ইলেকট্রিক মোটরসাইকেলের জোয়ার এশিয়াজুড়ে

যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপে ইলেকট্রিক ভেহিকেল’ বা ‘ইভি’ বললে মানুষ বোঝে টেসলার মত কোনো বিদ্যুৎচালিত গাড়ি, তবে এশিয়া, বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ‘ইভি’র প্রতিরূপ হয়ে উঠছে ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 28 June 2022, 02:22 AM
Updated : 28 June 2022, 04:16 AM

আপনি যদি এশিয়ার দেশগুলোতে ভ্রমণ করেন, বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, চীন কিংবা ভারতে, চারপাশে এ ধরনের প্রচুর ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল আপনার চোখে পড়বে।

এ অঞ্চলে পেট্রোল-চালিত সাধারণ মোটরসাইকেলের বাজারটি ধীরে ধীরে ইলেকট্রিক মোটরসাইকেলে বদলে যেতে শুরু করেছে। এশিয়ার দেশগুলোতে বিদ্যুৎচালিত দুই চাকার এ বাহনের সম্ভাবনাময় বিশাল বাজারের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে বিবিসির এক প্রতিবেদনে।

তাইওয়ান, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া বা থাইল্যান্ডে মোটরসাইকেল অনেকটা পারিবারিক গাড়ির ভূমিকা পালন করে, কারণ গাড়ির চেয়ে এ বাহন অনেক দিক দিয়েই সাশ্রয়ী। ফলে এসব দেশে দুই-চাকার মোটরসাইকেলে চড়ে পুরো পরিবারের দৈনন্দিন যাত্রা খুবই স্বাভাবিক একটি দৃশ্য।

বিবিসি লিখেছে, বিশ্বের যত মোটরসাইকেল বিক্রি হয়, তার অর্ধেক বেচা হয় এশিয়ায়। এখানে এমন দেশও আছে, যেখানে পরিবারে একটি মোটরসাইকেল না থাকাটা অস্বাভাবিক একটি বিষয়।

থাইল্যান্ডের কথাই ধরা যাক, বিশ্বে মাথাপিছু সবচেয়ে বেশি মোটরসাইকেলের মালিক থাইরা। এ দেশের ৮৭ শতাংশ পরিবার অন্তত একটি মোটরসাইকেলের মালিক। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে থাইরা ব্যবহার করেন স্কুটার। চালক তার দুই পা সরাসরি সামনে একটি পাদানিতে রেখে এ বাহন চালাতে পারেন।

পরিবারপিছু মোটরসাইকেল ও স্কুটার ব্যবহারে থাইল্যান্ডের পর আছে ভিয়েতনাম (৮৬ শতাংশ), ইন্দোনেশিয়া (৮৫ শতাংশ) এবং মালয়েশিয়া (৮৩ শতাংশ)।

চীন ও ভারতের ক্ষেত্রে এই হার কিছুটা কম; যথাক্রমে ৬০ ও ৪৭ শতাংশ পরিবার অন্তত একটি মোটরসাইকেলের মালিক এ দুই দেশে। তারপরও এই সংখ্যা যুক্তরাজ্যের চেয়ে ঢের বেশি, সেদেশে পরিবারপিছু মোটসাইকেল ব্যবহারকারীর হার মাত্র ৭ শতাংশ।

এশিয়ার বেশিরভাগ মোটরসাইকেল এখনও পেট্রোলচালিত। তবে পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব দেশের বাজারে দ্রুত বাড়ছে ইলেকট্রিক মোটরসাইকেলের সংখ্যা।

ইকনোমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের পরিবহন বিশ্লেষক আরুশি কোতেচা বলেন, “[ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল বিক্রিতে] আমরা বিপুল সম্ভাবনা দেখছি, বিশেষ করে এশিয়ায়। প্রথম কারণ হচ্ছে এর দাম, ব্যক্তিগত আয় থেকেই এই বাহন কেনা সম্ভব। বিশেষ করে চীনের বাইরে, ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে। গড় আয় এখনও অনেক কম হওয়ায় গাড়ি কেনার সামর্থ্য অধিকাংশ মানুষের নেই।

“আর বিশেষ করে এই সময়ে, যখন খাদ্য ও জ্বালানির দাম খুবই বেড়ে গেছে। এই সময়ে পেট্রোলচালিত একটি বাহনের মালিক হওয়া মানে বড় ধরনের খরচের বোঝা মাথায় নেওয়া। সে কারণেই আমাদের ধারণা, ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল দ্রুত দখল করে নেবে বাইকের বাজারের একটি বড় অংশ।

আরুশি কোতেচা বলছেন, চলতি দশকের শেষ নাগাদ এশিয়ায় ইলেকট্রিক মোটরসাইকেলের বিক্রি এখনকার তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বাড়তে পারে। বৈশ্বিক চাহিদাও একই হারে বাড়বে বলে তাদের ধারণা।

এ বছরের শুরুর দিকে একটি প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়, ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল বিক্রির অর্থমূল্য ২০২০ সালের এক হাজার ৫৭৩ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ২০৩০ সালে দ্বিগুণ হবে, যার পরিমাণ দাঁড়াতে পারে তিন হাজার ৫২ কোটি ডলারে।

বর্তমানে ইলেকট্রিক মোটরসাইকেলের বৈশ্বিক উৎপাদনের নেতৃত্বে রয়েছে চীন এবং দুই চাকার এসব বাহনের বেশিরভাগই স্কুটার।

বেইজিং-ভিত্তিক এনআইইউ টেকনোলজিস এ খাতের অন্যতম বড় প্রস্তুতকারক। ২০১৫ সালে তারা নিজেদের প্রথম ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল বাজারে আনে।

এনআইইউ টেকনোলজিসের বৈশ্বিক বাজার বিভাগের পরিচালক জোসেফ কনসট্যান্টি তাদের কোম্পানিকে বর্ণনা করেন এভাবে: “যদি টেসলা [যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ইলেকট্রিক গাড়ি নির্মাতা] ও ভেসপার [ইতালির প্রসিদ্ধ স্কুটার প্রস্তুতকারক] সন্তান হয়, সেটাই আমাদের কোম্পানি।”

তিনি বলেন, চীনে ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল আগে থেকে থাকলেও সেগুলো মূলত সীসা অ্যাসিড ব্যাটারি-চালিত। এনআইইউ প্রথম কোম্পানি, যারা ইলেকট্রিক মোটরসাইকেলে আধুনিক লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির ব্যবহার শুরু করেছে। টেসলার গাড়ি বা সাধারণ মোবাইল ফোনেও এ ধরনের ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়।

চীনে ইলেকট্রিক মোটরসাইকেলের বিক্রি বাড়ার ক্ষেত্রে দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারি প্রণোদনাও ভূমিকা রাখছে। তবে কম্বোডিয়া বা লাওয়ের মতো দেশগুলোতে শূন্য থেকেই পথচলা শুরু করেছে ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রি।

চীনভিত্তিক পরিবহন খাত বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান সিনো অটো ইনসাইটসের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক তু লি বলেন, এশিয়াজুড়ে ইলেকট্রিক মোটরসাইকেলের ব্যাপক বিস্তারের আগে বেশ কিছু বিষয়ের সুরাহা করতে হবে। এর একটি হল ব্যাটারি চার্জ করার স্টেশন। কারণ চার্জ করার স্টেশন করা না হলে প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকায় ইলেকট্রিক মোটরসাইকেলের ব্যবহার বাড়বে না।

মোটরসাইকেলের জগতে ইয়ামাহা ও হন্ডার মত বড় কোম্পানিও এখন ইলেকট্রিক মডেল উৎপাদন শুরু করেছে। তবে এশিয়ার বাজারের সামনের সারি নতুন কোম্পানিগুলোই দখল করে রেখেছে।

তাইওয়ানের গোগোরো এ ধরনের একটি কোম্পানি। কয়েক ধরনের ইলেকট্রিক মোটরসাইলেক প্রস্তুত করার পাশাপাশি তারা ব্যাটারি চার্জ করার সমস্যার একটি সমাধান নিয়ে এসেছে।

ব্যাটারি চার্জ করানোর জন্য চালককে এখন আর ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল নিয়ে চার্জিং স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। বরং গোগোরোর চালকদের যেতে হবে তাইওয়ানজুড়ে ছড়িয়ে থাকা দুই হাজার ২০০টি ব্যাটারি স্টেশনের যে কোনোটিতে। সেখানে তারা বিনামূল্যে তাদের মোটরসাইকেলের চার্জ শেষ হওয়া ব্যাটারি বদলে পূর্ণ চার্জসহ ব্যাটারি নিতে পারবেন।

গোগোরোর এই ব্যাটারি স্টেশনগুলো ২৪-ঘণ্টা চালু থাকে এবং সেগুলো টাইফুনের মত ঝড় এবং গ্রীষ্মের চরম গরমেও সেবা দিয়ে যেতে পারবে বলে এ কোম্পানির দাবি।

গোগোরো এখন এশিয়াজুড়ে তাদের অংশীদারদের কাছে এই ব্যাটারি-বদলানোর হার্ডওয়ার ও সফটওয়ার সহজলভ্য করার পরিকল্পনা করছে। তাদের অংশীদারদের মধ্যে আছে ভারতের হিরো, ইন্দোনেশিয়ার গোজেক, ও চীনের ইয়াদেয়া কোম্পানি। ইয়ামাহার সঙ্গেও অংশীদারিত্ব গড়ার কাজ করছে তারা।

গোগোরোর প্রধান নির্বাহী হোরেইস লুক জানান, ইলেকট্রিক মোটরসাইকেলের জগতের‘অ্যান্ড্রয়েড’ হওয়ার চেষ্টা করছে তাদের কোম্পানি। মোবাইল ফোনের জগতে অ্যান্ড্রয়েড যেভাবে সব মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে তাদের সুবিধাজনক ফোন উৎপাদনের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে, ঠিক সেভাবেই ইলেকট্রিক মোটরসাইকেলের দুনিয়ায় ব্যাটারি ব্যবহারের ক্ষেত্রে একই ধরনের ভূমিকা নিতে চায় গোগোরো। 

এ খাতে অনেক কোম্পানি অনেক বড় স্বপ্ন দেখলেও, কিছু কোম্পানি বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়েছে। ভারতের ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল নির্মাতা ওলা ইলেকট্রিক এরকম একটি কোম্পানি।

গত কয়েক মাস ধরে তারা বার বার সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে, কারণ তাদের একটি মডেলের মোটরবাইকেলে চলার সময় আগুন ধরে যাচ্ছে।

ভারতীয় কোম্পানি ওকিনাওয়া এবং জিতেন্দ্র নিউ ইভি টেকের ক্ষেত্রেও একই রকম আগুন ধরার খবর পাওয়া গেছে। সবগুলো আগুন ধরার ঘটনার সূত্রপাত মূলত ত্রুটিপূর্ণ ব্যাটারি থেকে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক