ধামরাই: বিনুপিসির মন্দিরে আমাদের বিফল মনোরথ

মাইদুল মিঠুন
Published : 28 Jan 2022, 05:44 PM
Updated : 28 Jan 2022, 05:44 PM

বিনুপিসি বেজায় চটলেন। শৈত্যপ্রবাহের মধ্যে বাইরে থেকে অনেকক্ষণ হাঁকডাকের পর একটা চাদর জড়িয়ে আস্তেধীরে বেড়িয়েছেন তিনি। তালাটা খুলে দরজা খানিক ফাঁক করে আমাদের চারজনকে দেখে কপাল কুচকে তাঁকিয়ে বললেন, 'কি চাই?'। আমার থতমত খাওয়ার যোগাড়। নিজেকে সামলাতে না সামলাতে তুষার ভাই বলে ফেললেন, 'আপনার বাড়িতে একটু ঢুকতে চাই, মন্দিরটা দেখতে।'

'না, না। আজ সম্ভব না। আরেকদিন আসেন।' ভয়ংকর মুখভঙ্গি করে মুখের সামনে দরজাটা ঠাস করে বন্ধ করে হন হন করে বাড়ির ভেতরে চলে গেলেন তিনি। আমরা একজন আরেকজনের মুখের দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে সেখান থেকে ফিরে এলাম।

তানজিনা মনি আপু, তানভীর তুষার ও অনার রহমান ভাই আর আমি গিয়েছিলাম ঢাকার ধামরাইয়ের দুইশো নয় বছরে পুরোনো একটা মন্দির দেখতে। মদনমোহন ও শিবমন্দির। ওই যে, যেখানে রথের মেলা হয়, ধামরাইয়ের কায়েতপাড়ার মঠবাড়িতে। কিন্তু বিফল মনোরথে ফেরা ছাড়া আর উপায় নেই।

তারপরও বেড়ার ওপর দিয়ে উঁকিঝুঁকি মেরে যতটুকু দেখা যায়, ততটুকুই দেখলাম। দুশো বছরের পুরোনো ছোট ছোট ইট দিয়ে বানানো দেয়াল দেখে মনে হলো প্রাচীন কোন পুরাকীর্তি। দেয়াল ধরে ছোট সড়কের মতো পথটার ঠিক ৫০ গজের মাথায় একটা ছোট মাটির ঘর। সেখানে বিনুপিসি আর তাঁর স্বামী থাকেন। ঘরটার পেছনে উঁচু মন্দির। সেখানে সকাল সন্ধ্যা পুজো করেন বিনুপিসি। পুজার সময়ে আমরা বিরক্ত করতে গিয়েছিলাম বলেই ঢুকতে দিলেন না। এই মন্দিরটা কাছ থেকে দেখার বাসনা ছিলো আমাদের।

হতাশ নয়নে আশপাশের বেশ কয়েকটা পুরোনো মন্দির ঘুরে টুরে দেখলাম আমরা। তাতে ওই মন্দির দেখার শখ কিছুটা মিটলো বটে, কিন্তু…। এরপর এলাকাটা ঘুরে দেখলাম। কলকাতা শহরের মহল্লাগুলোর যে চিত্র সিনেমায় দেখা যায়, ঠিক ওরকম বাড়িঘর, একটার সাথে আরেকটা লাগানো। যেন প্রাচীন কলকাতা। মাটির ঘর, তুলসী গাছের ঢিবি। ছোট ছোট শাখা, সিঁদুর, রুদ্রাক্ষের মালা, কাঁসার কাজলদানি, নথ ইত্যাদির দোকান। আর বাড়িগুলোর দেয়ালের উপরে বানরের নানানরকম নৃত্যকলা। আহা! কি দৃশ্য!

আবার পাশে বড় বড় গম্বুজওয়ালা মসজিদ। মসজিদও বেশ পুরোনো। মন্দিরের পাশেই মুসলমানদের স্মৃতিচিহ্ন দার-ই-নূর। স্থাপত্যকাঠামো দেখে সেটাও বেশ পুরোনোই মনে হলো। মানে হিন্দু-মুসলিম পাশাপাশি ছিলো অনেক আগে থেকেই। তাঁরাও কি আমাদের মতো সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কে দিতো? মনে হয় না। কেননা, বাংলাদেশ তো মুসলিমপ্রধান এলাকা। সাম্প্রদায়িকতার উস্কানি থাকলে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বেঁধে যেতো। দাঙ্গা বাঁধলে হিন্দুদের পক্ষে তাঁদের সংস্কৃতিচর্চাকে এতকাল আগলে রেখে স্বচ্ছন্দে বসবাস করতে পারতেন না।

পাকা দালান আছে একটা, বেশ জমিদারের বাড়ির মতো, প্রাসাদও বলা যায়। বাড়ির সামনে বাগানবিলাসের বাহার। সেটার সাথে লাগোয়া একটা কাঁসার তৈজসপত্রের দোকান। পিতলের রাম-কৃষ্ণের মূর্তি। মনি আপু বললেন, বিয়ের পর এই বাড়িতে হানিমুনে আসতে পারলে বেজায় জমিদারী একটা ভাব আসতো। তুষার ভাই কি তাতে সায় দিলেন, বোঝা গেলো না।

কাঁসা পিতলের দোকান আছে বেশ কয়েকটা। অসম্ভব সুন্দর করে বানানো একেকটা মূর্তি। পিতলের তৈরি হাতি, ঘোড়া, গরু, তৈজসপত্র, দেব-দেবীর মূর্তি। অভিজাত ব্যাপার-স্যাপার। ঢাকার কাছেই এমন চমৎকার একটা এলাকা চোখে না দেখলে বিশ্বাস হতো না।

পাশেই পুরোনো পাবলিক লাইব্রেরি। সেটাতে বই আছে কিনা বোঝা গেলো না। কিন্তু বেশ অভিজাত একটা ক্যাফে হয়েছে- নাম অফিসার্স ক্যাফে। ভেতরের নকশায় আধুনিকতার ছোঁয়া। গানও বাজছে বর্তমানকালের ব্যান্ড সংগীত। তবে খাবারদাবারের দাম দেখে চোখ কপালেই উঠলো। সেখান থেকে বেড়িয়ে আমরা খেলাম মতিলালের বিখ্যাত মালাইচাপ। বেশ খেতে, একদম পারফেক্ট যাকে বলে, আমি গুড়ের মিষ্টি আর একটা স্পেশাল কালোজামও খেলাম। দাম তুলনামূলক কমই মনে হলো, যদিও বিল আমার দিতে হয়নি! হা হা।

মূল সড়কেই দাঁড়িয়ে আছে রথের মেলার সেই বাহন, মানে রথ। প্রতি বছর রথযাত্রার দিন এই সুবিশাল ছয়তলা রথে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার মূর্তি আরোহন করে শোভাযাত্রা করে। এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয় চন্দ্র আষাঢ়ের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয় তিথিতে। আর একাদশী তিথিতে হয় প্রত্যাবর্তন। অর্থাৎ রথটি প্রথম দিন যেখান থেকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়, আটদিন পরে আবার সেখানেই ফিরিয়ে আনা হয়। একে বলে উল্টো রথ। ইংরেজি মাসের হিসেবে জুন-জুলাইয়ে হয় এই আয়োজন। ধামরাইয়ের রথের মেলা বেশ বিখ্যাত। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ মেলা দেখতে আসেন এখানে।

রথের পাশেই পুরোনো দ্বিতল বাড়ি, কাঠ আর টিনের প্রাচীন কারুকার্যখচিত ঘরদোর, জুয়েলারি আর মুদি দোকান। আবার আধুনিককালের ইট, কাঠ পাথরের কাঠামোও স্থান পেয়েছে। আধুনিকতার ছোঁয়া ধীরে ধীরে গ্রাস করছে প্রাচীন ঐতিহ্যের ধামরাইকে।

এসব ভাবতে ভাবতেই বিকেল পেরিয়ে যাচ্ছিলো। সড়কের পাশের মাঠে কিশোরদের ফুটবল খেলায় দু একটা কিক দিয়ে মাঠের পাশের পেয়াজুর দোকান থেকে ১০ টাকায় পাঁচটা পেঁয়াজু কিনে খেতে আমরা ধরলাম ফেরার পথ।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক