বাংলাব্রেইল: দৃষ্টিহীন শিশুদের পাশে হাজারো তরুণ

পাঠ্যবই হাতে না পাওয়া দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রেইল বই তৈরির কাজ শুরু করেছে ‘বাংলাব্রেইল’ নামের একটি ফেইসবুক গ্রুপ।

মামুনুর রশীদবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 11 July 2013, 10:27 PM
Updated : 12 July 2013, 04:09 AM

একইসঙ্গে দ্রুততম সময়ে দৃষ্টিহীন ছাত্রছাত্রীদের দুর্দশা দূর করতে এসব বইয়ের অডিও সংস্করণও তৈরি করছেন এই গ্রুপের দুই হাজারের বেশি সদস্য।

দেশের বিপুলসংখ্যক দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীর পাঠ্যবই সঙ্কট নিয়ে গত ২৫ জুন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

‘৬ মাসেও বই পায়নি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, সব সময়ই দেশে ব্রেইল পদ্ধতির পাঠ্যবইয়ের সঙ্কট থাকলেও জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড এবার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে নতুন ১০৪টি বই প্রণয়ন করায় সঙ্কট নতুন রূপ পেয়েছে।

বিষয়টি জানতে পেরে এই শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু করার তাড়না থেকে এগিয়ে আসেন রাগিব হাসান, যিনি ইউনিভার্সিটি অব আলাবামা অ্যাট বার্মিংহামে কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের একজন সহকারী অধ্যাপক।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “প্রথমে আমি দেশে অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের সাথে যোগাযোগ করে সেদিনই ফেইসবুকে বাংলাব্রেইল নামে একটি গ্রুপ তৈরি করি। সেখানে প্রথম দিনেই যোগ দেন চারশর বেশি মানুষ।”

বর্তমানে এই গ্রুপের দুই হাজারের বেশি সদস্য স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে পাঠ্যবইগুলোর টেক্সট প্রথমে ইউনিকোডে রূপান্তর করছেন৷ এরপর তা অধ্যাপক জাফর ইকবালের ব্রেইল প্রিন্টার থেকে ছাপা শুরু হবে বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান রাগিব।

“প্রজেক্টটা মাত্র কিছুদিন আগে শুরু হলেও গ্রুপের উৎসাহী কর্মীরা একে তরতর করে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এরই মধ্যে ১০/১২টা বইয়ের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়েছে। প্রিন্টে নেয়ার আগে সেগুলোর প্রুফ দেখার কাজ চলছে এখন।”

প্রথম থেকে নবম-দশম শ্রেণীর বাকি বইগুলো ইউনিকোডে রূপান্তরের কাজ আর দু’এক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হবে বলে আশা করছেন রাগিব।

‘বাংলাব্রেইল প্রজেক্ট’ এর পাশাপাশি এগিয়ে চলছে ‘অডিও বুক প্রজেক্ট’ এর কাজও। এতে ব্রেইল বই ছাপতে দেরি হলেও অডিওবুকগুলো শিক্ষার্থীদের কাজে আসবে।  

রাগিব বলেন, “আমাদের স্বেচ্ছাসেবকরা পাঠ্য বইগুলোকে পড়ে অডিও রেকর্ড করে ফাইলগুলো অনলাইনে আপলোড করে রাখবেন। দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীদের অভিভাবকেরা তাদের মোবাইল ফোনে সেই অডিও ফাইল ডাউনলোড করে নিয়ে ব্রেইল বই হাতে পাওয়ার আগ পর্যন্ত কাজ চালাতে পারবেন।”

অডিও বুক প্রজেক্টের কাজ শুরু হয়েছে পঞ্চম শ্রেণির বিজ্ঞান বই দিয়ে, যা রেকর্ড করেছেন রাগিব হাসান নিজে। ইতোমধ্যে প্রথম থেকে দশম শেণীর প্রায় ২৫টি বইয়ের কাজ শুরু হয়েছে, যার কয়েকটি পূর্ণাঙ্গ অথবা অসম্পূর্ণ অবস্থায় শিক্ষক ডটকম নামের একটি ওয়েবসাইটে তুলে দেয়া হয়েছে বলে জানান রাগিব।

“শ্রম আর সময় কম লাগে বলে অডিও বুক প্রজেক্টে আমরা আরো ভালো সাড়া পেয়েছি। বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই এ কাজে অংশ নিচ্ছেন।”

একইসঙ্গে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের পাঠ্যবই সঙ্কটের স্থায়ী সমাধানের জন্য তহবিল সংগ্রহের কাজও চলছে বলে রাগিব হাসান জানান।

“একটা মোটামুটি মানের ব্রেইল প্রিন্টারের দাম ন্যূনতম ৮০ হাজার ডলার। আর ব্রেইলে ছাপার খরচটাও অনেক বেশি। আশার কথা হচ্ছে বেশ কিছু প্রবাসী বাঙালি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, যাতে এই সমস্যার একটা স্থায়ী সমাধান হয়।”

দেশে দৃষ্টিহীনদের নিয়ে কাজ করে এমন বিভিন্ন সংগঠন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হচ্ছে জানিয়ে এই শিক্ষক বলেন, “এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীদের সংখ্যা কতো তার একটা ধারণা পেলে সে অনুযায়ী বই সরবরাহ করা যাবে।”

দেশের সরকারি স্কুলগুলোর দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীরা কিছু বই পেলেও বেসরকারি স্কুলগুলোর শিক্ষার্থীরা সরকারি কোনো বই পায় না।

আগামী ১৩ জুলাই বাংলাব্রেইল ও অডিও বুক প্রজেক্টের প্রথম পর্যায়ের কাজগুলো প্রকাশ করা হবে জানিয়ে রাগিব শুক্রবার এক ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন, “এখন পর্যন্ত সম্পন্ন হওয়া বইগুলা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। সেই সাথে আমাদের প্রজেক্টের ওয়েবসাইটটিও উদ্বোধন করা হবে, যেখানে এই বইগুলা ও অডিওবুক পাওয়া যাবে।”

এ কাজে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে রাগিব আরেকটি পোস্টে বলেন, “দৃষ্টিহীনদের কাছে জ্ঞানের আলো পৌঁছে দেয়ার এই চেষ্টায় আপনিও এগিয়ে আসুন, খুব অল্প সময় লাগবে প্রতিদিন, কিন্তু পাল্টে দিতে পারবেন লাখ লাখ শিশুর জগৎটাকে।”  

এই প্রজেক্টের সঙ্গে প্রথম থেকেই আছেন অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “এটা মহৎ একটা উদ্যোগ। খুব অল্প সময়েই আশাতীত সাড়া পেয়েছি আমরা। আশা করছি এর মধ্য দিয়েই দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের সঙ্কটের একটা স্থায়ী সমাধান হবে।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক