ক্রিকেট, রাজনীতি ও একটি অবহেলা

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
Published : 1 Jan 2011, 10:58 PM
Updated : 20 Feb 2011, 05:15 PM

আমি কুমিল্লায় পাড়ার মাঠে প্রথম ক্রিকেট খেলা দেখি। নিজে ক্রিকেট খেলেছিও। এক সময় খুব ভালো বোলারও ছিলাম। সিলেট মহামেডান টিমে খেলেছি। আমাদের সময় যেটা ছিলো এবং এখন যেটা নেই তাহলো প্রচুর মাঠ ছিলো, ছোট ছোট শহরে, বড় বড় শহরে মাঠ ছিলো। চিটগংয়ে আমার মামা ছিলেন, সেখানে বেড়াতে যেতাম। মাঠে ক্রিকেট খেলা দেখতাম। প্রত্যেকটা শহরে তখন ক্রিকেট খেলার চর্চা ছিলো। তখন কিন্তু আমরা টেপড টেনিস বল নামে কোন কিছু চিনতাম না, তখন ছিলো কাঠের বল। হাতে ব্যাট থাকতো, কিন্তু হ্যালমেট বলে কিছু ছিলো না। ফলে প্রচুর ব্যাথা পেয়েছি। এখনতো টেপড টেনিস বল, টেপ পেচিয়ে টেনিস বল দিয়ে খেলছে। এতে আসলে স্বাদ পাওয়া যায় না।

তখনকার দিনে পাকিস্তানের শিয়ালকোটে ক্রিকেটের সামগ্রী তৈরি হতো। সেগুলো বেশ সস্তায় আমরা এখানে পেতাম। মানের দিক থেকেও সেগুলো ছিলো বিশ্বমানের। সেই লাল রংয়ের কাঠের বল দিয়ে আমরা খেলতাম। এবং মাঠে পিচ বলে কিছু ছিলো না। তখন আমরা স্পিন বলতাম না, বলতাম অফ ব্রেক এবং লেফট ব্রেক। আরেকটা ছিলো সেটা হলো টিলা ব্রেক। এই টিলা ব্রেকটাই আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। টিলা মানে উচু নিচু জায়গা। এই টিলা ব্রেকে কোন ব্যাটসম্যান আউট হলে বলতো, আমি টিলা ব্রেকে আউট হলাম। এই টিলা ব্রেকটা আমাদের কাছে খুব ভীতিকর ছিলো।

শৈশব কৈশোরে এই খেলাধুলার পর আমার সুযোগ হয়েছিলো আন্তর্জাতিক কিছু ক্রিকেট খেলা দেখার। যেমন ইংল্যান্ডে Gants Hill-এর পাশে Essex-এর মাঠে দেখেছি। সেখানে কোন এন্ট্রি ফি ছিলো না। একটা স্যান্ডউইচ এবং কোকাকোলা নিয়ে ঘাসের উপরে কিছুক্ষন বই পড়া এবং খেলা দেখতাম। এসেক্সের সঙ্গে বিভিন্ন কাউন্টি ম্যাচ খেলতো। সেগুলো আমি দেখেছি। তখন এসেক্সের সাথে ওয়েস্ট ইন্ডিজ খেলতে এসেছিলো। সেখানে ভিব রিচার্ডস ছিলো কার্ল হুপার ছিলো। এসেক্স ওদের কাছে গোহারা হেরেছিলো। আরেকবার পাকিস্তান খেলছিলো ইংল্যান্ডের সঙ্গে। সেখানে ওয়াসিম আক্রামের খেলা দেখেছি। নাসির হোসেনের দুর্দান্ত ব্যাটিংও দেখেছিলাম ওখানেই। আর ক্যানাডাতে যখন ছিলাম, তখন সেখানকার কিছু সৌখিন দলের খেলা দেখেছি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের অনেক পুরোনো খেলোয়াড়দের খেলা আমি সেখানে দেখেছি। নিউ ইর্য়কের সেন্ট্রাল পার্কে একটা ক্রিকেট পিচ আছে। সেখানেও দেখেছি। হয়তো খুব জম্পেশ খেলা না, তবে পুরোনো অনেক খেলোয়াড়দের খেলা ওখানে দেখেছি।

ক্রিকেটের প্রতি আমার অনুরাগ এবং ছোট বেলায় খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপ ক্রিকেট দেখা শুরু করলাম। ক্রিকেটে বাংলাদেশের কৃতিত্ব এখন গৌরব করার মতো বিষয়। দক্ষতা, মান এবং কৌশলের দিক থেকে আমি বলবো এই অর্জন বিশাল। ভারতের সাথে বাংলাদেশ ব্যাটিংয়ে খুব ভালো করেছে। ভারতের বিরুদ্ধে ২৮৩ করা চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। তবে প্রথম ফিল্ডিং কেন নিলো সেটা আমি এখনও আবিস্কার করতে পারিনি। তাদের কথা হচ্ছে স্পিনাররা বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের মূল স্তম্ভ। তারা বলেছে ডিউ ফ্যাক্টর মানে শিশির একটা ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে। বল ঘুরবে না। কিন্তু তারা তো এই মাঠেই এতদিন প্র্যাকটিস করেছে। তারা জানে ফেব্রুয়ারির এই সময় ডিউ কোন ফ্যাক্টর হওয়ার কথা নয়। ডিউ ফ্যাক্টর যখন গুরুত্বপূর্ণ হয় তখন ক্যামেরাতে তা দেখানো হবে।

তেমন কিছু কিন্তু আমরা দেখিনি। বল ভিজে গেলে দেখানো হয়। হরভজন সিং যখন বল করে তখন তো পরিস্কার করার মতো কোন কাপড়ও তার ছিলো না বল মোছার জন্য। তার মানে ডিউ ফ্যাক্টর ইজ নট এ ফ্যাক্টর। তাহলে কেন তারা ফিল্ডিং নিলো–এটা আমি বুঝতে পারলাম না। আর ভারতকে ফিল্ডিং দেয়ার যখন কোন চাপ থাকে না তখন বীরেন্দর শেবাগ বাঘ হয়ে যায়। চাপ থাকলেই বীরেন্দর অনেক ভুলভ্রান্তি করে। টেন্ডুলকার যখন আউট হলেন তখন কিছুটা আশাম্বিত হওয়া গেছে কিন্তু আমাদের বেজবলিং খুব দুর্বল। আমার কাছে যা দৃষ্টিকটু মনে হয়েছে তাহলো এত সট বল বীরেন্দর শেবাগকে দেওয়াটা আমার কাছে মনে হয়েছে যেন রঙিন কাগজে মুড়িয়ে একটা উপহার দেয়া হলো। শেবাগ খুব দুর্দান্ত খেলেছে। কিন্তু তারপরও আমার মনে হয়েছে বাংলাদেশ যেন ওদেরকে উপহার হিসেবেই এটা দিলো। এত দুর্বল বাংলাদেশ ছিলো না।

এখানে মাশরাফি থাকলে কী করতো সেই বিবেচনায় আমি যাবো না। আমাদের ক্যাপ্টেন যেভাবে ফিল্ডিং সাজিয়েছে সেভাবে তারা বল করেনি। তাদের মধ্যে বোধ হয় তাড়াহুড়া ছিলো। তাদের হয়তো ধারণা ছিলো প্রথম দুই ওভারে টেন্ডুলকারকে তুলে নেবো এবং শেবাগকে তুলে নেবো। এভাবে একটা ক্রিকেট দল অগ্রসর হয় না। পাকিস্তানের সাথে প্র্যাকটিস ম্যাচে বরং অনেক ভালো করেছিলো। যদি আমরা চার পাঁচ করেও ভারতকে অগ্রসর হতে দিতাম তাহলে হয়তো আমরা জিততে পারতাম। ফলে যা হলো তা হচ্ছে এই যে তামিম হাত গুটিয়ে নিলো। সে তার স্বভাবসুলভ খেলাটা খেলতে পারলো না। আর নাইম ইসলাম কী কাজ করলো বুঝতে পারলাম না। আমি হলে সেখানে আশরাফুলকে বসাতাম। নাইমের চেয়ে আশরাফুল ভালো বল করতে পারে।

সাজসজ্জা ও কিছু প্রশ্ন
বিশ্বকাপ ক্রিকেট উপলক্ষ্যে স্বাগতিক দেশ হিসেবে ঢাকা শহর নতুনভাবে সজ্জিত হয়েছে। এটা খারাপ না। কেউ কেউ হয়তো বলতে পারেন কেবল মাত্র নিজেদের দেশের খেলোয়াড়দের ছবি টানিয়েছে, কাজ ঠিক হলো কিনা। বিদেশেও আমি দেখেছি যেমন, ভারতীয়রা তাদের নিজেদের খেলোয়াড় ছাড়া আর কারো ছবি টানায় না। অস্ট্রেলিয়াও তাই। তবে বাংলাদেশের একটা উদার এবং অতিথিপরায়ন দেশ হিসেবে যেহেতু পরিচয় আছে সেক্ষেত্রে বিদেশী খেলোয়াড়দের ছবি টানালে ভালো হতো। তবে সাজ সজ্জার ব্যাপারে আমার একটা প্রশ্ন আছে। এই যে চৈনিক লন্ঠন ঝুলানো হয়েছে তাতে একটা চীনা গন্ধ পাওয়া যায়, চেনা গন্ধ নয়। মনে হচ্ছে চৈনিক নববর্ষের কোন উৎসব চলছে। আমাদের দেশের কিছু ছোঁয়া থাকতে পারতো। বৈদ্যুতিক বাতি দিয়ে হারিকেন লাগানো যেতো। রিকসা তো ঠিকই ব্যবহার করা হয়েছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠান নিয়েও আমার একটা আপত্তি রয়েছে। আমি দেখিনি, তবে আমার এক ছাত্রী বলেছে যে আমাদের গায়িকারা ভারতীয় শাড়ি পরে দাম দাম মাসকেলান্ডার কেন গাইলেন, এটা কেন হয়েছে তা আমি বুঝতে পারিনি। আমাদের জামদানী শাড়ি পরে একটা বাউল সংগীত হতে পারতো বা কোন লোকগীতি হতে পারতো। আমার দেশের প্রতিনিধিত্ব হতে পারতো। সাবিনা ইয়াসমিন ভালো গান গায়, রুনা লায়লা উপমহাদেশের বিখ্যাত শিল্পী। কিন্তু তারা বাংলাদেশকে কী দিলেন? এরকম একটা আন্তর্জাতিক উৎসবে আমরা আমাদের নিজস্ব জিনিস তুলে ধরলে ভালো হতো। কত বিদেশী এসেছে। তারা দেখতে পেতো আমাদের ভালো জিনিসগুলো। কিন্তু সেটা হয়নি। তারপরে বাংলাদেশের যুবকরা দাঁড়িয়ে আছে পশ্চিমা চিকচিকা পোষাক পরে। এটার সাথে আমাদের সংস্কৃতির কোন সম্পর্ক নেই। রাস্তাঘাট যেভাবে সাজানো হয়েছে তা খুবই নিম্ন রুচির। এদেশের শিল্পীদের সঙ্গে পরামর্শ করে সাজাতে পারলে ভালো হতো।

খেলা, হকার্স ও ভিক্ষুক
খেলা উপলক্ষ্যে, শহরকে সুদৃশ্য করার লক্ষ্যে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে হকার্সদের, সরানো হয়েছে ভিক্ষুকদেরকেও। এই কদিনের জন্য তাদের জীবীকা কি নষ্ট হবে? দেশের একটা বিশাল জনগোষ্ঠীকে তাদের দৈনন্দিন উপার্জন থেকে বঞ্চিত করাটা অন্যায় হয়েছে। এখন কেউ হয়তো বলবে হকার্সরা তো অবৈধভাবে ব্যবসা করছে। যদি তাই হয় তাহলে শুধু খেলার সময় কেন, সব সময়ের জন্যই তাদেরকে উচ্ছেদ করা হোক। কোলকাতাতে আমি একবার দেখেছি সেখানে জ্যোতি বসুর কম্যুনিস্ট সরকারের আমলে অপারেশন সানসাইন গরিয়াহাটের সমস্ত হকার্সকে তারা উচ্ছেদ করলো, কিন্তু তাদের জন্য একটা বিকল্প ব্যবস্থা তারা করেছে। একটা বাজার তারা নির্মাণ করেছে এই হকার্সদের জন্য। দোকানগুলি সরকার তৈরি করে দিয়েছে। টোল-ফোল বলে কিছু নেই। তিন বছরের জন্য ট্যাক্স মওকুফ করে দিয়েছে। এ রকম যদি আমরা করতে পারি তাহলে আমি হকার্স উচ্ছেদের পক্ষে। কেবল এই খেলা উপলক্ষ্যে তাদেরকে উচ্ছেদ করা হবে এটা অন্যায়। একটা কৌতুককর শ্লোগান সরকার বলছে : দরিদ্র মুক্ত বাংলাদেশ। সব দরিদ্রদেরকে যদি বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেওয়া হয় তাহলে অবশ্যই দরিদ্রমুক্ত হবে বাংলাদেশ। বরং বলা উচিত দারিদ্র মুক্ত বাংলাদেশ। প্রধান মন্ত্রীর নামে এই শ্লোগান হচ্ছে। মানে দরিদ্রদের আমি চাচ্ছি না। ভিক্ষুকদের যদি আমরা বিতাড়িত করতে চাই তাহলে তাদেরকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে এদেরকে এভাবে বাস্তুচ্যুতি করাটা অন্যায়।

খালেদা জিয়ার জন্য একটি টিকিট
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে খেলা দেখার জন্য একটি টিকিট পাঠিয়েছিলো। অর্থাৎ খালেদা জিয়া একা গিয়ে খেলা দেখবেন। এটা সত্যি হাস্যকর এবং অপমানজনক একটা ব্যাপার। সরকারের ভিতর কিছু মানুষ আছে যারা এ ধরনের কাজ করে আনন্দ পায়। বিরোধী দলীয় নেত্রীকে খাটো করে বিমলানন্দ পেলো তারা। সরকারের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে যারা মনে করে বিরোধী দলীয় নেত্রীকে আঘাত বা অপমান করতে পারলে শেখ হাসিনা খুশী হবেন। এই মনে করাটা খুবই অন্যায়।

যে কোন গণতান্ত্রিক দেশে বিরোধী দল সরকারেরই একটি অংশ। প্রধান মন্ত্রীর টেলিফোন করে বলা উচিত ছিলো যে আপনি খেলা দেখতে আসুন। কিংবা একজন সচিব বলতে পারতেন, ম্যাডাম আপনি কয়টা টিকিট চান, কখন যাবেন এবং আপনাকে বিশেষ প্রোটোকল দিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। নিয়ম অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী প্রবেশ করার পরপরই তাকে নিয়ে আসা উচিৎ ছিলো। আট দশজন মানুষ নিয়ে তিনি খেলা দেখতে যাবেন এমন একটা ব্যবস্থা করা উচিৎ ছিলো। এটা একটা সভ্য সংস্কৃতির দাবী। আমরা সভ্যতার দাবী মেটাতে ব্যর্থ হয়েছি। এই কাজটি করা মোটেই উচিৎ হয়নি। এটা স্বাভাবিক সৌজন্যের বিরুদ্ধে গেছে। আমি জানি, আমাদের বিরোধী দলের যে সংস্কৃতি তাদেরকে দশটা কেন বিশটা টিকিট দিলেও যেতেন না। এটা জেনেই তো তাকে বিশটা টিকিট দেয়া উচিৎ ছিলো। কোন ক্ষতি তো ছিলো না। সরকারের একটা সুযোগ ছিলো উদারতা প্রদর্শনের। এখন কিন্তু বলটা খালেদা জিয়ার কোর্টে চলে গেল।

এতে করে ফলাফলটা কী দাঁড়ালো ? বিরোধী দলের পক্ষ থেকে খেলা নিয়ে ব্যয়ের হিসাব নিকাশ চাওয়ার কথা এসেছে। এই দাবীটা অবশ্যই ন্যায়সঙ্গত। আমি এই দাবীর সঙ্গে একমত। এই যে ৩০০ কোটি টাকার কথা বলা হয়েছে এখন সরকারের উচিৎ স্বচ্ছতার সাথে জবাবদিহি করা। সরকার যদি সৎ হয় তাহলে কয়েকদিনের মধ্যে পুরো হিসেবটা দাখিল করবে। আমি মনে করি বিএনপি এটা একটা গঠনমূলক কাজ করেছে। তবে আমি বেশি খুশী হতাম যদি বিএনপি গঠনমূলকভাবে গঠনমূলক কাজটা করতো। কিন্তু তারা এটা করেছে প্রতিক্রিয়া হিসেবে।

অনুলিখনকৃত
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : অধ্যাপক, প্রাবন্ধিক ও কথাশিল্পী।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক