ক্রেতার অপেক্ষায় গাবতলী পশুর হাট

ঢাকার সবচেয়ে বড় পশুর হাট গাবতলীতে স্থায়ী অবকাঠামোর বাইরেও পশ্চিমে বুড়িগঙ্গা নদীর পাড় ধরে দক্ষিণ পূর্ব পাশে ইটের ভাটাগুলোতে বসানো হয়েছে অস্থায়ী হাট। আগের রাত থেকে যেখানে কোরবানির পশু আসা শুরু হয়েছে; নিয়মিত বিরতিতে নতুন পশু আসছে। ক্রেতা দর্শনার্থীও হাটে আসছেন, দাম দর করছেন; তবে কিনছেন কম জানালেন ব্যাপারিরা।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 6 July 2022, 04:40 PM
Updated : 7 July 2022, 04:36 AM

বুধবার ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে কোরবানির পশুর হাট আনুষ্ঠানিকভাবে শুরুর প্রথম দিন থেকেই ক্রেতা বিক্রেতাদের হাঁকডাকে সরব হতে শুরু করেছে গাবতলীর এ হাট। এদিন রাজধানীতে আরও ২০টি হাটেও কেনাবেচা শুরু হয়েছে। সিটি করপোরেশনের তালিকার বাইরে পাড়া-মহল্লাতেও রয়েছে কিছু হাট। আর ডিজিটাল হাট নিয়ে চলছে প্রচার।

এদিন সকালে এক পশলা ভারী বৃষ্টির পরও বিকালে গাবতলীতে পরিচ্ছন্ন পরিবেশই পেয়েছেন ক্রেতা-দর্শনার্থীরা। খুব বেশি ভিড় না থাকায় ঘুরেফিরে পছন্দের পশু দেখেছেন সময় নিয়ে। প্রথম দিনে গরু-মহিষ, ছাগল-ভেড়ার বড় সংখ্যক সমারোহ চোখে পড়লেও বিক্রি এখনও জমে ওঠেনি। তবে বছরজুড়ে পশু কেনাবেচার এ হাটে ঈদের আমেজ শুরু হয়েছে আরও কয়েক দিন আগে থেকেই।

দুপুরে গাবতলীর এ হাটে গিয়ে দেখা যায়, মূল প্রবেশ মুখের কাছে তৈরি অস্থায়ী অবকাঠামোতেই বড় গরুগুলো জায়গা পেয়েছে। ঢোকার পর হাতের ডান দিকে এগিয়ে গেলে প্রথমে ছাগল-ভেড়া এবং তারপর মহিষ ও দুম্বার সারি। অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের গরুগুলোও এর আশেপাশে।

হাটের ব্যবস্থাপক আবুল হাশেম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, কোভিড মহামারী পরিস্থিতির কারণে গত দুই বছর কোরবানির ঈদে পশুর হাট অতটা জমেনি। এবার তারা ভালো কিছু আশা করছেন।

ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে খামারি ও ব্যাপারীরা পর্যাপ্ত পশু নিয়ে হাটে এসেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ঢাকার ঐতিহ্যবাহী এ হাটে সব ধরনের গরুই আছে। তবে এখনও বেচাবিক্রি জমে উঠেনি। হয়তো অফিস খোলা থাকার কারণে এমনটা হচ্ছে। রাতের দিকে বেচাবিক্রি বাড়তে পারে। বৃহস্পতিবার হাটের বেচাবিক্রির প্রকৃত চিত্র বোঝা যাবে।

এবার গাবতলীতে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা দামের ‘সৌখিন’ গরুর পাশাপাশি ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা দামের ছোট গরুও আছে বলে জানান হাশেম। আগামী শুক্রবার মধ্যপ্রাচ্যের কিছু উট হাটে আসবে বলে আশা করছেন তারা।

“এখানে গরুর পাশাপাশি মহিষ, খাসি, ভেড়া ও দুম্বা রয়েছে। আগামী শুক্রবার কিছু উট আসবে বলে বিক্রেতারা যোগাযোগ করছেন,” বলেন তিনি।

স্বপ্নরাজ দাম পাবে কত?

হাটের মূল প্রবেশ মুখেই কোরবানি উপলক্ষে বড় সৌখিন গরুগুলোকে স্থান দেওয়া হয়েছে। এমনই একটি গরু হচ্ছে স্বপ্নরাজ। পাবনার খামারি মোজাম্মেল হক বাবু লালন পালন করে বেড়ে তুলেছেন এটিকে। চার বছর বয়সী এই ফিজিয়ান ষাড় তার খামারেই জন্ম হয়েছিল বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, ভালো যত্ন ও রক্ষণাবেক্ষণ পেয়ে এখন ৩৫ মন ওজনের অধিকারী হয়েছে ‘স্বপ্নরাজ’। যেটির দাম হাকছেন তিনি ১৭ লাখ।

কেমন সাড়া পাবেন জানতে চাইলে মোজাম্মেল বাবু বলেন, ৫০ বছর ধরে গরু লালন পালন করছি। সবাই বলেছে হাটের ১০টা সুন্দর গরুর মধ্যে আমার স্বপ্নরাজ থাকবে। আমি আপাতত ১৭ লাখ টাকা দাম চাচ্ছি। বাকিটা বাজারের ওপর নির্ভর করবে।

মঙ্গলবার রাতেই নিজের ছোট ভাই, ভাগিনাসহ পাঁচজন সঙ্গীকে নিয়ে হাটে এসেছেন মোজাম্মেল। হাটের খুব সুবিধাজনক স্থানে অবস্থান নিতে পেরে খুব খুশি তিনি।

“এখনও হাট জমে উঠেনি, ক্রেতা আসেনি। তেমন দরদাম কেউ করেনি। দেখি রাতের দিকে কী পরিস্থিতি হয়,” বলেন এ অভিজ্ঞ খামারি।

বগুড়ার শেরপুর থেকে আসা হাজী হামিদুল হক সরকার বেলাল জানান, মঙ্গলাবার রাত ৮টার দিকে গাবতলীতে এসে ঠিকঠাক মত জায়গা করে নিতে পেরেছেন তিনি। একটি শাহিওয়াল, আরেকটি সিন্দি জাতের গরু এনেছেন। শাহিওয়ালের আট দাঁত আর সিন্দিটা চার দাঁত। এদের বয়স যথাক্রমে সাড়ে চার ও চার বছর।

দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ট্রাকে করে ঢাকার পশুর হাটগুলোতে আসছে গরু। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

“আমরা গ্রাম থেকে আসছি, শখ করে ২/৪টা গরু লালনপালন করি। বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী বিক্রি করে দেব। খুব বেশি বারগেইনিংয়ে যাব না। আমার টার্গেট আছে দুইটা গরু ১২ লাখ টাকায় বিক্রি করে দেব। কেউ যদি দুইটা একসাথে নেয় তাহলে হয়ত কিছু কম রাখব।“

দেড় বছর ধরে এ দুটো লালন পালন করছেন, যা প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকায় তিনি কিনেছিলেন বলে জানান।

টাঙ্গাইলের ভুয়াপুর থেকে আসা শহিদুল ইসলাম ৯০টি ভারতীয় জাতের গরু নিয়ে এসেছেন। ভারত থেকে এক বছরের বাছুর নিয়ে এসে গত তিন বছর ধরে লালন পালন করেছেন। প্রতিটি গরুর দাম চাইছেন ৬ লাখ থেকে ৮ লাখ টাকা। দুএকটি আছে ১০ লাখ টাকা দামের।

তিন দিন ধরে গাবতলী হাটে আছেন তারা। তিনটি গরু বিক্রি হয়েছে, যার মধ্যে বড় একটির দাম পেয়েছেন ৮ লাখ টাকা। অন্য দুটোর একটি সাড়ে ৫ লাখ ও একটি ছয় লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন।

ঢাকার ভাটারা অস্থায়ী পশুর হাটে গরু নিয়ে আসা এক খামারি গোখাদ্য তৈরিতে ব্যস্ত। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

আরেক বিক্রেতা মোহাম্মদ লিটন সোমবার এসেছেন নাটোর থেকে। এক লাখ ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যে তার অধিকাংশ গরু। দুই থেকে শুরু করে চার দাঁতের গরু রয়েছে তার কাছে। সব নিজের হাতেই লালন পালন করেছেন।

“আমি ছোট গরুই লালন পালন করি। এদের রোগবালাই কম হয়। খাবার খরচ কম। খাবার খাওয়াতে হয় কম।“

আমজাদ হোসেন নয়টি দুম্বা নিয়ে এসেছেন। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে কয়েক মাস ধরে দেশে লালন পালন করেছেন।

তিনি বলেন, দুম্বাগুলোর দাম দুই লাখ থেকে তিন লাখ টাকার মধ্যে চাচ্ছি। হাটে মোট নয়টি দুম্বা আনা হয়েছিল। কয়েকটি বিক্রি হয়ে গেছে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক