এই গরমে লবণ না দিলে নষ্ট হবে চামড়া, শঙ্কায় ব্যবসায়ীরা

কোরবানির ঈদের আগে লবণের দাম বাড়ায় শঙ্কা প্রকাশ করে পশুর চামড়া নষ্ট হওয়া ঠেকাতে এবারও কোরবানিদাতাদের নিজ উদ্যোগে কয়েক কেজি লবণ মিশিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

ফয়সাল আতিক নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 4 July 2022, 05:13 PM
Updated : 4 July 2022, 05:51 PM

তারা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে গরম আবহাওয়ার কারণে কোরবানির পশু জবাই করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে চামড়ায় লবণ না মেশালে এর মান নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

কিন্তু গত বছরের তুলনায় এবার লবণের দাম ৫৭ শতাংশ বেড়ে প্রতি কেজি ১১ টাকায় উঠায় মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে অনীহা সৃষ্টি হয় কি না সেই আশঙ্কা করছেন চামড়া ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ হাইড মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আফতাব খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গতবছর যেই লবণের কেজি ৭ টাকা করে ছিল এবার সেটা বেড়ে ১১ টাকা হয়ে গেছে।

“লবণ ব্যবসায়ীরা কী কারণে দাম বাড়িয়ে দিলেন বুঝতে পারছি না। লবণের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে হয়তো কোরবানিদাতাদের মধ্যে নিজ উদ্যোগে চামড়ায় লবণ দেওয়ার আগ্রহ কমে যেতে পারে।”

গত বছরও লবণ দিতে দেরি হওয়ায় সংগ্রহ করা অনেক চামড়া শেষ মুহূর্তে বেচাকেনার অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে আড়তদারের চেয়ে কোরবানিদাতা এবং তৃণমূল পর্যায়ে সংগ্রাহকদের উদ্যোগী হতে পরামর্শ দেন তিনি।

আড়ত থেকে লবণযুক্ত চামড়া ট্রাকে তুলছেন এক শ্রমিক। ছবি: আব্দুল্লাহ আল মমীন

তাপমাত্রা বেশি থাকার কারণে গত বছর কোরবানির রাত এবং পরের দিন কাঁচা চামড়ার সবচেয়ে বড় আড়ত পুরান ঢাকার পোস্তাসহ বিভিন্ন এলাকায় অনেক মৌসুমী ব্যবসায়ীর চামড়া গ্রহণ করেননি আড়তদারেরা।

আফতাব খান বলেন, “এখন গরমের মওসুম হওয়ায় কোরবানির ৬/৭ ঘণ্টার মধ্যে চামড়ায় লবণ না দিলে তা টেকানো যাবে না। শীতকাল হলে হয়তো কোরবানির ২০/২৫ ঘন্টা পর লবণ দিলেও সমস্যা হয় না।”

গতবছরও কোরবানিদাতাদের নিজ উদ্যোগে চামড়ায় লবণ দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, “তারপরেও কিছু চামড়া নষ্ট হয়েছিল। এবারও সেই ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে।

“অন্যথায় চামড়ার মান খারাপ হয়ে গেলে ভালো দাম দিয়ে কেউ সেই চামড়া কিনবে না। তখন একটা সমস্যার সৃষ্টি হবে।”

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, দেশে বছরে লবণের চাহিদা ২৩ লাখ টন। আর কোরবানির সময় লাগে ৫৫ থেকে ৬০ হাজার মেট্রিক টন।

চামড়া শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, “প্রতিবছর যথাসময়ে লবণ না দিয়ে চামড়া নষ্ট করে ফেলে। এটা নিয়ে আমরা শঙ্কা করতেছি।

“এবার লবণের দামটাও অতিরিক্ত বেশি। গতবছর লবণের বস্তা (৭৪ কেজি) যেখানে ৭০০ টাকা ছিল এবার সেটা ১১০০ টাকা। দাম বেশি হওয়ার কারণে চমড়ায় লবণ দেওয়ার প্রবণতা কম থাকতে পারে বলে শঙ্কায় আছি।”

তবে লবণের দাম এমন বেড়ে যাওয়া দেশে অন্যান্য পণ্যের তুলনায় ‘খুব বেশি নয়’ বলে মনে করছেন বাংলাদেশ লবণ মিল মালিক সমিতির সভাপতি নুরুল কবির।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “গত কয়েক বছরে বৈধ-অবৈধ উপায়ে লবণ আমদানির চাপে দেশীয় লবণের দামটা খুব লাভজনক ছিল না।

“এখন লবণের দাম বৃদ্ধির ফলে মিলগুলো লাভে ফিরে এসেছে, পাশাপাশি লবণ চাষিরাও ভালো দাম পাচ্ছেন। তবে বাংলাদেশে অন্যান্য পণ্যের তুলনায় ১১/১২ টাকা লবণের কেজি খুব বেশি কিছু নয়।”

এবার চামড়ার বাজার কিছুটা ভালো হওয়ার আশাবাদ জানিয়ে এক কোটির কিছু বেশি গরু, মহিষ ও খাসি-ভেড়া কোরবানি হতে পারে বলে মনে করছেন ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত।

আগামী ১০ জুলাই ঈদুল আযহা। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে দেশে মোট ৬ লাখ ৮১ হাজার ৫৩২ জন খামারির কাছে এক কোটি ২১ লাখ ২৪ হাজার ৩৮৯টি পশু রয়েছে। আর কোরবানির সম্ভাব্য চাহিদা ৯৭ লাখ ৭৫ হাজার ৩২৫টি।

কোরবানিযোগ্য পশুর মধ্যে ৪৪ লাখ ৩৭ হাজার ৮৯৭টি গরু, ১ লাখ ৭৩ হাজার ৫০৪টি মহিষ, ৬৫ লাখ ৭৩ হাজার ৯১৫টি ছাগল, ৯ লাখ ৩৭ হাজার ৬৮২টি ভেড়া এবং অন্যান্য পশু আছে ১ হাজার ৪০৯টি।

বাড়তে পারে চামড়ার দাম

গত কোরবানির ঈদে চামড়ার যে দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল এবার তারচেয়ে একটু বাড়তে পারে জানিয়ে বাংলাদেশ হাইড মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আফতাব খান বলেন, “এখন সরকার কী সিদ্ধান্ত দেয় সেটাই দেখার বিষয়।”

দাম কতটা বাড়তে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “খুব বেশি নয়, প্রতি বর্গফুটে ২/৩ টাকা বাড়তে পারে। একটা চামড়ায় হয়তো ৫০/৬০ টাকা দাম বাড়বে।”

২০২১ সালে ঢাকার আড়তে লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরু বা মহিষের চামড়া আগের বছরের চেয়ে ৫ টাকা বাড়িয়ে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ঢাকার বাইরেও ৫ টাকা বাড়িয়ে ৩৩ টাকা থেকে ৩৭ টাকা করা হয়েছিল।

এছাড়া সারা দেশে লবণযুক্ত খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ১৫ থেকে ১৭ টাকা, আর বকরির চামড়া প্রতি বর্গফুট ১২ থেকে ১৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

ঢাকার হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে চামড়া শিল্প স্থানান্তরের পর থেকে দেশে কাঁচা চামড়ার বাজার পড়তে শুরু করে। বিভিন্ন জেলায় কোরবানির চামড়া বিক্রি করতে না পেরে মাটিতে পুঁতে ফেলার ঘটনাও আলোচনায় আসে।

তবে গত তিন বছর ধরে চামড়া রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, পাশাপাশি কাঁচা চামড়ার দামও কিছুটা বেড়েছে।

অবশ্য এবারও চামড়ার বাজার নিয়ে খুব বেশি আশার কিছু দেখছেন না ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি ও হাজারীবাগ (১৪ নম্বর ওয়ার্ড) এলাকার কাউন্সিলর ইলিয়াস রহমান বাবুল।

তিনি বলেন, “এবারও চামড়ার বাজার ভালো হবে না। কারণ ট্যানারি মালিকদের হাতে কোনো টাকা নাই। রাসায়নিকের দাম বেড়ে গেছে। মহামারীর কারণে অনেক ট্যানারি মালিক আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।

সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে ৩২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রসঙ্গে ইলিয়াস বলেন, “চীনের ব্যবসায়ীরা কিছু পণ্য নিয়েছে, তবে ভালো বা দামি পণ্য নেয়নি। যেগুলোর কোয়ালিটি একেবারেই ডেমেজ, সেগুলো নিয়েছে।

“যেখানে ২ ডলার থেকে আড়াই ডলার দাম রয়েছে সেখানে তারা ৬০ সেন্ট থেকে ৭০ সেন্টের দাম চামড়া নিয়েছে।”

তিনি  বলেন, “প্রতিফুট চামড়ায় ৩০ টাকা থেকে ৩৫ টাকা খরচ করে একটা চামড়া ক্রাস্ট পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। ট্যানারিগুলোতে এখনও প্রচুর চামড়া জমা হয়ে আছে। সারা পৃথিবীতে চামড়ার ব্যবসা ডাউন হয়ে গেছে।

“ইউরোপীয় ইউনিয়নে চামড়া রপ্তানির বড় বাজার থাকলেও কারখানায় মানসম্মত কর্মপরিবেশ না থাকার কারণে বাংলাদেশের পণ্য এসব দেশে প্রবেশাধিকার পাচ্ছে না।”

আরব ট্যানারির সত্ত্বাধিকারী ইলিয়াসুর বলেন, “ইতালি, ব্রাজিলসহ ইউরোপের বড় বড় দেশগুলো ফিনিশ লেদারের অন্যতম ক্রেতা। কিন্তু এসব দেশে আমরা চামড়া রপ্তানি করতে পারিনি।

“আমাদের হেমায়েতপুর চামড়া শিল্প নগরীর রাস্তাঘাট সুন্দর হলেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি ভালো নয়। একসাথে বড় ৪/৫টি কারখানা কাজ শুরু করলেই সিইটিপি উপচে ময়লা পানি নদীতে পড়ে।” 

২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে প্রায় ১০২ কোটি ডলার আয় করেছিল। তার পরের অর্থবছরেই তা ৭৯ কোটি ৭৬ লাখ ডলারে নেমে যায়।

তবে ২০২০-২০২১ অর্থবছরে এ খাতে আয় বেড়ে ৯৪ কোটি ১৬ লাখ ডলার হয়েছে। পরবর্তী ২০২১-২০২২ অর্থবছরে ১২৪ কোটি ৫১ লাখ ডলারের চামড়া ও চামড়া জাতীয় পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যাতে ৩২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।

আরও খবর:

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক