মুক্তিযুদ্ধে প্রথম শহীদ ফারুক ইকবাল

বোরহান বিশ্বাস
Published : 2 March 2022, 09:55 AM
Updated : 2 March 2022, 09:55 AM

রাজধানীর মৌচাক মোড়ের বিশাল আইল্যান্ডের ওপর দুটি সমাধি। যার একটি শহীদ বীরমুক্তিযোদ্ধা মো. তছলিমের। অন্যটি মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রথম শহীদ ফারুক ইকবালের। তার ঢাকা সিটি করপোরেশনের করা নামফলকে লেখা 'মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ, ৩রা মার্চ ১৯৭১ ইং, শহীদ ফারুক ইকবাল'।

মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ হিসেবে রাজধানী ঢাকার গুলবাগ এলাকার ফারুক ইকবালের নাম এখন সবাই জানে।

চার ভাই তিন বোনের মধ্যে ফারুক ইকবাল ছিলেন দ্বিতীয়। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ তিনি শহীদ হন। রামপুরায় (বর্তমান টিভি ভবনের ১ নং গেট) পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গুলিতে মারা যান।

ফারুক ইকবালের শহীদ হওয়ার সেই দিনের সকালটি কেমন ছিল?

এ নিয়ে গুলবাগের 'শহীদ ফারুক ইকবাল ভিলায় বসে কথা হয় তার বড় ভাই এ এন এম জুলফিকার হারুনের সঙ্গে।

স্মৃতি হাতড়ে তিনি বলেন,  "ফারুক তখন আবুজর গিফারী কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। ছাত্রলীগের এবং কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক ছিল। আমি ছিলাম তৎকালিন গভর্মেন্ট ইসলামিয়া কলেজের (বর্তমানে কবি নজরুল কলেজ) দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করতাম। আমিও ছাত্রলীগের কর্মী ছিলাম। হোস্টেল থেকে বাসায় আসতাম মাঝে-মধ্যে। কিন্তু ফারুকের সঙ্গে খুব একটা দেখা হতো না।

"সেদিন ছিল উত্তাল মার্চের ৩ তারিখ। কি মনে করে যেন বাসায় এসেছিলাম। সকাল সাড়ে ১০টা হবে। কলেজের সামনে লোকজনের জটলা। সেই জটলা থেকে ফারুক বেরিয়ে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, কখন আসছেন?  আমি বললাম, এইমাত্র। ও বললো, বাসায় যান, রেস্ট করেন। আমি আসছি। আমি বাসায় চলে এলাম। এরপর সবাই মিলে 'বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো', 'তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা'সহ বিভিন্ন শ্লোগান নিয়ে রামপুরার দিকে রওনা হয়।"

ওইদিন দুপুরের দিকে ভাই ফারুক ইকবালের মৃত্যুর সংবাদ জানতে পারে পরিবার।

"দুপুর দুইটা কি আড়াইটা হবে। একটি ছেলে আমাদের বাসার গেটে এসে এক জোড়া জুতো আমার হাতে দিল। ফারুকের ওই জুতো দেখেই মনটা মোচড় দিয়ে উঠলো। সেটি নিয়ে ঘরে ঢুকতেই মা হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন। তাকে সান্ত্বনা দিতে লাগলাম।"

শহীদ ফারুকের বড় ভাই জুলফিকার হারুন বলেন,  "পরে বাড়ির বাইরে রাস্তায় গিয়ে দেখি লোকজনের ভিড়। তাদের কাছে জানতে পারি গুলবাগ থেকে একটি মিছিল রামপুরা গিয়ে সেখান থেকে পল্টনে যাওয়ার কথা ছিল। মিছিলের অগ্রভাগে ছিল ফারুক। পরনে ছিল মুজিব কোর্ট, পায়জামা। মাথার চুলগুলো ছিল বড়। দেখে সহজেই বোঝা যাচ্ছিল ও একজন নেতা।

"রামপুরায় মিছিল পৌঁছলে এক পাকিস্তানী আর্মি ফারুককে ডেকে দূরে নিয়ে কি যেন জিজ্ঞেস করে। সেখান থেকে ফিরে আসার সময় পেছন থেকে গুলি করে। সঙ্গে সঙ্গে ফারুক রাস্তার আইল্যান্ডে লুটিয়ে পড়ে। রমনা থানায় তখন কিছু বাঙালি অফিসার ছিল। তাদের সহযোগিতায় কয়েকজন মিলে ফারুকের লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যায়। সেখানেই ও মারা যায়।"

শহীদ ফারুকের শেষ ইচ্ছেতেই তাকে ওই আন্দোলনের পথেই কবর দেওয়া হয়।

"মালিবাগ প্রথম লেনে ফারুকের বেশি বন্ধু-বান্ধব ছিল। তারাই লাশ গোসল দিয়ে আমাদের বাসায় নিয়ে আসে। অনেকেই তখন লাশ আইল্যান্ডে দাফনের কথা বলতে লাগলেন। বিশেষত গিফারী কলেজের ওই সময়ের বাংলার শিক্ষক (নামটি ঠিক মনে পড়ছে না) এগিয়ে এসে বললেন, ফারুক আমাকে বলেছিল, 'স্যার যে আন্দোলন আমরা করছি তাতে যদি কেউ মারা যাই তাদের লাশ যেন এই আইল্যান্ডে কবর দেওয়া হয়।' সেই কথার প্রেক্ষিতে সেদিন সবাই একমত হয়ে মৌচাক-মালিবাগের আইল্যান্ডে ফারুককে দাফন করি", বলেন জুলফিকার হারুন।

"ওই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি সেখানে উপস্থিত থেকে জনসম্মুখে বলেন, স্বাধীনতার জন্য ফারুকই প্রথম শহীদ।"

ফারুকের জানাজায় সেদিন ছাত্রনেতা নূরে আলম সিদ্দিকী, আ স ম আব্দুর রব, আব্দুল কুদ্দুস মাখন, বীরবিক্রম মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়াসহ অনেক নেতা উপস্থিত ছিলেন। মালিবাগ, গুলবাগ, শান্তিবাগ থেকে শত শত লোক ফারুকের লাশ দেখতে এসেছিল।

"মার কাছে শুনেছি, সেদিন সকালে মিছিলে যাওয়ার জন্য ফারুক যখন ঘর থেকে বের হচ্ছিল তখন মা পাউরুটি আর দুধ খেতে দেন ওকে। ফারুক তাড়াহুড়ো করে কয়েক পিছ রুটি খেয়েই উঠে যায়। দুধ পরে এসে খাবে বলে বেরিয়ে যায়। সেই দুধ সেভাবেই ছিল। ফারুক আর ফিরে আসেনি। ফারুকের রক্তমাখা শার্ট-প্যান্ট বুকে জড়িয়ে ধরে মা প্রায়ই কাঁদতেন।"

দেশের জন্য প্রথম শহীদ ফারুক ইকবালকে নিয়ে সরকারি পর্যায়ে উল্লেখ করার মতো তেমন কিছু করা হয়নি বলে জানালেন হারুন।

তবে এজন্য তাদের 'কোনো অক্ষেপ নেই' জানিয়ে তিনি বলেন,  "আমরা আয়োজন করলে সরকারের লোকজন আসেন। মুক্তিযুদ্ধের ২০ বছর পর্যন্ত একটি জাতীয় দৈনিক প্রতিবছর ফারুকের মৃত্যুবার্ষিকীর খবর প্রকাশ করতো। এক সময় তা -ও বন্ধে হয়ে যায়।

"শহীদ ফারুক ইকবাল উচ্চ বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে প্রতিবারই আমরা অনুষ্ঠানের আয়োজন করি। করোনাভাইরাসের জন্য দুই বছর তা বন্ধ ছিল।"

শহীদ ভাতা নিতে ফরম জমা দেওয়া হয়নি আর ফারুকের পরিবারের।

জুলফিকার হারুন বলেন,  "একবার এরশাদের সময় সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে একটি ফরম দিয়েছিল পূরণ করে জমা দেওয়ার জন্য। আব্বাকে জানালে তিনি সোজা বলেছিলেন, 'আমার ছেলে দেশের জন্য শহীদ হইছে, আর আমি ভাতা নেব!' ফলে, সবুজ রঙের সেই ফরমটি আর পূরণ করে জমা দেওয়া হয়নি।"

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহযোগিতায় এবং সিটি করপোরেশেনের তত্ত্বাবধানে ফারুকের কবরের সৌন্দর্য বর্ধন করা হয় বলে জানালেন তিনি।

"ফারুকের মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে তৎকালিন মেয়র হানিফ ভাই আমাদের এই কথা কাজ শুরুর আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন।"

তবে,শহীদ ফারুক ইকবালের সমাধিস্থলের পাশে জরাজীর্ণ অবস্থা এলাকাবাসীকে ব্যথিত করছে। ভবঘুরে কিশোররা এখানে সময় কাটানোর পাশাপাশি নেশা করে বলেও অভিযোগ জানালেন  এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠরা।

সমাধিস্থল ঘুরে দেখা যায় এর চারপাশে কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী না থাকায় এ স্থান দিয়ে পথচারিরা দিনরাত বাধাহীন চলাচল করে থাকেন।

মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িতি এই সমাধি সংরক্ষণের জন্য এলাকাবাসী ও শহীদ ফারুক ইকবালের পরিবার সরকারের কাছে আহ্বান জানান।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক