‘হাল ছেড়ো না’, বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের প্রতি আজহারউদ্দিন

বিশ্বকাপে ভরাডুবির পর বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা কতটা চাপে আছেন, অনুভব করতে পারছেন মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দেড় দশকের ক্যারিয়ারে নিজেও তো সামাল দিয়েছেন কত ঝড়-ঝঞ্ঝা! ঠিকই সব মাড়িয়ে ফিরেছেন স্বরূপে। কব্জির মোচড়ে মোহিত করেছেন কোটি কোটি ক্রিকেট ভক্তকে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের ভারতের সাবেক এই অধিনায়কের পরামর্শ, দমে যাওয়া যাবে না।

অনীক মিশকাতদুবাই থেকে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 15 Nov 2021, 10:32 AM
Updated : 15 Nov 2021, 05:12 PM

আবু ধাবি টি-টেনের দল বাংলা টাইগার্স ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর করেছে ভারতের হয়ে ৯৯ টেস্ট ও ৩৩৪ ওয়ানডে খেলা আজহারকে। আগামী শুক্রবার শুরু হতে যাওয়া নতুন আসরের আগে দল নিয়ে বেশ ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১৫ হাজারের বেশি রান করা ভারতের সাবেক এই মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান। নানা অনুষ্ঠানের ব্যস্ততার মাঝে কথা বললেন, ১০ ওভারের ক্রিকেট, টেস্ট, বাংলাদেশের ক্রিকেট ও তার বাংলাদেশ অভিজ্ঞতা নিয়ে।  

টি-টেনের সঙ্গে কেন সম্পৃক্ত হলেন? ১০ ওভারের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ কেমন দেখছেন?

আজহারউদ্দিন: আমি ভাবিনি কখনও এই ধরনের কোনো উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হব। বাংলা টাইগার্সের মালিক ইয়াসিন চৌধুরি অনেকটা হুট করে প্রস্তাব দেন। নতুন একটি উদ্যোগের সঙ্গে কাজ করার প্রস্তাব ভালো লেগে গেল। এরপরই এই প্রকল্পে যোগ দিলাম।

এখন পর্যন্ত যতটুকু দেখেছি, ১০ ওভারের ক্রিকেট টি-টেনের ভবিষ্যৎ ভালোই মনে হচ্ছে। আপাতত শুধু আবু ধাবিতেই এই সংস্করণে খেলা হচ্ছে, অন্য কোথাও নয়। যদি বড় প্রভাব ফেলতে হয়, তাহলে অন্য দেশেরও এই ১০ ওভারের ক্রিকেটকে গ্রহণ করতে হবে। আবু ধাবিতে পঞ্চম বছরের মতো খেলা হতে যাচ্ছে এবার। একটি টুর্নামেন্ট কোথাও পাঁচ বছর চলার অর্থ, এটা ভালো হচ্ছে। এমন টুর্নামেন্ট চালানো সহজ কাজ নয়।

টেস্টের পর ওয়ানডে এসেছে, এখন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ চলছে। সম্ভবত এটাই ক্রিকেটের সবচেয়ে জনপ্রিয় সংস্করণ। সেই জায়গা কি নিয়ে নেবে টি-টেন ক্রিকেট?

আজহারউদ্দিন: টি-টেনের সঙ্গে আমি মাত্রই সম্পৃক্ত হয়েছি। এই ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ ভালো, কিন্তু আমি সব সময়ই চাই, টেস্ট ক্রিকেট থাকুক। একজন ক্রিকেটারের সামর্থ্যের সত্যিকারের পরীক্ষা সেখানেই হয়।

আমি দাবি করছি না, ক্রিকেটের অন্য কোনো সংস্করণের আবেদন কম, বা সেগুলোতে কম স্কিলের প্রয়োজন হয়। তবে ক্রিকেটে সব কিছুর চূড়ান্ত হলো টেস্ট। এখানেই একজন খেলোয়াড়ের সামর্থ্যের সর্বোচ্চ পরীক্ষাটা দিতে হয়। টেস্ট যেহেতু পাঁচ দিনে খেলা হয়, উইকেট-কন্ডিশন প্রতি নিয়ত পাল্টাতে থাকে। সব যখন দ্রুত পাল্টাতে থাকে, তখন ক্রিকেটারদের এর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পরীক্ষাও দিতে হয়। সেদিক থেকে টেস্টই হলো ক্রিকেটের চূড়ান্ত। এখন তো টি-টোয়েন্টি, টি-টেনের মতো খেলাগুলো হচ্ছে। আমাদের এগুলোর সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।

ঘটনাচক্রে আপনার সবশেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ বাংলাদেশে। বেশ কয়েকবার খেলেছেন বাংলাদেশের বিপক্ষে। ঢাকা ও চট্টগ্রামেও খেলেছেন কয়েকবার। যদিও অনেক আগের কথা, তবে কোনো বিশেষ স্মৃতি এখনও মনে পড়ে?

আজহারউদ্দিন: সবার আগে মনে পড়ছে ১৯৯৮ সালের কথা। সেবার সম্ভবত বাংলাদেশে ইন্ডিপেন্ডেন্টস কাপে খেলেছিলাম। আমার যতদূর মনে পড়ে, বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রথম খেলি সেই ১৯৮৮ সালে (বাংলাদেশের মাটিতেই)। এশিয়া কাপে, সঙ্গে শ্রীলঙ্কা (ও পাকিস্তান) ছিল।

আমার যেটা সবচেয়ে ভালো মনে আছে, বাংলাদেশের মানুষ ক্রিকেট-পাগল। তারা দলকে পাগলের মতো সমর্থন করে। যেখানেই বাংলাদেশ খেলে, দেখেছি গ্যালারি দর্শকে পূর্ণ থাকে। দেশের বাইরেও এখন ওদের প্রচুর সমর্থক রয়েছে। ইংল্যান্ডে গত বিশ্বকাপে দেখেছি, প্রতিটি ম্যাচে বাংলাদেশের অনেক দর্শক ছিল গ্যালারিতে। দেশের বাইরে ১০-১৫ হাজার সমর্থক পাওয়া কিন্তু সহজ কথা নয়। ওদের কিন্তু একটাই চাওয়া, বাংলাদেশ ভালো খেলুক। এই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও তিন ভেন্যুতে বাংলাদেশের প্রচুর সমর্থক ছিল মাঠে।

দর্শকদের এই চাওয়া তো প্রায়ই পূরণ করতে পারছে না বাংলাদেশ। বিশেষ করে দেশের বাইরে। একটা সময় তো ভারতও এই অবস্থার মধ্য দিয়ে গেছে। কোনো পরামর্শ?

আজহারউদ্দিন: সবার আগে আমি যে কথাটা বলতে চাই, বাংলাদেশের খেলতে হবে ভালো উইকেটে। ভালো উইকেট বলতে আমি বোঝাচ্ছি, যেখানে ব্যাটসম্যান-বোলার সবার জন্য সুবিধা থাকবে। আমি যতদূর দেখেছি, ওরা দেশের মাটিতে ‘টেইলর মেইড’ উইকেটে খেলে। ওরা যখন মন্থর, টার্নিং উইকেটে খেলে সেখানে বোলাররা খুব ভালো করে। কিন্তু যখন ওরা দেশের বাইরে খেলে তখনই ঝামেলা হয়। বল সেখানে টার্ন করে না, ওরা উইকেট থেকে সহায়তা পায় না, সমস্যা হয়ে যায়। আমার মনে হয়েছে, এটা এমন একটা ব্যাপার যেখানে বাংলাদেশের মনোযোগ দেওয়া দরকার।

দেশের বাইরে উন্নতি করতে হলে, দেশের মাটিতে উইকেট ও কন্ডিশনে পরিবর্তন আনা দরকার। ভালো উইকেটে খেলার সামর্থ্য কিন্তু বাংলাদেশের আছে। তাদের খুব ভালো মানের কয়েকজন পেসার রয়েছে। তারা সীমিত সুযোগের মধ্যে তাদের সামর্থ্যও দেখিয়েছে। ওদের এমন কিছু উইকেট বানানো প্রয়োজন যেখানে পেসারদের জন্য সহায়তা থাকবে, সুইং, সিম মুভমেন্ট থাকবে। এমন উইকেটে খেললে শুধু বোলাররা না বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের জন্যও ভালো হবে। দেশের বাইরে খেলার এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে।  

সব ধরনের ক্রিকেটে উন্নতির জন্য কি একটাই পথ?

আজহারউদ্দিন: হ্যাঁ, সব ধরনের ক্রিকেটে উন্নতির জন্য মূল ব্যাপার এটাই। বাংলাদেশের উইকেটে উন্নতি করতে হবে, কন্ডিশনে উন্নতি করতে হবে। ওদের ভালো উইকেটে খেলতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত পেসারদের কিছু করার সুযোগ না দেওয়া হচ্ছে, যতক্ষণ পর্যন্ত না ব্যাটসম্যানদের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত উন্নতি তো হবে না। উইকেট যদি টার্নিং হয়, স্পিনাররা তো ভালো বল করবেই। উইকেট তো তৈরিই সে জন্য। কিন্তু যে মুহূর্তে ওরা বাইরে যাবে এবং খেলবে, সব কিছু ওদের জন্য অনেক কঠিন হয়ে যাবে। স্পিনিং উইকেটে ব্যাটসম্যানদের বেঁধে রাখা সহজ। কিন্তু ভালো উইকেটে ভালো ব্যাটসম্যানদের বেঁধে রাখা মোটেও সহজ কাজ নয়।

কিন্তু দেশের মাটিতে অমন উইকেটে খেললে তো প্রতিপক্ষ সুবিধা পেয়ে যাবে…

আজহারউদ্দিন: এটা আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু শিখতে তো হবে এভাবেই, নাকি? হতে পারে পুরো সিরিজ একই ধরনের উইকেটে খেলল না। একটি দুটি-ম্যাচ নিজেদের জন্য খুব সহায়ক নয় এমন উইকেটে খেলল। যদি দেশের মাটিতে এমন উইকেট বানিয়ে খেলে তাহলে সবচেয়ে ভালোভাবে শেখা যাবে। যেখানে অনেক সহায়তা নেই, তেমন উইকেটে খেললেও স্কিল বেশি বাড়বে।

এটা শুধু বোলারদের জন্য নয়, ব্যাটসম্যানদের ব্যাপারেও খাটে। স্পিন মঞ্চ না বানিয়ে, একটু স্পিন আছে, কিছুটা সুইং আছে এমন উইকেটে খেললে বেশি শিখবে। যদি টার্ন অনেক বেশি করে, তাহলে যে কেউই ভালো করতে পারে। সত্যিকারের সামর্থ্যটা সেখানে বোঝা যাওয়ার সম্ভাবনা কম। 

শুধু উইকেটই তো যথেষ্ট নয়। প্রতিপক্ষও তো একটা ব্যাপার। বাংলাদেশ তো ভারতের মতো দলগুলোর বিপক্ষে খেলার সুযোগ খুব বেশি পায় না…

আজহারউদ্দিন: ম্যাচ আসলে সবার সঙ্গেই খেলতে হবে। আর আমার যেটা মনে হয়, সব সময় বেশি ম্যাচ খেলাও জরুরি নয়। উন্নতি করতে চাইলে সেটা অনেকভাবেই করা যায়। যখন ঘরোয়া ক্রিকেট হয়, সেটা হতে পারে ভালো উইকেটে। কেবল স্পিনারদের জন্য সহায়ক উইকেটে না খেলে সেখানে ব্যাটসম্যানদের জন্য সহায়ক উইকেট, পেস বোলারদের জন্য সহায়ক উইকেট রাখা যেতে পারে।

আমি জানি, বাংলাদেশের ভালো স্পিনার আছে। তারা শক্তির জায়গা অনুযায়ীই খেলতে চায়। কিন্তু এখনকার ধারায় থাকলে ওরা কেবল দেশের মাটিতেই ভালো ক্রিকেট খেলবে। বাইরে গেলেই ভুগতে থাকবে। এটা মোটেও ভালো কোনো লক্ষণ নয়, বাংলাদেশের জন্য।

একটা সময় তো ভারতও স্পিন মঞ্চেই খেলত। সেখান থেকে আজকের অবস্থানে এসেছে। বাংলাদেশেরও কি একই পথ অবলম্বন করা উচিত?

আজহারউদ্দিন: ভারত যে সব সময় স্পিন মঞ্চ বানাত, তা কিন্তু নয়। অনেক রকম উইকেটেই খেলত। ব্যাটিং সহায়ক উইকেট ছিল। কোথাও কোথাও পেসারদের জন্য সহায়ক উইকেটও ছিল। এতো ভিন্ন ধরনের উইকেটে খেললে যেটা হয়, একজন খেলোয়াড় যে কোনো কন্ডিশনে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে।

বাংলাদেশের এখন যে স্পিনার আছে তাদের বেশিরভাগই তরুণ। ওরা ভালোও করছে। কিন্তু অনেক রকম কন্ডিশনে খেলার অভিজ্ঞতা তাদের নেই। এখনই ওদের সময়, বিভিন্ন ধরনের উইকেটে খেলে ঋদ্ধ হওয়ার। নইলে হয়ত, বেশি দেরি হয়ে যাবে।

কদিন পরেই দেশের মাটিতে পাকিস্তানের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ। শুরুতে হবে তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ। বিশ্বকাপ ব্যর্থতার পর দলের আত্মবিশ্বাস তলানিতে। এমন পরিস্থিতিতে তাদের চাঙা করতে কোনো পরামর্শ?

আজহারউদ্দিন: ওদের একটাই কথা বলব, সব সময়ই ইতিবাচক থাকতে হবে। ব্যর্থতা খেলার অংশ। কখনও জিতবে, কখনও হারবে। শুধু ক্রিকেটে না জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেও কিন্তু উত্থান-পতন থাকে। কিন্তু কখনও হাল ছাড়তে হয় না। সব সময়ই শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে হয়।

যদি হাল ছেড়ে দাও, এর অর্থ তুমি যথেষ্ট দৃঢ় নও। কখনও হাল ছেড়ো না। কঠোর পরিশ্রম করে যাও। তুমি নিজেই জানো কি ভুল হয়েছে, কেন ব্যর্থ হয়েছো। উন্নতি করো, তাহলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক