যশোর-দিনাজপুরে হিন্দুদের ওপর হামলা, ঘরে আগুন

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর যশোর ও দিনাজপুরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করেছে দুর্বৃত্তরা।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 6 Jan 2014, 05:35 PM
Updated : 6 Jan 2014, 05:48 PM

দুর্বৃত্তদের দেয়া আগুনে এসব এলাকায় পুড়েছে শতাধিক কাঁচাঘর এবং কয়েকশ’ পরিবার সর্বস্ব হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটিয়েছে।

হামলা হয়েছে মাগুরায়ও। আক্রান্তরা অভিযোগ করেছেন, ভোট দেয়ায় তাদের ওপর হামলা হয়েছে।

বিএনপি-জামায়াত জোটের বর্জনের মধ্যে রোববার জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হয়, যাতে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে।  

এই ভোট ঠেকানোর হুমকি ছিল বিএনপি-জামায়াত জোটের। আর ভোটের পরই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর এই হামলা হয়।  

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের দিনাজপুর প্রতিনিধি জানান, ভোটের পর সদর উপজেলার একটি গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের শতাধিক বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালিয়েছে নির্বাচনবিরোধীরা।

রোববার চেহেলগাজী ইউনিয়নের কর্ণাই গ্রামে এ হামলা থেকে রক্ষা পেতে প্রায় অর্ধশত পরিবারের লোকজন বাড়িঘর ছেড়ে স্থানীয় সমাজসেবী রেজাউল করিম রাকির বাড়িতে আশ্রয় নেন।

এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আবেদন করেও কোনো সহায়তা পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ ওই পরিবারগুলোর।

রেজাউল করিম রাকি এবং উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান জেসমিন আরা জোৎস্না বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, রোববার কর্ণাই সরকারি প্রাথমিক বিদালয় কেন্দ্রে ভোট গণনার পরপরই ভোটে অংশ নেয়ায় জামায়াত-শিবিরের কয়েকশ’ ক্যাডার সংখ্যালঘু পরিবারের বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালায়।

হামলাকারীরা লাঠিসোঁটা ও দেশি অস্ত্র নিয়ে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত কর্ণাই গ্রামের সাহাপাড়া, প্রিতমপাড়া, প্রফুল্লপাড়া, তেলীপাড়া, বৈদ্যপাড়া, হাজীপাড়া ও অজয়পাড়ায় প্রায় তিন ঘণ্টা তাণ্ডবলীলা চালায়।

গভীর রাত পর্যন্ত হামলাকালে তারা ৪/৫টি বাড়ি, ৬/৭টি দোকান জ্বালিয়ে দেয়। এছাড়া শতাধিক বাড়ি, অর্ধশতাধিক দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাংচুর করে এবং মূল্যবান মালামাল লুট করে।

হামলার শিকার দীপক কুমার, শিবু চন্দ্র, রতন চন্দ্র, চঞ্চল চন্দ্র, ভরত চন্দ্র মুকুল চন্দ্রসহ গ্রামের লোকজনের অভিযোগ,ভোট দেয়ার অপরাধে তাদের উপর হামলা চালিয়েছে নির্বাচন বিরোধীরা। ভোটের আগে এরাই তাদের ভোট কেন্দ্রে না যেতে বলেছিল।

হামলা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনকে জানিয়েও কোনো সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে কোতোয়ালি থানার ওসি আলতাফ হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমরক বলেন, নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত থাকায় ওদিকে নজর দিতে পারেনি পুলিশ।

দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।

দুর্বৃত্তের আগুরে ভস্মীভূত দিনাজপুরের কর্ণাই গ্রামে হিন্দুদের ঘর

স্থানীয় সাংসদ ইকবালুর রহিমসহ প্রশাসনের লোকজন সোমবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তারা হামলার জন্য বিরোধী জোটকে দায়ী করেন।

তবে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মুকুট চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তাদের দলের লোকজন এ হামলায় জড়িত নয়। এটা ‘অপপ্রচার’।

যশোর প্রতিনিধি জানান, ভোট শেষের পর রোববার সন্ধ্যায় অভয়নগরের চাপাতলা গ্রামের মালোপাড়ায় হামলা করে হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েকটি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়।

এরপর স্থানীয়দের সহায়তায় ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা আগুন নেভায়। খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা রাতেই ঘটনাস্থলে যায় এবং সেখানে অবস্থান নেয়।

যশোর পুলিশের এএসপি (সদর) রেশমা শারমিন বলেন, “জামায়াত-শিবিরের লোকজন এ হামলা চালিয়েছে। প্রশাসনের লোকজন যখন ভোট গণনায় ব্যস্ত ছিল, ঠিক তখনি তারা এ ঘটনা ঘটায়।”

এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা মামলা না করলে পুলিশ মামলা করবে বলে তিনি জানান।

স্থানীয়রা জানান, রোববার সন্ধ্যা ৭টার দিকে দেড় শতাধিক লোক মালোপাড়ায় ঢুকে পাড়ার অন্তত দেড়শ বাড়ির আসবাবপত্র, ঘরের চালা, ধান-গমের গোলাসহ বিভিন্ন মালামাল ভাংচুর ও তছনছ করে।

পরে ৪/৫টি বাড়িতে আগুন দেয় এবং বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী লুট করে নিয়ে যায়।

এ সময় ভয়ে মালোপাড়ার লোকজন গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায়।

সোমবার সকালে স্থানীয় সংসদ সদস্য, যশোরের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

জেলা প্রশাসক মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অর্ধশতাধিক বাড়িতে ভাংচুর ও লুটপাট চালায় এবং কয়েকটি বাড়িতে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের ২শ কম্বল দেয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

বেসরকারিভাবে নির্বাচিত সাংসদ রণজিত রায়ের অভিযোগ,তার নির্বাচনী প্রতিপক্ষ হুইপ শেখ আব্দুল ওহাবের প্ররোচনায় জামায়াত-বিএনপির লোকজন এ ঘটনা ঘটিয়েছে।

তবে এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য শেখ আব্দুল ওহাবের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে পাওয়া যায়নি।

মাগুরা প্রতিনিধি জানান, মাগুরা সদরে হিন্দু সম্প্রদায়ের এক কৃষকের পানের বরজ পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে রোববার রাতে।

বাটাজোড় গ্রামের নৃপেন্দ্র নাথ মণ্ডলের পানের বরজে আগুন দেয়ায় প্রায় এক একর জমির পান ও প্রায় একশ’ মেহগনি গাছ পুড়ে যায়।

নৃপেন্দ্রনাথ সাংবাদিকদের বলেন, সংসদ নির্বাচনে ভোট না দেয়ার জন্য স্থানীয় একটি মহল এলাকার সংখ্যালঘু পরিবারগুলোকে হুমকি দিয়ে আসছিল। কিন্তু  তা অগ্রাহ্য করে তারা ভোট দেন।এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তারা পানের বরজে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেয়।

এ ব্যাপারে সদর থানার ওসি এম এ হাসেম বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তবে ঘটনাটি রাজনৈতিক নয় বলে মনে হচ্ছে। সামাজিক বিরোধ নিয়ে এ ঘটনা ঘটতে পারে।