ঢাবির ভৌত মহাপরিকল্পনার আগে প্রয়োজন শিক্ষার মহাপরিকল্পনা: শিক্ষামন্ত্রী

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার একশ বছর পর শিক্ষার সার্বিক পরিবেশের উন্নয়নে যে মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে, তার আগে একটি যুগোপযোগী অ্যাকাডেমিক মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের ওপর জোর দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি।

নিজস্ব প্রতিবেদকও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 1 Dec 2021, 01:07 PM
Updated : 1 Dec 2021, 01:07 PM

তিনি বলেছেন, সেই অ্যাকাডেমিক মহাপরিকল্পনা করতে হবে একুশ শতকের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য রেখে, ভৌত মহাপরিকল্পনা হবে তার পরিপূরক।

বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষপূর্তি ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনে পাঁচ দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য আয়োজনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য ও রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে এ অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে শতবর্ষের তথ্যচিত্র প্রদর্শন এবং 'থিম সং' পরিবেশন করা হয়।

রাষ্ট্রপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষপূর্তি ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে প্রকাশিত ছয়টি গ্রন্থ এবং ওয়েবসাইট উদ্বোধন করেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং ভিডিও বার্তায় শুভেচ্ছা জানান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে বুধবার দুপুরে দেশের সর্বপ্রাচীন এই উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শতবর্ষ উদযাপনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া অতিথিদের একাংশ। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

গত ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ পূর্ণ হয়। করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে বন্ধ ক্যাম্পাসে সেদিন সীমিত পরিসরে দিনটি পালন করা হয়। কযেক দফা পিছিয়ে উধবার সেই উদযাপনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হল। 

অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শতবর্ষে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে, জোর দিতে হচ্ছে শিক্ষার মানোন্নয়নের দিকে।

“বিগত একশ বছরের পদযাত্রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে যেতে হয়েছে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে। শুরুর এক দশকে এ বিশ্ববিদ্যালয় যে সুনাম অর্জন করেছিল, দুঃখজনক হলেও সত্যি, সেই অগ্রযাত্রার গতি নানা কারণে ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। সে কারণে আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের হারানো গৌরবের কথা ফিরিয়ে আনার কথা ভাবতে হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেপররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, “আমার বিনীত নিবেদন, ভৌত মহা পরিকল্পনার আগেই যে অ্যাকাডেমিক মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন প্রয়োজন, একুশ শতকের বিশ্বের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য রেখে জ্ঞান সৃষ্টি, জ্ঞান চর্চা, মুক্তবৃদ্ধির চর্চার মধ্য দিয়ে কর্মপযোগী আধুনিক, বিজ্ঞানমনষ্ক, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে দক্ষ মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন সুনাগরিক তথা বিশ্বনাগরিক গড়ে তুলতে উচ্চ শিক্ষায় যে পুনর্গঠন বা পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন, তা সম্পন্ন করে তৈরি করুন শিক্ষার, জ্ঞানের, দক্ষতার, গবেষণার অ্যাকাডেমিক মহাপরিকল্পনা। তাকে পূর্ণতা দিতে বাস্তবায়িত হোক ভৌত মহাপরিকল্পনা।”

এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অব মেডিসিন থেকেই ঢাকা মেডিকেলের এমবিবিএস ডিগ্রি পাওয়া দীপু মনি বলেন, “আমাদের প্রত্যাশা, আমরা আবার পাব ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সত্যেন্দ্রনাথ বোস, রমেশচন্দ্র মজুমদার, কাজী মোতাহার হোসেনের মতো জ্ঞান চর্চার উজ্জ্বল নক্ষত্র। রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা আপনাদের সঙ্গে আছেন এবং সব সময় থাকবেন।”

ঔপনিবেশিক আমলে বঙ্গভঙ্গ রদের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ায় ঘটনার আবর্তে ১৯২১ সালের ১ জুলাই রমনার সবুজ প্রাঙ্গণে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পূর্ববঙ্গের প্রথম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামসহ বাঙালির প্রতিটি গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের সূতিকাগারের মতো ভূমিকা রাখে এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃত্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

সেই ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, পূর্ব বাংলা তখনও দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবের ঢেউ মোকাবেলা করার জন্য যথেষ্ঠ প্রস্তুত ছিল না। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ‍শিল্প বিপ্লবের ঢেউ সামাল দেওয়ার মত দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। যদিও আমরা সেই শিল্প বিপ্লবগুলোর সফল অংশীদার আমরা হতে পারিনি।

“বর্তমানে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সারা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার দক্ষ কর্মীবাহিনী গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এই বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের পথ দেখিয়ে যাবে, এমনটাই প্রত্যাশা আমাদের।”

এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, “দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আমি ভাগ্যবান যে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হওয়ার সুযোগ আমার হয়েছিল। আমাদের গর্ব করার অনেক কিছু আছে।

“আমাদের যা কিছু অর্জন; মাতৃভাষা, স্বাধীকার আন্দোলন, সাংস্কৃতিক জাগরণ কিংবা গণজাগরণ, স্বদেশি সংস্কৃতি ও মননশীলতা, সবকিছুর অগ্রভাগে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আমাদের ঐতিহ্য অত্যন্ত গৌরবের। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে আমরা জাতীয় অনেক সমস্যার সমাধান পেয়েছি।”

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক কাজী শহীদুল্লাহ বলেন, “গত একশ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাতিকে একটি সাকসেসফুল লিডারশিপ উপহার দিয়েছে। আগামী একশ বছর কী হবে, তা নিয়ে আামাদের ভাবতে হবে। আমাদের মাইন্ডসেট চেইঞ্জ করতে হবে। ট্র্যাডিশনাল সিস্টেমস থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমাদেরকে আউটকাম বেইজড অথবা স্কিলবেইজড এডুকেশন দরকার, অ্যাকাডেমিক-ইন্ডাস্ট্রি কো-রিলেশন দরকার।”

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান বলেন, পূর্ব বাংলার অবহেলিত জনপদে একটি শিক্ষিত, বুদ্ধিদীপ্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ ঘটিয়ে একটি জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং সেই রাষ্ট্রের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির বিবর্তন ও উন্নয়নে অব্যাহতভাবে কোনো একক প্রতিষ্ঠান অনন্য ও অসাধারণ ভূমিকা রেখেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্বে এর তুলনা ‘বিরল’।

“আন্তর্জাতিক জ্ঞানরাজ্যেও এর অবদান অনস্বীকার্য। একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মেকাবেলায় আমরা বিশ্ববিদ্যালয়কে গড়ে তোলার চেষ্টা করছি।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক  মুহাম্মদ সামাদ অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন; স্বাগত বক্তব্য দেন উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) ও শতবর্ষ উদযাপন কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটির সদস্য-সচিব অধ্যাপক  এ এস এম মাকসুদ কামাল ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার প্রবীর কুমার সরকারের সঞ্চালনায় বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশেনের সভাপতি এ কে আজাদও অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক