যুদ্ধাপরাধ মামলায় রিভিউ চলবে

যুদ্ধাপরাধের মামলাতেও সর্বোচ্চ আদালতের দেওয়া রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) জন্য আবেদন করা যাবে বলে জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।

সুপ্রিম কোর্ট প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 25 Nov 2014, 07:04 AM
Updated : 25 Nov 2014, 02:30 PM

আসামি ও রাষ্ট্র- দুপক্ষই ১৫ দিনের মধ্যে রায় পুনর্বিবেচনার জন্য এই আবেদন করতে পারবে। তবে রায়ের নির্ভরযোগ্যতায় ‘খাদ আছে’ বা‘বিচার-বিভ্রাটের’আশঙ্কা আছে বলে মনে করলেই আদালত তা পুনর্বিবেচনার জন্য গ্রহণ করবে।   

যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার ‘রিভিউ’ আবেদন খারিজের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনে দণ্ডিতদের ক্ষেত্রেও আপিলের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন গ্রহণযোগ্য (মেনটেইনেবল) হবে। তবে তা আপিলের সমকক্ষ হবে না।

মঙ্গলবার এই পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপক্ষ ও যুদ্ধাপরাধ মামলার আসামিদের আইনজীবীদের দীর্ঘ বিতর্কের অবসান ঘটল।

এর ফলে জামায়াতের আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল  মো. কামারুজ্জামানও তার ফাঁসির আদেশ রিভিউয়ের আবেদন করার সুযোগ পাচ্ছেন।

একইসঙ্গে জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর দণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন সাজার রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষও একই আবেদন করতে পারবে।

গতবছর ১৭ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগে যুদ্ধাপরাধ মামলার প্রথম রায়ে কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়। এরপর তার আইনজীবীরা দুটি আবেদন করেন।

এর একটিতে ওই রায় পুনর্বিবেচনা আবেদন করা হয় এবং দ্বিতীয় আবেদনে রায় পুনর্বিবেচনা করে কাদের মোল্লার খালাসের আবেদন করা হয়।

সর্বোচ্চ আদালত তার আবেদন খারিজ করে দিলে গত ১২ ডিসেম্বর রাতে কার্যকর করা হয় ফাঁসির দণ্ড।

কিন্তু রিভিউ গ্রহণ ও খালাসের আবেদন একত্রে খারিজ হওয়ায় এ ধরনের মামলায় রিভিউ আদৌ চলবে কি-না, সে অস্পষ্টতা থেকে যায়।

এরপর চলতি বছর ১৭ সেপ্টেম্বর আপিলের দ্বিতীয় রায়ে সাঈদীর সাজা মৃত্যুদণ্ড থেকে কমে আমৃত্যু কারাদণ্ড হলে এর বিরুদ্ধে রিভিউ করা যাবে কি না- সে প্রশ্ন ওঠে।

৩ নভেম্বর তৃতীয় রায়ে কামারুজ্জামানের ফাঁসির আদেশ বহাল থাকলে আরো জোরালো হয় সেই প্রশ্ন।

কামারুজ্জামানের আইনজীবীরা বলে আসছিলেন, ওই রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করার সাংবিধানিক অধিকার তাদের রয়েছে। ‘রিভিউয়ের সুযোগ না দিয়ে’ রায় কার্যকর করা যাবে না বলেও তারা মন্তব্য করে আসছিলেন।

অন্যদিকে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমসহ রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলে আসছিলেন, যেহেতু যুদ্ধাপরাধের বিচার হচ্ছে বিশেষ আইনে, সেহেতু সংবিধানের ১০৫ ধারা এই দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।

কাদের মোল্লার রিভিউ খারিজের পূর্ণাঙ্গ রায়ে এ বিতর্কের মীমাংসা হল।

রায় প্রকাশের পর সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, এই রায়ের ফলে দুই পক্ষই রিভিউ আবেদন করার সুযোগ পাবে।

রায়ে বলা হয়েছে, সাধারণ মামলার ক্ষেত্রে রিভিউয়ের জন্য ৩০ দিন সময় দেওয়া হলেও এ আইনের মামলায় তা প্রযোজ্য হবে না। ১৯৭৩ সালের এই আইনের অধীনে আপিলের রিভিউয়ের সময় হবে ১৫দিন। আর তা নিষ্পত্তি হবে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে।

ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় আপিল বিভাগ বহাল রাখলে এবং আসামিপক্ষ পুনর্বিবেচনার আবেদন করলে তার নিষ্পত্তি হওয়ার আগে দণ্ড কার্যকর করা যাবে না।

আপিল বিভাগের সর্বোচ্চ সাজার আদেশে বিচারিক আদালত (ট্রাইব্যুনাল) মৃত্যু পরোয়ানা পাঠালে আসামি রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করতে পারবেন। তিনি স্বজনদের সঙ্গে দেখাও করতে পারবেন।

তবে কারাবিধিতে উল্লেখিত ৭ বা ২১ দিনের সময়সীমা প্রযোজ্য হবে না।

এই রায়টি লিখেছেন আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি এসকে সিনহা। প্রধান বিচারপতিসহ অন্য চার বিচারপতি তার সঙ্গে একমত পোষণ করেন।

গত বছরের ১২ ডিসেম্বর প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন নেতৃত্বাধীন এই বেঞ্চই কাদের মোল্লার রিভিউ খারিজের আদেশ দেয়।

ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের নজির দেখিয়ে রায়ে বলা হয়, আপিলে উচ্চতর কর্তৃপক্ষের কাছে মামলার পুরো প্রক্রিয়া উপস্থাপিত হয়। আইনের সীমায় সামগ্রিক দলিলাদির ভিত্তিতে সমগ্র প্রক্রিয়াকে বিবেচনা করা হয়।

“যদি কোনো পক্ষ আদালতের কোনো আদেশ বা রায়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেক্ষেত্রে রিভিউয়ের সুনির্দিষ্ট বিধান না থাকলে আদালত অন্তর্নিহিত ক্ষমতাবলে তার রায় বা আদেশ রিভিউ করতে পারেন। আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত যে কোনো আদালতে, বিচারের যে কোনো পর্যায়ে রিভিউয়ের ক্ষমতা প্রয়োগ করা যায়।”

রায়ে বলা হয়, “বিচার বিভাগের প্রাথমিক কাজ হলো, পক্ষগুলোর মধ্যে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, যাকে আমরা উপেক্ষা করতে পারি না।”

আপিল বিভাগ বলছে, যুদ্ধাপরাধ মামলায় সর্বোচ্চ আদালত রিভিউয়ের এই সুযোগ দিচ্ছে ‘অন্তর্নিহিত ক্ষমতাবলে’, সংবিধানের ১০৪ বা ১০৫ অনুচ্ছেদ অনুসারে নয়।

রায়ে বলা হয়, ১৯৭৩ সালের ট্রাইব্যুনাল আইন একটি সুরক্ষিত আইন। তাই সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদে ‘পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচারের’ বিষয়টি এক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। সংবিধানের ৪৭(ক)(২) ধারা অনুসারে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতরা সংবিধানের আলোকে প্রতিকার চাইতে পারেন না।

“তারা আপিলের অধিকার পায় ১৯৭৩ এর আইনের আলোকে, সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদ অনুসারে নয়। যদি ১০৩ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য না হয়, তাহলে রিভিউ করার জন্য ১০৪ ও ১০৫ অনুচ্ছেদও প্রযোজ্য হবে না। স্বাভাবিকভাবেই ১৯৮৮ সালের সুপ্রিম কোর্ট (আপিল বিভাগ) রুলও প্রযোজ্য হবে না।”

রিভিউ আপিলের সমকক্ষ নয় উল্লেখ করে রায়ে বলা হয়, “এটা এখন মীমাংসিত বিষয় যে, রিভিউ আবেদনকারীর একটি অধিকার হিসাবে বিবেচিত হবে না।”

রিভিউয়ের জন্য আবেদন করা হলেই যে রায় পুনর্বিবেচনা করা হবে- এমন নয়।   

আপিল বিভাগ বলছে, “পূর্ববর্তী আদেশের নির্ভরযোগ্যতায় খাদ পাওয়া গেলে বা বিচার-বিভ্রাটের ফল সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে বলে সন্তুষ্ট করতে না পারলে পুনর্বিবেচনা অনুমোদনযোগ্য হবে না।”

রায়ে বলা হয়, “কোনো মামলায় রায়ের রিভিউ একটি গুরুতর পদক্ষেপ। চোখে পড়ার মতো কোনো কিছু বাদ গেলে বা সুস্পষ্ট বা বড় কোনো ভুল না হলে আদালত তার এই ক্ষমতা ব্যবহার করতে অনিচ্ছুক।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক