রক্ত-মৃত্যু-গৃহহীন নিথর শিশু: সমাধান কীসে?

স্বদেশ রায়
Published : 19 Nov 2011, 05:03 AM
Updated : 5 Sept 2017, 02:49 AM

ওয়াশিংটনের আব্রাম লিঙ্কন মেমোরিয়ালের সামনের সবুজ মাঠে এক চাইনিজ শিশু দৌড়ে এসে আমার হাত ধরে। তারপর গড়গড় করে কথা বলে যায়, কোনো কথা বুঝি না তার। তবে সে হাত ধরে যেদিকে টানছিল সেদিকেই যাই, বাধা দিইনি। বুঝতে পারি আমি তার খেলনা এখন। কিছুক্ষণ আমাকে এভাবে হিড়হিড় করে টেনে আবার আমার হাত ছেড়ে দিয়ে দৌঁড়ে চলে যায়। তার দুরন্ত পায়ে চলে যাওয়া দেখে মনে পড়ে আমার ছেলের ছোটবেলার কথা। তার কাছেও খেলনা ছিলাম আমি। বাবা বাসায় ফিরলে বা বাসায় থাকলে বাবাই হত তার জীবন্ত একটি খেলনা।

সাগরের চড়ায় অ্যালান কুর্দির নিথর ছবিটি দেখে দুচোখ বেয়ে শুধু জল গড়িয়ে পড়েছিল। বারবার মনে হয়েছিল ছুটে যাই আরব সাগরপারে– ওর নিথর হাত ধরে বলি, "অ্যালান, আমি তোমার খেলনা হব। জীবন্ত খেলনা হব। তুমি দুরন্ত হও।"

না, তা পারিনি। বরং ছবিটির দিকে যতবার তাকিয়েছি ততবার মনে হয়েছে কী অক্ষম পিতা আমি। মনে হয়েছে আমার মতো কত কোটি কোটি অক্ষম পিতার দুগণ্ড বেয়ে কেবল দুফোটা অশ্রুই ঝরছে।

অ্যালান কুর্দির পর যদি এক এক করে নিথর শিশুর সারি সাজাতে থাকি, অসহ্য হবে সেটি। তবে নিথর নয়, কোনো এক অব্যক্ত ভাষা দেখেছি সিরিয়ার সেই শিশুটির মুখে, বোমাবিধ্বস্ত বাড়িতে রক্তাক্ত শরীরে যে বসেছিল সোফায়। তখন মনে হয়েছে, "পৃথিবী! তোমাকে তোমার মানবসন্তান কত মহামারী পার করে নিয়ে এল, কত খরতাপে ভরা খরা পার করে নিয়ে এল। এখন তুমি ফসলে ভরা পৃথিবী। তোমার পৃথিবীতে অধিক খাদ্য খেয়ে ওবেসিটিতে মারা গেছে এক দশকে তিন মিলিয়ন শিশু। তাই তুমি এখন আর অন্নরিক্তা ভীষণা নয়। তুমি এখন কেবল এক অদ্ভুত যুদ্ধউম্মাদনায় উন্মাদ পৃথিবী।"

যে দেশে শান্তির দূত, জরা-মৃত্যু থেকে উত্তরণের দূত, বুদ্ধের হাজার হাজার মুর্তি আছে– সেখান থেকে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে এসে নাফ নদীর পানিতে নিথর হয়েছে দুটি শিশু– দুজন পিতা দুই নিথর শিশুকে মাথায় বয়ে পানি থেকে উঠে আসছেন– এই ছবি এসেছে মিডিয়ায়। পড়তে পারিনি পুরো খবর। আগের মতো সেই শক্ত মন পাইনে। বরং শিশু হতে ইচ্ছে করে। বাসায় ফেরার সময় যখন কেউ না কেউ দৌড়ে এসে হাত ধরে বলে, "আঙ্কেল"– তখন মনে হয় এই বুঝি পৃথিবীর সবথেকে বড় সুখ।

ওই দুই জন ওই দুই শিশুর পিতা নন। তবে তারাও আমার মতো পিতা। যে কোনো পিতার কাছে সব শিশুই নিজের শিশু। তাই পিতার মাথায় পুত্রের মৃতদেহ, এ হিমালয় ভার বইবে কে? মানুষ কতকাল আর এ ভার বহন করবে?

মানুষ কেন ক্ষুদ্রতায় বিভক্ত হয়

এ মুহূর্তে পৃথিবীতে বড় কোনো মহামারী নেই। এবোলা এসেছিল। তা-ও মাত্র তিরিশ হাজার মানুষকে আক্রান্ত করেছিল। মারা গেছে ১১ হাজার। তারপর সে মৃত্যুর গতি থমকে দিতে পেরেছেন বিজ্ঞানীরা। পৃথিবীতে এ মুহূর্তে এমন খাদ্যাভাব কোথাও নেই যে, সারাদিন একজন মানুষকে না খেয়ে থাকতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন আর দুর্যোগ নয়। এ মুুহূর্তে পৃথিবীতে মানুষের মৃত্যুর কারণ কোনো কনভেনশনাল যুদ্ধও নয়। বড় বড় মারণাস্ত্র যা তৈরি হয়েছে, পারমাণবিক বোমা যা তৈরি হয়েছে– তা শুধু একজন আরেকজনকে ভয় দেখাতে ব্যবহার করছে। ভয়ের শীতলতায় শান্তি আনার চেষ্টা কেবল।

এ সময় মানুষ মারা যাচ্ছে গোষ্ঠীগত হামলায় আর জঙ্গিপনায়। তবু এভাবে মৃত্যুর ঘটনা হয়তো সারা পৃথিবীর রোড অ্যাক্সিডেন্টে মৃত্যুর চেয়ে বেশি নয়। কিন্তু এ মৃত্যু বিভক্ত করছে মানুষকে। শিয়া সুন্নীকে মারছে, সুন্নী ইয়াজিদিদের। হিন্দু মুসলিমকে হত্যা করছে, মুসলিম হিন্দুকে। বৌদ্ধ মুসলিমকে, হিন্দু বৌদ্ধকে আবার বৌদ্ধ হিন্দুকে আঘাত করছে।

যারা মারা যাচ্ছে তারা সকলেই মানুষ। মারা যাবার পর তাদেরকে সবাই মৃতদেহ বলছে। তখন সকলকেই ইন্দ্রনাথ হতে হচ্ছে। কেউ বলতে পারছে না 'মড়ার আবার জাত কী!' কেন মানুষের ভিতর এই ক্ষুদ্রতা? কেন এ বিভক্তি?

কেন গৃহহীন করা মানুষকে

মানুষের জীবন স্বল্পকালীন। যদিও বলা হচ্ছে, 'স্লোগান হোক, নব্বই হবে জীবনকাল', সেখানে এখনও পৌঁছায়নি পৃথিবী। বাংলাদেশে গড় আয়ু ৭২। ভারতে সেখানে পৌঁছায়নি। মায়ানমারে তো নয়ই। সেই মায়নামার থেকে গৃহহীন মানুষ দলে দলে আসছে বাংলাদেশে। সেই বছরই মায়ানমার থেকে দলে দলে মানুষ বাংলাদেশে আসছে যে বছর বিবিসিসহ গোটা মিডিয়া উপমহাদেশে ৭০ বছর আগে যে মানুষ গৃহহীন হয়েছিল সেই স্মৃতি তুলে ধরছে।

বাংলাদেশের মোহাম্মদপুর ক্যাম্পে, সৈয়দপুর ক্যাম্পে এখনও গৃহহীন মানুষ আছে। গৃহহীন মানুষ ভারতের পথে পথে। যারা একদিন পাকিস্তানের পাঞ্জাব থেকে আর এই বাংলাদেশ (সেদিনের পূর্ব বাংলা) থেকে দলে দলে পাড়ি জমিয়েছিল ভারতের পথে। ধন নয়, মান নয় এতটুকু বাসাও নয়, শুধু প্রাণে বেঁচে থাকার জন্যে। আজও কারও বংশধর বাস করছে ভারতের রেল লাইনের ধারে– কেউ বা দ্বীপান্তরে অর্থাৎ আন্দামান বা নিকোবরে। সত্যিকার অর্থে যাকে বাঁচা বলে এখনও কি সেই বাঁচা তারা বাঁচতে পেরেছে?

মানুষ পিছে ফেলে আসছে তার সাজানো ঘর। মানুষ যে ঘরকে কত ভালোবাসে! বাবুই পাখির চেয়েও অনেক বড় কারিগরের মতো সে যে নিজের হাতের তৈরি বাসাটি গোছাতে থাকে তা ঠিক শহরের ইন্টিরিয়র ডেকোরেটর দিয়ে সাজানো ফ্ল্যাট দেখলে বোঝা যাবে না। গ্রামের মেঠো পথের পাশে দুখানা ছোট চালা ঘর। তার ভিতর কিছু তৈজসপত্র, ঘরের গা বেয়ে ওঠা একটি সবুজ ডগা, ওই ডগার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তারই মতো সতেজ গ্রাম্য কিশোরী। তার অদূরে বেঁধে রাখা গো-শাবকটির মতোই অবুঝ সরল দুটি চোখ তার। সামনে হেঁটে বেড়াচ্ছে কিশোরীর হাতের ছোঁয়া পাওয়া মুরগিটি। এই সব মিলে গৃহ। এরাই গৃহবাসী।

পুরবাসীরা এ গৃহবাসীদের সবটুকু চেনে না। জানতেও পারে না ওই গৃহে ওরা কত সুখী, কত সুন্দর, কতটা মানানসই। ধর্মের দ্বন্দ্বে সন্ত্রাসের হলাহলে আর রাষ্ট্রের নিপীড়নে তারা হচ্ছে গৃহহীন। তারা হয়ে পড়ছে ক্যাম্পবাসী। দেশত্যাগী।

মিথ্যে বিশ্বমানবতা

সকলে এখন জোর দাবি জানাচ্ছে বিশ্বমানবতার কাছে। মানবতার আন্দোলনকে বলা হয় হিউম্যান রাইটস আন্দোলন। এর সংজ্ঞা কিন্তু এনজিও বা এর কর্মীরা বোঝে না। কারণ তারা মাসে মাসে বেতন পায়। হিউম্যান রাইটসের চরিত্র সম্পর্কে শেখ হাসিনার চমৎকার একটি লাইন আছে– "হিউম্যান রাইটসের সংজ্ঞা আটলান্টিকের ওপারে এক রকম আর এপারে অন্য রকম।"

তিনি যেটা বলতে চেয়েছেন, হিউম্যান রাইটসের সকল সূত্র আসলে শ্বেতাঙ্গদের হাতে তৈরি। সেখানে এশিয়ার কিছু কালো রোহিঙ্গা মুসলিম আর রাখাইনরা আরেকটি কালো মুসলিমের দেশে আসছে– এখানে হিউম্যান রাইটস নিয়ে কিছুদিন ব্যবসা চলতে পারে। কিছু শ্বেতাঙ্গ আর তাদের এদেশের চাকর-বাকরের পকেটে নগদ পয়সা যেতে পারে। তাতে রোহিঙ্গাদের সমস্যার সমাধান হবে না, বাংলাদেশের ওপর থেকে এ গুরুভারও নামবে না।

এখনও তাই শেষ ভরসা শেখ হাসিনা ও সুচি

বিশ্বমানবতা এশিয়ার এই দরিদ্র কালো মানুষের জন্যে নয়। সুচি কালো নন, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে তার রঙের মিল নেই। তবে বুঝতে হবে তিনিও তৃতীয় বিশ্বের নেত্রী। তিনি দারিদ্র ও অশিক্ষায় ভরা একটি দেশের নেত্রী। তাঁকে নেতৃত্ব দিতে হবে দরিদ্র মানুষের। মুঢ় মুক মুখে তাঁকে দিতে হবে ভাষা। শেখ হাসিনা এই একই কাজ করে আসছেন। অভিজ্ঞতায় ও যোগ্যতায় তিনি সুচির থেকে অনেক বেশি বলে পশ্চিমারা তাঁর সঙ্গে শত্রুতা করে, তাঁকে শাসন করতে চায়, সম্মানিত করতে চায় না। সুচির মতো পশ্চিমাদের দিকে এক পা রাখতে পারলে তিনিও এতদিন শান্তিতে নোবেল পেতেন।

শান্তির নোবেল বড় নয়। বরং সেটি লুকিয়ে রেখে সুচি যদি শেখ হাসিনার সঙ্গে বসেন তাহলেই বন্ধ হবে নরহত্যা, গৃহীকে গৃহহীন করার প্রক্রিয়া। তা না হলে এখানে আরও ষড়যন্ত্রকারীরা আসবে। এ সত্য মনে রাখা উচিত যে, দেবালয়ে আগুন লাগলে দেবতাও রক্ষা পান না। তাই এ আগুনে শুধু বাংলাদেশ পুড়বে এমন ভাবলে দেশ-পরিচালক হিসেবে ভুল করবেন সুচি।

তাঁর সীমাবদ্ধতা আছে, তিনি এখনও সামরিকজান্তার কবল থেকে পূর্ণ মুক্ত নন। তারপরও এটা সত্যি যে, দুদেশের আলোচনার টেবিলটি যত বড় করা যাবে ততই বের হবে পথ।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক