সেই ৪৩-এর চেয়েও হতাশার এই ১৪৩

‘৪৩’ কি এখনও কাঁটা হয়ে বিদ্ধ করে বাংলাদেশকে? কয়েকদিন আগে কোচ স্টিভ রোডস বলেছিলেন, “১১ জন রিকি পন্টিং থাকলেও হয়তো সেদিন আমরা কোনোরকমে একশ করতাম।” কন্ডিশন সেখানে ব্যর্থতার ঢাল। কিন্তু এবার? গত জুলাইয়ে অ্যান্টিগায় ৪৩ রানের চেয়ে এবার সিলেটের ১৪৩ সংখ্যার হিসাবে একশ বেশি। তবে হতাশাও এই ইনিংসে শতগুণ বেশি!

আরিফুল ইসলাম রনিআরিফুল ইসলাম রনিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 4 Nov 2018, 02:37 PM
Updated : 4 Nov 2018, 03:49 PM

কোচের কথার সূত্রেই মিশে আছে হতাশার এই পরিমাপ। অ্যান্টিগায় সবকিছুই ছিল বিরুদ্ধ। আকাশ ছিল মেঘলা। টস হেরে ম্যাচের প্রথম সকালে ব্যাটিংয়ে নেমেছিল বাংলাদেশ। সবুজাভ উইকেটে ছিল মুভমেন্ট ও বাউন্স। এমন উইকেট-কন্ডিশনে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা ছিল সীমিত, সামর্থ্য বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ। ক্যারিবিয়ানদের পেস আক্রমণের ছোবলে ছিল বাংলাদেশের ব্যাটিং ঘায়েল করার বিষ। ৪৩ রানে গুটিয়ে যাওয়া অবশ্য কোনো পরিস্থিতিতেই গ্রহণযোগ্য নয়। তবে কারণটা বোধগম্য। এবার কোনো কারণ পাওয়াই কঠিন!

সিলেটের উইকেটে নেই তেমন প্রাণের ছোঁয়া। প্রথম দিন শেষে দলের প্রতিনিধি হয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসা আবু জায়েদ চৌধুরী যেমন বলেছিলেন, দ্বিতীয় দিন শেষে তাইজুল ইসলামও অকপটে বলে দিলেন, ‘উইকেট ফ্ল্যাট’। না আছে গতি, না আছে মুভমেন্ট; না মিলছে টার্ন। মাঝেমধ্যে দু-একটি বল খানিকটা উঁচু বা নিচু হওয়া ছাড়া নেই আর কোনো বিপদ।

মরা উইকেটে প্রাণের ছোঁয়া আনার মতো বোলারও নেই জিম্বাবুয়ের। কাইল জার্ভিসের মূল শক্তি সিম মুভমেন্ট এখানে অকার্যকর, টেন্ডাই চাটারার নেই সেই গতি বা স্কিল। স্পিন আক্রমণে যারা, তাদের চেয়ে ঢের ভালো স্পিনার ঢাকার লিগ ক্রিকেটে নিত্য খেলে এই ব্যাটসম্যানরাই।

সব মিলিয়ে টেস্ট ক্রিকেটে এর চেয়ে সহজ পরীক্ষা আর হয় না। অ্যান্টিগায় টিকে থাকাই ছিল বড় পরীক্ষা। এখানে কেউ আউট হতে না চাইলে আউট করা কঠিন। কিন্তু বাংলাদেশের প্রায় সব ব্যাটসম্যানই যেন কোনো অমোঘ টানে পতঙ্গের মতো ঝাঁপ দিলেন আগুনে।

টেস্ট ব্যাটিং কতটা বাজে হতে পারে কিংবা কেমন ব্যাটিং উচিত নয়, সেটিরই আদর্শ ডকুমেন্টারি ছিল রোববার বাংলাদেশের ব্যাটিং। যেন দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যাটিংয়ের পুরস্কার নিয়ে ড্রেসিং রুমে অপেক্ষায় ছিলেন কেউ; সেটি জিতে নেওয়ার তাড়না ছিল সবার!

অথচ অনেকের জন্যই সুযোগটি ছিল অমূল্য। তামিম ইকবাল ফিরলে তার সঙ্গী হবেন কে? প্রথম পরীক্ষায় পুরো ব্যর্থ ইমরুল কায়েস ও লিটন দাস। লাঞ্চের পর প্রথম বলেই ভীষণ দৃষ্টিকটু একটি শট খেলেছিলেন ইমরুল। অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিলেন। সেই রেশ না কাটতেই ‘সফল’ হয়েছেন বাইরের বল স্টাম্পে টেনে আনতে। লিটন দাস ড্রাইভ খেলেছেন শরীর থেকে দূরে।

ফেরার ম্যাচের জন্য এই ম্যাচের চেয়ে উপযুক্ত মঞ্চ আর পেতে পারতেন না নাজমুল হোসেন শান্ত। কিন্তু স্নায়ুর চাপে হোক বা মনোযোগ হারিয়ে, হঠাৎ হলেন অশান্ত। লিটনের মতো শরীর থেকে দূরে ড্রাইভ খেলে বিপদকে আমন্ত্রণ জানালেন তিনিও।

বেশ কিছুদিন ধরেই স্পিনে, বিশেষ করে অফ স্পিনে যথেষ্ট আঁটসাঁট মনে হচ্ছে না মুমিনুল হকের ব্যাটিং। এ দিন তিনি সিকান্দার রাজার নিরীহ অফ স্পিনে নাকাল। বলের কাছে না গিয়েই ব্যাট ‘পুশ’ করলেন হালকা, খেসারত দিতে হলো ভারী।

অফ স্টাম্পের বাইরের যে লেংথ বল ছাড়া যেত অনায়াসেই, নিজের কেবল দ্বিতীয় বলেই সেই ডেলিভারিতে মাহমুদউল্লাহ যে শট খেললেন, ক্রিকেটের পরিভাষায় তাকে বলে ‘নাথিং শট’। না করলেন ব্লক, না খেললেন শট।

বিপর্যয়ে বারবার ভরসা জুগিয়েছে যার ব্যাট, সেই মুশফিকুর রহিম চা-বিরতির পর দ্বিতীয় বলেই খোঁচা দিলেন স্টাম্পের বাইরের একটু বাড়তি লাফানো বলে। যে বলে আউট হওয়া কঠিন, অনেক কসরত করে সেই বলেই শন উইলিয়ামসকে ফিরতি ক্যাচ দিলেন মেহেদী হাসান মিরাজ।

নিজের পায়ে কেউ কুড়াল মারলে প্রতিপক্ষ ফায়দা নেবেই। বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে ছিল সেই আত্মঘাতী আয়োজন। কেবল অভিষিক্ত আরিফুল হক লড়লেন বলে আরও বড় হয়নি জিম্বাবুয়ের লিড।

সেই ৪৩ ও এই ১৪৩ রানের মাঝে বা আগে ব্যর্থতার সাইনবোর্ড হয়ে আছে আরও কিছু স্কোরকার্ড। এ নিয়ে টানা সাতটি টেস্ট ইনিংসে দুইশর কাছ যেতে পারল না বাংলাদেশ, এর ছয়টিতেই ইনিংস শেষ দেড়শর নিচে। অজুহাত চলে না, তবে কারণ অনুসন্ধানে যুক্তি কিছু মেলে।

ওয়েস্ট ইন্ডিজে চার ইনিংসেই কন্ডিশন, নিজেদের সীমাবদ্ধতা আর প্রতিপক্ষের বোলিং ছিল বড় পরীক্ষা। তার আগে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে মিরপুর টেস্টে উইকেট ছিল ভীষণ টার্নিং। ১১০ ও ১২৩ রানে অলআউট তাতে জায়েজ হয় না, তবে কিছু কারণ অন্তত পাওয়া যায়। কিন্তু সিলেটের এই ১৪৩ রানে অলআউটের ব্যাখ্যা কোনো যুক্তিতেই অনুধাবন করা কঠিন।

চাইলে অনুমানের আশ্রয়ে কারণ হাতড়ে ফেরা যায়। হয়তো ওয়ানডে সিরিজের ব্যাটিংয়ের ঘোর থেকে এখনও বের হতে পারেনি বাংলাদেশ। সে কারণেই একের পর এক বাইরের বল তাড়া, প্রায় প্রতি বলেই ব্যাট ছোঁয়ানোর চাওয়া। এই কারণেই বল না ছাড়ার মানসিকতা, এমন রোমাঞ্চপ্রিয়তা।

হতে পারে আত্মতুষ্টি। ওয়ানডে সিরিজের সাফল্যের রেশ এখনও লেগে আছে গায়ে। হতে পারে জিম্বাবুয়ের বোলিং ধারহীন বলে ব্যাটসম্যানরা ভেবেছিলেন হেলাফেলায় খেলেই পার পাওয়া যাবে। হতে পারে এই ভাবনা যে, এমন বোলিংয়ের বিপক্ষে একটি-দুটি জুটি এমনিই দাঁড়িয়ে যাবে। এসবের কোনো একটিই যথেষ্ট পতন ডেকে আনতে। ক্রিকেট খেলাটা এমন, অবহেলা কিংবা অতি তুষ্টির মূল্য সবসময়ই চড়া।

শন উইলিয়ামসের মতো স্পিনে দক্ষ ব্যাটসম্যানকে না হয় বাদ রাখা গেল, পিটার মুরের মতো নবীন একজনও দেখিয়েছেন, এই ২২ গজে চাইলেই সময় কাটানো যায়। প্রয়োজন স্রেফ নিবেদন ও টেম্পারামেন্ট। বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে পড়েনি সেই চাওয়ার প্রতিফলন।

অবশ্যই সব শেষ হয়ে যায়নি এখনও। এই ম্যাচ এখনই শেষ নয়, নাটকীয় অনেক কিছুর সাক্ষী অনেকবারই হয়েছে ক্রিকেট। এই সিরিজও সবকিছুর শেষ নয়। কিন্তু সামনের পথচলায় যা কিছুই হোক, এই ইনিংসের বাস্তবতা বদলাচ্ছে না। এই ইনিংসের ব্যর্থতা আঘাত করেছে বাংলাদেশের টেস্ট দর্শনের মূলে। এই ঘা যদি জাগাতে না পারে, সাদা পোশাকে এমন কালো দিন তবে আসবে আরও!

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক