অবমাননার দায়ে বার্গম্যানের দণ্ড

যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালকে বিতর্কিত করতে উদ্দেশ্যমূলক প্রচার চালানোয় আদালত অবমাননার দায়ে সাজা হয়েছে সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানের।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 2 Dec 2014, 06:31 AM
Updated : 2 Dec 2014, 06:31 AM

সাজা হিসেবে বিদেশি এই নাগরিককে মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পুরোটা সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। সেই সঙ্গে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে তাকে, জরিমানার টাকা দিতে ব্যর্থ হলে তাকে সাত দিন কারাগারে থাকতে হবে।

সর্বোচ্চ আদালতের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের মেয়ে ব্যারিস্টার সারা হোসেনের স্বামী যুক্তরাজ্যের নাগরিক বার্গম্যানের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগের রায়ে এই দণ্ডাদেশ দেয় বিচারপতি ওবায়দুল হাসান নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-২।

রায়ে ট্রাইব্যুনাল ঐতিহাসিকভাবে মীমাংসিত বিষয়ে ভবিষ্যতে সমালোচনামূলক লেখা না লিখতে সতর্ক করে দিয়েছে নিউ এইজের সাবেক বিশেষ প্রতিনিধি বার্গম্যানকে, যিনি একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচার দাবির আন্দোলনকারীদের কাছে ব্যাপক সমালোচিত।

ব্লগে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ লেখার মাধ্যমে বার্গম্যান বিচারাধীন বিষয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো এবং ট্রাইব্যুনালকেই ‘বিতর্কিত’ করার চেষ্টা করেছেন বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।

যুদ্ধাপরাধী আবুল কালাম আযাদের মৃত্যুদণ্ডের রায়কে কেন্দ্র করে নিজের ব্লগে বার্গম্যানের লেখা নিয়ে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ এনেছিলেন হাই কোর্টের আইনজীবীআবুল কালাম আজাদ।

গত বছরের ২৮ জানুয়ারি ব্লগে তোলা ‘আযাদ জাজমেন্ট অ্যানালাইসিস-১, ইন অ্যাবসেন্সিয়া ট্রায়াল অ্যান্ড ডিফেন্স ইনডিকোয়েন্সি’ এবং ‘আযাদ জাজমেন্ট অ্যানালাইসিস-২, ট্রাইব্যুনাল অ্যাজাম্পশন’ শীর্ষক লেখা ধরে বার্গম্যানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা চেয়ে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট সাঈদ মিজান।

এসব লেখায় ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আবুল কালাম আযাদের রায় নিয়ে করা মন্তব্যে ট্রাইব্যুনালের মর্যাদাহানি হয়েছে বলে আবেদনে অভিযোগ করা হয়। শুনানি শেষে মঙ্গলবার রায় দেয় ট্রাইব্যুনাল।

রায়ে বলা হয়েছে, আপিল বিভাগের বিচারক এস কে সিনহার একটি পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সৎ উদ্দেশ্য ও জনস্বার্থে আদালতের কার্যক্রম নিয়ে স্বচ্ছ ও গঠনমূলক সমালোচনা করা হলে তা আদালত অবমাননা হবে না। তবে এক্ষেত্রে মন্তব্যকারীর পরিপার্শ্ব বিবেচনা করে সৎ উদ্দেশ্য ও জনস্বার্থের বিষয়টি  নিশ্চিত করতে হবে আদালতকে, মন্তব্যকারীর ওই বিষয়ে যথার্থ জ্ঞান আছে কি না, তাও বিবেচ্য। যদি আইন বিষয়ে যথাযথ জ্ঞান রাখেন এমন কেউ, যেমন- একজন আইনজীবী, অথবা আইনের শিক্ষক অথবা তাত্ত্বিক স্বচ্ছ মন্তব্য করেন তাহলে আদালত নিশ্চিত হতে পারে যে তা সৎ উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল।

“আমাদের সর্বোচ্চ আদালতের এ পর্যবেক্ষণের আলোকে আমরা মনে করছি, একজন সাংবাদিক হিসেবে ঘোষিত রায় নিয়ে সমালোচনামূলক মন্তব্য করা উচিত হয়নি অবমাননাকারীর (বার্গম্যান)। তিনি আইন বিশেষজ্ঞ নন। এ বিষয়ে একটি ডিগ্রি থাকলেই তাকে একজন বিশেষজ্ঞ বলে ধরে নেয়া যায় না, বিশেষ করে জাতির মূল চেতনাই যে আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত রয়েছে। উপরোক্ত আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণে এ বিষয়টি স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে।”

আবেদনকারীর আইনজীবী সাঈদ মিজান শুনানিতে বলেন, ডেভিড বার্গম্যান ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণার আগেই সেই রায় নিয়ে মন্তব্য করেছেন। এছাড়া বিচারাধীন বিষয় নিয়েও তিনি মন্তব্য করেছেন তার লেখায়। এসব মন্তব্য বিচারিক আদালতের জন্য ‘হুমকিস্বরূপ এবং জনস্বার্থবিরোধী’। এগুলো রায় নিয়ে জনগণের মধ্যে ‘বিভ্রান্তি’ সৃষ্টি করেছে এবং ‘জাতীয় অনুভূতিকে’ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

ডেভিড বার্গম্যান (ফাইল ছবি)

 

ডেভিড বার্গম্যানের ব্লগে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায় নিয়ে করা মন্তব্যেও আদালত অবমাননা হয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।

আইনজীবী মিজান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন,“দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে গঠিত অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল বলেছিল, মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশে ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়, দুই লাখ নারী ধর্ষিত হয় এবং প্রায় এক কোটি মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। ডেভিড বার্গম্যান তার ব্লগে লিখেছেন, ‘ট্রাইব্যুনালের দেওয়া এসব তথ্যের কোনো ভিত্তি নেই’।”

ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়েছে, “তিনি (বার্গম্যান) ট্রাইব্যুনালকে কলুষিত এবং এর কর্তৃত্বকে খাটো করার উদ্দেশ্যে ইঙ্গিতপূর্ণ শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করেছেন। এই অসৎ উদ্দেশ্যপূর্ণ প্রচেষ্টা বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে।

“অবমাননাকারী একজন বিদেশি নাগরিক এবং পেশায় সাংবাদিক হলেও একটি পক্ষের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেছেন, যারা ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে অন্যায়, অসৎ ও ভিত্তিহীন সমালোচনা ছড়িয়ে একটি উদ্দেশ্যমূলক অযাচিত প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।”

রায়ের সময় বার্গম্যানের স্ত্রী সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সারা হোসেনও ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন। তিনি রায়ের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, “এই রায় বাক স্বাধীনতাকে কোনোভাবেই সংরক্ষণ করে না, বরং বাক স্বাধীনতাকে রুদ্ধ করে।”

“৩০ লাখ, তিন লাখ বলা বা ইতিহাস বিকৃত করার কথা এখানে আসছে না। ৩০ লাখ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এমন অনেককে হাতের কাছে পাওয়া যায়নি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, কিন্তু রায় হয়নি। হাতের মধ্যে একজনকে পাওয়া গেছে সেজন্যই কি রায় দেওয়া হয়েছে,” প্রশ্ন করেন সারা।

বার্গম্যানের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগটি প্রসিকিউশনের বদলে অন্য একটি পক্ষ থেকে আসায় তার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “ওই তৃতীয় পক্ষ কারা? কারা তাদেরকে এখানে পাঠিয়েছে? কেন তারা এখানে এসেছেন?”

সারা হোসেন

কারা পাঠিয়েছে বলে মনে করেন- প্রশ্ন করা হলে গণফোরামের সভাপতি কামাল হোসেনের মেয়ে সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, “আমার মনে হচ্ছে এর পেছনে কোনো একটা কারণ আছে। আপনারা সংবাদকর্মী, আপনাদের তদন্ত করে বের করা উচিত যে কেন মনে করা হচ্ছে যে সরকারের বিরুদ্ধে কোনো একটি প্রশ্ন তোলা যাবে না।”

আদালত অবমাননার অভিযোগ উত্থাপনের পর গত ১৮ মার্চ আইনজীবীর মাধ্যমে অভিযোগের বিষয়ে নিজের ব্যাখ্যা ট্রাইব্যুনালে দাখিল করেছিলেন ডেভিড বার্গম্যান। তাতে সন্তুষ্ট না হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল ১৭ এপ্রিল তাকে আবার জবাব দাখিল করতে বলে।

২৫ অগাস্ট বার্গম্যানের পক্ষে দ্বিতীয়বারের মতো দাখিল করা জবাবের বিষয়ে শুনানি করেন তার আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান খান। গত ৪ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে এ বিষয়ে উভয় পক্ষের শুনানি শেষ হয়। প্রসিকিউটরদের মধ্যে জেয়াদ আল মালুম এবং তুরিন আফরোজ শুনানিতে ছিলেন।

আদালত নিয়ে মন্তব্যের জন্য এর আগেও সতর্ক করা হয়েছিল বার্গম্যানকে। ২০১১ সালে ইংরেজি দৈনিক ‘নিউ এইজ’ এ মতামত কলামে সাঈদীর বিরুদ্ধে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ গঠন বিষয়ে বিরূপ মন্তব্য করায় তাকে কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছিল ট্রাইব্যুনাল।

এর আগে ২০১১ সালের ২ অক্টোবর ‘এ ক্রুশিয়াল পিরিয়ড ফর আইসিটি’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর আদালত অবমাননার অভিযোগে প্রতিবেদক বার্গম্যান, নিউ এইজ সম্পাদক নুরুল কবির এবং প্রকাশক আ স ম শহীদুল্লাহ খানকে কারণ দর্শাতে বলেছিল ট্রাইব্যুনাল।

শুনানি শেষে ২০১২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ডেভিড বার্গম্যানকে সর্বোচ্চ সতর্ক করে আদেশ দেওয়া হয়। তখন আদালত অবমাননা হয়েছে উল্লেখ করে ট্রাইব্যুনাল শুধু ভাবমূর্তির কথা বিবেচনায় সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেন।

 
তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক