দর্শন কেন?

মোনেম অপু
Published : 12 March 2014, 02:59 AM
Updated : 12 March 2014, 02:59 AM

দার্শনিক চিন্তার প্রতি আগ্রহের শুরুটা বা দর্শনের সূচনাটি হয় বিস্ময়বোধ থেকে, প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা থেকে, প্রচলিত ধারণা বা উত্তরগুলোর যথার্থতা বা যথেষ্টতা নিয়ে সংশয় থেকে। জগত ও জীবনের প্রতি একটি বিস্ময়ভাব, নৈতিক জীবনের জন্য একটি মজবুত ভিত অন্বেষণের ইচ্ছা, আত্মসত্ত্বার বিকাশের পথ ও সামাজিক সম্পর্কের সূত্র সন্ধান এবং তার যথার্থতা পরীক্ষা করে দেখার ইচ্ছা ইত্যাদি থেকে আমরা চিন্তা করতে আগ্রহী হই। এই চিন্তাই দর্শন নির্মাণের উপায়। এই বিস্ময়ানুভূতি ও প্রশ্ন করার প্রবণতা আমাদের মধ্যে শৈশবেই পরিলক্ষিত হয়। জগতটা শুরু হলো কিভাবে? আমি এসেছি কোথা থেকে? যাবইবা কোথায়? ঈশ্বরকে কে তৈরি করল?—আমরা নিজেরা শিশুকালে আমাদের পিতামাতাকে যেমন এসব প্রশ্ন করেছি, তেমনই আমাদের সন্তানদের কাছ থেকেও আমাদেরকে এসব প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। শুধু তা-ই নয়; জন্মানোর সাথে সাথেই—যখন সে দোলনায় বাস করে—শিশুর মনে নানা ঔৎসুক্য কাজ করে, যদিও সে তখনও কথা বলতেই শেখেনি।

শিশুমনের দার্শনিকতা মায়ের কোল বা দোলনা থেকেই শুরু হলেও বড় হওয়ার সাথে সাথে সংসারের নানা কাজে ব্যস্ত হয়ে উঠলে, বা অবসর সময়কে বিনোদনের মধ্যে বিনিয়োগ করে রাখলে, বা ধর্মের ব্যাখ্যাতাদের কাছ থেকে কোন উত্তর পেয়ে সে উত্তরে অবিচল হয়ে থেকে গেলে, অথবা কোন না কোন ভাবে নিজে ভেবে বা অন্য কারও বই পড়ে একটি উত্তর সাব্যস্ত করে তা নিয়ে সন্তুষ্ট থেকে গেলে আমাদের মধ্যে এই বিস্ময়ভাবটি জোরালো বা কার্যকর থাকে না। অর্থাৎ আমরা দোলনায় থাকা অবস্থায় আমাদের দার্শনিক অভিযাত্রার সূচনা করলেও কবর বা শ্মশান পর্যন্ত তা অব্যাহত রাখি না। "তোমার জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস বা বিষয় কোনটি?" যারা খাবারের অভাবে বিপন্ন তারা হয়তো এর উত্তরে বলবেন, খাবার। যাদের জীবনে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ভালভাবে বিদ্যমান তারা হয়তো বলবেন, বিনোদন, আনন্দ, সুখ। কিন্তু যারা সচ্ছল এবং একইসাথে বিনোদন-সুখের পরিতৃপ্তি দ্বারা বিরক্ত হয়ে উঠেছেন তারা হয়তো বলে বসবেন, একঘেয়েমি ও অবসাদ থেকে মুক্তি। যদি মানুষের মৌলিক প্রয়োজনগুলো পূরণ হয়, যদি মানুষ স্বচ্ছন্দে বাস করে, তারপরও কি এমন কিছু থেকে যেতে পারে যার প্রয়োজন সকলে সক্রিয়ভাবে অনুভব করবে? দার্শনিকরা মনে করেন তখন মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে "আমি কে", "আমরা এখানে কেন বিদ্যমান", "কোনকিছু না থেকে কিছু একটা কেন আছে" প্রশ্নগুলো। তবে একথাও ঠিক যে, আমরা বিপদেই থাকি অথবা সম্পদে—আমাদের সবাই জগত ও জীবনের উৎস, পরিণতি, তাৎপর্য ও মূল্য সম্বন্ধীয় দার্শনিক প্রশ্নগুলো নিয়ে কোন না কোন সময় একটু আধটু ভেবেই থাকি, এবং এক সেট চলনসই উত্তরও আমরা সাথে নিয়ে চলি।

দর্শনের মূল্য বা উপযোগিতা বা উপকারিতা কী? দর্শন নিজেইবা আদতে কী? দার্শনিকেরা কি আমাদেরকে দর্শনের আওতাধীন প্রশ্নগুলোর বা সমস্যাগুলোর কোন সর্বজনগ্রাহ্য উত্তর বা মীমাংসা দিতে পেরেছেন? বা ভবিষ্যতে দিতে পারবেন—এমন আশা করা যায় কি? খোদ দার্শনিকদের কাছ থেকেই এসব প্রশ্নের উত্তরে নানা পরস্পর বিরুদ্ধ কথা ও মত পাওয়া যায়। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছেও দর্শনের স্বরূপ ও দার্শনিকদের সাধ্য উভয়ই বিতর্কিত বিষয়। আমরা অনেকেই মনে করে থাকি দর্শন একটি "বেহুদা" কাজ—অন্ধ কর্তৃক অন্ধকার ঘরে অনুপস্থিত কালো বেড়াল দেখার চেষ্টা করার মতো কিছু, অথবা অন্ধদের হস্তিদর্শনের মতো কিছু। আমাদের আরও ধারণা এই যে, কিছু অকেজো, মতিচ্ছন্ন, স্বপ্নাবিষ্ট মানুষ তৈরি হয় দর্শনচর্চা থেকে, যারা দুর্বোধ্য ভাষায় এমন সব অদ্ভুত কথা বলে থাকেন যা পাগলামির সাথেই তুল্য হতে পারে। এধরণের একপেশে ধারণা ক্ষোভ বা বিরক্তি থেকে অথবা দর্শন সম্বন্ধে ভালভাবে না-জানা থেকে উৎপন্ন হতে পারে। সক্রেটিস, প্লেটো, ইবন সিনা, ইবন রুশদ, বার্ট্রান্ড রাসেল বা আয়ন র‍্যান্ডের মতো মানুষেরা পাগল ছিলেন এমন কথা এরূপ বিরক্ত মানুষেরা দাবী করবেন বলেও মনে হয় না।

সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের মতো বিজ্ঞানমনস্করাও দর্শনকে অপছন্দ করতে পারেন, যেহেতু দার্শনিকেরা সব রকমের মততন্ত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার দাবী করলেও আদতে কোন প্রশ্নেরই অবিতর্কিত উত্তর দিতে পারেননি। জগত ও জীবনের রহস্য উন্মোচনই যদি দার্শনিকদের প্রয়াস হয় তবে বিজ্ঞানের ছাত্রদের কাছে দর্শনের প্রয়োজনীয়তাটিই প্রশ্নবোধক হয়ে উঠতে পারে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি যেখানে সিস্টেমেটিক ও উন্নত পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণের উপর প্রতিষ্ঠিত, বিজ্ঞানের সিদ্ধান্তগুলো যেখানে সার্বজনীনভাবে গৃহীত, বিজ্ঞানীরা যেখানে আমাদের জীবনকে বিপুলভাবে বাস্তবত বদলে দিতে পারছেন, সেখানে দর্শন করার দরকার কী? "অনপেক্ষ" জ্ঞানের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা, দার্শনিকেরা এই সীমাকে ছাড়িয়ে উঠতে ঠিক কোন অঞ্চল থেকে চেষ্টা করে থাকেন, জ্ঞানের ক্ষেত্রে বিজ্ঞান ও দর্শনের পদ্ধতি ও পরিসরে ফারাকটি কোথায়, তা সম্বন্ধে অসচেতনতা থেকে এরূপ প্রশ্নের উৎপত্তি হতে পারে। ইবন সিনা ও তুসী একাধারে বিজ্ঞানী ও দার্শনিক ছিলেন, দেকার্তে ও লিবনিজ একাধারে দার্শনিক ও গণিতবিদ ছিলেন। আমাদের কালের নয়া পদার্থ বিজ্ঞানীদের অনেকেই বিজ্ঞান ও দর্শন উভয়টিই করে থাকেন; তাদের কাজ ও কথার কোনটি বিজ্ঞানের আওতায় থাকে ও কোনটি দর্শনের আওতায় গিয়ে পড়ে তা নিয়ে তারা অসচেতন নন। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পূর্বগৃহীত ভিতগত নীতিগুলোর স্বরূপ, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অর্জিত জ্ঞানের স্বরূপ, এদের বৈধতার পরিসর ইত্যাদি নিয়ে সার্বিকভাবে আলোচনা বা পরীক্ষা করাটাও দর্শনের মধ্যে গিয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, ঐতিহ্যবাদী ধর্মপন্থীরা দর্শনকে দেখেন ভয়ের সাথে, ভ্রষ্টতা ও বিশৃঙ্খলার উৎস হিসেবে। তারা মনে করেন যে, ধর্ম, ধর্মগ্রন্থ ও ধর্মপ্রতিষ্ঠাতার কর্মজীবন সম্বন্ধে যথাযথ ব্যাখ্যা এবং জীবন সংক্রান্তে অভূতপূর্ব কোন সমস্যার সঠিক শাস্ত্রীয় মীমাংসা অতীতের কোন না কোন একটি নির্দিষ্ট চিন্তা ও মত ধারার প্রতি আনুগত্য ও নিষ্ঠার উপর নির্ভরশীল; এই ধারা থেকে বিচ্যুত হওয়ার অর্থই হচ্ছে ধর্মের সঠিক পথ থেকে ভ্রষ্ট হওয়া। একারণে প্রায় সব ধর্মেই ভিন্ন ভিন্ন উপসম্প্রদায়ের উৎপত্তি হয়েছে; তারা সকলেই নিজ নিজ মততন্ত্র নিয়ে সন্তুষ্ট থাকেন এবং একে অপরকে ধর্মের যথাযথ পথ থেকে বিচ্যুত বলেই মনে করেন। তারা জীবনকে স্ট্যাটিক বা স্থবির করে তোলেন এবং মানবজাতির বিকাশের প্রক্রিয়া থেকে নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। তারা মানবজাতির নতুন সম্ভাবনা, চিন্তার নতুন মাত্রা এবং মাত্রার বিস্তারে সম্প্রসারণগত সম্ভাবনাকে কার্যত নস্যাৎ করে দেন। এখানে চিন্তায় বৈচিত্র্যকে, অতীতের চিন্তা ও অনুধাবনকে প্রশ্নবিদ্ধ করাকে ইতিবাচক চোখে দেখা হয় না; দেখা হয় সন্দেহ, হতাশা ও বিরক্তির চোখে। দর্শন ব্যক্তিকে চিন্তার ক্ষেত্রে স্বাধীন ও সাহসী করে তুলতে পারে বিধায়, এতে সংহতি ও শৃঙ্খলা বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কাকে বড় করে দেখা হয় বিধায়, অতীতে নির্ধারিত আপ্তবাক্য ও শাস্ত্র থেকে বিচ্যুতি পরকালে মানুষকে ব্যর্থ করে দেবে বলে বিশ্বাস করা হয় বিধায়, মুক্তভাবে ব্যাপক দর্শনচর্চা থেকে তারা সভয়ে দূরে সরে থাকেন।

আবার অনেকেই দর্শনকে দেখে থাকেন সংস্কার ও নির্বিচার বদ্ধমতের দাসত্ব থেকে মুক্ত হবার উপায় হিসেবে; প্রগতির সহায়ক জরুরী অবলম্বন হিসেবে। প্রগতির উদ্দেশে যারা ধর্মকে অনাবশ্যক ও একটি বাধা হিসেবে দেখেন তারা মুক্তির জন্য দর্শনকে একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে দেখে থাকতে পারেন। তবে সিস্টেমেটিক ও অব্যাহত দর্শনচর্চা একজনকে ধর্ম বা ঈশ্বর থেকে যেমন বিচ্ছিন্ন করতে পারে তেমনই আবার সেদিকে ঠেলেও দিতে পারে। গায্‌যালি, স্পিনোজা, কিয়ার্কেগার্ড বা এমনকি উইটগেনস্টাইনও গভীরভাবে ধর্মভাবাপন্ন ছিলেন, যদি ঈশ্বরভিত্তিক আত্মিকতাকে ধর্ম হিসেবে দেখা যায়। জগত ও মানব প্রকৃতি এমনই যে, শৈশব থেকেই আমরা জগতের প্রতি একটি বিস্ময়ভাব নিয়ে তাকাই ও একে বুঝবার চেষ্টা করি। শিশুর এই বিস্ময়ভাবকে দার্শনিকতা ও বুঝবার জন্য তার প্রয়াসকে বৈজ্ঞানিকতা হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে বিজ্ঞানী বলতে আমরা যা বুঝি তা অনুসারে আমরা সকলেই বিজ্ঞানীর কাজ করার উপযুক্ত হিসেবে পরিগণিত হই না—এজন্য বিশেষ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়। কিন্তু আমারা সকলেই কম-বেশী দার্শনিক এবং আমাদের প্রত্যেকের জন্যই অব্যাহত দার্শনিক চিন্তন একটি প্রয়োজন, যেমন খাদ্য আমাদের প্রত্যেকের জন্যই প্রয়োজন। অর্থাৎ বৈজ্ঞানিক প্রয়াসে প্রাপ্ত জ্ঞানের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতার বিচারে সার্বজনীনতা থাকলেও, সকলকেই বিজ্ঞানী হতে হয় না; কিন্তু দার্শনিক চিন্তায় কোন নিশ্চিত জ্ঞান পাওয়া না গেলেও এবং এতে মতের বৈচিত্র্য থাকলেও আমাদের সকলের জন্যই দার্শনিকচিন্তা আবশ্যক হয় নিজেকে স্বাধীন করার জন্য ও নিজের সম্ভাবনাকে ক্রমাগতভাবে আবিষ্কার করতে থাকতে সক্ষম হবার জন্য।

দর্শনকে ইংরেজিতে বলা হয় ফিলোসফি (philosophy) যা গ্রীক শব্দ philein ও sophia শব্দ দুটি থেকে এসেছে—যেখানে প্রথমটির অর্থ to love (ভালবাসা, অনুরক্ত হওয়া) ও পরেরটির অর্থ wisdom (প্রজ্ঞা)। অর্থাৎ গ্রীকদের বিচারে দর্শন হচ্ছে প্রজ্ঞার প্রতি অনুরাগ বা ভালবাসা। দর্শন করার অর্থ হচ্ছে প্রজ্ঞার সন্ধানী হওয়া। মানুষ হওয়ার প্রকৃত অর্থ কী? জগতের বা বাস্তবতার স্বরূপ কী? জ্ঞানের উৎসগুলো কী ও আমাদের জ্ঞানবৃত্তির সীমাবদ্ধতা কোথায়? নৈতিকতা, ন্যায়, শুভ ইত্যাদি ধারণাগুলোর প্রকৃত তাৎপর্য কী, জীবনে ও সমাজে এগুলো রূপায়িত হতে পারে কিভাবে? প্রজ্ঞা হচ্ছে জীবন সম্বন্ধে সুগভীর বোধ, সচেতনতা ও বিচারিক সামর্থ্য যা একজনকে এসব প্রশ্নের উত্তর তৈরি করতে সাহায্য করে, তাকে ন্যায়পরায়ণ ও সুন্দর জীবনের পথে চালিত করতে পারে। তবে একথাও অনেকটা ঠিক যে, যারা দর্শনের প্রতি কিছুটা আগ্রহী তাদের অনেকেই দর্শনচর্চা বলতে দর্শনের উপর লিখিত বা বড় বড় দার্শনিকদের রচিত বই পড়াকেই বুঝে থাকেন; অর্থাৎ বিষয়টি পঠন-পাঠন ও অনুধাবনের, নানা মত থেকে কোন একটিকে নিজের জন্য বেছে নেয়ার বা নিজ মতের পক্ষে যুক্তি অন্বেষণের মধ্যে সীমিত। কিন্তু দর্শনকে "পড়া"র বিষয় না ভেবে "করা"র বিষয় হিসেবে নেয়া গেলে আমরা প্রত্যেকেই একে নিজের জীবনের সাথে আরও ঘনিষ্ঠ করে তুলতে পারি, তখন দর্শন খাবারের মতোই জীবনের জন্য একটি আবশ্যক উপাদানে পরিণত হয়।

দর্শনকে একটি নিরন্তর ক্রিয়াপরতা, একটি সক্রিয়তা, উপরের দিকে উঠবার উদ্দেশ্যে একটি অভিযাত্রা হিসেবে দেখলে এটি ফিজিক্স বা ইতিহাস বা অন্য অনেক পাঠ্য বিষয় থেকে স্বতন্ত্র হয়ে উঠে; এটি আর তখন কেবল তথ্য সংগ্রহের কাজ থাকে না। অঙ্ক পড়া ও অঙ্ক করার মধ্যে যেমন ফারাক আছে, তেমনই দর্শন "পড়া" ও দর্শন "করা"র মধ্যেও ফারাক রয়েছে। দার্শনিকেরা দর্শন করেছেন, কিন্তু তাদের কাজগুলো দর্শনের উৎপাদিত পণ্যস্বরূপ, যা থেকে আমরা শিখতে পারি কিভাবে দর্শন করতে হয়। দর্শনচর্চা সেই পণ্যের বাজার থেকে কিছু নিয়ে ঘরে ফেরা নয়, বরং স্বাধীনভাবে নিজের জন্য নিজের দর্শন তৈরি করা—অর্থাৎ দর্শন সাবস্ক্রাইব করার বিষয় নয়, বরং নিজের জন্য নিজে উৎপাদন করার বিষয়। এপর্যায়ে আমরা শঙ্কিত হয়ে উঠতে পারি—প্লেটো, হেগেল বা হাইডেগার হওয়া তো দূরের কথা, তাদের লেখা বুঝবার সামর্থ্যই তো আমাদের মতো সাধারণ মানুষের নেই! দর্শন করা সহজ নয় সত্য; তবে এও সঠিক যে, ব্যক্তির সাথে দর্শন করার সম্পর্ক, ব্যক্তির সাথে ধর্ম করার সম্পর্কের মতোই। ধর্ম করাও সহজ নয়—তাই বলে আমরা বলিনা যে, আবুবকর বা ওমর, আলী বা আবুযর হওয়া যেহেতু সহজ নয় সেহেতু সবার পক্ষে ধর্ম করা কিভাবে আবশ্যক হতে পারে? একজন ব্যক্তি কৃষক, শ্রমিক, ডাক্তার, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী, লেখক, শিল্পী, বিজ্ঞানী বা দর্শনের ছাত্র যা-ই হোন না কেন, তার সাথে ধর্ম, নৈতিকতা বা সুনাগরিকতার যেমন সম্পর্ক, দর্শনের সাথেও তার সমরূপ সম্পর্ক—এমন কথা অবান্তর নয় বলেও গণ্য করা সম্ভব।

দর্শন করা কঠিন—জ্ঞানের দিক থেকে যেমন, তেমনই প্রয়োগের দিক থেকেও। ঐতিহ্য বা সমাজের কাছ থেকে পাওয়া একেবারেই মৌলিক ধারণা বা বিশ্বাসগুলোকেই পরীক্ষা করার ইচ্ছা থেকে দর্শনের যাত্রা শুরু হয়। অপরীক্ষিত জীবন, যাপনের অযোগ্য জীবন—এমন সাহসী অবস্থান দর্শন করার জন্য প্রয়োজন, যাকে ঐতিহ্যপন্থীরা বা সমাজপন্থীরা সহজে মেনে না-ও নিতে পারে। দর্শন করার ফল হিসেবে তাই এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া হতে পারে যা সমাজ প্রত্যাখ্যান করে থাকে। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় যে, সক্রেটিস বা মুহম্মদের আবেদন পরীক্ষা করে দেখা ও তাতে ইতিবাচকভাবে সাড়া দেয়ার জন্য সেকালের মানুষকে এরূপ সাহসী হতে হয়েছিল। জ্ঞানের দিক থেকে এটি কঠিন একারণে যে, এখানে সতর্ক ও বিচক্ষণ বিচারমূলক চিন্তার প্রয়োজন হয়, যুক্তি ও সঙ্গতি বজায় রাখতে হয় এবং চিন্তায় যত্নবান হতে হয়। তাহলে কি আমরা ঘুরেফিরে একই স্থানে থেকে যাচ্ছি? দর্শন যদি কঠিনই হয় এবং খোদ বড় বড় দার্শনিকেরাই যদি কোন কিছুতে একমত হতে সফল না হয়ে থাকেন, তবে পুরাতন সংস্কৃতি বা ঐতিহ্যপরায়ণ ধর্মে আস্থা রেখে সুন্দরভাবে জীবন যাপন করার চেয়ে বেশী ভার সাধারণ মানুষের উপর আরোপ করার কার্যকারিতা কী?—অতীতের মহাবিবরণনির্ভর সংস্কৃতি বা ধর্মের ভার আর দর্শনের ভার তো সমান নয়, দর্শনের ভার যে অনেক বেশী।

এখানে এসে আমাদেরকে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে—যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ শিক্ষাবঞ্ছিত, অর্থনৈতিকভাবে বিপদগ্রস্ত—সমাজকে দুটি অংশে ভাগ করে চিন্তা করতে হয়: সাধারণ ব্যক্তিরা ও নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিরা। যারা গণমানুষের মুক্তি ও প্রগতি নিয়ে চিন্তা করেন, কাজ করেন—অর্থাৎ অবস্থার পরিবর্তনকামী নেতৃত্ব—দর্শন থেকে দূরে থাকলে অগ্রগমনটি ধীর হবে, নতুবা এক পর্যায়ে নিজেই পথহারা হয়ে পড়বে, নতুবা সংঘাতের চক্রের মধ্যেই আবর্তিত হতে থাকতে হবে। একথা সব অঙ্গনের—সংস্কৃতি, রাজনীতি, ধর্ম—নেতৃত্বদানকারীদের জন্য প্রযোজ্য। আবার আমাদের মতো সাধারণ মানুষের বেলায়ও এদাবী অবান্তর নয় যে, ঐতিহ্য ও ধর্মের প্রতি আস্থাশীল থেকে "সুন্দর" জীবন অর্জন করতে হলেও "ন্যায়পরায়ণ" চিন্তা ও আচরণ প্রয়োজন। সুন্দর ও ন্যায়ানুগ জীবনের জন্য "সুন্দর" ও "ন্যায়" সম্ন্ধীয় ধারণা অর্জন, সে ধারণা অবলম্বন করে চলার পথ অন্বেষণের জন্য বৌদ্ধিক সচেতনতা, সতর্কতা, চিন্তাশীলতা দরকার হয়। ফলে অন্তত কোন না কোন একটি স্তর পর্যন্ত দার্শনিকতার বা প্রজ্ঞার প্রয়োজন ধর্মপথ অনুসরণকারীদের জন্যও থেকে যাচ্ছে। ধর্ম আমাদেরকে নির্দেশ করেছে মমতাকে শত্রু অবধি এবং ন্যায়কে নিজের পার্থিব ক্ষতিকে মেনে নেয়া অবধি বজায় রাখতে। উভয় নির্দেশনা অনুসরণের ক্ষেত্রে বাসনার সাথে চিন্তার সমন্বয় প্রয়োজন হয়। এই বিরোধপূর্ণ জীবনক্ষেত্রে নিছক বিশ্বাস বা সালাত-সিয়ামের মতো সামাজিক অনুশীলনগুলো বা অন্য যে কোন সাংস্কৃতিক আচার প্রকৃত পথের সন্ধান দিতে ও চলার সামর্থ্য যোগান দিতে পারে না। উদাহরণ হিসেবে ধর্মনিষ্ঠার বেলায় বলা যায়, যদিও বিশ্বাস মমতা ও ন্যায়ের ভিত এবং অনুশীলনগুলো এই উদ্দেশ্যেই প্রদত্ত, তবুও চিন্তা ও প্রজ্ঞার মাত্রার উপরেই সেগুলোর বাস্তব সুফল নির্ভরশীল।

দর্শনচর্চার সুফল কী? এর একটি সুফল হচ্ছে স্বাধীনতা বা স্বায়ত্তশাসন অর্জন। আমরা ঐতিহ্য, অন্যের মীমাংসা ও সমাজের শিক্ষাকে পরীক্ষা করে দেখার মাধ্যমে নিজের জন্য "সঠিক ও ন্যায়সঙ্গত" সিদ্ধান্তটি নিজে নিতে সক্ষম হলেই স্বাধীন হই। স্বাধীনতার দিকে এই যাত্রা একটি অব্যাহত যাত্রা এবং স্বাধীনতার পরিসর ক্রমে ক্রমে বিস্তৃত হতে পারে। জগত সম্বন্ধে জ্ঞান ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রেই হোক, নৈতিক মূল্যমানের ক্ষেত্রেই হোক, অথবা ব্যক্তিজীবনের উদ্দেশ্য, পূর্ণত্ব বা সফলতার ধারণার ক্ষেত্রেই হোক, আমরা নানা রকমের শেকলে বন্দী হয়ে থাকতে পারি—এমনকি এই শেকলগুলো সম্বন্ধে আমাদের সম্বিতও না-ও থাকতে পারে। দর্শন ব্যক্তিকে তার চারপাশের ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া বহুদিনের সংস্কার ও চিন্তাবর্জিতভাবে গড়ে তোলা অভ্যাস থেকে মুক্ত করতে পারে এবং নিজের জন্য এমন দৃষ্টিভঙ্গি ও মত তৈরি করতে পারে যা তার নিজস্ব ও যা তুলনামূলকভাবে সত্য, শুভ, ন্যায় ও সুন্দরের অধিকতর নিকটবর্তী।

দর্শনচর্চার দ্বিতীয় সুফল হচ্ছে জীবনে অধিক থেকে অধিকতর ভারসাম্য বা সামঞ্জস্য অর্জন করা। মমতাকে শত্রু পর্যন্ত ও ন্যায়কে নিজ পর্যন্ত বিস্তৃত করে জীবন গঠন করাকে যারা ধর্ম বা আদর্শ হিসেবে নেন তারা একটি বিরোধাত্মক অবস্থায় নিপতিত হন। তাছাড়া মানব জীবন চিন্তা-আবেগ, মমতা-বাসনা, সাহস-শঙ্কা, দেহ-চৈতন্য, স্বার্থ-পরার্থ, ব্যক্তি-সমাজ ইত্যাদি নানা পরস্পর বিরুদ্ধ বা ডায়ালেকটিক সম্পর্কে আবদ্ধ বৃত্তি ও উপাদানে গঠিত একটি সমগ্র। এগুলো সবই প্রকৃতি প্রদত্ত বা ঈশ্বর প্রদত্ত; কোনটিই নিন্দনীয় বা মন্দ নয়। ভাল-মন্দের বিষয়টি হচ্ছে আপেক্ষিক পরিমাপে বা অনুপাতে। সামঞ্জস্যেই সৌন্দর্য, সামঞ্জস্যেই পুণ্য। ডিফরমিটি হচ্ছে সৌন্দর্যহানি, পাপ, মন্দ। নির্মম কিন্তু শক্তিশালী বুদ্ধি যেমন ডিফরমিটি, তেমনই বুদ্ধিহীন মমতাও ডিফরমিটি—আবার অঙ্গহানিই কেবল ডিফরমিটি নয়, কোন অঙ্গের অসমঞ্জস বৃদ্ধিও ডিফরমিটি। জীবনের সকল বৃত্তির সুসমঞ্জস বিকাশের পথ ও বিকাশে সামঞ্জস্য বজায় রাখার সামর্থ্য অর্জনের জন্য প্রজ্ঞার অনুরক্ত সন্ধানী হওয়া দরকার। বলা হয়ে থাকে, যাকে প্রজ্ঞা দেয়া হয়েছে, তাকে প্রভূত কল্যাণ দেয়া হয়েছে।

দর্শনচর্চার তৃতীয় সুফল হতে পারে সমাজে সুস্থ সংহতি বা ঐক্য। ধর্মীয় চিন্তা থেকে যেমন অন্ধত্ব, গোঁড়ামি তৈরি হতে পারে, তেমনই "মুক্তবুদ্ধি"জাত মত থেকেও অন্ধত্ব, গোঁড়ামি, অহংকার, স্বৈরধর্মীতা তৈরি হতে পারে। নির্বিচার, অন্ধ, অসচেতন আনুগত্য সামাজিক সংহতি নষ্ট করে, সমাজকে বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করে, অংশগুলোকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করে, এবং বিরোধকে জীবন-ক্ষয়ী ও ভয়াবহ করে তুলতে পারে। তবে আমরা যারা নেতৃত্বকামী ও প্রভুত্বকামী তাদের অনেকের এই শঙ্কা থাকাই স্বাভাবিক যে, স্বাধীন চিন্তা সংহতির জন্য বিপদজনক। স্বাধীন বিচারমূলক চিন্তা নেতৃত্বের বা প্রভুত্বের ভিতে আঘাত করতে পারে এবং স্বাধীন চিন্তা সার্বজনীন হয়ে উঠলে "জনতা" নামক ধারণার বিলোপ ঘটতে পারে ও ব্যক্তিরা নেতৃত্বের বাসনা মতো চলতে নারাজ হয়ে উঠতে পারে। একারণে ঐতিহ্যনিষ্ঠ ধর্মাধিকারীরা যেমন আবেগের আবেশে মানুষকে বন্দী করতে পারেন, তেমনই পারেন আধুনিক চিন্তকেরাও। উভয় পন্থাতেই অনুসারী ধরার জন্য ও অনুসারীদেরকে ধরে রাখার জন্য নানা রকমের ঐতিহ্যপ্রেমের আবেগাশ্রয়ী ভাবরসের জাল তৈরি করতে হয়। আর নানা রকম অন্ধত্বের আপোষহীন লড়াইয়ের আবর্তে সমাজ কেবল ক্ষয়িত হতে থাকে এবং ব্যক্তির জীবন স্বাধীনভাবে বিকশিত হওয়ার পরিবর্তে তা অপরের নির্মিত "ধর্ম" বা "আদর্শ" নামক দেবতার বেদীতে বলী হতে থাকে। আমরা অতীতের এমন মহাবিবরণ পেয়ে থাকি, যাকে চ্যালেঞ্জ করা জাতিচ্যুতিসাধক পাপ, ক্ষমার অযোগ্য স্পর্ধা বা সুস্পষ্ট দ্রোহ হিসেবে সাব্যস্ত হয়ে থাকে; এবং ধারণা করা হয়, এই ভূত-উপাসনাই জীবনকে আখেরে সফল করে তোলে। দর্শন আমাদের প্রত্যেককে বিচার ও সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে স্বনির্ভর করে তুললে সমাজে যত ব্যক্তি তত আদর্শের উৎপত্তি হতে পারে। আদর্শের এই বহুল বৈচিত্র্য সকলকে সমান্তরালে চালিত করলে আমরা পরস্পরের হাত ধরে সুস্থ সংহতি তৈরি করতে পারব; আমাদেরকে তখন আর পিপড়ার মতো লাইন ধরে একজনের পেছনে আরেক জনকে যুদ্ধক্ষেত্রে যেতে হবে না।

সাধারণ মানুষের অস্থিরচিত্ততাকে গণতন্ত্রের অকার্যকারিতার জন্য দায়ী করেছিলেন প্লেটো; এটি রাষ্ট্রকেই যে কেবল দুর্বল করে তুলেছিল তা-ই নয়, সক্রেটিসের মতো জনের হাতে হেমলকও তুলে দিয়েছিল। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন এমন এক আদর্শ রাষ্ট্রের যেখানে দার্শনিকেরা নেতৃত্ব দেবেন। আজ অনেকেই বলে থাকেন যে, গণতন্ত্র প্রকৃত প্রস্তাবে জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত অভিজাতদের শাসনে পর্যবসিত হয়েছে; অনেকেই মনে করেন গণতান্ত্রিক অভিজাততন্ত্রই শ্রেষ্ঠ ও সুফলপ্রসূ শাসনব্যবস্থা। কিন্তু আমরা কি এমন স্বপ্ন দেখতে পারি না যে, সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তিই দার্শনিক অভিযাত্রী হবেন এবং তারা তাদের মধ্যে সেরা যারা তাদেরকে নির্বাচিত করে তাদের হাতে নেতৃত্ব প্রদান করবে? একে দার্শনিকদের রাজ্যে দার্শনিকদের গণতান্ত্রিক শাসন বলা যেতে পারে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক