ঢাকা, নভেম্বর ১৩ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- ভাষার অধিকার নিয়ে শুধু সরাসরি লড়াইয়েই নয়, ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিস্মারক শহীদ মিনারের নকশায় মূলস্তম্ভের পেছনে লাল সূর্যটি এসেছিলো শিল্পী ইমদাদ হোসেনের প্রস্তাবেই।
পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়, সে নামটিও চারুকলা অনুষদের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী ইমদাদেরই দেওয়া।
আজীবন সংগ্রামী শিল্পী ইমদাদ হোসেন ৮৫ বছর বয়সে রোববার সকালেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। অন্য সব বাদ দিলেও এ দুটি ক্ষেত্রে তার ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এছাড়া বাংলাদেশ টেলিভিশনের লোগোটি তারই করা।
ইমদাদ হোসেনের জন্ম ১৯২৬ সালের ২১ নভেম্বর, চাঁদপুরে। বাবার নাম মজিদ বক্স, মায়ের নাম সাবেদুন নেসা। তার শৈশব-কৈশোর কেটেছে ঢাকার কেরানীগঞ্জে পৈত্রিক বাড়িতে। স্কুলের লেখাপড়াও সেখানেই।
প্রথম ব্যাচের ছাত্র হিসেবে ইমদাদ ১৯৪৮ সালে ভর্তি হন তৎকালীন ঢাকা আর্ট কলেজে (বর্তমানে চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)। ১৯৫২ সালে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য ইমদাদ চারুকলার ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
ভাষা আন্দোলনের পরও নানা সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ চালিয়ে যান ইমদাদ। ১৯৬১ সালে ছায়ানট প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই শিল্পী ইমদাদ হোসেন ছিলেন সংগঠনটির একজন সক্রিয় সদস্য। ১৯৬৯ সালে স্বাধিকার আন্দোলনে তুমুল ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের সময়ে প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শিল্পী কামরুল হাসানের সঙ্গে মিলে প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে 'চারু শিল্পী সংস্থা' গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।
শিল্পী ইমদাদ সারা জীবনই যুক্ত ছিলেন সৃষ্টিশীল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। স্বাধীনতার পর ভাষা আন্দোলনের স্মারক কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নতুন করে নির্মাণের উদ্যোগে ভূমিকা রাখেন তিনি। ১৯৭৪ সালে শহীদ মিনারের মূল স্তম্ভের পেছনে বিশালাকৃতির লাল সূর্যের নকশাটি যোগ হয় এই ভাষা সৈনিকের প্রস্তাব অনুসারেই।
আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের শেষদিকে তৎকালীন চারুকলা ইন্সটিটিউটের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখে বাংলা নববর্ষের শোভাযাত্রা শুরুর সময়েও সক্রিয় প্রবীণ এই শিল্পীই এর নাম দেন 'মঙ্গল শোভাযাত্রা'।
১৯৬০ সালে ইস্ট পাকিস্তান ডিজাইন সেন্টারে নকশাবিদ হিসেবে পেশাজীবন শুরু করেন ইমদাদ। পরের বছরই শিল্প নির্দেশক হিসেবে যোগ দেন 'ইউএসএআইডি মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন সেন্টার'-এ। ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটে জ্যেষ্ঠ প্রভাষক হিসেবে শিক্ষকতায় যোগ দেন তিনি।
১৯৬৬ সালে প্রধান নকশাবিদ হিসেবে কাজ শুরু করেন পূর্ব পাকিস্তান টেলিভিশন ঢাকা কেন্দ্রে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ টেলিভিশনের লোগো নকশা করেন শিল্পী ইমদাদ হোসেন। ১৯৭৬ সালে অবসর নেন বাংলাদেশ টেলিভিশন থেকে।
১৯৭৬ সালেই যোগ দেন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন 'বিসিক'-এ। ১৯৯১ সালে অবসরে যাওয়ার সময় তিনি ছিলেন সংস্থাটির প্রধান নকশাবিদ।
ইমদাদ হোসেন ১৯৫৪ সালের ২১ নভেম্বর বিয়ে করেন। তার স্ত্রীর নাম মনোয়ারা বেগম বকুলি। চার ছেলে ও দুই মেয়ের জনক এই শিল্পী নিজের পরিবারকেও গড়ে তুলেছেন যথার্থই শিল্পী পরিবার হিসেবে। তার তিন ছেলেই চারুকলায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণকারী শিল্পী। মেজ ছেলে শিল্পী নিসার হোসেন বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অংকন ও চিত্রায়ন বিভাগের অধ্যাপক।
শিল্পকলায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১০ সালে একুশে পদক লাভ করেন ইমদাদ হোসেন।
গত কয়েক বছর ধরে অসুস্থ থাকলেও ২০১০ সালেই বেশি ভুগতে হয়েছিলো ইমদাদকে। হাসপাতালেও ছিলেন কিছু দিন।
শ্বাস কষ্টে ভুগলে গত বুধবার পুনরায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই রোববার তার জীবনের অবসান ঘটলো।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এএমটি/এমআই/১৩৪৮ ঘ.
bdnews24