গ্রামীণ টেলিকম: আইনজীবী ইউসুফকে নিয়ে তদন্তে হাই কোর্টে আবেদন

আদালতের বাইরে ‘সমঝোতা’ করে দেওয়ার নামে গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিক-কর্মচারীদের আইনজীবী ইউসুফ আলীর কয়েক কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগের তদন্ত চেয়ে হাই কোর্টে রিট আবেদন করেছেন আরেক আইনজীবী।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 6 July 2022, 01:40 PM
Updated : 6 July 2022, 01:40 PM

আইনজীবী ইউসুফ আলী।

এ ঘটনায় ‘সংক্ষুব্ধ’ হয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আশরাফুল ইসলাম বুধবার হাই কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এ আবেদন করেন। এতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও সচিব এবং আইনজীবী ইউসুফ আলীকে বিবাদী করা হয়েছে।

আইনজীবী ফি হিসেবে বিপুল পরিমাণ অর্থ নেওয়া হয়েছে কি না বা হয়ে থাকলে তার আইনি বৈধতা কী, তা তদন্তের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে আবেদনে।

পাশাপাশি বিষয়টি গণমাধ্যমে যথেষ্ট প্রচার হওয়া সত্ত্বেও এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএফআইইউ জানার পরও কেন বার কাউন্সিল জানবে না এবং আইনজীবীদের সম্মান রক্ষায় কেন বিষয়টি তদন্ত করা হবে না, এই রুল চাওয়া হয়েছে আদালতের কাছে।

বৃহস্পতিবার হাই কোর্টের একটি অবকাশকালীন বেঞ্চে এ রিট আবেদনের উপর শুনানি হওয়ার দিন ধার্য রয়েছে বলে সাংবাদিকদের জানান আইনজীবী আশরাফুল।

এদিকে এর প্রতিক্রিয়ায় ইউসুফ আলী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এ রিট করা প্রয়োজন ছিল না। যেহেতু বিষয়টি সংশ্লিষ্ট আদালত শুনবেন, শুনানির জন্য ২ অগাস্ট দিন ধার্য আছে। তারপরেও রিট করেছেন, করতেই পারেন। এ বিষয়ে তার স্বাধীনতা আছে।”

গ্রামীণ টেলিকমের প্রায় দুইশ শ্রমিক-কর্মচারী তাদের পাওনা ৪৩৭ কোটি টাকা আদায়ে আদালতে মামলা করেছেন। সেই মামলায় কর্মীদের পক্ষে লড়ছেন ইউসুফ আলী।

সম্প্রতি একটি অনলাইন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রামীণ টেলিকমের কর্মীদের আইনজীবী ইউসুফ আলীকে ১২ কোটি টাকা দেওয়ার বিনিময়ে গ্রামীণ টেলিকমের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো আদালতের বাইরে ‘সমঝোতায়’ মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে।

এর মধ্যে বাদী-বিবাদী পক্ষ থেকে হাই কোর্টকে জানানো হয়, পাওনা পরিশোধের আশ্বাসে দুই পক্ষের সমঝোতা হয়েছে, ফলে ১১০টি মামলা চালাতে চান না তারা।

এদিকে সংবাদ প্রতিবেদন নজরে এলে গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিক-কর্মচারীদের পাওনা ৪৩৭ কোটি টাকা পরিশোধের বিষয়ে উভয় পক্ষকে যৌথভাবে প্রতিবেদন দাখিল করতে গত বৃহস্পতিবার নির্দেশ দেয় হাই কোর্ট।

ওই দিন শুনানির সময় বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার বলেন, “আমরা শুনেছি, টাকার বিনিময়ে কর্মচারীদের আইনজীবী পক্ষপাতদুষ্ট ছিলেন এবং কর্মচারীরা সমঝোতার মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তি করতে বাধ্য হয়েছেন।”

তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলেন, “শুধু বাংলাদেশেই নয়, এই উপমহাদেশে এমন কোনো আইনজীবী নেই, যিনি একটি মামলায় ১২ কোটি টাকা ফি নিতে পারেন।”

এ নিয়ে আলোচনার মধ্যে গত রোববার সুপ্রিম কোর্টে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন সর্বোচ্চ আদালতের আইনজীবী ইউসুফ আলী দাবি করেন, ‘স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়’ মক্কেলদের থেকে ফি হিসেবে অর্থ পেয়েছেন তিনি।

তবে ‘মক্কেল ফি’ হিসেবে কত টাকা পেয়েছেন, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাব দিতে রাজি হননি এই আইনজীবী। ওইদিন তিনি বলেছেন, তার এবং তার সহযোগীদের ছয়টি ব্যাংক হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএফআইইউ জব্দ করেছে।

এসব বিষয় নিয়ে বুধবার রিট আবেদনকারী আইনজীবী আশরাফুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল অর্ডিন্যান্স-১৯৭২ এর আচরণবিধিতে বলা আছে কীভাবে একজন আইনজীবী ফি নেবেন।

“একজন আইনজীবী কখনোই কোনো ক্লায়েন্টের সম্পত্তির উপর ফিস নিতে পারবেন না। এমনকি কোনো মামলায় যদি কোনো ইন্টারেস্ট থেকে থাকে, সেখানেও কোনো আইনজীবী সম্পৃক্ত হতে পারবেন না। বহু পারসন আমাদের কাছে আসেন, যারা বড় বড় সম্পত্তি সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে, আমরা যদি সেই প্রপার্টির একটা অংশ চাই, তাহলে আমাদের আইনজীবীদের আচরণবিধি লঙ্ঘন হবে।”

গ্রামীণ টেলিকমের কর্মীদের থেকে কোটি কোটি টাকা আইনজীবী ফি নেওয়ার বিষয়টি গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারের পর একজন আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ববোধ থেকে এ রিট আবেদন করেছেন জানিয়ে আশরাফুল বলেন, “কারণ আইনজীবী সম্পর্কে বার কাউন্সিলের আইনে বলা আছে যে, আমরা সব সময় প্রটেক্ট প্রিভেন্ট অ্যান্ড ডিফাইন করব ল’কে এবং আমরা সর্বোচ্চ নৈতিকতা দেখিয়ে চলব। তো আমরাই যদি রেগুলেশন ফলো না করি, তাহলে সাধারণ মানুষ কি করবে?”

আইনজীবীর ফি ১২ কোটি টাকার বিষয়ে নতুন প্রজন্মের আইনজীবীদের কেউ কেউ এ ব্যাপারে অতিউৎসাহী হয়েছেন, সেটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে দেখেছেন উল্লেখ করে এই আইনজীবী বলেন, “আইনে বলা আছে, যেহেতু আইনজীবীরা রুল অব ল’কে একজিস্ট করবে তাহলে তারা রেগুলেশনের মধ্য থাকবে। তারা যদি অসহায় ব্যক্তির অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তার প্রপার্টি অথবা ইন্টারেস্টের মধ্যে সম্পৃক্ত হয় তাহলে তা একটি দেশ ও জাতির জন্য বিপর্য নিয়ে আসবে।”

গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিক-কর্মচারীদের আইনজীবী ইউসুফ আলীর এক বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় আশরাফুল ইসলাম বলেন, “আমি ৩০০ কোটি ৪০০ কোটি টাকা বের করে দিয়েছি, তুমি ৪০০ কোটি কেন, হাজার কোটি টাকা আর্ন করে দিলেও সেটা হচ্ছে ক্লায়েন্টের মানি, তুমি তোমার ফিস শুধু নিতে পারো। আর উনি (ইউসুফ আলী) স্পেসিফিক করেননি যে কত টাকা নিয়েছেন। কথা হচ্ছে- আইনজীবী যে ফিসই নিবে না কেন সেটা খুব স্বচ্ছতার সাথে হবে, সেটা তার ক্লায়েন্ট এবং সবাই জানবে।”

এদিকে ১১০টি মামলা প্রত্যাহারের ঘটনাটিকে বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাত হিসেবে দেখিয়ে করা আরেক মামলায় গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মো. কামরুজ্জামান (৩৭) এবং সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ মাহমুদ হাসানকে (৪২) মঙ্গলবার গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক