষদিকে ফেরান দুর্দান্ত খেলতে থাকা মুশফিকুর রহিমকেও। ক্যারিয়ার সেরা বোলিংয়ে ৩২ রানে ৪ উইকেট, ঢাকার সঙ্গে খুলনা টাইগার্স পেরে উঠল না হাসানের কারণেই।

এই ম্যাচে তিনিই নায়ক, তবে আগের ম্যাচগুলিতেও দেখিয়েছেন কিছু ঝলক। দেশের ক্রিকেটে পেস বোলিংয়ের বরাবরের সঙ্কট আরও তীব্র হয়েছে গত কয়েক বছরে। সেই দম বন্ধ করা আবহেই যেন খানিকটা আশার হাওয়া বইয়ে দিচ্ছেন ২০ বছর বয়সী হাসান।

পরিসংখ্যান দেখে যদিও বিভ্রান্ত হওয়া স্বাভাবিক। এই ম্যাচে ৪ উইকেটের পরও ৯ ম্যাচে তার উইকেট ৯টি, ওভারপ্রতি রান দিয়েছেন প্রায় ৯ করে। কিন্তু ক্রিকেটে, বিশেষ করে টি-টোয়েন্টিতে পরিসংখ্যান তো অনেক সময়ই বিভ্রান্তিকর! সহজাত গতি, দুই দিকেই সুইং, দারুণ স্লোয়ার ডেলিভারি ও পরিস্থিতি বুঝে মাথা খাটিয়ে বোলিং করে হাসান জানান দিয়েছেন তার সম্ভাবনার উজ্জ্বল বার্তা।

বাংলাদেশের ক্রিকেটের মূল স্রোতে এসেছেন তিনি আর বেশির ভাগের মতোই, অনূর্ধ্ব-১৯ দল দিয়ে। লক্ষীপুরের ছেলে শৈশবে যোগ দিয়েছিলেন নিজ জেলা শহরের একাডেমিতে। সেখান থেকে অনূর্ধ্ব-১৩, অনূর্ধ্ব-১৫ হয়ে এসেছেন বসয়ভিত্তিক ক্রিকেটের জাতীয় পর্যায়ে। খেলেন ২০১৮ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে। সহজাত সামর্থ্য আর উইকেট শিকারি প্রবণতা দিয়ে তখনই ছিলেন আলোচনায়।

তবে বিশ্বকাপের পর দেশে ফিরে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ, জাতীয় লিগ, বিসিএল খেলেন। গত বছরের শুরুর দিকে চোট পান হাতে। বিসিবি তাকে চিকিৎসা করিয়ে আনে ভারত থেকে। মাঠের বাইরে থাকতে হয় মাস ছয়েক। সেই দুঃসময়কে পেছনে ফেলে আস্তে আস্তে আবার ফিরে পেয়েছেন নিজেকে।

মাঠে ফেরার পরে ঘাম ঝরিয়ে চেষ্টা করেছেন আরও অস্ত্রের ভাণ্ডার আরও সমৃদ্ধ করতে। চোটে পড়ার আগের চেয়েও বেড়েছে গতি, আরও বেড়েছে নিয়ন্ত্রণ। তূণে যোগ হয়েছে সুইং, বাড়তি বাউন্স। পরিস্থিতি বুঝে বল করা আর অভিজ্ঞতা তো বাড়বে সময়ের সঙ্গে।

সম্ভাবনা তুমুল বলেই চোট কাটিয়ে ফেরার পর তাকে সুযোগ দিতে বেশি দেরি করেননি নির্বাচকেরা। গত অক্টোবর-নভেম্বরে জাতীয় লিগে চট্টগ্রামের হয়ে দুটি ম্যাচে দারুণ বোলিং করেন। সুযোগ পান ইমার্জিং টিমস এশিয়া কাপে।

এশিয়ার উঠতিদের সেই আসরে অসাধারণ বোলিং করেছিলেন। উইকেট নিয়েছিলেন ৭টি, ওভারপ্রতি রান দিয়েছিলেন সাড়ে চারের কম। তার স্কিলের উন্নতি ফুটে উঠেছিল সেই টুর্নামেন্টেই। পরে দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের সোনা জয়ের ম্যাচে ৩ উইকেট নিয়ে তিনিই ছিলেন ম্যাচ সেরা। সেই ধারাবাহিকতায় আলো ছড়িয়ে চলেছেন বিপিএলে।

প্লেয়ার্স ড্রাফটে দল পাওয়ার পর থেকেই হাসানের লক্ষ্য ছিল বিপিএলে নিজেকে মেলে ধরা। দল তাকে সব ম্যাচে খেলিয়েছে। শুক্রবার ম্যান অব দা ম্যাচ হওয়ার পর কৃতজ্ঞতা জানালেন সতীর্থদের প্রতি।

“টুর্নামেন্ট শুরুর আগে টার্গেট ছিল বলতে আলাদা একটা চিন্তা ছিল যে টুর্নামেন্টের জন্য ভালো কিছু করতে হবে। বিপিএল বড় একটা মঞ্চ। চেষ্টা করছি ভালো কিছু করার। চেষ্টা থাকবে শেষ পর্যন্ত এটা যাতে ধরে রাখতে পারি।”

“প্রথমবার একটু রোমাঞ্চিত, ভালো একটা দলে আছি। জাতীয় দলের অনেকে আছেন। মাশরাফি ভাই আছেন, তামিম ভাই আছেন, মুমিনুল ভাই আছেন, ভালো একটা দলে আছি। সবাই সাহায্য করছেন।

রুশোকে এদিন যে ডেলিভারিতে আউট করেছেন, তার ছোট্ট ক্যারিয়ারের সেরা ডেলিভারি এটিই। তবে এই ম্যাচে মুশফিকুর রহিমের সামনে সুবিধা করতে পারেননি হাসান। ৩৩ বলে ৬৪ রানের ইনিংসের পথে হাসানকে দুটি করে চার ও ছক্কা মেরেছেন মুশফিক। শেষ পর্যন্ত জিতেছেন যদিও হাসানই। ম্যাচ শেষে তরুণ পেসার বললেন দুজনকে নিয়েই।

“এটা অবশ্যই সেরা ডেলিভারি (রুশোকে আউট)। রুশোর জন্য পরিকল্পনা ছিল স্টাম্প টু স্টাম্প বল করা, ও তো বাইরে ভালো খেলে। ৪ উইকেটের মধ্যে এই উইকেটই সবচেয়ে ভালো লেগেছে। বলটা অনেক ভালো জায়গা থেকে বাউন্স করেছিল, ভালো লেংথে হিট করেছিল। সেজন্য ভালো লেগেছে।”

“মুশফিক ভাইকে বল করা খুব কঠিন। উনি প্রায় ৩৬০ ডিগ্রি জুড়ে খেলেন। উনার জন্য পরিকল্পনা ছিল ওয়াইড ইয়র্কার করা হবে অফসাইডে তিন ফিল্ডার রেখে। এরপর উনি স্লো ফুলটসে আউট হয়ে গেলেন। ভিন্ন কিছু চেষ্টা করেছি।”

রুশোর চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না রবি ফ্রাইলিঙ্ককে বোল্ড করা ডেলিভারি। ‘ব্যাক অব দা হ্যান্ড’ স্লোয়ার ডেলিভারিটি কাট করে অনেকটা ভেতরে ঢুকেছিল। হাসান জানালেন, বেশ কিছুদিন ধরে এটির অনুশীলন করছেন। ওই মুহূর্তে স্লোয়ারের পরিকল্পনা অবশ্য এসেছিল উইকেটের পেছনে এনামুল হকের কাছ থেকে।

“ইমার্জিং কাপ থেকে এই ব্যাক হ্যান্ড স্লোয়ার প্র্যাকটিস করছি। নিজেই চেষ্টা করছি। বিজয় ভাই (এনামুল) পেছন থেকে সাহায্য করেছেন।  উনিই বলেছিলেন চেঞ্জ আপ করার জন্য।

“বিজয় ভাই পেছন থেকে মোটামুটি সব প্লেয়ারকেই বোঝেন, কাকে কোন বল খেলালে কেমন হবে। উনি মাঝেমাঝে ইশারা করে বলেন, এটা বদলে ওটা করতে। মাশরাফি ভাই এসেও সাহায্য করেন অনেক।”

গতির প্রতি তার টান আলাদা। এজন্যই প্যাট কামিন্স, মিচেল স্টার্ক, মার্ক উডদের বোলিং দেখেন সময় করে। চেষ্টা করেন অনুসরণের। তবে পরক্ষণেই নিজেই বললেন, “গতির মতো সুইংও গুরুত্বপূর্ণ। চেষ্টা করছি নিজেকে ভালো জায়গায় নেওয়ার।”

হাসান সেই চেষ্টায় সফল হলে, বাংলাদেশ ক্রিকেটের পেস আঁধারে ফুটবে আলোর রেখা।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক