ওয়ানডেতে বাংলাদেশ যে কোনো কন্ডিশনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ: পোলক

সর্বকালের সেরা পেসারদের মধ্যে তার নাম চলে আসে অবধারিতভাবে। ১০৮ টেস্টে ৪২১ উইকেটের পরিসংখ্যানই তার সাক্ষ্য। সঙ্গে দুই সেঞ্চুরিতে করা ৩৭৮১ রানে বোঝা যায় শন পোলকের অলরাউন্ড সামর্থ্য। এক যুগের বেশি সময়ের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়কত্বও করেছেন অনেক দিন।

অনীক মিশকাতব্লুমফন্টেইন থেকে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 8 Oct 2017, 06:14 PM
Updated : 9 Oct 2017, 11:08 AM

সেই পোলক ধারাভাষ্য দিচ্ছেন বাংলাদেশ-দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে। দ্বিতীয় টেস্টের ফাঁকে ম্যানগাউং ওভালে কথা বললেন পেস বোলিং, টেস্টের বাংলাদেশ আর ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিয়ে।

দুই টেস্টে বাংলাদেশের খেলা কেমন দেখলেন?

শন পোলক: এটা নিঃসন্দেহে হতাশাজনক। আমি মনে করি বাংলাদেশ দেশের মাটিতে অনেক উন্নতি করেছে। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে তারা যেভাবে খেলেছে, তা খুবই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল। নিউজিল্যান্ডের মাটিতেও তারা কিউইদের বিপক্ষে একটা টেস্টে খুব ভালো খেলেছে। আমি এখানে তাদের পারফরম্যান্সে কিছুটা হতাশ। এগুলো দক্ষিণ আফ্রিকার উইকেটগুলোর মতো নয়। পচেফস্ট্রুম আর ব্লুমফন্টেইন সম্ভবত ব্যাটিং করার জন্য সবচেয়ে ফ্ল্যাট উইকেটগুলোর মধ্যে অন্যতম। আমরা যদি বাংলাদেশ বা ভারতে খেলতে গিয়ে এমন উইকেট পাই যেখানে বল খুব একটা টার্ন করে না, তাহলে আমাদের খেলা সহজ হয়ে যায়। এই উইকেটগুলোতে বাউন্স খুব বেশি নেই, গতিও ভয়াবহ নয়। সেজন্যই আমি একটু হতাশ।

বাংলাদেশ অনেক দিন ধরেই খেলছে, তাই যখন তারা বিদেশের মাটিতে খেলবে, তখন তাদের নিজেদের খেলার মান পরের ধাপে নিয়ে যেতে হবে। দেশের মাটিতে তারা খুবই ভালো, কিন্তু বিদেশের মাটিতে তাদের কাছ থেকে আরেকটু ভালো খেলা প্রত্যাশা করি আমি। তারা ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতে ভালো দল, কিন্তু টেস্টে তাদের কাছ থেকে আরও ভালো পারফরম্যান্স প্রত্যাশা করি।

আপনি টেস্ট ক্রিকেটের সেরা বোলারদের একজন ছিলেন। এই ধরনের উইকেটে বাংলাদেশি বোলারদের পারফরম্যান্স নিয়ে কি বলবেন?

পোলক: আমি মনে করি এটা তাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং। তারা বোলিং করার খুব বেশি সুযোগ পায় না। বাংলাদেশের মাটিতে টেস্টগুলো যদি আপনি দেখেন, তারা নতুন বলে ৫ ওভার বল করার সুযোগ পায়। তারপর আবার পুরোনো বলে রিভার্স সুইং করার চেষ্টা করে। এছাড়া তাদের বোলিংয়ে প্রচুর কাটার থাকে। দক্ষিণ আফ্রিকায় এগুলোর কোনোটাই তেমন কাজে আসে না। এখানে ধারাবাহিকভাবে সঠিক লাইন ও লেংথে বল করতে হয়।

আমি ফিজকে (মুস্তাফিজুর রহমান) ভালোবাসি। ওর বোলিং ভালো লাগে। তার দারুণ দক্ষতা আছে। আমার মনে হয়, তাকে সিম পজিশন বিষয়ে আরো অনুশীলন করিয়ে কিভাবে ডানহাতি ব্যাটসম্যানদের জন্য বল ভেতরে ঢোকানো যায় শেখানো উচিৎ। রুবেল হোসেন দ্রুতগতির বোলার। সেও বল কাট করাতে পারে। তাদের অবশ্যই অনেক কিছু শিখতে হবে। সত্যি কথা বলতে, দেশের মাটিতে খেলার সময় আপনাদের স্পিনাররাই বেশিরভাগ ম্যাচ জেতায়। আমার মনে হয়, পেসাররা দেশের বাইরে খেলে যতো বেশি অভিজ্ঞতা অর্জন করবে, ততোই ভালো হবে। কিন্তু একাজে খুব বেশি তাড়াহুড়া করা যাবে না। তারা এই জায়গায় আসা পর্যন্ত আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে। এটা তাদের জন্য একটু কঠিনই বটে। আমি জানি না কীভাবে কোচিং স্টাফরা কাজ করে বা ঘরোয়া ক্রিকেটের কি অবস্থা। হয়তো ওখানে স্পিনারদের পেছনে বেশি সময় দেয়া হচ্ছে। আমার মনে হয় ভালো গতি আছে এমন কিছু লম্বা খেলোয়াড় আপনাদের খুঁজে বের করা দরকার। তারাই বিদেশের মাটিতে বেশি কার্যকর হবে।

আপনি কি বড় দৈর্ঘ্যের ম্যাচ নিয়ে বাংলাদেশের পেসারদের জ্ঞানের অভাব দেখেছেন?

পোলক: এটা শুধুমাত্র বাংলাদেশের সমস্যা না। পৃথিবীর অনেক দলেরই এই সমস্যা আছে। ওয়ানডে ক্রিকেট বেশি খেলার জন্য এমনটা হয়। তারা কাটার ও অন্যান্য বৈচিত্র্যপূর্ণ বোলিংয়ে দক্ষতা অর্জন করে। কিন্তু যখন আপনাদের বোলিং কোচ কোর্টনি ওয়ালশের মতো করে ব্যাটসম্যানদের দীর্ঘ সময় ক্রিজে বেঁধে রাখার প্রয়োজন হয়, তখন তারা সমস্যায় পড়ে। আসলে এখনকার তরুণ বোলাররা সবকিছুই তাড়াতাড়ি করে ফেলতে চায়। হতে পারে, তারা কিছুটা অধৈর্য।

এই সিরিজে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের পারফরম্যান্স নিয়ে কি বলবেন? এই ব্যাটিং পিচে তাদের ব্যাট করার ধরন দেখে হতাশ?

পোলক: হ্যাঁ। আমি জানি না কী ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। তারা একটা প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছে। হয়তো, তাদের দুই বা তিনটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলা দরকার ছিল। কিন্তু যখন বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলার প্রসঙ্গ ওঠে, যখন আমরা ওদেশে খেলতে যাই, তখন আমরা জানি ওরা পিচকে যতোটা সম্ভব রাফ করে তৈরি করবে। সেখানে হয়তো পায়ের ছাপের ক্ষত থাকবে যেখানে বল ফেলে স্পিনাররা ফায়দা তোলার চেষ্টা করবে। সেখানে আপনি এ ধরনের অভিজ্ঞতাই পাবেন। যখন আমরা ওয়েস্ট ইন্ডিজে ওয়ালশ ও কার্টলি অ্যামব্রোসে বিপক্ষে খেলতে গেছি, তখন আমরা নেটে টেনিস বলে প্রচুর অনুশীলন করেছি। আমি মনে করি, আপনাদের খেলোয়াড়রা অতোটা লম্বা নয়, কিন্তু তারা যতো বেশি সম্ভব বলগুলোকে খেলার চেষ্টা করেছে এবং সেটাই মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই দাঁড়িয়ে থেকে বল খেলার চেষ্টা করেছে। কীভাবে হাত নিচে নামিয়ে বল ছেড়ে দিতে হয়, সেটা আপনাকে শিখতে হবে। এ ধরনের অভিজ্ঞতা তারা প্রতিদিন পাবে না। সেজন্যই তাদেরকে এমন পরিস্থিতির জন্য নিজেদেরকে প্রস্তুত রাখতে অনেক বেশি অনুশীলন করতে হবে।

বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের মধ্যে কাকে আপনার সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে?

পোলক: তারা সবাই ভালো খেলেছে, যদিও খুব বেশি অবদান রাখতে পারেনি। লিটন দাস গতকাল খুব ভালো খেলেছে। মমিনুল হক আর মাহমুদুল্লাহ একটা করে ইনিংস ভালো খেলেছে। আমি ফিজকে দেখে খুশি হয়েছি। দুজন স্পিনারও ভালো ছিল। তবে, যেটা দরকার তা হলো সমন্বিত পারফরমেন্স। একটা ইনিংসে ভালো খেললে হবে না। এটা নিশ্চয়ই বাংলাদেশের জন্য হতাশাজনক। তারা কি আসলেই দেশের বাইরে ভালো ক্রিকেট খেলতে চায়? আমি ঠিক নিশ্চিত নই। হয়তো এটা তাদের লক্ষ্য নয়। হতে পারে, তারা দেশের মাটিতে ভালো খেলতে চায় আর বাইরে ওয়ানডেতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে চায়। আমি আসলে ঠিক জানি না।

মুস্তাফিজ ক্যারিয়ারের শুরুতে দুর্দান্ত পারফর্ম করেছে। কিন্তু এখন ততোটা ভালো করতে পারছে না। আপনার কি মনে হয়, তার কোথায় ঘাটতি আছে?

শন পোলক: আপনাকে বিভিন্ন ধরনের দক্ষতা অর্জন করতে হবে। আমি আগেই বলেছি যে তার অনেক বৈচিত্র্য আছে। সে খুব ভালো কাটার আর বাউন্সার দিতে পারে। কিন্তু এগুলো ওয়ানডেতে বেশি কার্যকর যখন ব্যাটসম্যান আপনাকে আক্রমণ করতে আসবে। যেসব কন্ডিশনে বল গ্রিপ করে সেখানেও এগুলো কার্যকর। কিন্তু যখন আপনি দক্ষিণ আফ্রিকায় আসবেন যেখানে বল খুব সুন্দরভাবে ব্যাটে আসে, সেখানে তার জন্য চ্যালেঞ্জ অনেক বেশি। যেমনটা আগেও বলেছি, সে যদি ডানহাতি ব্যাটসম্যানের জন্য বল ভেতরের দিকে আনা শিখতে পারে, তাহলে সে আরো বেশি কার্যকর বোলার হয়ে উঠবে।

৯০ এর দশকের তুলনায় এখন খুব বেশি ফাস্ট বোলার দেখা যায় না। কেন? এখন কি কেউ ফাস্ট বোলার হতে চায় না?

পোলক: আমার মনে হয়, স্কুল এবং ক্লাব ক্রিকেটেও এখন অনেক বেশি ছোট ফরম্যাটের ক্রিকেট খেলা হয়। বড় দৈর্ঘ্যের ম্যাচ খুব কম হয়। মানুষ এখন উত্তেজনাপূর্ণ ফরম্যাটে খেলতে বেশি আগ্রহী। হয়তো তাদের কেউ কেউ টেস্ট ক্রিকেটকে ততোটা উত্তেজনাপূর্ণ মনে করছে না। তারা টি-টোয়েন্টি বা ওয়ানডের পরিবেশকে বেশি পছন্দ করে। দর্শকদের উল্লাস, উত্তেজনা ইত্যাদি। সম্ভবত এটাই কারণ।

বাংলাদেশের ক্রিকেটে টেস্ট খেলার প্রতি আগ্রহ কম দেখছেন?

পোলক: না, আগ্রহের কোন কমতি নেই। আমি শুধু লক্ষ্যের কথা বলছি। মানে হলো, আপনি সাধারণত দক্ষিণ আফ্রিকা বা অস্ট্রেলিয়ায় ৪-৫ বছর পরপর খেলতে আসেন। কিন্তু, উপমহাদেশে অনেক বেশি সফর করেন অথবা ওয়েস্ট ইন্ডিজে যান। সেগুলোর সবগুলোই প্রায় একই ধরনের উইকেট। এ ধরনের কন্ডিশনে খেলার জন্য খেলোয়াড়দের তৈরি করার চেষ্টা করা কি খুব বেশি উপকারী কিছু? নাকি শুধু দক্ষিণ আফ্রিকায় এলেন, দেখলেন কি হয় এবং এরপর দেশের মাটিতে ভালো খেলার উপর বেশি জোর দিলেন? এটাই আমি বলতে চাইছি। আমি আসলে জানি না সেটাই মূল লক্ষ্য কিনা।

তাহলে তাদের কি করা উচিৎ?

পোলক: এমন ক্রিকেটার তৈরি করা দরকার যারা সারা বিশ্বে ভালো খেলবে। আপনি আপনাদের দুজন স্পিনারের উপর নির্ভর করতে পারেন, তারা খুবই ভালো। এছাড়া আপনাদের সাকিব আল হাসান আছে, যে টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরি করেছে। আমি তাকে এখানে টেস্ট খেলতে দেখতে চাই। সে একজন ভালো ক্রিকেটার। আমার মনে হয় সে এখানে ভালো করতে পারতো। সে হয়তো অন্যদেরকেও দেখাতে পারতো, এ ধরনের উইকেটে কীভাবে খেলতে হয়।

আপনি কি মনে করেন ওয়ানডেতে বাংলাদেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারবে?

পোলক: অবশ্যই। বাংলাদেশ যেখানেই যাক, তারা ওয়ানডেতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দল। যেসব উইকেট আপনি পাবেন, সেগুলোও হয়তো ফ্ল্যাট হবে। কিম্বার্লি, পার্ল, ইস্ট লন্ডন, পচেফস্ট্রুম, ব্লমফন্টেইন- সবগুলো উইকেটই ফ্ল্যাট। সবগুলোই ব্যাটিংয়ের জন্য আদর্শ উইকেট।

দুটি টেস্টেই টসে জিতে মুশফিক ফিল্ডিং নিলেন। আপনি কিভাবে দেখছেন?

পোলক: আমি হয়তো আগে বল করতাম না। তবে, যদি সে পচেফস্ট্রুম আগে বল করে তাহলে ব্লমফন্টেইনে অবশ্যই করতে হবে। স্থানীয় ক্রিকেটার হিসেবে আমরা যতদূর পিচ চিনি, যদি এটা ব্যাটিং উইকেট মনে হয়, আপনি ব্যাট করুন, যদি বোলিং উইকেট মনে হয় তা-ও আপনি ব্যাট করুন, আর যদি এটা অবশ্যই বোলিংয়ের উপযোগী উইকেট মনে হয়, তারপরও আপনি ব্যাট করুন। কারণ, এই উইকেট আসলেই এতোটা ফ্ল্যাট। আমরা নিশ্চয়ই ঢাকায় টসে জিতে আগে বল করবো না।

এবার আপনার প্রসঙ্গে আসি। নয় নম্বরে ব্যাট করতে নেমে দুটি টেস্ট সেঞ্চুরি। কোনটাকে এগিয়ে রাখবেন আপনি?

পোলক: শেষ পর্যন্ত তারা আমার ব্যাটিং পজিশন খুঁজে পেয়েছে (হাসি)। আমার মনে হয় প্রথমটাই সেরা ছিল। কারণ, প্রথমটা সবসময়ই স্পেশাল হয়।

বোলিংয়ের সেরা স্পেল?

পোলক: আসলে অনেকগুলোই আছে। আমার ব্যক্তিগতভাবে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অ্যাডিলেইডে স্পেলটা (৭/৮৭) সেরা। অ্যালান ডোনাল্ড ওই ম্যাচে খেলেননি। তাই, আমাকেই বোলিংয়ের নেতৃত্ব দিতে হয়েছিল। তাই, সেটাই আমার জন্য সেরা।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক