বইয়ের সঙ্গে এক মাসের প্রেম, ১১ মাসের বিচ্ছেদ!

বইয়ের সঙ্গে এক মাসের সংসার শেষে ১১ মাসের জন্য বিচ্ছেদ হয়ে গেলো! আগামীবছর ১ ফেব্র"য়ারি আবার পুনর্মিলনী। এবং তারপর আবার বিচ্ছেদ! বই আর বাঙালি, লেখক আর প্রকাশক, পাঠক আর বিক্রেতার সম্পর্কটা মোটামুটি এই অমোঘ বৃত্তের ভেতর বন্দী। আর তাই ফেব্র"য়ারি মাসের শেষ দিনটা বিয়োগ ব্যথার দিন। প্রেমবিচ্ছেদের এই বৃত্তান্ত লিখেছেন মোস্তফা মামুন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 29 Feb 2008, 07:52 AM
Updated : 29 Feb 2008, 07:52 AM
ঢাকা, ২৯ ফেব্র"য়ারি (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- বইয়ের সঙ্গে এক মাসের সংসার শেষে ১১ মাসের জন্য বিচ্ছেদ হয়ে গেলো! আগামীবছর ১ ফেব্র"য়ারি আবার পুনর্মিলনী। এবং তারপর আবার বিচ্ছেদ! বই আর বাঙালি, লেখক আর প্রকাশক, পাঠক আর বিক্রেতার সম্পর্কটা মোটামুটি এই অমোঘ বৃত্তের ভেতর বন্দী। আর তাই ফেব্র"য়ারি মাসের শেষ দিনটা বিয়োগ ব্যথার দিন। প্রেমবিচ্ছেদের এই বৃত্তান্ত লিখেছেন মোস্তফা মামুন।
শুক্রবার দিনটা তেমন আনন্দ আর বেদনা একাকার হয়ে থাকল। প্রত্যাশামতো খুব ভিড় এদিন, বইমেলায় জনারণ্য, মানুষ দুই হাতে বই কিনছে, ক্রেতার চাহিদা মেটাতে নাভিশ্বাস প্রকাশকের, কিন্তু ফিরতি টাকা দিতে দিতে এক মুহুর্তের জন্য আনমনা! কাল থেকে তো আর এসবের কিছুই থাকবে না। আবার শুরু ১১ মাসের অপেক্ষা।
হুমায়ূন আহমেদ এখন আর মেলায় খুব একটা আসেন না। ঘনিষ্ঠদের কাছে শোনা যায় তিনি বরং বই লেখার চেয়ে সিনেমা বানানোতেই বেশি উৎসাহ বোধ করেন, নিজের মনে ছবিও আঁকেন নাকি খুব। তা ফাঁক করে এক-দুই দিন এসেছিলেন। আর তখন তার প্রকাশনী অন্য প্রকাশের সামনে যে উপচে পড়া ভিড় তা দেখে যদি কেউ মনে করে ইনি বাংলাদেশের জনপ্রিয়তম লোক, তাকে দোষ দেয়া যায় না।
জাফর ইকবাল এসে কোনো স্টলে বসেন না, তিনি আসন পাতেন বটতলায়, শুক্রবার শেষ দিনে সেখানেও কিশোরদের লাইন। বই কিনেছে, এখন বইয়ে অটোগ্রাফ নেবে। স্রেফ লেখক একটা বইতে অটোগ্রাফ দেবেন আর তার জন্য সাধারণত উচ্ছৃঙ্খল হিসেবে পরিচিত বাঙালি এমন সুশৃঙ্খল, লাইনবদ্ধ! বইমেলা এসব দৃশ্য উপহার দিয়ে ঘোষণা করে এই জাতি মারাত্মক বইপ্রেমী। শিক্ষা আর বুদ্ধিবৃত্তিতে দারুণ বিকশিত মানুষের বসবাস এই ভুখণ্ডে। ভুল!
ইংল্যান্ডের আন্ডারগ্রাউন্ড রেলস্টেশনে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আমাদের দেশের কিছু মানুষের আছে। যাদের অভিজ্ঞতা নেই তারা কোনো প্লাটফরমে ঢুকলে ভেবে বসবেন বোধহয় কোনো একটা উন্মুক্ত ক্লাসরুমে চলে এসেছেন। স্যার ছাত্রদের সেলফ স্টাডি দিয়েছেন। যে যতো মনযোগ দিয়ে পড়বে সে ততো বেশি নাম্বার পাবে। সবার হাতে বই। ট্রেনের সিটে বসতে না বসতেই সিংহভাগ লোক বই মেলে ধরছে। কেউ কেউ দাঁড়িয়েও বই মেলে ধরে। পাশের দেশ কলকাতার রেল স্টেশনেও শরৎ রচনাবলীর পাতা ওল্টাতে দেখা যায় কোনো এক প্রৌঢ়কে। তুলনায় ঢাকার বাসের কথা চিন্তা করুন। পত্রিকার বাইরে কি কাউকে কিছু পড়তে দেখা যায়। অথচ এই দেশের দৃশ্যত বই এবং পড়াশোনাবিমুখ মানুষগুলো এমন বইপ্রেমী যে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে বই কেনে। বছরখানেক আগে সেই লাইনে পুলিশ লাঠিচার্জও করেছিল। সেই ছবিটা আন্তর্জাতিকভাবে প্রচার পেলে ভাবমূর্তির জন্য কী অসাধারণ একটা ব্যাপার হতো। বই কেনার জন্য মার খেতেও রাজী এই দেশের মানুষ।
সমস্যা হলো বইমেলা শেষ, বইও শেষ, পড়াশোনাও যেন শেষ। বইয়ের দোকানগুলো ফাঁকা। বিক্রেতাদের অখণ্ড অবসর। ব্যবসা হিসেবে এটা কোনো জাতেরই না-শুনতে পাই অনেক বই ব্যবসায়ীর মুখে। কথাটা বাকি ১১ মাস সত্য। এই এক মাস মিথ্যা! সত্য-মিথ্যার এই যে অদ্ভুত বেড়াজাল তা থেকে বেরোনোর কি কোনো উপায় আছে! এই এক মাস অনেক সেমিনার-সিম্পোজিয়াম হলো বটে, অনেক আলোচনা, কিন্তু গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় আমরা জানি এই আলোচনাটাও ফেব্র"য়ারিকেন্দ্রিক। দিনকয়েক আগে লেখককুঞ্জের আড্ডায় এক লেখক বলছিলেন, এই মেলা এবং ফেব্র"য়ারিকেন্দ্রিকতারও একটা ইতিবাচক দিক আছে। যে মাসে ভাষার জন্য আমাদের লোকজন প্রাণ দিয়েছে, শুধু সেই মাসেই আমাদের লোকজন ভাষা আর সাহিত্যের প্রতি প্রেম দেখাবে বলে ঠিক করে করেছে। অন্য মাসে সেটাকে নিয়ে গেলে অন্যায় হয় না! রসিকতা, কিংবা কথার কথা, কিন্তু কাকতালীয়ভাবে সেটাই আসল কথা হয়ে গেছে। আর সেজন্যই বইমেলা মানে জনারণ্য। বইমেলা মানে লাইন ধরে মানুষের বই কেনা!
গত কয়েক বছর ধরে ফিসফিসানি ছিল। এবার রীতিমতো স্লোগান। মেলার জায়গা বাড়াতে হবে। পুরো ফেব্র"য়ারি মাস জুড়েই বিতর্কটা চলেছে এবং কোনো মীমাংসা হয়নি। হওয়াটা সহজ ব্যাপারও নয়। বাংলা একাডেমীর জায়গাটা পুরো ১ কোটি মানুষের শহরের একটা মেলার জন্য যথেষ্ট সংকীর্ণ। সমাধানের সহজ উপায়, মেলাটাকে সরিয়ে বড় কোনো জায়গায় সরিয়ে নেয়া। কিন্তু তাতে আবার ঐতিহ্যের প্রতি অমর্যাদা হতে পারে। এবং তারচেয়েও বড় ভয়, যদি জমজমাট ভাবটা কমে যায়। তাই বিভক্ত মতামত। কিন্তু বিতর্কটা এবার খুব ভালোমতোই উঠে গেছে।
যেমন এটাও একটা বড় বিতর্ক যে এক প্রকাশকের বই আরেক প্রকাশকের স্টলে বিক্রি হবে কিনা? কয়েক বছর আগেই নিয়মটা হয়েছে, কিন্তু এবারই বোধহয় প্রথম খুব কড়াকড়িভাবে সেটা পালিত হলো। তার অসুবিধার দিক হচ্ছে যে জনপ্রিয় লেখকদের বই কিনতে গিয়ে পাঠকদের রীতিমতো গলদঘর্ম হতে হয়। ওসব স্টলে লেগে থাকা ভিড়ের জন্য অনেকে কাঙ্খিত বই সংগ্রহও করতে পারেন না। সেই যুক্তিতে এটা গ্রহণযোগ্য নয়। আবার তাই যদি হয়, অর্থাৎ সব স্টলে সবার বই পাওয়া যায় তাহলে তো আর প্রকাশনা সংস্থাগুলোর নিজস্ব সত্ত্বা প্রকাশেরই সুযোগ থাকে না। এবং বইমেলা আর বইয়ের বাজারে কোনো তফাতও থাকে না। এটাও তাই সমাধানহীন সমস্যা।
এরচেয়েও বড় সমস্যা হলো বই প্রকাশ পুরোপুরি মেলাকেন্দ্রিক হয়ে যাওয়াতে বইয়ের মানের ওপর পড়া কুপ্রভাব। একদিন একটা বই এসেছে, নতুন লেখকের বই, খুব উৎসাহ নিয়ে বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে লেখক এসেছেন, পরম আগ্রহে বইটা ওল্টাতে গিয়ে আবিষ্কার করলেন বইয়ের ভেতর এমন কিছু লেখা যেগুলো তিনি কোনোদিনই লিখেননি। তাহলে! আসলে বাইন্ডিংয়ের ভুলে আরেকটা বইয়ের কিছু পাতা ঢুকে গেছে তার বইয়ে। সময়ের তাড়া থাকে বলে ঠিকমতো প্র"ফ দেখাও হয় না অনেক ক্ষেত্রে; ভুল বানান, অশুদ্ধ বাক্যেও বেরিয়ে গেছে প্রচুর বই। আবার লেখকের তাড়াহুড়ার কারণে প্রকাশক অনেক ক্ষেত্রে অপ্রস্তুত বইও নিয়ে এসেছেন মেলায়। বাইন্ডিংয়ের পর কিছুটা সময় বইকে চাপ দিয়ে রাখতে হয়, কিন্তু সেটা না করাতে দেখা গেছে বাইন্ডিং খুলে যাচ্ছে। পাতা ছড়িয়ে পড়ছে। এসবই বই প্রকাশ এবং বিক্রি শুধু মেলাকেন্দ্রিক হওয়ার সমস্যা।
আরেকদিন ঘটল আরেকটা মজার ঘটনা। একজনের বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হবে, অতিথিরা সব চলে এসেছেন, লেখকও এসেছেন সেজে-গুজে, কিন্তু বই নেই। কিছুক্ষণ আগে পৌঁছার কথা, কিন্তু ট্র্যাফিক জ্যামে পড়ে....। অতিথিরা দীর্ঘ অপেক্ষা করে চলে গেলেন, তখন এলো বই। মোবাইল ফোনের সুবাদে একজনকে আটকানো গেলো বটে, কিন্তু বাকিরা চলে যাওয়াতে মোড়ক উন্মোচনের সময় লেখকের মন বিষন্ন।
এত সমস্যার পরও বইমেলাই বাঙ্গালির শ্রেষ্ঠতম মিলনমেলা। জ্ঞানভিত্তিক ভাব-বিনিময়ের সার্বজনীন সমারোহ। এবং শত সমস্যা আর সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এই সমারোহ বছর-বছর আরও বর্ণিল হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় এবার বই বেরিয়েছে অনেক বেশি। আর বিক্রি! প্রায় প্রত্যেক প্রকাশকই একমত, এবারের মতো এত বই কোনোদিনই বিক্রি হয়নি।
ইন্টারনেট আর ডিভিডির মহামারীতে বইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে যারা চিন্তিত তাদের চিন্তার আর কোনো কারণ থাকল না। জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় বাঙ্গালির মন নেই এই অপবাদ দেয়ার সুযোগও অন্তত ২৯ ফেব্র"য়ারি তারিখে নেই।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এমএম/এমএইচবি/১৯০০ঘ.
তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক