থামল বাংলাদেশের স্বপ্ন-রথ

প্রথম ইনিংস শেষে তবু আক্ষেপ ছিল। রান আরও বেশি হওয়ার কথা ছিল। অন্তত তিনশ তো বটেই। পরের ইনিংসে আক্ষেপটুকুও উধাও। এমন একতরফা ম্যাচে প্রতিপক্ষের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নেওয়া ছাড়া করার আর কী-ই বা থাকে!

আরিফুল ইসলাম রনি বার্মিংহাম থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 15 June 2017, 01:27 PM
Updated : 16 June 2017, 08:28 AM

ব্যাটিং স্বর্গে সম্ভাবনা জাগিয়েও ব্যাটসম্যানরা ছুঁতে পারল না তিনশ রান। ২৬৪ রানের পুঁজি নিয়ে বোলাররা পারল না লড়াই করতেও। আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে বাংলাদেশের স্বপ্নযাত্রা থামল সেমি-ফাইনালে। এজবাস্টনে ৯ উইকেটের জয়ে ফাইনালে উঠল বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ভারত।

চ্যাম্পিয়নরা খেলেছে চ্যাম্পিয়নের মতোই। ব্যাটিংয়ে শুরুর ধাক্কা সামলে দারুণ এক জুটিতে এগিয়ে যাচ্ছিলো বাংলাদেশ। কিন্তু ভারতীয় বোলাররা ঘুরে দাঁড়িয়েছেন দারুণ ভাবে। লক্ষ্যটাকে রেখেছে নাগালে।

ব্যাটিং স্বর্গে সেই লক্ষ্যের দিকে ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা ছুটল বুলেট ট্রেনের গতিতে। বাংলাদেশের বোলারদের সব প্রচেষ্টা পিষ্ট হয়েছে সেই ট্রেনের চাকায়। ভারত ম্যাচ শেষ করেছে প্রায় ১০ ওভার আগেই!

২০১৫ বিশ্বকাপে মেলবোর্নের কোয়ার্টার-ফাইনালের মতোই দারুণ এক সেঞ্চুরি উপহার দিলেন রোহিত শর্মা। ১২৯ বলে অপরাজিত ১২৩। ইনিংসটি পুরোটিই ক্লাস!

কোহলি বলতে পারেন, বাংলাদেশ রান আরেকটু বেশি কেন করল না! ৭৮ বলে অপরাজিত ৯৬ রানে। জয় এনে দেওয়া শট খেলে মুষ্টিবদ্ধ হাত যেভাবে ছুঁড়লেন, তাতে অবশ্য সেঞ্চুরি না পাওয়ার আক্ষেপ দেখা গেল না। বরং ফুটে উঠল দাপুটে জয়ের প্রতিচ্ছবি।

বোলিংয়ে বাংলাদেশের একমাত্র প্রাপ্ত শিখর ধাওয়ানের উইকেট। উড়ন্ত সূচনার পর চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির রান মেশিনকে ফেরাতে পেরেছেন মাশরাফি।

বাংলাদেশের বোলারদের অসহায়ত্বের দিনে অধিনায়ক আরও একবার দেখিয়েছেন এখনও কেন তিনি দেশের সেরা বোলারদের একজন। বোলারদের অগুণতি রান গোণার দিনেও ৮ ওভারের টানা স্পেলে দিয়েছেন মাত্র ২৯ রান।

রোহিত ও কোহলি যেটি পেরেছেন, মাচের প্রথম ভাগে সেটিই করতে পারেননি তামিম ইকবাল ও মুশফিকুর রহিম। দুজনই দারুণ খেলেছেন, গড়েছেন দারণ জুটি। কিন্তু দুজনই ফিরে গেছেন দলকে মাঝপথে বিপদে ফেলে। যে ধাক্কা সামলাতে পারেনি দল।

তৃতীয় উইকেটে তামিম ও মুশফিকুর রহিমের ১২৩ রানের জুটি বাংলাদেশকে তুলে দেয় আশার উড়ানে। কেদার যাদবের অফ স্পিনে সেখান থেকে দুজনই ভূপাতিত। তাতে আছড়ে পড়ে দলের ইনিংসও।

এক পশলা বৃষ্টিতে খেলা শুরু হয় ১০ মিনিট দেরিতে। আকাশ তখন মেঘে ঢাকা। শুরুতে আধার ঘনিয়ে এলো বাংলাদেশের ইনিংসেও। প্রথম ওভারেই ভুবনেশ্বর কুমারের বল স্টাম্পে টেনে আনলেন সৌম্য সরকার।

সাব্বির রহমান গিয়ে শুরু করেছিলেন পাল্টা আক্রমণ। খেললেন দারুণ কিছু শট। কিন্তু লম্বা করতে পারলেন না আবারও। বলটি মারার মতোই ছিল। স্লোয়ার যদিও, তবে শর্ট ও অনেক বাইরে। সাব্বির তুলে দিলেন পয়েন্টের হাতে।

তামিম তখনও ঝিমিয়ে। দলের ইনিংসকে জাগিয়ে তুললেন মুশফিক। জোড়া উইকেট নেওয়া ভুবনেশ্বরকেই চার মারলেন টানা তিন বলে। প্রথমটি ব্যাটের কানায়, পরের দুটি চোখ জুড়োনো শটে।

 

১২ ওভার শেষে তামিমের রান ছিল ৩৪ বলে ১২। ১৮ রানে হার্দিক পান্ডিয়ার বলে বোল্ড হয়েও বেঁচে গেলেন নো-বল হওয়ায়। ব্যাটে যেন আত্মবিশ্বাসের ছোঁয়া লাগল তাতে। পান্ডিয়ার ওই ওভারে মারলেন চার, পরের ওভারে বেরিয়ে এসে কবজির মোচড়ে দারুণ ছক্কা মারলেন মিড উইকেট দিয়ে।

সময়ের সঙ্গে স্ট্রোকের ফোয়ারা দুজনের ব্যাটেই। অশ্বিন-জাদেজার স্পিনকে এলোমেলো করে দিলেন পায়ের কাজে, সুইপ, রিভার্স সুইপ, কাট আর লেট কাটে। দারুণ তিনটি শটে টানা তিন বলে অশ্বিনকে চার মারলেন তামিম।

৬২ বলে পঞ্চাশ ছুঁলেন তামিম, ৬১ বলে মুশফিক। দুজনের জুটি ছাড়িয়ে গেল একশ। ছোঁয়া হলো রেকর্ড। ওয়ানডেতে তামিম-মুশফিকের এটি চতুর্থ শতরানের জুটি। বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি শতরানের জুটিতে এই জুটি স্পর্শ করল সাকিব-মুশফিক জুটিকে।

শুরুর ঘাটতি পুষিয়ে রান রেট তখন প্রায় ছয়। ভারতের ফিল্ডিংও ছন্নছাড়া, চাপে পড়ার প্রমাণ। জুটি ভাঙতে মরিয়া কোহলি বোলিংয়ে আনলেন কেদার জাদবকে। ম্যাচের মোড় পাল্টে যাওয়ার শুরু!

সোজা বলে সুইপ করতে গিয়ে বোল্ড তামিম। ৮২ বলে ৭০ রানের ইনিংসটায় আরেকটি সেঞ্চুরি করতে না পারার আক্ষেপ।

তখনও বোঝা যায়নি অপেক্ষায় দুর্যোগ। জাদেজাকে কাট করতে গিয়ে কটবিহাইন্ড সাকিব। আরও বড় সর্বনাশ পরের ওভারে। কেদারকে বেরিয়ে এসে ফুল টস বানিয়ে মিড উইকেটে ক্যাচ দিলেন মুশফিক (৮৫ বলে ৬১)। ক্যাচ নিয়ে কোহলির উল্লাসই বুঝিয়ে দিচ্ছিল উইকেটটির গুরুত্ব। ২৫ রানের মধ্যে তিন সেরা ব্যাটসম্যানকে হারিয়ে এলোমেলো বাংলাদেশের সাজানো বাগান

মোসাদ্দেক ও মাহমুদউল্লাহর জুটি আশা জগিয়েছিল খানিকটা। স্পিনে যথারীতি দারুণ খেললেন মোসাদ্দেক। কিন্তু পেস আসতেই নড়বড়ে। জাসপ্রিত বুমরাহর বলে ভুগে আউট হলেন শর্ট বলে দৃষ্টিকটু ভাবে।

১ রানে জীবন পাওয়া মাহমুদউল্লাহ ২১ রানে বোল্ড বুমরাহর দারুণ এক ইয়র্কারে। দলের তখন আড়াইশ নিয়ে টানাটানি। মাশরাফি ছিলেন বলে রক্ষে!

ভুবনেশ্বরকে শর্ট বলে পুল করে চার মেরে শুরু। তার পর ব্যাট চালাতেই থাকলেন অধিনায়ক। কানায় লেগে রান এলো কিছু, কিছু মাঝ ব্যাটে। ২৫ বলে অপরাজিত ৩০। বাংলাদেশ পার হলো ২৬০।

তাতে লড়াইয়ের আশা জেগেছিল। ভারতের দুই ওপেনারের ব্যাটেই সেই আশা উড়ে গেছে কর্পুরের মত।

 

তবে বাংলাদেশের সাফল্য উড়ে যাচ্ছে না। শেষটা হয়েছে হতাশায়। তবে দেশের উড়ানে চাপার সময় শেষের হতশার চেয়ে সেমি-ফাইনালে ওঠার ভালো লাগাই বেশি থাকার কথা দলের। আইসিসি টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের সেরা সাফল্য!

সংক্ষিপ্ত স্কোর:
 
বাংলাদেশ: ৫০ ওভারে ২৬৪/৭ (তামিম ৭০, সৌম্য ০, সাব্বির ১৯, মুশফিক ৬১, সাকিব ১৫, মাহমুদউল্লাহ ২১, মোসাদ্দেক ১৫, মাশরাফি ৩০*, তাসকিন ১১*; ভুবনেশ্বর ২/৫৩, বুমরাহ ২/৪০, অশ্বিন ০/৫৪,পান্ডিয়া ০/৩৪, জাদেজা ১/৪৮, যাদব ২/২২)

ভারত: ৪০.১ ওভারে ২৬৫/১ (রোহিত ১২৩*, ধাওয়ান ৪৬, কোহলি ৯৬*; মাশরাফি ১/২৯, মুস্তাফিজ ০/৫৩, তাসকিন ০/৪৯, রুবেল ০/৪৬, সাকিব ০/৫৪, মোসাদ্দেক ০/১৩, মাহমুদউল্লাহ ০/১০, সাব্বির ০/১১)
 
ফল: ভারত ৯ উইকেটে জয়ী

ম্যান অব দ্য ম্যাচ: রোহিত শর্মা

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক