ডলার বাঁচাতে আমদানি আরও কঠিন করল বাংলাদেশ ব্যাংক

দ্রুত বাড়তে থাকা চাহিদার বিপরীতে ডলার সংকট কাটিয়ে উঠতে অপেক্ষাকৃত কম প্রয়োজনীয় ও বিলাসী পণ্য আমদানি নিয়ন্ত্রণে আরও কড়াকড়ি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক; এখন থেকে এলসি (ঋণপত্র) খুলতে নগদ মার্জিন হার বাড়িয়ে ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত করা হয়েছে।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 10 May 2022, 05:41 PM
Updated : 10 May 2022, 05:43 PM

মঙ্গলবার নেওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ এ পদক্ষেপে বিদেশ থেকে গাড়ি, টিভি, ফ্রিজ, এসির মত বিলাস পণ্য আমদানিতে এলসির মার্জিন হার তিন গুন বাড়ানো হয়েছে।

জরুরি ও নিত্যপণ্য আমদানিতে মার্জিন ঋণ সংক্রান্ত আগের নির্দেশনা বহাল থাকবে বলে সাকুর্লারে বলা হয়েছে। এ নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর করতে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের বলা হয়েছে।

এর আগে গত ১১ এপ্রিলেই জরুরি ছাড়া অন্য পণ্য আমদানিতে একদফা কড়াকড়ি করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

তখন এলসি খোলার ক্ষেত্রে নগদ মার্জিন হার ন্যূনতম ২৫ শতাংশ সংরক্ষণের নির্দেশনা দেওয়া হয়। আগে এ হার ব্যাংক তার গ্রাহকের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে ঠিক করত।

ব্যাংকগুলোকে দেওয়া নতুন নির্দেশনায় বিলাসবহুল গাড়ি ও গৃহস্থালী পণ্য সামগ্রী আমদানি নিরুসাহিত করতে বেশি কড়াকড়ি করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সেডান কার বা এসইউভি এর মত মোটর গাড়ি এবং ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক্স হোম অ্যাপ্লায়েন্স আমদানিতে ঋণপত্র খুলতে ন্যুনতম ৭৫ শতাংশ নগদ মার্জিন সংরক্ষণ করতে বলা হয়েছে।

অপরদিকে একই সার্কুলারে জরুরি ও সুনির্দিষ্ট খাতের কিছু পণ্য ছাড়া অন্য সব পণ্যের আমদানির বিপরীতে ঋণপত্র খুলতে ন্যুনতম ৫০ শতাংশ নগদ মার্জিন সংরক্ষণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

শর্তের বাইরে থাকবে শিশুখাদ্য, অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যপণ্য, জ্বালানি, স্থাস্থ্য অধিদপ্তর স্বীকৃত জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও সরঞ্জামসহ চিকিৎসা সংক্রান্ত কাজে ব্যবহৃত দ্রব্যাদি, উৎপাদনমূখী স্থানীয় ও রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য সরাসরি আমদানিকৃত মূলধনী যন্ত্রাপাতি ও কাঁচামাল, কৃষি খাত সংশ্লিষ্ট পণ্য এবং সরকারি অগ্রাধিকার প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য আমদানি করা পণ্য।

কেন এ পদক্ষেপ

বেশ কিছু দিন ধরে বাড়তে থাকা ডলারের চাহিদা সাম্প্রতিক সময়ে আরও তীব্র হয়েছে; এতে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে টাকার বিপরীতে দামও গিয়ে ঠেকেছে সর্বোচ্চে।

আমদানির পরিমাণ বাড়ায় চলতি লেনদেন ভারসাম্যেও রেকর্ড হয়েছে। বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণও বাড়ছে প্রতি মাসেই।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ডলারের চাহিদা ক্রমাগত বেড়ে তা এখন অনেকটা সংকটের পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে আন্তঃব্যাংক লেনদেনে যেমন দাম বাড়ছে, তেমনি খোলা বাজারে মঙ্গলবার তা প্রায় ৯৩ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।

বেশ কিছু দিন থেকেই ঊর্ধ্বমুখী ডলারের দাম। কোভিড পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর থেকে বিশ্বজুড়ে চাহিদা বাড়ায় পণ্যের দাম বাড়তে থাকে। দেশেও ব্যবসা বাণিজ্য গতিশীল হওয়ায় আমদানির পরিমাণ বাড়ে। এ কারণে ডলারের চাহিদা তৈরি হয় অনেক বেশি; যা ডলারকে ঊর্ধ্বমুখী করে তোলে।

সবশেষ ইউক্রেইন যুদ্ধের পর ডলারের দাম আরও বাড়তে থাকে। সবশেষ আন্ত:ব্যাংক লেনদেনে এবং আমদানির জন্য এলসি খুলতে ব্যাংকগুলোতে প্রতি ডলারের দাম রাখা হয় ৮৬ টাকা ৭০ পয়সা। এক দিনের মধ্যে ডলারের দাম ২০ পয়সা বাড়লে টাকার দাম আরও কমে যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ২৮ এপ্রিল আন্তঃব্যাংক লেনদেনে প্রতি ডলারের দর ছিল ৮৬ টাকা ২০ পয়সা এবং ১ মার্চ ছিল ৮৬ টাকা। এক বছর আগে ২০২১ সালের ১৮ এপ্রিল এ দর ছিল ৮৪ টাকা ৮০ পয়সা।

দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রাবাজারে নিয়মিত ডলার বিক্রি করছে। চাহিদা বাড়ায় ব্যাংকগুলোও প্রতিদিন ডলারের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ধরনা দিচ্ছে।

এমন প্রেক্ষাপটে বৈদেশিক বিনিময়ে ডলার ব্যবহারের চাপ কমাতে আমদানি নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক এলসি মার্জিন বাড়ানোর এ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বলে ব্যাংকার ও কর্মকর্তারা জানান।

মঙ্গলবারের সার্কুলারেও এমন আভাস দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, “কোভিড ১৯ এর প্রভাব এবং বহিঃবিশ্বে যুদ্ধাবস্তার কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার প্রেক্ষিতে দেশের মুদ্রা ও ঋণ ব্যবস্থাপনা অধিকতর সুসংহত রাখতে আমদানি ঋণপত্র স্থাপনে নগদ মার্জিন হার পুর্ননির্ধারণের জন্য নিদের্শনা প্রদান করা হল।“

এর আগে আমদানি পণ্যের লাগাম টানতে গত ১১ এপ্রিল দীর্ঘদিন পর এলসিতে মার্জিন আরোপের নির্দেশনা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

এ বিষয়ে এপ্রিলের শেষ দিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, “এই নিয়মের ফলে বিলাসবহুল পণ্য আমদানি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। আর ডলারের চাহিদাও কমানো যাবে।”

সবশেষ আমদানি ব্যয়সহ অন্য দায় মেটানোর পর বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৪ বিলিয়ন ডলার।

কী বলছেন ব্যবসায়ীরা

ধারাবাহিকভাবে ডলারের দাম বেড়ে চলার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ব্যবসা-বাণিজ্যে। সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমদানিতে, বাড়ছে পণ্যের ব্যয়। বিদেশ যেতে যাদের নগদ ডলারের প্রয়োজন তাদেরও গুনতে হচ্ছে বাড়তি অর্থ।

এমন প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবার এলসি মার্জিন বাড়িয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কড়াকড়ি আরোপের বিষয়ে অবশ্য একমত নন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি মো. রিজওয়ান রহমান।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক কারণে কিন্তু পণ্য আমদানি খরচ বাড়ছে। এর ভুক্তভোগী সবাই। ব্যবসায়ীরাও এক ধরনের চাপের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে এসএমএই প্রতিষ্ঠানগুলো। আমাদের ভোগ্যপণ্যর কয়েকটি পুরোটাই আমদানিনির্ভর।

“এখন এলসি খুলতে কড়াকড়ি করলেই যে সমস্যার সমাধান সম্ভব তা মনে হয় না। বড় বড় আমদানিকারকরা নগদ টাকায় এলসি খুলতে পারেন। তাদের ব্যাংক ঋণও প্রয়োজন হবে না। সেক্ষত্রে কিন্তু মাঝারি ও ক্ষুদ্র আমদানিকারকরা চাপে পড়বেন। বাজার নিয়ন্ত্রণ ও মূল্যস্ফীতির বর্তমান চাপটি আরও বাড়তে পারে।’’

ফাইল ছবি

এটিকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংকট উল্লেখ করে ব্যবসায়ী এই নেতা এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের উদার হওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, “মুনাফার চেয়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে লোকসানও দিয়ে সরবরাহ ঠিক রাখা প্রয়োজন; এটি ব্যবসায়ীদের স্বার্থেই করা উচিত। বাড়তি খরচের কতটুকু ব্যবসায়ী নিজে বহন করবে আর কতটুকু ভোক্তার উপর চাপাবে তা নির্ধারণ করেই ব্যবসা টিকিয়ে রাখা দরকার।“

এ ক্ষেত্রে সরকারি পর্যায়ে কিছু করার সুযোগ আছে কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে রিজওয়ান বলেন, “দ্রুত সিদ্ধান্ত না দিয়ে আরেকটু পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। এই সংকট কী দীর্ঘ হবে, না কি স্বল্প সময়ের জন্য হবে- এটুকু বুঝতে পারার মত সময় অপেক্ষা করেই নীতি সহায়তা দিতে পারে সরকার।“

আমদানিতে উল্লম্ফনের কারণে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়তে থাকায় অর্থনীতিবিদরা আমদানিতে লাগাম টানার পরামর্শ দিয়ে আসছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে আলাপকালে বাংলাদেশ ব্যাংককে ‘আমদানি নিয়ন্ত্রণের’ পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক